তিরিশের দশকের গোড়ায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের খ্যাতি তখন তুঙ্গে, নানাভাবে প্রভাবিত হয় তারই অনুগামী কলকাতার এক ছাত্র সরাসরি শান্তিনিকেতনে কবিগুরুর কাছে একাকী হাজির হলেন অটোগ্রাফ পাওয়ার আশায়। কবির হাতে তুলে দিলেন খাতা ও কলম এবং পরিশেষে কলমটি ফেরত নিয়ে উৎসাহে বলে ফেলেছিলেন, ‘ভবিষ্যতে বড় হয়ে লেখক হতে চাই।’ প্রত্যুত্তরে কবি বলেছিলেন, ‘রবীন্দ্রনাথের ছোঁয়া পেন দিয়ে লিখলে লেখক হওয়া যায় না।’
আশ্চর্যযের বিষয় হলো এই ঘটনার কিছুকালের মধ্যেই লেখালেখি জগতে বিশেষ পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন সেই ছাত্র। যার নাম ডক্টর নিহার রঞ্জন গুপ্ত। বাংলা সাহিত্যের রহস্য উপন্যাসের আঙ্গিনায় এক নবযুগ সৃষ্টিকারি লেখক।
১৯১১ সালের ৬ জুন তৎকালীন অবিভক্ত ভারতের যশোরের, বর্তমান বাংলাদেশের নড়াইল জেলার লোহাগড়া উপজেলার ইটনায় এক বিখ্যাত কবিরাজ বংশের তার জন্য বাবা ছিলেন সত্যরঞ্জন গুপ্ত এবং মা লবঙ্গলতা দেবী। শৈশব কাল অতিবাহিত হয় তার কলকাতায়। কৃষ্ণনগর স্কুলে পড়ার সময় ছোটদের জন্য তিনি নানা ধরনের লেখালিখি করতেন এবং সেই থেকেই তার মনে লেখক হওয়ার সুপ্ত বাসনা জন্মায়। ১৮ বছর বয়সে তৎকালীন জনপ্রিয় শিশুদের পত্রিকা শিশু সাথিতে ধারাবাহিক ছোটদের উপন্যাস ‘রাজকুমার’ লিখতে শুরু করেন। সেই যে সাহিত্যের অঙ্গনে তাঁর পথ চলা শুরু হয়, নিরবিচ্ছিন্নভাবে একটানা ছয় দশক ধরে নানা সাহিত্য সৃষ্টি করে পাঠকদের আনন্দ দান করে গেছেন। নীহার রঞ্জন গুপ্তের উপন্যাসের সংখ্যা প্রায় দুইশতেরও বেশি।
ওপার বাংলা থেকে এপার বাংলায় এসে কৃষ্ণনগর কলেজ থেকে আইএসসি ডিগ্রি অর্জনের পর কলকাতায় কারমাইকেল মেডিকেল কলেজ (বর্তমান যার নাম আরজিকর মেডিকেল কলেজ ও হসপিটাল) থেকে ডাক্তারি পরীক্ষা। কৃতকার্য হন। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে চট্টগ্রাম থেকে মিশর পর্যন্ত বিশ্বের বহু দেশের সেনাবাহিনী ডাক্তার হিসেবে কাজ করেন। সেই সময় রণাঙ্গনের বহু ঘটনা, অভিজ্ঞতা নিয়ে লিখলেন ‘ঝড়’ উপন্যাসটি। আবার স্বাধীনতার পর স্বাধীনতা আন্দোলনে বিভিন্ন ঘটনা নিয়ে তিনি রচনা করেছেন তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘বিদ্রোহী ভারত’। বিশ্বের বহু বিশিষ্ট রহস্য কাহিনী পাঠ করে তাঁর নিজস্ব ভঙ্গিতে তিরিশ দশকে তিনি খণ্ডে খণ্ডে রচনা করেছিলেন ‘কালভ্রমর’ নামক সার্বকালীন সুপার ডুপার হিট বইটি। প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে অসম্ভব জনপ্রিয় হয়েছিল গ্রন্থটি লেখক সেই থেকেই বাঙালি পাঠক্রমণে বিশেষভাবে চিহ্নিত হয়ে গেলেন রহস্যকাহিনীর এক জনপ্রিয় স্রষ্টা হিসেবে।

বাংলাদেশের নাড়াইলে বসত বাড়ি।
ছাত্রাবস্থায় তার বড় বোনের পোকার কামড়ে মৃত্যু হয়। চিকিৎসা বিজ্ঞানের মহান পেশায় নিয়োজিত থেকে রোগ সরানোর সংকল্পে তিনি লন্ডন থেকে ডার্মেটোলোজি বা চর্মবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী লাভ করেন। এরপর তিনি কলকাতার মেডিকেল কলেজে কাজে যোগদান করেন। ভারতবর্ষের বিভিন্ন হাসপাতালে তিনি কাজ করেছেন। বিলেতের ডাক্তারি পড়ার সময় ব্যক্তিগত কৌতূহলবশত বিখ্যাত রহস্যকাহিনীকার আগাথা ক্রিস্টির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন তার বাড়িতে গিয়ে।
এরপরই দেশে ফিরে এসে নির্মাণ করেন কিরীটী চরিত্র। উৎসাহী বাঙালি পাঠকের কাছে অনন্য এক চরিত্রের নাম কিরীটী রায়। লেখকের ছেলেবেলায় প্রত্যক্ষ করা এক আত্মহত্যা ও অন্তঃসত্ত্বা বিধবা বৌদিকে গুলি করে যক্ষারোগ আক্রান্ত তার অসুস্থ দেওর — এমন কিছু ঘটনাগুলোই পরবর্তীতে গোয়েন্দা চরিত্র নির্মাণ করতে তাঁকে প্ররোচিত করে। এত ঝকঝকে হ্যাট কোট, সুট বুট, হাভানা চুরুট, কেতা দুরস্ত ইংরেজি কথা বলা বুদ্ধিদীপ্ত গোয়েন্দা চরিত্র বাংলা সাহিত্যে খুব কমই খুঁজে পাওয়া যায়। বাঙালি হয়েও নিখুঁত তার সাহেবিয়ানা। তাই আজও বাংলা বইয়ের বাণিজ্যের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য মাইলস্টোন হয়ে আছে ১৪ খন্ডের “কিরীটি অমনিবাস”।
গোয়েন্দা প্রবর কিরীটি রায় ছিলো নিহার রঞ্জনের মানসপুত্র। কিরীটি চরিত্রে এতটাই মুগ্ধ ছিলেন তিনি, যে মহানায়ক উত্তম কুমার এই চরিত্রে অভিনয় করার জন্য নিহার রঞ্জনের কাছে ছুটে এলেও বিনীত ভাবে নিহার রঞ্জন জানিয়ে দেন, ‘আপনি কিরীটি রায় হলে আপনাকে কিছুতেই মানবে না।’
কিরীটিকে যে নিহার রঞ্জন সেলুলয়েডে আনতে চাননি তা নয়, তিনি মনে করতেন কেউ যদি এই চরিত্র করতে পারেন, তবে তিনি অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়। অবশ্য অজিতেশবাবু এ কথা জানতে পারেননি।
পেশায় ডাক্তার নিহাররঞ্জন চিকিতসাশাস্ত্রর জ্ঞান প্রয়োগ করেছিলেন তার গল্পে। ‘ক্যাকটাসের বিষ ‘ ,’ মরফিন ‘, ‘হাইপোডার্মিক নিডল’ ‘একিমোসিস’ এর মত গল্পে তার নমুনা দেখা যায়। তার কাহিনীতে প্রায়ই প্রাধান্য পেয়েছে অবচেতন মনের দুঃস্বপ্ন, মৃত্যুভয় , আত্মহত্যা প্রবণতার মত মনস্তাত্ত্বিক বিষয়।
আপাতগম্ভীর স্বল্পভাষী এই মানুষটি নিজের কাজেই বেশি নিমগ্ন থাকতেন। সভা সমিতিতে যাওয়া পছন্দ করতেন না। রবীন্দ্র সংগীতের প্রতি বিশেষ আকর্ষণ অনুভব করতেন। সময় পেলে স্ত্রী কন্যাদের নিয়ে রবীন্দ্র সংগীত শুনতে বসে যেতেন। তিনি নিজেও ভালো বাঁশি বাজাতে পারতেন। স্বপ্নাদেশ পেয়ে বৃন্দাবন থেকে কষ্টিপাথরের একটি গোপাল ঠাকুর নিয়ে এসেছিলেন বাড়িতে। নিত্য পুজা পাঠ করতেন । রবীন্দ্র সরোবরের ধারে প্রাতঃ ভ্রমণ-এর সঙ্গী থাকত প্রিয় জ্যাকলিন। অ্যালসেশিয়ানটির নাম তাঁরই দেওয়া।

পরিবারের সকলের সঙ্গে নীহাররঞ্জন গুপ্ত
ভালবাসতেন ভুরভুরে গন্ধজর্দা দিয়ে পান খেতে। নাখোদা মসজিদের কোন এক দোকান থেকে নিয়ম করে তাই নিয়ে আসতেন ‘গুলি জর্দা ‘। মৎস্যপ্রীতি বাঙ্গালীটির পাতে সরষে ইলিশ থাকলে খাওয়া-দাওয়াটা যেন অন্য মাত্রা পেত।
তার লেখা অসংখ্য গল্প উপন্যাস বাংলা ও হিন্দিতে চলচ্চিত্রায়িত হয়েছে। বাণিজ্যিক মঞ্চে তার লেখা নাটক দীর্ঘকাল জনপ্রিয়তা শিখরে ছিল। অগ্রদূতের পরিচালনায় লালুভুলু উপন্যাসটি নিয়ে যে ছবি তৈরি হয়, সেই ছবি দুই বাংলাতেই বেশ জনপ্রিয় হয়।উপন্যাস ‘লালুভুলু’ পাঁচটি ভাষায় চিত্রায়িত হয়েছে।নীহার রঞ্জনের অন্তত ৪৫টি উপন্যাস চলচ্চিত্রায়িত হয়েছে। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘উল্কা’, ‘বহ্নিশিখা’, ‘উত্তর ফাল্গুনী’, ‘লালুভুলু’, ‘হাসপাতাল’, ‘মেঘ কালো’, ‘রাতের রজনীগন্ধা’, ‘নিশিপদ্ম’, ‘নূপুর’, ‘ছিন্নপত্র’, ‘বাদশা’, ‘কোমল গান্ধার’, ‘মায়ামৃগ’, ‘কাজললতা’, ‘কন্যাকুমারী’, ‘কলঙ্কিনী কঙ্কাবতী’ প্রভৃতি।
নিয়মিত লেখালেখির কাজ করতেন। গোলপার্কে নিজের বাড়ির নাম রেখেছিলেন “উল্কা”।সেখানে লেখক বন্ধুরা ছাড়াও উত্তম কুমার হেমন্ত মুখোপাধ্যায় থেকে শুরু করে বহু বিশিষ্টজন ছুটে আসছেন নানা প্রয়োজনে জমিয়ে চলতে নানান গল্প। সেই আড্ডার মধ্যমণি থাকতেন প্রমথনাথ বিশী।অগ্রজ লেখক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিশেষ শ্রদ্ধার চোখে দেখতেন তিনি। কাল ছিলো তাঁর ১১২তম জন্মদিবস। প্রিয় লেখক নীহাররঞ্জন গুপ্তকে জানাই অশেষ শ্রদ্ধা ও অভিবাদন।
*ড.নীহার রঞ্জন গুপ্ত* আপনার কলমে নতুন করে
জীবন্ত হলেন চমৎকার উপস্থাপনায়।কিরীটি রায়*
আর “কলো ভ্রমর” ভীষণভাবে আকৃষ্ট করেছিলো
আমার মা আর আমাকে।একটানা দুমাস আমরা
ড.নীহার’র সমস্ত লেখা পড়ে ফেলেছিলাম।মা’র
পড়া শেষ হলে তবে আমি পেতাম।বাংলা সাহিত্য
জগত অনেক গোয়েন্দাদের সঙ্গ পেয়েছে কিন্তু
ভীষণভাবে ভালোবাসা পেয়েছেন “কিরীটি রায়”
আপনার প্রতিবেদনের মাধ্যমে প্রিয় “নীহার বাবু”
শ্রদ্ধাঞ্জলিতে আবার ভালোবাসায় ভাসালেন।
ভালোলাগা ভালোবাসা।
নীহার রঞ্জন গুপ্তের গোয়েন্দারহস্যের বই পড়তে দুর্দান্ত লাগে। তবে মিত্র ঘোষ সব বইগুলোর অসম্ভব
দাম বাড়িয়েছে।
আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ জানাই ❤️
খুব ছোটবেলায় যখন Library র বই পড়া শুরু করি, আমার প্রথম প্রেম নীহার বাবু। মনে হয় আমি ওনার সব বইই পড়েছি। ভীষণ addicted হয়ে পড়েছিলাম। বাড়ির আর সকলকেও পড়া করাতাম। তুই একজনের নাম নিলি না তো! সু ওরফে সুব্রত, কিরিটির assistance. ওনার লেখার Style ছিল অনবদ্য। এক নি:শাষে বই গুলো শেষ করতাম।
নীহাররঞ্জন গুপ্তর সৃষ্টি প্রতিটি চরিত্র অনবদ্য। কিরীটি রায় এদের মধ্যে শ্রেষ্ট। দারুণ ইন্টারেস্টিং।
মতামতের জন্য থ্যাঙ্ক ইউ মামা ❤️