পুরনো বাতিল খবরের কাগজের ক্লিপিংসে অভিনব এক মিউজিয়াম খেজুরির মধুসূদন জানার। অমূল্য সম্পদে ভরা খবরের কাগজের ক্লিপিংসে ভরা মিউজিয়ামের পোষাকি নাম ‘খেজুরি নিউজ পেপার মিউজিয়াম’ রেখেছেন স্বয়ং মধুসূদন জানা। কী নেই সেখানে? মধুসূদন বাবুর এই অমূল্য সম্পদে ভরা পুরনো বাতিল খবরের কাগজের খেজুরি নিউজ পেপার মিউজিয়ামে বা সংগ্রহশালায় প্রায় ৭৫ থেকে ৮০বছরের পুরনো খবর কাগজের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ, প্রতিবেদন ও তথ্যচিত্র ছাড়াও ১২১ রকমের পত্র পত্রিকার সংবাদের সংগ্রহ আর বাংলা, ওড়িয়া, ইংরেজি, তামিল, মালায়ালম, উর্দু ও তেলেগু, সহ ১১টি ভাষার পত্র পত্রিকার তথ্যচিত্রের ক্লিপিংস রয়েছে। মধুসূদনবাবুর কথায়, “সংবাদ বা সংবাদপত্র কখনও বাসি হয়না।” সংবাদপত্রের গুরুত্ব কতোটা যে অপরিসীম তা বোঝাতে নিজের বাড়ি ‘জাদুভবন’-এ ব্যক্তিগত উদ্যোগে খেজুরি নিউজ পেপার মিউজিয়াম নামে সংবাদপত্র ক্লিপিংস সমৃদ্ধ সংগ্রহশালা গড়ে তুলেছেন।

খেজুরির উত্তর কলমদান গ্রামের বাসিন্দা মধুসূদন জানার এই অভিনব মিউজিয়াম সংগ্রহে থাকা উল্লেখযোগ্য কয়েকটি ক্লিপিংসের মধ্যেই ১৯৪৭ সালের ১৫ই আগস্ট ভারতের প্রথম স্বাধীনতা দিবসের সংবাদপত্র, জওহরলাল নেহেরুর প্রথম জাতীয় পতকা উত্তোলনের খবর ও ছবি, মহাত্মা গান্ধীর শেষ অনশন ও অসহযোগ আন্দোলনের বৈঠকের তথ্যচিত্র, ১৮৭৪ সালের কলকাতার তথ্য ও ছবি, কলকাতাতে প্রথম ট্রাম চালু, ১৯৫০ সালে ভারতের প্রথম প্রজাতন্ত্র দিবস, শহিদ ক্ষুদিরামের ফাঁসির স্থল, ১৯১২ সালে টাইটানিক জাহাজ ডুবির তথ্য ও ছবি ছাড়াও মাদার টেরিজার প্রয়াণ, প্রথম কার্গিল যুদ্ধ ও প্রথম বিধবা বিবাহের তথ্য ও ছবি অন্যতম। এ ছাড়াও পুলওয়ামা অ্যাটাক, বিভিন্ন বিশ্বকাপ ক্রিকেট ও ফুটবল, নোট বাতিল, রাজস্থানের ভুজের ভূমিকম্প, বুলবুল, আমফান প্রাকৃতিক বিপর্যয় সহ প্রায় আড়াই হাজারের বেশি উল্লেখযোগ্য ঘটনার সংবাদপত্রের তথ্য ও ছবি সংরক্ষণ রয়েছে। এছাড়াও চিন, নেপাল, বাংলাদেশ, আরব প্রভৃতি দেশের সংবাদপত্রও স্থান পেয়েছে তাঁর সংগ্রহশালায়।

পূর্ব মেদিনীপুরের খেজুরি -১ ব্লকের উত্তর কলমদান গ্রামের বাসিন্দা বছর চৌত্রিশের মধুসূদন জানা ভূগোলে এম এ, বি .এড করে দশবছর ধরে ভূপতিনগর থানার ঘোলবাগদা হাইস্কুলের আংশিক সময়ের শিক্ষকতার সঙ্গে যুক্ত। শিক্ষকতা করে যে উপার্জন করেন তাতে সংসার চলে না। তাই বিভিন্ন অনুষ্ঠানে জাদুকর হিসেবে জাদু প্রদর্শন করে থাকেন। জাদুকর হিসেবেও স্থানীয় এলাকায় যথেষ্ট জনপ্রিয় মধুসূদন নিজের বাড়ির নামও রেখেছেন ‘জাদুভবন’। এছাড়াও অবসর সময়ে হাতুড়ে বা কোয়াক ডাক্তার হিসেবে রোগীও দেখে থাকেন। প্রতিদিন সন্ধ্যার পর থেকে গভীররাত পর্যন্ত বাড়িতেই চলে সংগ্রহশালার জন্য সংবাদপত্রের সংবাদ ও ছবি সংরক্ষণের কাজ। গোটা ছয়েক সংবাদপত্র কেনা হয় প্রতিদিনই। সেই সংবাদপত্র বা খবরের কাগজ থেকে প্রয়োজনীয় খবর ও ছবি কাঁচি দিয়ে কেটে গাম দিয়ে তা এ-ফোর কাগজে পেস্ট করতে হয়। মধুসূদনবাবুকে এ কাজে তাঁর পরিবারের সদস্যরাও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন। পরিবার বলতে বাবা কার্তিকচন্দ্র জানা, স্ত্রী শেফালী ও একমাত্র ছেলে অদ্রিত। সকলেই একসঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে কাগজ কাটিং, পেস্ট করা যাবতীয় কাজে সহযোগিতা করেন। মা নমিতা জানা’র বছর খানেক আগে মৃত্যু হয়েছে। তিনিও ছেলের ক্লিপিংস সংরক্ষণের কাজে যাবতীয় সহযোগিতা করতেন।

২০২৩ সালে বাংলাদেশের ‘বিদ্যাপীঠ সাহিত্য পরিষদ’ নামে একটি সাহিত্য সংগঠনের পক্ষ থেকে তাদের অষ্টম বার্ষিক প্রতিষ্ঠা দিবসে ঢাকার কবি সুফিয়া কামাল অডিটোরিয়ামে পশ্চিমবঙ্গের পূর্ব মেদিনীপুরের খেজুরির প্রত্যন্ত গ্রাম উত্তর কলমদানের মধুসূদন জানাকে তাঁর অভিনব এই উদ্যোগ ও প্রচেষ্টার জন্য গুনীজন সংবর্ধনা দেন।
সুকুমার রায়, জ্যোতি বসু, রজনীকান্ত সেন, অতুলপ্রসাদ সেন, বুদ্ধদেব বসু, বুদ্ধদেব গুহ, শঙ্খ ঘোষ, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, সুচিত্রা সেন প্রমুখ পশ্চিমবঙ্গের যে সমস্ত রাজনীতিক, সাহিত্যিক, কবি বা অভিনেতাদের আদি বাড়ি বাংলাদেশে ও সেই সব মানুষদের এদেশের বিভিন্ন সংবাদপত্র ও পত্র পত্রিকার তাঁদের নিয়ে প্রকাশিত সংবাদের কাটিং নিয়ে ঢাকার কবি সুফিয়া কামাল অডিটোরিয়ামে প্রদর্শন করেন প্রশংসিত হন মধুসূদন জানা। প্রতিবছর পনেরোই আগস্ট স্বাধীনতা দিবসের দিন উত্তর কলমদানের নিজের বাড়িতেই ‘দিকদর্শন’, ‘সমাচার দর্পণ’ ‘সংবাদ প্রভাকর’ থেকে তমলুকের ‘তাম্রলিপ্ত’ ও কাঁথির ‘নীহার’ পত্রিকার প্রথম স্বাধীনতা দিবস নিয়ে প্রকাশিত সংবাদের ক্লিপিংস নিয়ে প্রদর্শনীর আয়োজন করে থাকেন।

এক জেদ থেকেই তাঁর এই সংবাদপত্রের ক্লিপিংস সংগ্রহ, সংরক্ষণের আগ্রহ ও সংগ্রহশালার তৈরির নেপথ্য বলে মধুসূদন জানা জানান। বলেন, “একবার মাধ্যমিক পরীক্ষার ফল প্রকাশ হওয়ার পর স্কুলে এক সাংবাদিককে খবর সংগ্রহ করতে দেখি। পরের দিন একজন পাঠককে সেই সংবাদপত্র একটি আবর্জনার স্তূপে ফেলতে দেখি। মনে হয়েছিল কতজনের পরিশ্রমের ফসল একবেলায় আবর্জনার স্তুপে পরিণত হল। মনকে যা ধাক্কা দিয়েছিল। মাথায় নাড়া দিয়ে উঠল জেদ। শুরু হল সংবাদপত্র সংগ্রহ সংরক্ষণের কাজ।” মধুসূদন জানা মনে করেন, তাঁর এই সংরক্ষণের উদ্দেশ্য সকালের সংবাদপত্র বিকেলে বাসি আর পরে ঠোঙায় পরিণত হলেও সেই সংবাদপত্র যে আধুনিক সভ্যতার মেরুদন্ড ও তার গুরুত্ব অপরিসীম তাই জনসমক্ষে তুলে ধরার একটা ক্ষুদ্র প্রয়াস। মধুসূদন জানা বলেন, “আমার এই সংরক্ষণের মূল উদ্দেশ্য হল, সংবাদের মূল্য, সাংবাদিকদের অক্লান্ত পরিশ্রমের মূল্য ও সর্বোপরি সংবাদপত্রের মূল্য আজকের সমাজের কাছে তুলে ধরা।