নবগ্রহের রাজা সূর্যকে জগতের আত্মা বলা হয়। তার কৃপাতেই পৃথিবীতে প্রাণের সঞ্চার ঘটেছে। সকল দেবতাদের মধ্যে কলিযুগে সূর্য দৃশ্যমান দেবতা। ভারত-সহ নানান দেশে সূর্যের নানান মন্দির আছে। তবু আজো শারদীয় মহাবিষুবে (২৩ শে সেপ্টেম্বর) সূর্যের প্রথম কিরণ পরে শতাব্দী প্রাচীন মধেরার সূর্য মন্দিরে খোদিত সূর্যবেদীর উপর।
শুধু শ্রদ্ধা নয়, প্রতি বছর হাজার হাজার পর্যটক আজকের দিনে এখানে আসেন ইতিহাসের অনন্য কীর্তির সাক্ষী হতে। মন্দিরগাত্রে শুধু পৌরাণিক কাহিনী নয়, নানা স্থানে রয়েছে জ্যামিতিক ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের রকমারি নক্সা।
গুজরাটের আমেদাবাদ থেকে মাহেসানাগামী ঝকঝকে হাইওয়ে ধরে যেতে হবে মধেরা। আমেদাবাদ থেকে ১০০ কিমি আর মাহেসানা শহর থেকে মধেরা ৩৫ কিমি। পুষ্পবতী নদীর তীরে ফুলের বাগান ও নানা গাছে সাজানো বিশাল চত্বরের মধ্যে মধেরার বিখ্যাত সূর্য মন্দির।

স্কন্দ পুরাণ ও ব্রহ্ম পুরাণে মধেরাকে ‘ধর্মারণ্য’ নামে অভিহিত করা হয়। ব্রহ্ম পুরাণের মতে রাবণকে হত্যা করে লঙ্কা বিজয়ের পর শ্রীরামচন্দ্র পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে বশিষ্ঠমুনির নির্দেশে ধর্মারন্যে গিয়ে যোগ সাধনা করতে যান। শ্রীরাম এখানে এসে সীতাপুর নামে একটি গ্রাম তৈরি করেন।
১০২৬ সালে সোলাঙ্কি রাজবংশের রাজা প্রথম ঋষভ ভীমদেব প্রতিষ্ঠা করেন এই মন্দির। মন্দিরটি এমনভাবে নির্মিত যাতে প্রতিবছর ২০ শে মার্চ ও ২১/২৩ শে সেপ্টেম্বর গর্ভগৃহে সরাসরি পূর্বের প্রথম আলো এসে পড়ে। একদিকে যেখানে মন্দির নির্মাণ হচ্ছে গুজরাটের অন্যপ্রান্তে তখন সোমনাথ মন্দির লুণ্ঠন করছে সুলতান মামুদ। মধেরা মন্দিরটি ধ্বংস করেনআলাউদ্দিন খিলজি।
ঐতিহাসিকদের মতে গুজরাটের স্বর্ণযুগের সাক্ষী মধেরা। যে সময় মধেরার সূর্য মন্দির নির্মাণের কাজ চলছে তখন গুজরাটের অন্যপ্রান্তে সোমনাথ মন্দির লুন্ঠন করছেন সুলতান মামুদ। মধেরা ধ্বংস করার চেষ্টা করেন প্রথম আলাউদ্দিন খিলজি।

সূর্য মন্দিরের মূলত তিনটি অংশ। সম্মুখ ভাগের প্রথম অংশের নাম রংমহল বা গুরা মণ্ডপ। গুরা মণ্ডপটি বিশাল হলঘর ও গর্ভগৃহ সম্বলিত। মন্ডপের কারুকার্য দেখার মতো৷ উপরের ছাদটি গম্বুজাকৃতি৷ পাঠানদের আক্রমণের সময় এটিই সোলাঙ্কি রাজাদের প্রধান মন্ত্রণালয় ছিল৷ ভিতরে একটি লম্বা সুড়ঙ্গও রয়েছে৷
কারুকার্যময় রংমহলের পরের অংশ নাটমণ্ডপ বা সভাগৃহ। এখানে মূলত ধর্মীয় অনুষ্ঠান হতো। সভা মণ্ডপে মোট ৫২ টি জটিল এবং দুর্বোধ্য কারুকাজময় নকশা খোদাইকৃত স্তম্ভ রয়েছে। বছরের ৫২ টি সপ্তাহের জন্য নিবেদিত স্তম্ভে রামায়ণ, মহাভারত, কৃষ্ণলীলা সহ নানান পৌরাণিক কাহিনী শিল্প কর্মের মধ্যে তুলে ধরা হয়েছে। এছাড়া এখানকার দেওয়ালে ১২টি শিল্পময় কুলুঙ্গি রয়েছে। এর মধ্যে খোদিত আছে সূর্য দেবতার ১২টি রূপ। এগুলি ১২ মাসের নির্দেশক।
সভা মণ্ডপের পরের অংশ গর্ভ গৃহ। গর্ভগৃহ আজ শূন্য হলেও এক সময় এখানে সাতটি ঘোড়ায় টানা স্বর্ণ রথের উপর রাখা থাকতো সোলাঙ্কি রাজবংশের কূলদেবতা দুর্মূল্য মণি মানিক্যে মোড়া সূর্য দেবতার মূর্তি। একসময় যে ভাবে বহু রত্ন, মণিমানিক্য, ভাস্কর্য ভারত থেকে বিদেশে চলে গেছে, তেমনি সুলতান মামুদ দেবমূর্তি লুঠ করে নিয়ে যান।

মন্দিরের সামনে চারিপাশে ধাপকাটা সিঁড়িসহ আয়তকার (৫৩.৬ x ৩৬.৬ মিটার) সূর্যকুন্ড বা রামকুণ্ড। পাথরের তৈরি সিঁড়ি এমনভাবে বিন্যস্ত যাতে সহজেই ভক্তরা নীচে নাবতে পারে। সিঁড়ির মাঝে আছে নানা মাপের ১০৮ টি মন্দির। নটরাজ শিব, বিষ্ণু এবং গণেশের পাথরের মূর্তি আছে সুর্যকুণ্ডের তিন দিকে। আজো নিয়মিত পুজো হয় মন্দিরের লাগোয়া প্রাচীণ শিব মন্দিরে। প্রতি বছর জানুয়ারি মাসে এখানে অনুষ্ঠিত হয় বিখ্যাত নৃত্য উৎসব।
মন্দিরের বাইরের দেওয়ালে ৮টি দিক বা দিকপাল সহ ১২টি ভিন্ন ভিন্ন ভঙ্গিতে সুর্যের খোদিত মূর্তি। এছাড়াও রয়েছে বিশ্বকর্মা, সরস্বতী, সিদ্ধিদাতা গণেশ ও সমুদ্র মন্থনের দৃশ্য।সোলাঙ্কি রাজাদের নির্মিত সুর্যের এই মন্দিরের শিল্পকলাতে যৌনআবেদন মুলক বিভিন্ন মোটিফের দৃশ্য। সেইকালে যৌনতাকে কোন নিষিদ্ধ বিষয় নয় বরং স্বাভাবিক প্রাকৃতিক প্রয়োজনীয় শারীরবৃত্তীয় ঘটনা হিসেবে দেখা হতো। এইজন্যই হয়তো যৌন কামনা উদ্রেককারী বিভিন্ন শৈল্পিক ভাবনার প্রকাশ দেখা যায়।

বর্তমানে অবশ্য মূল মন্দিরে পুজো হয় না। সংরক্ষিত এলাকাটির দায়িত্বে রয়েছে ভারতীয় পুরাতত্ব পর্ষদ বা আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া। মন্দির চত্বরে প্রবেশ করতে হলে টিকিট কাটতে হয়। সাধারণত একদিনের জন্য মধেরায় যান পর্যটকেরা। এখানে হোটেল বা রিসর্টের ব্যবস্থা না থাকলেও আহমেদাবাদ ও মাহেসেনায় থাকার সুব্যবস্থা আছে। সুযোগ হলে ঘুরে আসুন ঐতিহ্যবাহী এই মন্দিরে।।
Source : Various sources have been referred to for information.
ভালো লেখা। অনেক কিছু জানতে পারলাম।
অনেক ধন্যবাদ