বর্তমান বঙ্গ মিডিয়ার কাজকর্ম-র ধরন নিয়ে কিছু লিখতে বহুদিন ধরেই আগ্রহ হারিয়েছি। কিন্তু চল্লিশ বছরের সাংবাদিক জীবনের জার্নিটা তো ডিমেনশিয়া রোগ নয় যে ভুলে যাবো। ফলে সাংবাদিকতার অধঃপতন কানেও শুনতে হয় চোখেও দেখতে পাই।
মাঝে মাঝে আমার একটা কথা খুব মনে পরে। সাংবাদিকতার প্রথম দিকে খুবই শুনতাম, কুকুর মানুষকে কামড়ালে সেটা খবর নয় কিন্তু মানুষ কুকুরকে কামড়ালে তবেই তা খবর। কিন্তু কালক্রমে দু-পক্ষের কামড়া-কামড়ি এই পর্যায়ে চলে গেছে যে, কে কুকুর আর কে মানুষ সেটাই বোঝা যাচ্ছে না।
এইযে নিয়োগ কেলেঙ্কারির সঙ্গে যুক্ত একজন অভিযুক্তকে একদা মঞ্চে ডেকে সমাজসেবী হিসেবে পুরস্কার দেবার সময় সে চোর নাকি সাধু সেটা আপনারা জানতেন না। কি সুন্দর স্বীকারোক্তি তাই না?
বিষয় হচ্ছে, এতই যদি আপনাদের ক্ষমতা তাহলে যেকোনো ঘটনা নিয়ে সন্ধেবেলা বিপ্লব না করে নিজেরা তদন্ত করেন না কেন? ওই সূত্র মারফৎ খবরের এতই দম তাহলে কেন পুলিশের আগে নিজেরা খুঁজে বার করতে পারেননা খুন, চুরি, দুর্নীতির রহস্য উদঘাটন? কেন নড়িয়ে দিতে পারেন না সরকারের ভিত? অথচ আমার নিজেরই সাংবাদিক জীবনে সাদা বাড়ি কালো গ্রিলের করা খবরে বামফ্রন্ট জমানায় অন্তত দুই তিনজন মন্ত্রীর পদত্যাগ করার মত ঘটনা ঘটেছে।
আসলে এই খবর না খুঁজেই খবর ছড়ানো এখনকার সাংবাদিকতা। অথচ আপনারা দাবী করেন যে চোখ নাকি বাংলার কোণে কোণে ঘোরে সবসময়। সব খবর সবার আগে দেবার জন্য রাজ্য নাকি চষে ফেলেন! তা ওই ঢুঁড়ে বেরোনোর সময় চারপাশে খারাপ রাস্তা কিংবা ফাটল ধরা ব্রিজ চোখে পরে না? তখন সেটা জনগণ তথা প্রশাসনের নজরে আনার জন্য একটা সন্ধ্যেবেলা বরাদ্দ করতে দেখা যায় না কেন? কিন্তু যেই কোথাও ব্রিজ ভেঙে অথবা রাস্তায় দুর্ঘটনা ঘটলো — ওমনি গোটা রাজ্যের রাস্তাগুলো খানাখন্দে ভর্তি আর ব্রিজগুলো রীতিমত দুলছে-র খবরে মোটামুটি সাত দশদিন টিভিতে আর কোনো খবর পাওয়া যাবে না।
আসলে হাতে ক্যামেরা আর মোবাইল নিয়েই আপনারা নিজেদের বিশাল সাংবাদিক ভেবে বসেছেন। যে কারণেই কয়েকদিন আগে পিছিয়ে পরা চ্যানেলে দেখলাম সাংবাদিকতার দিকপাল রামন ম্যাগসাইসাই পাওয়া গৌড় কিশোর ঘোষের ন্যাড়া হওয়ার সঙ্গে তুলনা করা হলো নেতা হবার লোভে ফুটেজ খেতে ন্যাড়া হওয়া কংগ্রেসের একজন কর্মীর!
ন্যূনতম পড়াশোনাও আপনারা করেন না কোনসময়, নাহলে সাংবাদিক গৌড়কিশোর ঘোষের সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক নেতার তুলনা করার মত মূর্খতা করা হলো এবং ওখানে বসা বিশেষজ্ঞের দলগুলোও দেখলাম সেটা দিব্য গিলে ফেললো। প্রকৃত সাংবাদিকতার জ্ঞান থাকলে এমার্জেন্সির সময়ে গৌড়কিশোর ঘোষের মাথা ন্যাড়া করার মত ভাবনাকে এভাবে ভূলুণ্ঠিত করে সন্ধ্যেবেলার মজলিসে নির্লজ্জের মতো তুলনা করার দুঃসাহস হতো না। আসলে ঔদ্ধত্যের সব সীমা পার করে ফেললে চেতনা এভাবেই নষ্ট হয়ে যায়।
ইলেকট্রনিক মিডিয়া এসে এমনিতেই সাংবাদিকতার বারোটা পাঁচ বাজিয়ে দিয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়া মনে হচ্ছে তার আর এককাঠি উপরে উঠে কফিনে শেষ পেরেকটা পুঁতে দেবে। হাতে হাতে ফোন, ফলে যার যা ইচ্ছে হচ্ছে অগ্র পশ্চাৎ না ভেবে ছেড়ে দিচ্ছে ফেসবুক, ইউটিউবে। ব্যাস ভাইরাল হলো তো তার কারণ কার্য খোঁজার সব নিয়ম কানুন লাটে তুলে টিভিতে সন্ধ্যেবেলার আসর বসে যাবে স্নো পাউডার মেখে। এই তো বর্তমান চতুর্থ স্তম্ভের কর্মপদ্ধতি।
এখন তো আবার নতুন আঙ্গিকের আসর বসছে। সমাজের ডাক্তার, প্রফেসর, উকিল, আমলারা কি দারুন সান্ধ্যকালীন রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ হয়েছেন। আর সবথেকে মজার বিষয় যা কিছুই রাজ্যে বর্তমানে ঘটুক তার সব দায়ভারের অভিমুখ এখন শাসকদল তৃণমূলও ঠিক নয়। দায় সব কালীঘাট নামক একটি জায়গায় টালির চালের ঘরে বসবাসকারী একটি মহিলার। যেখানে যাই হোক ওই মহিলাকে টেনে এনে মনের সুখে গালাগালি করার মধ্যে দিয়ে যে মহান সাংবাদিকতা প্রকাশ পায় সেটা আর বলার অপেক্ষা রাখেনা।
কিন্তু এটার মধ্যে কিছু নতুনত্ব আছে কি? ওনাকে তো বিগত চল্লিশ বছর ধরেই আপনারা গাল দিচ্ছেন। উনি গাল শুনে শুনেই একটা চৌত্রিশ বছরের সাম্রাজ্য ধুলোয় মিশিয়ে দিয়ে তিনবারের মুখ্যমন্ত্রী। ষোলো আর একুশের ভোটে আপনাদের বাঘা বাঘা বিশ্লেষনে চ্যানেলে চ্যানেলে তৃণমূল লুটোপুটি খেলো। কিন্তু রেজাল্টে দেখা গেলো ঘোড়ার ডিম। আপনারা নিজেরাই দেখুন যাদের ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে বাঘ বানানোর চেষ্টা করছেন তাদের বিধানসভার আসন শূন্য আর বাকি যে দুটো আছে তারা ওই ওনারই ভাষায় জগাই মাধাই।
আজব আশ্চর্য বললেও ঠিক বোঝানো সম্ভব নয় যে এগুলো সাংবাদিকতার নামে আদতে সার্কাস চলছে। আসলে মূল ঘটনা হচ্ছে আপনাদের কিছু করার নেই। যতক্ষণ সুবিধা মানে নেবেন আর দেবেন ততক্ষণ কেউ চোর ডাকাত কিছুই নয়। ফলে এই বিনিময় প্রথার উজ্জ্বল উদাহরনে সংবাদ জগতটা দৃষ্টিকটু নিম্ন মেধার আড্ডাখানা হয়ে গেছে। কারো কিছুই যেন শেখার নেই। সবাই সবকিছু জেনে বুঝে বসে আছে।
এখন টিভি খুলুন দেখবেন খবর সেই রাজনৈতিক তাও আবার শুধুমাত্র শাসকদলই টার্গেট। আর সেই থোর বড়ি খারার বাইরে কিছু নেই। অথচ অমর্ত্য সেনের মত মানুষকে বিশ্বভারতীর উপাচার্য উচ্ছেদের নোটিশ ধরিয়েছে সে বিষয়ে কোনো উচ্চবাচ্য নেই। রাষ্ট্রপতির বঙ্গ সফর নিয়ে কোনো বক্তব্য নেই। বাংলা আন্তর্জাতিক ট্যুরিজম ডেস্টিনেশনের মর্যাদা পেয়েছে সেই বিষয়ে মুখে কুলুপ।
এসব ব্যাপারে বাংলার বিখ্যাত সব বিশেষজ্ঞদেরও অমূল্য মতামত জানার প্রয়োজন নেই। আর এলিট বুদ্ধিজীবি বাঙালির তো কিছু বলার থাকতেই পারে না। এসব তুচ্ছ বিষয় নিয়ে তাদের অমূল্য সময় নষ্ট করার মত সময় আছে নাকি! তারা সংবামাধ্যমে মতামত দেবে শুধুমাত্র তৃণমূল দলের ক্ষেত্রে। কারণ তাদের মতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নামক মেয়েটি বস্তি থেকে উঠে এসে মুখ্যমন্ত্রী হয়ে গিয়ে বাংলার মান মর্যাদা ধুলোয় লুটিয়ে দিয়েছে।
ভাবলে খারাপ লাগে যে আমাদের প্রজন্মই বোধহয় শেষ যারা সংবাদ খুঁজে পাঠকের ভাবনায় ছড়িয়ে দিতো। এখন দাঁড়িপাল্লায় মেপে নেবার মত কেনারাম বেচারামের খবর। কোথাও যেতে হয় না। ফ্যাক্ট খোঁজার দায় নেই। শুধু একটু হাওয়া বইয়ে দাও শাসক দলের। ব্যাস টিআরপি-র খেল শুরু।
এইভাবেই চোখের সামনে শেষ হয়ে যাচ্ছে একটা সিস্টেম। সাংবাদিকতার নামে এরা স্বেচ্ছাচারিতা করছে। ফলে সংবিধানের চতুর্থ স্তম্ভ আজ গুঁড়ো হয়ে পরে আছে সমাজের কোনায় কোনায়।
মমতা বন্দোপাধ্যায়কে আনন্দবাজার সেরা বাঙালির পুরস্কার দিয়েছিলো। আমিও তখন আনন্দবাজারে। আজ সেই সেরা বাঙালিকে টিআরপির চক্করে রোজ সন্ধ্যেবেলা কালি ছেটানো হচ্ছে। তাকে নিয়ে কেচ্ছা কাহিনী তৈরি করে চ্যানেলের টিআরপি ধরে রাখার মত চরম নোংরামী চলছে। অথচ এই মেয়েটিই কিন্তু পরিবর্তনের আগে হোক কি পরে সবথেকে বেশি সাহায্য ও সহযোগিতা সংবাদমাধ্যমকেই করেন।
পরিশেষে বলি, অনেকদিন আগে সাদা বাড়ি কালো গ্রিলে শুনতাম, খবর সেটা নয় যেটা মানুষ বলবে। খবর সেটা যেটা আমরা মানুষকে গেলাবো। হাসি পায় সেই ট্র্যাডিশন বজায় রাখার চেষ্টা বারবার ব্যর্থ হলেও স্নো পাউডার মেখে সন্ধ্যেবেলায় যা খুশি বাংলার মানুষকে গেলানোর বৈঠকী কিন্তু বন্ধ হয় না। কি লাভ হয় এসব করে? মানুষ তো বিলক্ষণ বোঝে আপনারা পয়সার নেশায় ওদের আবেগ নিয়ে খেলা করেন। আর সেটা তারা বারবার ভোটের রেজাল্টের দিন প্রমাণ দেয়। কিন্তু দুর্ভাগ্য আপনারা অচিরেই তা ভুলে যান।
২৮ মার্চ ২০২৩