মাত্র দশ বছর বয়স যে দলটির সে রাজধানীর পর দখল করেছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি রাজ্য। কেবল পাঞ্জাবে সরকার গড়া নয়, দেশের পাঁচ রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল জানাচ্ছে অরবিন্দ কেজরিওয়াল ও তাঁর আম আদমি পার্টি কার্যত নয়া ইতিহাস রচনা করেছে। অন্যান্য চার রাজ্যে যে বিজেপি ফিরছে তার আন্দাজ আগে থেকে করা গেলেও কয়েক যুগ ধরে পঞ্জাবের মসনদ দখল করে থাকা কংগ্রেস যে আপ ঝড়ে এইভাবে খড়কুটোর মতো উড়ে যাবে সেটা ভাবা যায়নি। ফলত সদ্য প্রকাশিত পাঁচ রাজ্যের বিধানসভা ভোটের ফলাফলে পাঞ্জাব সব দিক থেকেই তাক লাগিয়ে দিয়েছে।
পাঞ্জাবে ঐতিহাসিক জয়ের পর থেকেই কেজরিওয়ালের আম আদমি পার্টি দেশের অন্য রাজ্যগুলির দিকেও নজর দিয়েছে। ইতিমধ্যে বাংলায় শুরু করেছে শক্তিশালী সংগঠন তৈরির কাজ। তারপরেই আপের নজর উপজাতি অধ্যুষিত ছত্রিশগড়ের দিকে। যদিও আপ নেতা অক্ষয় মারাথে জানিয়েছেন, পঞ্জাবের পর আপের নজর গুজরাটের দিকে, দেশের প্রধানমন্ত্রী সে রাজ্যের ভূমিপুত্র। একই সঙ্গে অক্ষয় মারাথে জানান, তাঁরা হিমাচল প্রদেশের আগামী বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির সঙ্গে সম্মুখ সমরে নামছেন। ইতিমধ্যে এই দুটি রাজ্যে আপ দলীয় কর্মী পাঠাতে শুরু করেছে এবং তাদের বিশ্বাস পঞ্জাবের মতো এই দুটি রাজ্যেও বড় ঘটনা ঘটবে।
পাঞ্জাব দখলের পর আপ নিজেদের ক্ষমতা বাড়াতে বিপুলভাবে উৎসাহী। মোদীর রাজ্য গুজরাট ও হিমাচল প্রদেশ ছাড়াও আপের নজর কংগ্রেসের দখলে থাকা আরও এক রাজ্য রাজস্থানের দিকে। সেই রাজ্যের দখল নিতে কেজেরিওয়াল সেই দলটিকে রাজস্থানে পাঠানোর পরিকল্পনা করছেন যে দলটি পাঞ্জাব জয় করতে সাহায্য করেছে। ইতিমধ্যে জয়পুরের রাস্তায় আপের পোস্টার এবং হোর্ডিং দেখা যাচ্ছে। রাজস্থানের আপ নেতা সঞ্জয় সিং-এর উদ্যোগে অরবিন্দ কেজরিওয়াল এবং পাঞ্জাবের ভাবী মুখ্যমন্ত্রী ভগবন্ত মানের মুখ চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। প্রসঙ্গত, ২০১৮ সালে রাজস্থান বিধানসভা ভোটে আপ ২০০টি আসনের মধ্যে ১৪২টি আসনে প্রার্থী দিয়ে একটি আসনও জিততে পারেনি।
হাত থেকে পাঞ্জাব বেড়িয়ে যাওয়ার পর কংগ্রেসের নিঃস্ব ভাণ্ডারে এখন কেবল রাজস্থান আর ছত্তিশগড়ই পড়ে আছে। তবে দুই রাজ্যেই হাত শিবির অন্তঃকলহে জর্জরিত। এর ওপর পরের বছরই উপজাতি অধ্যুষিত ছত্তিশগড়ে বিধানসভা নির্বাচন। সেখানে ভোটে লড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে আপ। কেজরিওয়ালের আম আদমি পার্টি মনে করে কংগ্রেসকে যেভাবে পাঞ্জাবের মানুষ প্রত্যাখ্যান করেছে একইভাবে ছত্তিসগড়ের মানুষও সেই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটাবে।
আপ ২০২৩-এর ছত্তিশগড়ের বিধানসভা নির্বাচনে পূর্ন শক্তি নিয়ে লড়াইতে নামার প্রস্তুতি শুরু করেছে এবং রণকৌশল নির্ধারণ করতে শুরু করে দিয়েছে। ইতিমধ্যে দিল্লির পরিবেশমন্ত্রী গোপাল রাই ও আপের পূর্বাঞ্চলীয় নেতা ছত্তিশগড়ের অবস্থা বুঝতে ছত্তিশগড় সফরে গিয়েছেন। সেখানে আপ নেতাদের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করবেন এবং ছত্তিশগড়ের রাজধানী রায়পুরে একটি কার্যালয়ের উদ্বোধনও করবেন।
ছত্তিশগড়ে গত ১৫ বছর ধরে কংগ্রেসে ক্ষমতা কায়েম রাখলেও দলের মধ্যে দ্বন্দ্ব বাড়ছে। দলের নেতা কর্মীরা গত কয়েক মাস ধরে ছত্তিশগড়ের মুখ্যমন্ত্রী ভূপেশ বাঘেলের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হয়ে উঠেছেন। তাঁরা বাঘেলের পরিবর্তে অন্য কাউকে মুখ্যমন্ত্রী চাইছেন। এই নিয়ে ছত্তিশগড় কংগ্রেসের কিছু নেতা দিল্লিতে হাইকমান্ডের কাছে নালিশও ঠুকেছেন। আপ কংগ্রেসের এই দুর্বলতার সুযোগ নিতে রণনীতি সাজাচ্ছে। প্রসঙ্গত, ২০১৮ সালে ছত্তিশগড় বিধানসভা নির্বাচনে আপ মোট ৯০ টি আসনের মধ্যে ৮৫ টিতেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিল, কিন্তু তাঁরা খাতা খুলতে ব্যর্থ হয়। কিন্তু এবারের পরিস্থিতি যে আলাদা তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
পাঁচ রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের পরবর্তী পরিস্থিতি বিবেচনা করে রাজনৈতিক মহলের একাংশের বক্তব্য, ভারতীয় রাজনীতির চিত্রনাট্যে দ্রুত বদল ঘটছে। প্রথমত; ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর প্রধান বিরোধী হিসাবে এতদিন যাকে ভাবা হয়েছিল অর্থাৎ বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়; তাঁকে কিছুটা হলেও পিছনে ফেলে সামনে উঠে এসেছেন আপ সুপ্রিমো দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল। কেবল তাই নয়, রাজনৈতিক বিশেষঙ্গরা মনে করছেন, ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী মোদীর অবস্থানকে দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল কঠিন করে তুলতে পারেন।