ঊনবিংশ শতকে এই বাংলাদেশে শিক্ষার আলোতে সমুদ্ভাসিত হয়ে পূর্ণ মনুষ্যত্বের সর্বাঙ্গীণ আকাঙ্ক্ষাকে রূপদান করতে যাঁরা আবির্ভূত হয়েছিলেন, স্বদেশপ্রেমিক মনস্বী আচার্য রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী তাঁদের মধ্যে অন্যতম।
মুর্শিদাবাদ জেলার পূতঃসলিলা ভাগীরথীর তীরে শক্তিপুরের নিকটে টেঁয়া-বদ্যিপুর গ্রামে বিশিষ্ট ত্রিবেদী পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন ১৮৬৪ সালের ২০ আগস্ট। রামেন্দ্রসুন্দরের পিতার নাম গোবিন্দসুন্দর, মায়ের নাম চন্দ্রকামিনী দেবী।
এই ত্রিবেদী পরিবার অতীতকালে বসবাস করতেন বিখ্যাত খাজুরাহো মন্দিরের সন্নিকটে বুন্দেলখণ্ডের জিঝেটিয়া গ্রামে। জিঝেটিয়ার এই ব্রাহ্মণ পরিবারের হৃদয়রাম ত্রিবেদী প্রায় হাজার বছর আগে কুমারিলের সময় বাংলার ওই গ্রামে বসবাস করতে শুরু করেন। প্রকৃতির অনাবিল সৌন্দর্যে লালিত-পালিত এই ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়ের কীর্তিমান পুরুষেরা প্রায় সকলেই ছিলেন বড় কবি বা যোগী। এঁদের মধ্যে কেউ বা ছিলেন শাসনকর্তা অথবা রাজমন্ত্রী।
হৃদয়রামের প্রপৌত্র বলভদ্র মুর্শিদাবাদের কান্দীর অর্ন্তগত জেমো রাজবাড়িতে লক্ষ্মীনারায়ণের কন্যা দয়াময়ীকে বিবাহ করে এখানেই বসবাস করতে থাকেন। বলভদ্রের জ্যেষ্ঠ পুত্র কৃষ্ণসুন্দর। তিনি রামেন্দ্রসুন্দরের পিতামহ। সকলেই ছিলেন সাহিত্যনুরাগী, সত্য-শিব ও সুন্দরের পূজারী।
রামেন্দ্রসুন্দর এইরকম পরিবেশে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশবকাল থেকেই শিক্ষার ঔজ্জ্বল্যে তিনি ছিলেন দীপ্তিমান। স্কুলের প্রতিটি পরীক্ষাতেই তিনি প্রথম স্থান অধিকার করেছেন। ১৮৮১ সালে কান্দীর ইংরেজি স্কুল থেকে প্রবেশিকা অর্থাৎ এন্ট্রাস পরীক্ষায় প্রথম স্থান লাভ করেন। কান্দী স্কুলে অধ্যয়নকালেই ১৮৭৮ সালে ৬ মে মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সেই জেমো রাজবাড়ির নরেন্দ্রনারায়ণ রায়ের কন্যা ইন্দুপ্রভাকে বিবাহ করেন। বিবাহের পরই তিনি কলকাতায় চলে আসেন এবং প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন।
১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দে বিজ্ঞানে স্নাতক পরীক্ষায় তিনি প্রথম স্থান লাভ করেন, এম.এ পরীক্ষায় তিনি প্রথম হয়ে স্বর্ণপদক লাভ করেন। ১৮৮৮ খ্রিস্টাব্দে তিনি পদার্থবিদ্যা এবং রসায়নশাস্ত্রে একই সঙ্গে কৃতিত্ব অর্জন করে প্রেমচাঁদ রায়চাঁদ বৃত্তিলাভ করার গৌরবের অধিকারী হন। বিশ্ববিদ্যালয়ের এই উচ্চতর পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিষয়ের সঙ্গে দর্শন শাস্ত্রকেও প্রধান পাঠ্য বিষয় করে এক অসাধারণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন রামেন্দ্রসুন্দর। দার্শনিক হয়েও এই বিজ্ঞানমনস্কতা তাঁর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য বলা চলতে পারে। বিজ্ঞানের ভিত্তিভূমিতে তিনি দর্শনকে যেভাবে তাঁর রচনা ও গবেষণাতে প্রতিষ্ঠিত করেছেন, তা শুধু বাংলায় নয়, ভারতবর্ষের চিন্তা জগতে তথা শিক্ষাক্ষেত্রে বিরল। তাঁর প্রতিভার স্পর্শেই বাংলাভাষার মাধ্যমে বিজ্ঞানচর্চা প্রসারলাভ করেছে। আবার দর্শনশাস্ত্রের জটিল তত্ত্বকে বাংলাভাষায় প্রথম সহজবোধ্য করে প্রচারও করেছেন রামেন্দ্রসুন্দর। দেশের মানুষকে এই জ্ঞান চর্চার সুযোগ করে দেবার জন্য তাঁর আন্তরিক প্রয়াসের কারণ, তিনি ছিলেন মনে-প্রাণে যথার্থ স্বদেশপ্রেমিক। দেশ জননী ছিলেন তাঁর আরাধ্যা দেবতা। এই দেশভক্তি, স্বদেশপ্রেম বা স্বাদেশিকতার দীক্ষা শৈশবকালেই তিনি লাভ করেছিলেন তাঁর পিতার কাছে।
বিদেশি শিক্ষায় শিক্ষালাভ করেও আপন মাতৃভাষার প্রতি তাঁর নিবিড় অনুরাগ এবং দেশপ্রেম বলা যায় তাঁর মাধুর্যময় জীবনের প্রধান বিশেষত্ব। সেই কারণেই মননশীলতার ক্ষেত্রে বাংলাভাষার পরিধিকে সুবিস্তৃত করতে আন্তরিক প্রয়াসী হয়েছিলেন এবং এই কৃতিত্বই তাঁর সমধিক। কোনও কোনও সমালোচকদের মতে সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্রের পরে বাংলাভাষার মননশীল প্রাবন্ধিক হিসাবে যাঁরা সুখ্যাতি অর্জন করেছেন, রামেন্দ্রসুন্দর নিঃসন্দেহে তাঁদের মধ্যে অগ্রগণ্য। সৌরজগৎ, তার উৎপত্তি বা পৃথিবীর বয়স ইত্যাদি বিষয়ে যেমন তিনি গবেষণাধর্মী গ্রন্থ রচনা করেছেন, তেমনই পারমার্থিক জগতের রহস্যের দ্বার উন্মোচন করায় তাঁর সাধনার বা চেষ্টার ত্রুটি ছিল না। এই জাতীয় বিশুদ্ধ সাহিত্য রচনার সঙ্গে বৈদিক সাহিত্য, বৈষ্ণব সাহিত্য, ইতিহাস, বাংলা, ব্যাকরণ, শব্দতত্ত্ব প্রভৃতির চর্চাও তিনি সযত্নে অনুধ্যান করেছেন। বাংলার প্রাচীন সাহিত্য, পুরাতত্ত্ব, বাংলার ইতিহাস, বাংলার অবদান — এক কথায় বলা যায় বাঙালির প্রাণের সম্পদ আহরণ এবং বিকশিত করাই ছিল তাঁর ধ্যানের বস্তু, জীবনমন্ত্র।
রামেন্দ্রসুন্দর একাধারে যেমন ছিলেন আদর্শ ছাত্র, আবার তেমনই ছিলেন একজন ন্যায়নিষ্ঠ আদর্শ শিক্ষক। ১৮৯২ সালে তিনি রিপন কলেজে অর্থাৎ বর্তমান সুরেন্দ্রনাথ কলেজে অধ্যাপনা শুরু করেন। ১৯০৩ সালে তিনি অধ্যক্ষের কর্মভার গ্রহণ করেন। প্রায় পঁচিশ বছর ধরে এই অধ্যাপনার জগতে, শিক্ষক-সমাজের কাছে তাঁদেরই একজন হিতৈষী বান্ধব হিসাবে শ্রদ্ধাভাজন শিক্ষক হিসাবে শ্রদ্ধার্ঘ্য লাভ করেছেন। শিক্ষক ও ছাত্রের মধ্যে যে কেমন প্রীতির সম্পর্ক স্থাপন করা যায়, তারও একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন আচার্য রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী।
প্রতি ছাত্রের সুখ-দুঃখ, আশা আনন্দের সঙ্গে তাঁর নিবিড় যোগ ছিল এবং সহকর্মীদের কাছেও তিনি ছিলেন একান্ত ভরসাস্থল। কারণ রামেন্দ্রসুন্দরের জীবনের মাধুর্য, হৃদয়ের ঔদার্য, চারিত্রিক শুচিতা তাঁকে সকলের কাছে একান্ত বন্ধুবৎসল, অমায়িক সদাশয় বন্ধুত্বেই পরিণত করেছিল। তাই শিক্ষার জগতেও অধ্যয়ন, অধ্যাপনা এবং অধ্যক্ষতার মধ্যেও প্রশাসনিক ক্ষমতার যথার্থ যোগ্যতা সার্থকভাবে প্রদর্শন করার কৃতিত্বে তিনি চিরস্মরণীয়। ব্যক্তি জীবনচর্যার এই আদর্শবোধের কারণেই তিনি কখনও পরচর্চা, পরনিন্দা, পরশ্রীকাতরতা বা হিংসা-বিদ্বেষে কাতর হননি।
রামেন্দ্রসুন্দরের এই চারিত্রিক সৌন্দর্য বা সৌন্দর্যপিয়াসী মন তাঁকে একজন সার্থক সাহিত্যসেবী খ্যাতিমান স্রষ্টায় পরিণত করেছিল। এ কথা তাই নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, রামেন্দ্রসুন্দরের বহুমুখী জীবনপ্রবাহে বাঙালি জাতির বহমান মননধারাটি নানা শাখা-প্রশাখায় প্রবাহিত হয়ে সমগ্র দেশকে সঞ্জীবিত করেছে।
বঙ্কিমচন্দ্রের ‘বঙ্গদর্শন’ যখন প্রথম প্রকাশিত হয়, তখন রামেন্দ্রসুন্দরের বয়স মাত্র আট। তখন থেকেই তিনি বঙ্গদর্শনের একজন নিয়মিত পাঠক। ছাত্রাবস্থায় ‘নবজীবন’ পত্রিকায় ১২৯১ বঙ্গাব্দের পৌষ সংখ্যায় তাঁর ‘মহাশক্তি’ নমে একটি প্রবন্ধ প্রথম প্রকাশিত হয়।
পরবর্তীকালে ভারতী, অধুনা, সাহিত্য, জন্মভূমি প্রভৃতি নানা পত্র-পত্রিকায় তাঁর রচনা ক্রমান্বয়ে প্রকাশিত হতে থাকে। তাঁর ভাষাও ছিল অত্যন্ত সহজ, সরল এবং প্রাঞ্জল। এই অসামান্য সাহিত্য-প্রীতির কারণেই বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের কর্মকাণ্ডেও তিনি অত্যন্ত নিবিড়ভাবে যুক্ত হয়ে গিয়েছিলেন। বঙ্গাব্দের ১৩০১ থেকে ১৩২৬ সাল, অর্থাৎ জীবনের শেষদিন পর্যন্ত এই যোগ তাঁর অব্যাহত ছিল।
জনৈক সমালোচকের মতে, রামেন্দ্রসুন্দরের বুকের রক্তে পরিষদ মন্দিরের ইঁটের পর ইঁট গাঁথা হয়েছিল বললে অত্যুক্তি হয় না।
১৩১২ সালের ৪ শ্রাবণ বঙ্গ ব্যবচ্ছেদের সংবাদ যখন ঘোষিত হলো, তখন রামেন্দ্রসুন্দর বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের সহকারী সভাপতি। রামেন্দ্রসুন্দর কবির সঙ্গে যোগাযোগ করে বঙ্গ বিভাজনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ সভার আয়োজন করেন। তাঁরই অনুরোধে বাংলার ঘরে ঘরে সেদিন ‘অরন্ধন’ পালিত হয়েছিল। তিনি রচনা করেন ‘বঙ্গলক্ষ্মীর ব্রতকথা’।
রবীন্দ্রনাথের রচিত ‘বাংলার মাটি বাংলার জল’ বিখ্যাত স্বদেশী সঙ্গীতটিও এই গ্রন্থের পরিশেষে সংকলিত হয়েছে। রামেন্দ্রসুন্দরের মহাজীবনের সকল কর্মের মূলেই ছিল আত্যন্তিক স্বদেশপ্রেম, দেশাত্মবোধ। দেশপ্রেম, দেশাত্মবোধে উদ্বুদ্ধ হয়ে সারা জীবন তিনি স্বদেশজননীর পূজায় ব্রতী হয়েছিলেন। ‘নানান দেশের নানান ভাষা — বিনে স্বদেশী ভাষা পুরে কি আশা’, তাঁর সাহিত্য জীবনের মূল মন্ত্র ছিল। সাহিত্যপ্রেমেই তিনি সংস্কৃত, বাংলা, ইংরেজি, দর্শন, বিজ্ঞান, ইতিহাস, ভূগোল প্রভৃতির বিষয়ে অনুধ্যান করে নানা গ্রন্থ রচনা করেছেন। প্রকৃতি, জিজ্ঞাসা, বঙ্গলক্ষ্মীর ব্রতকথা, কর্মকথা, চরিতকথা, বিচিত্র প্রসঙ্গ, শব্দ কথা, বিচিত্র জগৎ, যজ্ঞকথা, নানা কথা, জগৎ কথা প্রভৃতি গ্রন্থ তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তাঁর বেদচর্চার ফলশ্রুতি ঐতরেয় ব্রাহ্মণের অনুবাদ এবং যজ্ঞকথা গ্রন্থ। এছাড়াও কয়েকটি পাঠ্যপুস্তক তিনি রচনা করেছেন। তাঁর অপ্রকাশিত রচনার সংখ্যাও কম নয়।
১৯১৯ সালের পাঞ্জাবের জালিয়ানওয়ালাবাগের নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডে অধীর হয়ে রবীন্দ্রনাথ যখন তাঁর ব্রিটিশ প্রদত্ত ‘নাইট’ উপাধি পরিত্যাগ করেন, তখন রামেন্দ্রসুন্দর মৃত্যুপথযাত্রী। রোগশয্যায় কবির এই প্রতিবাদপত্র প্রদানের সংবাদ শুনেই কবিকে তিনি আমন্ত্রণ জানালেন। কবি রামেন্দ্রসুন্দরের শয্যাপার্শে এলে তিনি কবিকে বড়লাট চেমসফোর্ডকে লেখা তাঁর প্রতিবাদ পত্রটি পাঠ করতে অনুরোধ করলেন। রবীন্দ্রনাথ যখন স্বকণ্ঠে সেই প্রতিবাদ পত্রটি তাঁকে পড়ে শোনালেন, তখন দেশপ্রেমিক রামেন্দ্রসুন্দর অত্যন্ত অভিভূত। পরাধীন দেশবাসীর প্রতিনিধিস্বরূপ কবি সম্রাট রবীন্দ্রনাথের এই বজ্রকঠিন অন্যায়, অবিচারের প্রতিবাদ জ্ঞাপনপত্রটি শুনেই আনন্দে উদ্ভাসিত হয়ে তিনি কবির পদধূলি গ্রহণ করেই তন্দ্রায় আচ্ছন্ন হয়ে গেলেন।
রামেন্দ্রসুন্দরের মহাজীবনের সেই তন্দ্রাচ্ছন্নতা সঙ্গে সঙ্গে মহানিদ্রায় পরিণত হয়। তাঁর মৃত্যু ঘটে ১৯১৯ সালের ৬ জুন।