এক শ্রাবণে রবীন্দ্রনাথের মৃত্যু আরেক শ্রাবণে অবনীন্দ্রনাথের জন্ম। হতে পারে কাকতালীয়, তবে কেবল সৃষ্টিশীলতায় নয়; শ্রাবণসূত্রেও এই দুই কৃতি ছিলেন দোসর। ঠাকুরবাড়ির এই কাকা-ভাইপো বয়সে দশ বছরের ছোট-বড়।
জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে নাট্যচর্চা লেগেই থাকত। দ্বিজেন্দ্রনাথ ও জ্যোতিরিন্দ্রের পরে হাল ধরেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। ঠাকুরবাড়িতে ‘ড্রামাটিক ক্লাব’ ছিল। একদিন রবীন্দ্রনাথের প্রস্তাবে সে ক্লাবের মৃত্যু হয়। আর অবন ঠাকুরের প্রস্তাবে হয় সেই ক্লাবের শ্রাদ্ধ। কিন্তু কাকা নতুন সভার প্রস্তাব দেন তখন ভাইপো নাম দিলেন, “খামখেয়ালী সভা”। সেই সভার প্রযোজনায় হবে রবীন্দ্রনাথের নাটক ‘বৈকুণ্ঠের খাতা’। রবীন্দ্রনাথ ‘কেদার’ আর অবন ঠাকুর ‘তিনকড়ি’। যথা নিয়মেই অভিনয়ের সময় রবিকা পাট ভুলে একটা গোটা সিন বাদ দিয়ে ডায়লগ ধরলেন, ভাগ্যিস ভাইপো অবন ছিলেন স্টেজে, ফিসফিস করে সেটা ধরিয়ে দিতে রবিকা সামলে নিলেন। সেবার নাটক দেখতে এসেছিলেন স্বয়ং গিরিশ ঘোষ। নাটক শেষে গিরিশ ঘোষ অবন ঠাকুরের উদ্দেশে ঘোষণা করেন, “এ-রকম অ্যাকটার সব যদি আমার হাতে পেতুম তবে আগুন ছিটিয়ে দিতে পারতুম।”
ঠাকুরবাড়িতে কাকা-ভাইপোর নাট্যাভিনয় হয়েছে বহুবার। রবিকা যে ‘বাল্মীকি প্রতিভা’য় বাল্মীকি হয়েছিলেন, তাতে ভাইপো অবন হয়েছিলেন ডাকাত। এরপর ‘ডাকঘর’-এ সেজেছিলেন মোড়ল। যখনই রবীন্দ্রনাথ নিজের লেখা নাটক মঞ্চস্থ করতেন তখন মঞ্চসজ্জা থেকে অভিনেতা-অভিনেত্রীদের সাজসজ্জার ভার পড়ত তাঁর ওপর। নিজে অভিনয় করতে গিয়ে সবসময় কমিক পার্ট নিতেন। কমিক চরিত্রে এত ভাল অভিনয় করতেন যে রবিকা স্রেফ তাঁর কথা ভেবেই অনেক নাটকে একটি করে কমিক চরিত্র রাখতেন।
শুধু কি তাই, শিশির ভাদুড়ি, অহীন্দ্র চৌধুরী প্রমুখ প্রায়ই আসতেন অবনীন্দ্রনাথের সঙ্গে অভিনয় সংক্রান্ত আলোচনা ও পরামর্শ নিতে। অবনীন্দ্রনাথকে তাঁদের নাটক দেখাতে নিয়ে যেতেন।

একদিন দক্ষিণের বারান্দায় তাঁর প্রিয় বর্মা কাঠের নকশা করা চেয়ারটায় হেলান দিয়ে বসে আছেন, মোহনলাল এসে দাদামশায়কে ধরলেন; নাটক লিখে দিতে হবে। ওরা নাটক করবে। কিন্তু কি নাটক লিখবেন। তখন তো নিজেই যাত্রার পালা লিখছেন। কিন্তু মোহনলালের আবদার তো এড়াতে পারেন না। অগত্যা দাদামশায় নিজের লেখা ‘এসপার ওসপার’ নাটকটিকে যাত্রার পালায় লিখতে শুরু করলেন।
পালা লেখা খুব তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে গেল। এরপর শুরু করে দিলেন মহড়া। ক’দিন মহড়া চলার পর তা সাড়ম্বরে অভিনয় হল। তারপর একদিন জোড়াসাঁকোর দোতলার হলঘরে জ্বলে উঠল হ্যাজাকের আলো। পর পর তিনদিন সে পালার অভিনয় হল। শেষ দিন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ এলেন যাত্রা দেখতে। পালা শেষ হলে বললেন, ‘এ জিনিস অবন ছাড়া আর কেউ করতে পারবে না’।
তখন তাঁর মন পালা লেখার নেশায় মত্ত। একে একে ধরলেন হিতোপদেশের গল্পগুলি। প্রথম হিতোপদেশের গল্প নিয়ে পালা বাঁধলেন ‘উড়নচন্ডীর পালা’। তারপর চলল কথামালা, পঞ্চতন্ত্র, ঈশপের গল্প নিয়ে বেঁধে চললেন যাত্রার পালা, গান রচনা।
এরপর একদিন সরে এলেন হিতোপদেশ-পঞ্চতন্ত্র-ঈশপের গল্প থেকে। সেই সময় প্রকাশ হচ্ছিল রাজশেখর বসুর গল্প। দারুন জনপ্রিয়তা পাচ্ছিল। একে একে পড়ে ফেলেছেন সেসব গল্প। তার থেকেই বেছে নিলেন রাজশেখর বসুর ‘লম্বকর্ন’কে। রূপ দিলেনপালায়। তারপর ‘জাবালি’। এক এক করে অনেকগুলি গল্পকে যাত্রা পালায় বেঁধে ফেললেন। কথায়, গানে সেই গল্পগুলি পালায় হয়ে উঠল অনবদ্য।

একটা করে পালা লেখেন আর নাতি নাতনিদের পড়ে শোনান। নাতি নাতনীরাও খুব খুশী। তখন এভাবেই অবনীন্দ্রনাথের দিন কাটত। ছবিতে আর তেমন করে মন বশছিল না। কেউ ছবি আঁকার কথা বললে অবনীন্দ্রনাথ বেশ বিরক্ত হতেন। সেটা বোঝাও যেত। কারন মুখ গম্ভীর করে বসে থাকতেন।
তাই দেখে একদিন রবিকা বললেন, ‘অবন তোমার হলটা কী? ভাইপো বললেন, ‘কী জানো রবিকা, এখন যা ইচ্ছে করে তাই এঁকে ফেলতে পারি। সেই জন্যেই আর আঁকায় মন বসেনা। আমার মন এখন নতুন খেলায় ব্যস্ত’।
সেই নতুন খেলাতেই অবনীন্দ্রনাথের কেটেছিল কয়েক বছর। যাত্রা পালা লিখে, ঢোল বাজিয়ে বাড়ির ছোট বড় সকলকে নিয়ে মহড়া দিয়ে, অভিনয় চালিয়েছিলেন অবনীন্দ্রনাথ।
রামায়ণের কাহিনিতেও ঝুঁকেছিলেন। নিজের সংগ্রহের রামায়ণ বইটা তখন যেমন পুরনো তেমনি ছেঁড়া ফাটা। বাড়ির কাজের লোক রাধুকে ডেকে একদিন বললেন, এই ছেঁড়া রামায়ণটা বাঁধিয়ে আনাতে পারিস। রাধু রামায়ণ বাঁধিয়ে আনল। একদিন রামায়ণ কাহিনী নিয়ে পালা লেখা শেষ করলেন। কিন্তু তাঁর নিজেরই মন ভরল না। বেশ কয়েকবার লখে লখে ছিঁড়ে ফেললেন।
নিজেই ধরে ফেললেন গলদটা কোথায়। আসলে কাহিনীকে পয়ারের ছাঁদ থেকে বের করে আনতে হবে। তা না করতে না পারলে যাত্রাপালা ঠিক জমছে না। অনেক কাটছাঁট করে পয়ারকে বেঁধে ফেললেন গদ্যে। ঠিক পুঁথির মতো করে। তারপর সেই পুঁথির রামায়ণ কাহিনী যাত্রা পালায চলল গড়গড়িয়ে।
তখনও কাজের লোক রাধু রোজ নিয়ম করে জার্মান সিলভারের গোল গামলাটাতে জল ভরে রাখে। অবনীন্দ্রনাথ ছবি আঁকবেন বলে। কিন্তু অবনীন্দ্রনাথের সে সবে ধ্যান নেই। তিনি যে ছবিকে ছুটি দিয়েছেন। তাই খালি গামলা পড়ে থাকে। রাধু একদিন তাই রাগ করে গামলাখানাই উল্টে রাখলেন।
খুব সুন্দর লিখেছেন। পড়ে ভালো লাগলো।
বেশ ভালো লাগলো পড়তে।
খুব ভালো লাগল, দাদা। শেয়ার করলাম।
অনেক তথ্য দিয়ে সাজানো লেখা…????
তবে লেখাটা যেন আচমকাই ওই গামলা ওল্টানোর মত করে শেষ হয়ে গেল…