ওখানে মানুষের জটলা কেন? বাস থেকে নেমে নিজেকে প্রশ্ন করলেন রজতবাবু। তারপর এক-পা দু-পা করে এগিয়ে গেলেন। দেখলেন, এক ব্যক্তি ব্যথার তেল বেচছে। ব্যথার জায়গায় হালকা করে দিনে দু-তিনবার মালিশ করতে বলছে। তাহলে যেরকমই ব্যথা হোক নিমেষে আরাম দেবে। দাম খুবই সামান্য, মাত্র তিরিশ টাকা।
কিন্তু তেল কেউ কিনছে না। শুধু ভিড় করে সবাই দাঁড়িয়ে দেখছে। আর সে একটা ফাইল তেল হাতে করে তেলের গুণ সম্পর্কে অনর্গল বলে যাচ্ছে—আপনারা এর আগে অনেক জায়গায় অনেক তেল কিনে ব্যবহার করেছেন, বাম কিনে ব্যবহার করেছেন। কিন্তু কাজ পাননি, ঠকেছেন। ফলে আপনাদের বিশ্বাস তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। আমি বলব, আমার এই তেল কিনে ব্যবহার করুন, আপনাদের বিশ্বাস আবার চাঙ্গা হবে। বিশ্বাস না হয়, কিনে ব্যবহার করেই দেখুন!
মানুষ চুপ করে তার বক্তব্য শুনছে। শুনতে শুনতে এক ব্যক্তি হঠাৎ বলে উঠল—তোমার তেলে যে কাজ হবে তার গ্যারান্টি কী?
সে বলল—গ্যারান্টি কী মানে? হান্ড্রেড পারসেন্ট গ্যারান্টি।
ব্যক্তিটি তখন বলল—ওষুধ বেচার জন্য ওরকম গ্যারান্টি সবাই দেয়। কাজের বেলায় কচু হয়।
—আপনি তেল ব্যবহার করেছেন? না লোক মুখে শুনে বলছেন?
—ব্যবহার না করে এমনি বলছি?
—কাজ পাননি?
—না, যেরকম ব্যথা সেরকমই আছে।
—শরীরে আপনার কোথায় ব্যথা?
—কোমরে।
—ঠিক আছে, আমার তেল একটা ফাইল কিনে ব্যবহার করুন।
ব্যক্তিটি তখন বলল—খুব ঠকেছি, নতুন করে আর ঠকছি না। সব ফালতু। এক পয়সা কাজ নেই। এসব তেল কিনে শুধু পয়সা নষ্ট।
—আমার তেল কিনে ব্যবহার করুন, যদি কাজ না পান পয়সা রিটার্ন দেব। উত্তরে তেল বিক্রেতা বলল।
অমনি অন্য একজন লোক বলল—তোমাকে আবার পাবো কোথা? তুমি কি আর এদিকে আসবে?
—কেন আসব না? একমাস বাদে আবার আসব। একমাস বাদে আবার এখানেই পাবেন।
—আর আসবে না, বলছ তাই। তোমাদের আমরা চিনি।
আরেকজন লোক তখন বলল—তিরিশ টাকার তেলে যদি ব্যথা ভালো হতো তাহলে চারশো পাঁচশো টাকা ভিজিট দিয়ে মানুষ ডাক্তারের চেম্বারে গিয়ে লাইন দিত না। সবাই তোমার তেল কিনেই ব্যবহার করত। মানুষকে আর কত বোকা বানাবে তোমরা! ও পরে বলল—তোমার তেল আমরা নিতে পারি, কিন্তু পয়সা এখন দিব না। একমাস বাদে আবার যখন আসবে তখন পয়সা দিব। ব্যবহার করে কাজ পাচ্ছি কি আগে দেখব। রাজি আছো?
লোকটার সঙ্গে আরও কয়েকজন লোক তখন বলল—হ্যাঁ, রাজি আছো? থাকলে দিয়ে যাও। এখানে আমরা যতজন লোক আছি সবাই তোমার তেল নেব।
—না, তা হয়না।
—কেন তা হয়না, কাজ হবে বলে তুমি তো গ্যারান্টি দিচ্ছ। তাহলে তোমার ভয় কী?
—তবু তা হয়না। কারণ, পয়সা দিতে হবে বলে আপনারা তখন বলবেন যে, তেলে কোন কাজ হয়নি। কাজ হলেও বলবেন, কাজ হয়নি। এটা আমার দীর্ঘ দিনের অভিজ্ঞতা। তাই, আপনাদের তেল দিয়ে যাওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। নিলে আপনাদের নগদেই নিতে হবে।
—তারমানে বোঝাই যাচ্ছে যে, তোমার তেলে কোন কাজ হবেনা। তুমি শুধু আমাদের পয়সা লুঠতে এসেছ।
কথাটা শুনে তার খুব খারাপ লাগল। ফলে সে বলল—ফুটপাতে তেল বেচছি বলে আপনাদের এরকম কথা। চেম্বারে হলে কেউ কিন্তু এরকম কথা বলতে পারতেন না, বলার সাহস পেতেন না।
লুঙ্গি পরা একজন লোক তখন বলল—চেম্বার খুলে তুমিও বসো না!
তার পরে আরেকজন লোক বলল—হ্যাঁ ভাই, তুমি চেম্বার খুলেই কোথাও বসো। আজকাল সব মানুষেরই ব্যথা। ব্যথার রুগী তুমি প্রচুর পাবে। আমরা নিজেরা তো তোমার কাছে যাবোই, আরও অনেক রুগী পাঠাব। কোথায় বসবে তুমি শুধু চেম্বারের ঠিকানাটা আমাদের দিয়ে যেও।
রজত বাবু দাঁড়িয়ে সব দেখছেন এবং শুনছেন। এখানে ভিড় করে যারা দাঁড়িয়ে রয়েছে প্রত্যেকেই তাঁর চেনা। স্থানীয় এবং প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তি হিসাবে তিনিও তাদের চেনা। সেই হিসাবে রজত বাবুর বিশ্বাস, তিনি যদি এখন একটা বা দুটো ফাইল তেল কিনেন তাহলে তাঁর দেখাদেখি অনেকেই তেল কিনবে। তাহলে এর কিছু তেল বিক্রি হবে, দুটো পয়সা রোজগার হবে। দুটো পয়সা রোজগারের জন্যই তো সে এখানে দাঁড়িয়ে তেল বেচছে। আর মানুষের ব্যঙ্গ বিদ্রুপ শুনছে। তারপরও যদি দুটো পয়সা রোজগার না হয় তার চলবে কীভাবে? ভেবে দেখে রজত বাবু পকেট থেকে পয়সা বের করলেন এবং সেটা দেখতে পেয়ে এক ব্যক্তি বলল—কী ব্যাপার গাঙ্গুলি বাবু, তেল কিনবেন নাকি?
রজত বাবুর পুরো নাম রজত গাঙ্গুলি। যে কারণে কেউ কেউ গাঙ্গুলি বাবুও বলে।
রজত বাবু বললেন—হ্যাঁ, তেল কিনব। ব্যথার জন্য এই তেলটা খুব ভালো। আমি বরাবরই ব্যবহার করি। আমার বাড়িতে একটা দুটো ফাইল সবসময় থাকে। ক’দিন হল শেষ হয়ে গেছে। তাই আবার—
অত:পর তেল বিক্রেতা বলতে লাগল—আমার তেলে যে কাজ আছে আপনারা সবাই শুনলেন তো? তাহলে আর দেরি কেন? চটপট কিনুন আর বাড়ি নিয়ে যান। শিরার ব্যথা, জয়েন্টের ব্যথা, চোট লাগা ব্যথা ও মচকা লাগা ব্যথায় লাগাবেন। দারুণ কাজ! বলুন, আর কার লাগবে?
অমনি একজন হাত বাড়াল—আমাকে দুটো দাও তো।
তাকে দেওয়া হলে আরেকজন হাত বাড়াল—আমাকেও দুটো দাও।
তাকেও দুটো দিল।
সঙ্গে সঙ্গে আরেকজন বলল—আমাকে একটা দাও।
দেখাদেখি ভিড়ের লোক পরপর হাত বাড়াতে লাগল। তার পেন কিওর অয়েল বিক্রি হতে লাগল। প্রথম দিকে যারা বিরোধিতা করেছিল তারাও হাত বাড়াল—আমাদেরও একটা করে ফাইল দাও তো। সবাই যখন নিচ্ছে আমরাও নিয়ে দেখি।
রজত বাবু যেটা ভেবেছিলেন সেটাই হল, তাঁর দেখাদেখি অনেকেই একটা দুটো করে ফাইল তেল কিনল। ফলে তার তেল ভালোই বিক্রি হল। এখান থেকে তার কিছু পয়সা রোজগার হবে।
সমাজের সুপ্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিরা এই ধরনের লোকেদের কেউই ভালোবাসেন না, ভালো চোখে দেখেন না। শুধু অবজ্ঞা আর অবহেলা করেন। কিন্তু রজত বাবু বিপরীত মানুষ, তাঁর মহানুভবতার তুলনা নেই।
আব্দুস সাত্তার বিশ্বাস, সারাংপুর খাসপাড়া, ডোমকল, মুর্শিদাবাদ।