‘তুমি ছিলে শ্রমিকের দুর্গতের স্নিগ্ধচ্ছায়া তরু।
গণরাজ্যে মন্ত্রীছিলে মনোরাজ্যে রাজা তুমি আজ
স্মরণের স্বর্গলোকে চিরদিন করিবে বিরাজ’। – কালিকিঙ্কর সেনগুপ্ত
কালনা বা অম্বিকা-কালনা বাংলার অন্যতম কৃষ্টি গৌরবভূমি মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যে অম্বিকা-কালনা আম্বুয়া, অম্বুয়া বা আঁবুয়া নামে অভিহিত। বৃন্দাবন দাসের চৈতন্য ভাগবতে আম্বুয়ার উল্লেখ পাচ্ছি। অম্বিকা নামটি যথেষ্ট প্রাচীন, এই তথ্য স্পষ্ট। কালনার উপাস্য দেবী অম্বিকা, তন্ত্র-বাংলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কর্ষণভূমি অম্বিকা-কালনা। জৈন শ্বেতাম্বর ও দিগম্বর উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে দশম একাদশ শতাব্দী থেকে ত্রয়োদশ-চর্তুদশ শতাব্দী পর্যন্ত দেবী অম্বিকার উপাসনা প্রচলিত ছিল। অম্বিকা দেবী সিংহবাহিনী, হাতে আম্রপল্লব আর শিশু। কখনও দুহাতে আম্র লুম্বি, এক হাতে বরদমুদ্রা, অন্য হাতে শিশু। অষ্টভুজ হাতে খড়গ শস্য আম্র লুম্বি ইত্যাদি আছে। কথিত অম্বিকা কালনার অধিষ্ঠাত্রী দেবী সিদ্ধেশ্বরী। বৌদ্ধ তন্ত্র প্রভাবের যুগে, পালযুগে রাঢ় বাংলার কালনায় তান্ত্রিক দেবী অম্বিকা পূজা হত। ইতিহাসে প্রখ্যাত অম্বিকা-কালনার নাম আজও পরম শ্রদ্ধায় উচ্চারিত হয়। আওরঙ্গজেবের প্রিয় আমলা মুর্শিদকুলি খান যখন বাংলা নিয়াবতের প্রধান, সে সময় মঙ্গলকাব্য আঙ্গিকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি কেতকাদাস ক্ষেমানন্দ মনসামঙ্গল রচনা করেন। কেতকাদাসের মনসামঙ্গলে আজকের কালনা-২ ব্লকের গ্রাম উদয়পুর, হাসানহাট অথবা বৈদ্যপুরের অস্তিত্ব আজও রয়েছে সগৌরবে; আজও আমরা সেই হাজার বছরের ইতিহাস ছুঁয়ে আসতে পারি।

শুধু প্রাচীন বাংলাতেই নয়, কালনা উপনিবেশিক আমলের স্বাধীনতা সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। কালনা ছিল স্বদেশী আন্দোলনের অন্যতম উদ্ভবকেন্দ্র। কালনার জ্ঞানানন্দ আশ্রম ছিল স্বদেশীদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কর্মপীঠস্থান। প্রবন্ধটি কবি– যে রাজনেতার নামে উৎসর্গ করেছিলেন, এই প্রবন্ধে আমরা ঐতিহাসিক কালনার অন্যতম শ্রেষ্ঠ সন্তান, স্বাধীনতা সংগ্রামী, জননেতা আবদুস সাত্তারের কথা আলোচনা করব। একই সঙ্গে আলোচনা করব, কীভাবে স্থানীয় মানুষ, বিশেষ করে আবদুস সাত্তারের একলব্য শিষ্য প্রণব রায় এই মহান ব্যক্তিত্বের স্মৃতি আগলে রেখেছেন এবং তার মতবাদ অনুসারে আবদুস সাত্তারের অনারব্ধ কাজ নিজে বাস্তবায়িত করার দিকে এগিয়ে চলেছেন।
আবদুস সাত্তারের জন্ম ১৯১১, ৩ মার্চ মঙ্গলকাব্যে উল্লিখিত বৈদ্যপুরে। পিতা শামসের আলি মন্ডল। বাল্যকালে পিতার প্রয়াণে মায়ের স্নেহচ্ছায়ায় আবদুস সাত্তার বেড়ে উঠতে থাকেন। ‘জর্জ ইনস্টিটিউশন, বর্তমানের ‘বৈদ্যপুর রামকৃষ্ণ বিদ্যাপীঠ’-এ তিনি ন-বছর বয়সে শিক্ষা লাভ শুরু করেন। বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন স্বদেশীব্রতে জীবন উতসর্গ করা, বাগ্মী, পণ্ডিত জিতেন্দ্রনাথ মিত্র। আবদুস সাত্তারের সামাজিক-রাজনৈতিক বোধ তার হাতেই তিলে তিলে গড়ে উঠতে থাকে। শিক্ষকের ব্যতিক্রমী জীবনধারা এবং ১৯২৫-এ বর্ধমানে গান্ধীজীর ভাষণ আবদুস সাত্তারের জীবনপথ নির্দিষ্ট করে দিল। তিনি স্বাধীনতা সংগ্রামে আকৃষ্ট হলেন।

১৯২৮-এ সাইমন কমিশন বিরোধী আন্দোলন নিজের চোখে দেখেছেন ভবিষ্যতের রাজনেতা আবদুস সাত্তার। ইতিমধ্যে ঢোলা গ্রামে সমবায় সমিতি, স্বাক্ষরতার জন্যে নৈশ বিদ্যালয় তৈরি করেছেন। বর্ধমানের রাজ কলেজে পড়ার সময় দীর্ঘ ২০ বছর বর্ধমান জেলার কংগ্রেসের সভাপতি, অবিভক্ত বাংলার আইন পরিষদের সদস্য, স্বাধীন বাংলার মন্ত্রী, যাদবেন্দ্র পাঁজার সঙ্গে তাঁর পরিচয় হলে কংগ্রেসের প্রাথমিক সদস্যপদ লাভ করেই ১৯৩০-এ ৩০ জুন রথতলায় বক্তৃতা দেওয়ার সময় বন্দী হন। হিজলি জেলে বন্দি থাকার সময় আবদুস সাত্তারের সঙ্গে কংগ্রেস নেতা প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষ, প্রফুল্লচন্দ্র সেন, ক্ষুদিরাম মোদক, ভূপেন্দ্রনারায়ণ সেনগুপ্তদের সঙ্গে পরিচয় ঘটে। জেল থেকে বেরিয়ে আই.এ পরীক্ষা দিয়ে কলকাতায় উচ্চশিক্ষালাভের জন্যে কলকাতা আসেন। ১৯৩৬-এ আবদুস সাত্তার বঙ্গীয় কংগ্রেস কমিটি এবং পরের বছর নিখিল ভারত কংগ্রেস কমিটিতে অন্তর্ভূক্ত হন। ১৯৩৮-এ স্বাধীনতা আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী নূরউন্নেসাকে বিবাহ করেন। বিয়ের পরে পরেই জেলে যান। বর্ধমানে তিনি আইন ব্যবসাও করেছেন। প্রথম জীবনে ‘বর্ধমানের কথা’ নামে একটি পত্রিকা সম্পাদনা করেছিলেন। বহু পত্রিকায় লেখালিখিও করেছেন। মঙ্গলকোটের ‘নওদাপাড়া জুনিয়র হাই স্কুল, সিঙ্গি গ্রামের ‘কাশীরাম দাস স্মৃতিপাঠাগার’, বেড়ুগ্রামের ‘বান্ধব বিদ্যাপীঠ’, গোপালপুরের ‘বান্ধব বিদ্যালয়’ প্রভৃতি বিদ্যালয় স্থাপনের সঙ্গে তাঁর নাম জড়িয়ে রয়েছে।

বঙ্গভাগের পর বিধানচন্দ্র রায়ের মন্ত্রীসভায় শ্রমমন্ত্রী হিসেবে যোগ দেওয়া। বিধান রায় মন্ত্রীসভায় তিনি ভারতের প্রথম মিনিমাম ওয়েজেস এক্ট তৈরি করেন। সে সময় দোকান কর্মচারী বা শ্রমিকদের দৈনিক মাইনে খুবই ন্যুনতম ছিল। আইন তৈরি করে তাদের ন্যূনতম মাইনে নিশ্চিত করেন তিনি।
১৯৬৫ সালের ২৯ জুলাই চিত্তরঞ্জন হাসপাতালে এই মানুষটির জীবনাবসান হলেও আজও মানুষটার স্মৃতি জাগিয়ে রেখেছেন কালনা-২-এর সর্বক্ষণের রাজনৈতিক কর্মী, অকৃতদার, স্থানীয় মানুষের অভিভাবক প্রণব রায় মশাই আবদুস সাত্তার স্মৃতিরক্ষা কমিটি তৈরি করে। ঐতিহাসিক মায়াময় বেহুলা নদীর তীরে ঘরছাড়াদের স্বপ্নের আবাসস্থল ‘বেলাশেষে’ বৃদ্ধাশ্রম। কারিগর প্রণব রায়। এই নিয়ে বাগবিস্তার করেছেন পত্রিকা সম্পাদক জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায়। সেটা আপনারা নিশ্চই পড়েছেন।
বেলাশেষের সম্বন্ধে জানতে এই লিঙ্কে ক্লিক করুন—
মা এসেছেন বেলাশেষে, আবাসিকদের সুখ নেই আছে শান্তি : জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায়
আমাদের গর্ব , আমাদের অভিভাবক
দারুণ লাগলো