বাংলার মুখ্যমন্ত্রীর ডাকে সাড়া দিয়ে সুদূর আমেরিকা থেকে সশরীরে নবান্নে হাজির হলেন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়। করোনার তৃতীয় ঢেউ আসার আগেই গ্লোবাল অ্যাডভাইজরি বোর্ডের সদস্যদের নিয়ে জরুরি বৈঠক সারলেন মুখ্যমন্ত্রী। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদও মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে সহমত জানিয়েই বললেন, যেভাবে বাংলায় করোনার দ্বিতীয় ঢেউ আছড়ে পড়েছিল, এখন পরিস্থিতি তার তুলনায় অনেকটাই আশাব্যাঞ্জক।
কিন্তু বিশেষজ্ঞরা তৃতীয় ঢেউ আসার আশঙ্কা করছেন, তাই মুখ্যমন্ত্রী আগেভাগেই প্রস্তুতি সেরে নিচ্ছেন। বৃহস্পতিবার এ বিষয়েই বিশেষ বৈঠক ছিল নবান্নে। সেই বৈঠকের পর নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ জানান, রাজ্যের পরিস্থিতি এখন অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে। অক্সিজেন, চিকিৎসা সামগ্রী, হাসপাতালে বেডের ব্যবস্থা পর্যাপ্ত পরিমানে রয়েছে। দু-একটি জেলা বাদে সর্বত্রই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে। দৈনিক সংক্রমণ, মৃত্যুর হার অনেকটা কম, বাড়ছে পজিটিভিটি রেট।
প্রসঙ্গত, করোনা সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়তেই বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মোকাবেলায় আন্তর্জাতিক স্তরের পরামর্শ গ্রহণের জন্য গ্লোবাল অ্যাডভাইজরি বোর্ড তৈরি করেন। যার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়। এতদিন তিনি আমেরিকা থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়েছেন। বারবার তিনি করোনা মোকাবেলায় জানিয়েছেন, দ্রুত রোগ চিহ্নিত করা, তারপর দ্রুত টিকাকরণের ব্যবস্থায় জোর দিয়েছেন।
তবে এদিন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ স্পষ্ট ভাষাতেই বললেন, দেশের আর্থিক বিকাশ না ঘটলে বাংলার অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না। কারণ একটি রাজ্যের পক্ষে এককভাবে অর্থনীতিতে চাঙ্গা হয়ে ওঠা কখনই সম্ভব নয়। পাশাপাশি তিনি এও জানান, দেশের আর্থিক অবস্থা ফেরাতে গেলে কেন্দ্রকে আরও উদার হতে হবে। মানুষের হাতে তুলে দিতে হবে টাকা।
করোনার প্রথম ও দ্বিতীয় ঢেউয়ের ধাক্কায় ভারতের অর্থনীতির মেরুদণ্ড যে পুরোপুরি ভেঙে গিয়েছে সে কথা বলাই বাহুল্য। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ দেশের আজকের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির জন্য অনেকাংশেই কেন্দ্রীয় সরকারকে দায়ী করেছেন। তিনি বলেন, করোনার প্রভাবে দেশের অর্থনীতির মারাত্মক ক্ষতি হয়েছে এটা ঘটনা। কিন্তু করোনার প্রথম ঢেউয়ের সময় কেন্দ্র কয়েকটি স্টিমুলাস প্যাকেজ ঘোষণা করলেও দ্বিতীয় ঢেউয়ে আর কোনও আর্থিক প্যাকেজ ঘোষণা করেনি।
কেন্দ্রীয় সরকার লকডাউনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল ঠিকই তবে সাধারণ মানুষ জীবন জীবিকার প্রশ্নে কঠিন সঙ্কটে পড়ে। কর্মহীন মানুষ, দরিদ্র মানুষ খালি পেটে রোগের সঙ্গে লড়াই করবে কিভাবে? জীবনযুদ্ধে টিকে থাকতে হলে কাঁচা টাকার দরকার। গোষ্ঠী সংক্রমণ হয়নি বলে সরকার মুখে যতই বড় বড় কথা বলুক তাতে মানুষের পেট ভরবে না। তাই হাতে নগদ টাকা জোগান দিয়ে মানুষের ক্রয় ক্ষমতা বাড়ানোর ব্যবস্থা করতে হবে দেশের সরকারকে। বিক্রিবাটা না বাড়লে পণ্যের উৎপাদন বাড়বে না। সেটা দেশের অর্থনীতির পক্ষে ক্ষতিকর।
দ্বিতীয় ঢেউয়ের পরেও জীবনযাত্রা স্বাভাবিক ছন্দে ফিরতে চেষ্টা করছে। তবে লকডাউনের জেরে বহু ছোট কলকারখানা, ব্যবসা বাণিজ্য লাটে ওঠায় বহু মানুষ কাজ হারিয়েছেন। বেকার হয়ে যাওয়া মানুষেরা তো দিশাহারা। তা স্বত্বেও তাদের হাতে নগদের জোগান দিয়ে ভরসা জোগানোর কোনও উদ্যোগই নেই কেন্দ্রীয় সরকারের। লকডাউনকে সফল করতে জাতির উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বক্তব্য রাখতে কোনও কার্পণ্য করেন নি কিন্তু মানুষের হাতে নগদ টাকা পৌঁছনোর ব্যাপারে তিনি একটি কথাও খরচ করেননি। অথচ এই নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় আসার আগে গলা ফাটিয়ে বলেছিলেন, প্রত্যেক ভারতবাসীর অ্যাকাউন্টে ১৫ লক্ষ করে টাকা করে জমা পড়বে। করোনা-লকডাউনের চরম দুর্দিনে একটি টাকাও জমা পড়েনি।
করোনা আসার আগেই মোদির নোটবন্দির জেরে ভারতের অর্থনীতি হেলে পড়েছিল। ধাপে ধাপে বাড়ছিল বেকারতত্ব। দিনকে দিনে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমছিল। করোনা ঠেকাতে লকডাউনের জেরে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা শূন্য হয়ে যায়। এই অবস্থা কাটিয়ে অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার জন্য সেদিনও নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ দেশের মানুষের হাতে নগদ টাকা জোগানের কথা বলেছিলেন। কারণ ভেঙে পড়া অর্থনীতিকে বাঁচাতে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়াতে হয়, তা না হলে উৎপাদনে টান পড়ে। অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়ের আগে ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাঙ্কের প্রাক্তন গভর্নর রঘুরাম রাজনও দেশের গরিব মানুষের হাতে নগদ পৌঁছে দেওয়ার পক্ষে সওয়াল করেছিলেন।
শুধু তাই নয় নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ক্ষুদ্র শিল্পের ক্ষেত্রে তিন মাসের জন্য সুদ মকুব করে দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। গরিব মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য তাদের হাতে দশ হাজার করে টাকা করে দিতে বলেছিলেন। কারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা তৈরি না হলে ক্ষুদ্র, মাঝারি, বড় যে কোনও ধরনের শিল্প সংস্থার কোনও লাভ নেই। চাহিদা থাকলে তো পণ্য উৎপাদন বাড়বে, লাভের মুখ দেখবে তারা। দেশে যথেষ্ট খাদ্যশস্য মজুত থাকা স্বত্বেও তা মানুষের হাতে তুলে দেওয়া যায় নি। অথচ গণবণ্টন ব্যবস্থার মাধ্যমে সরকারই পারে সেই দায়িত্ব পালন করতে। এ বিষয়ে বাংলার মুখুমন্ত্রীর করোনার সময়ে সকলকে বিনা পয়সায় রেশন দেওয়ার উদ্যোগকে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ কার্যত মান্যতা দিয়েছেন।