ত্রিপুরা উত্তপ্ত হয়েই ছিল। আই প্যাকের ২৩ জন কর্মী সমীক্ষার কাজে ত্রিপুরা পৌঁছে হোটেলে ঢোকে, এরপরেই শুরু হয় নাটক। পুলিশ পৌঁছে যায় হোটেলে এবং ২৩ জন কর্মীকেই গৃহবন্দী করে। বলা হয়, করোনার কারণে তারা হোটেলের বাইরে বেরতে পারবেন না। আই প্যাকের কর্মীরা তা মানতে রাজি না হওয়ায় ডিজাস্টার আইনে ত্রিপুরার বিজেপি সরকার তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করে। কোর্টের দ্বারস্থ হয়ে আগাম জামিন নিতে বাধ্য হন ওই কর্মীরা।
আই প্যাকের কর্মীদের হোটেলে আটকে রাখার তীব্র প্রতিবাদ করে তৃণমূল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্দেশে শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসু, মলয় ঘটক, কাকলি ঘোষদস্তিদার, সাংসদ ডেরেক ও’ব্রায়েন, ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়-সহ একাধিক তৃণমূল নেতা ত্রিপুরা পৌঁছান। কিন্তু তাদের সঙ্গেও আই প্যাক কর্মীদের দেখা করতে দেওয়া হয়নি। এদিন অভিষেক ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব দেবকে ট্যাগ করে একটি ভিডিও টুইট করেছেন। সেখানে দেখা যাচ্ছে, বিজেপির পতাকা হাতে কর্মীরা অভিষেকের গাড়ির উপর লাঠি মারছে।
কোভিড পরিস্থিতির কারণে এবারের ত্রিপুরা সফরে অভিষেক কোনও প্রকাশ্য রাজনৈতিক কর্মসূচি নাও করতে পারেন। তা স্বত্বেও গত কয়েক দিন ধরে ক্রমাগত উত্তাপ বাড়ছিল ত্রিপুরার রাজনৈতিক মহলে। কারণ গত শুক্রবারই সে রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী, বিধায়ক-সহ সাত জন নেতা-নেত্রী তৃণমূলে যোগ দিয়েছেন। এই অবস্থায় অভিষেকের ত্রিপুরা সফর যে উত্তপ্ত হয়ে উঠবে তা আগেই আন্দাজ করা গিয়েছিল। এছাড়াও ত্রিপুরা সফরে অভিষেক সে রাজ্যের বিভিন্ন জেলা ভিত্তিক তৃণমূল নেতৃত্বের সঙ্গে ছোট ছোট বৈঠক করতে পারেন। সেক্ষেত্রে সিপিএম কংগ্রেস ও বিজেপি বিরোধী মুখকে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে সংগঠন সাজানো হতে পারে। অভিষেকের উপস্থিতিতে হতে পারে যোগদান পর্বও।
তবে তৃণমূলের পায়ের তলার জমি শক্ত করতেই অভিষেকের ত্রিপুরা সফর। সেক্ষেত্রে কীভাবে ত্রিপুরায় স্থানীয় তৃণমূল নেতা নেত্রীরা আন্দোলন ও লড়াই সংগঠিত করবেন অভিষেক তার একটা রুপরেখা করে দেবেন। তিনি ত্রিপুরার মানুষের কাছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বার্তা পৌছে দিতে পারেন। পরবর্তীতে সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে ব্যাপক প্রচার ও প্রসার চালাতে পারে ত্রিপুরার তৃণমূল। তাছাড়া স্থানীয় ভিত্তিক সংবাদ মাধ্যমে তিনি তৃণমূলের অবস্থান সম্পর্কে এবং ত্রিপুরা নিয়ে তৃণমূলের আগামীর পরিকল্পনার ব্যাখাও দিতে পারেন।
বুঝতে অসুবিধা হয় নাএই সব কারণেই ত্রিপুরায় বিজেপির পায়ের তলার মাটি সরতে শুরু করেছে। রবিবার রাত থেকেই বেশ কয়েকটি জায়গায় উত্তেজনা তৈরি হয়। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সমর্থনে লাগানো ফ্লেক্স ব্যানার ছেঁড়া হয় বলে অভিযোগ করে স্থানীয় তৃণমূল কংগ্রেস। তাছাড়া গত শুক্রবারের মতো এদিনও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপস্থিতি দল বদলের সম্ভাবনা ছিল। আর তাতেই সিঁদুরে মেঘ দেখতে শুরু করে বিপ্লব দেবের অনুগামীরা। তবে অভিষেকের নেতৃত্বে তৃণমূল এখনই ত্রিপুরাতে বিজেপি বিরোধী আন্দোলন শুরু করবে না। তার বদলে সেখানে ধীরে ধীরে সংগঠন শক্তিশালী করার কাজ শুরু করবে। যে কাজ ধীরে হলেও অনেক আগেই শুরু হয়ে গিয়েছে। আর সেই লক্ষ্যে সুদীপ রায়বর্মন বা তাঁর অনুগামী কিংবা তাদের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী কারো সঙ্গে গোপন বৈঠকও করতে পারেন অভিষেক। অর্থাৎ রাজনৈতিক ভাবে ত্রিপুরার প্রেক্ষাপট পর্যবেক্ষণ করে একাধিক কর্মসূচী নেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ত্রিপুরায় পৌঁছে কোন পথে কীভাবে অভিষেক তৃণমূলের জাল বিস্তার করবেন তা নিয়ে আগে থেকে উত্তপ্ত হয়েছিল ত্রিপুরা।
ত্রিপুরার পরিস্থিতি যে আগে থেকেই উত্তপ্ত হয়ে ছিল সেকথা অভিষেকেরও জানা ছিল। পাশাপাশি তৃণমূলের অন্য নেতাদের মতো তিনিও যদি ত্রিপুরাতে থেকে যান, তাহলে আরো জল ঘোলা হওয়ার সম্ভাবনার কথা বিজেপি আঁচ করেছিল। তারা কি ত্রিপুরাতে তৃণমূলকে এত সহজেই জায়গা ছেড়ে দেবে? কিন্তু বাংলা জয়ের পর তৃণমূলের টার্গেট এখন ত্রিপুরা। ত্রিপুরার সাত জন সাবেক বিধায়ক এবং মন্ত্রী সদ্য তৃণমূলে যোগ দিয়েছেন। একসময়ের বাম দূর্গ ত্রিপুরা এখন বিজেপির গড়। সেখানে থাবা বসাতে চাইছে তৃণমূল। যে কারণে তৃণমূল আই প্যাক কর্মীদের আটকে রাখার বিষয়টিকে বড় ইস্যু করতে চাইছে।
এয়ারপোর্ট থেকে উদয়পুর পর্যন্ত রাস্তার ধারে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে যেসব হোর্ডিং কিংবা ফ্লেক্স লাগানো ছিল তার বেশিরভাগই ছিঁড়ে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ। দলের কেউই এই ফ্লেক্স ছেঁড়ার ঘটনায় যুক্ত নয় বলে দাবি করা করেছে ত্রিপুরা বিজেপি। পতাকা লাগানো নিয়ে পুলিশের সঙ্গে ধস্তাধস্তি শুধু ফ্লেক্স ছেঁড়া নিয়েই নয়, আগরতলা-সহ বিভিন্ন জায়গায় তৃণমূলের পতাকা লাগানো নিয়ে এদিন পুলিশের সঙ্গে তৃণমূলের কর্মী সমর্থকদের ধস্তাধস্তি হয় বলে জানা গিয়েছে। কিন্তু ইতিমধ্যে অভিষেকের সফর থেকে উজ্জীবিত হয়ে উঠেছে ত্রিপুরার তৃণমূল শিবির। বিজেপি শিবির থেকে বেশ কয়েকজন নেতা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপস্থিতিতে তৃণমূলে যোগ দিতে আগ্রহী।
এদিন অভিষেক ত্রিপুরায় পা রাখতেই বিজেপির তরফে বাঁধা দেওয়া থেকেই বোঝা যায় বিজেপির পায়ের তলার মাটি সরতে শুরু করেছে। এর অনেক আগেই মুকুল রায়ের বিজেপিতে যোগদানের পরেই ত্রিপুরায় সংগঠন শক্তিশালী করার দিকে মন দিয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। মুকুল ঘনিষ্ঠ একাধিক বিজেপি নেতা ত্রিপুরায় তৃণমূলের দিকে ঝুঁকতে শুরু করেছে। ত্রিপুরায় বিজেপির অন্দরে রীতিমতো অশান্তি শুরু হয়ে গিয়েছে। অমিত শাহ দিল্লিতে এই নিয়ে ত্রিপুরার বিজেপি নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। ঘর বাঁচাতে এখন মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছেন বিপ্লব দেব।