জাতীয় রাজনীতিতে তৃণমূল এখন যথেষ্ট সক্রিয় হয়ে উঠছে। বাংলা বিধানসভায় হ্যাট্রিক করার পর থেকে দিল্লি দখল তৃণমূলের লক্ষ্য। ২০২৪ লোকসভা ভোটে বিজেপিকে হারাতে তৃণমূলের অন্দরে মমতার সঙ্গে অভিষেকও যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে চলেছেন তা ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে। ইতিমধ্যে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদকের পদে অভিষককে বসিয়ে সেটা বুঝিয়ে দিয়েছেন মমতা ব্যানার্জি। একুশে জুলাইয়ের ভার্চুয়াল মঞ্চেও তাঁকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় দেখা যায়। ২০২৪ লোকসভা ভোটে বিজেপির সঙ্গে কড়া টক্কর দিতে জোরকদমে প্রস্তুতি নিচ্ছে তৃণমূল কংগ্রেস। আর সেই লড়াইয়ের প্রস্তুতিতে যে অভিষেক মুখ্য ভূমিকায় থাকছেন সেটা বলতে কোনও অসুবিধা নেই।
একুশে জুলাইয়ের পর্ব মিটিয়েই দিল্লি উড়ে গিয়েছেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক। দিল্লিতে সংসদের বাদল অধিবেশনে দলের সাংসদদের রণকৌশল নির্ধারণ করা থেকে শুরু করে, তাঁদের নেতৃত্ব দেওয়া, সবটাই এবার নিজে করবেন অভিষেক। বাংলার গণ্ডি পেরিয়ে তৃণমূল যখন সর্বভারতীয় স্তরে প্রবলভাবে নিজেদের গুরুত্ব আরও বাড়াতে চাইছে, তখন দিল্লি সফরে অভিষেক কী ভূমিকা নেন, সেদিকে নজর রয়েছে রাজনৈতিক মহলের।
২২ তারিখ দুপুরে তৃণমূলের রাজ্যসভার সাংসদ তথা মুখ্য সচেতক সুখেন্দুশেখর রায়ের বাড়িতে মুখ্য অতিথি হিসাবে আমন্ত্রণ জানানো হয় অভিষেককে। দলীয় সমস্ত সাংসদদের মধ্যাহ্নভোজনে আমন্ত্রণ জানানো হয়। সেই মধ্যাহ্নভোজের আসরে দুপুরে সুখেন্দুশেখরের বাড়িতে বাদল অধিবেশনে দলের রণকৌশল নিয়ে আলোচনা হয়। কীভাবে কেন্দ্রের উপর চাপ আরও বাড়ানো যাবে, দলীয় সাংসদদের সেই মন্ত্রও দেন তৃণমূল সাধারণ সম্পাদক। এছাড়া তৃণমূলের রাজ্যসভার যে দুটি আসন ফাঁকা আছে, সেই দুই আসনে প্রার্থীপদ নিয়েও আলোচনা করেন অভিষেক।
প্রসঙ্গত, আগামী সপ্তাহেই দিল্লি যাচ্ছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। আর সেই সফরে অভিষেকও মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গেই থাকছেন। জাতীয় রাজনীতিতে মমতা-অভিষেকের দিল্লিযাত্রা নিয়ে বাড়ছে জল্পনা। বিভিন্ন বিরোধী দলের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন তৃণমূল নেত্রী। নয়া সমীকরণ কিছু তৈরি হবে কিনা সেদিকেও তাকিয়ে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। সব মিলিয়ে মমতার দিল্লি চলোর শপথকে বাস্তবায়িত করাই এখন তৃণমূল সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদকের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব৷ এছাড়া তৃণমূলের লক্ষ্য এখন ভিন রাজ্যে সংগঠন গড়ে তোলা। জাতীয় রাজনীতিতে নিজেদের ভিতকে আরও মজবুত করতে, এবার ত্রিপুরায় নিজেদের সংগঠনকে বাড়ানোর লক্ষ্য নিল তৃণমূল ৷ আর সেই লক্ষ্যে আগামী অগস্ট মাসে ত্রিপুরা সফরে যাচ্ছেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক।
ত্রিপুরায় বামশক্তি ক্ষয়িষ্ণু। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকারের পক্ষে একা বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াই করা অসম্ভব কাজ। অন্যদিকে ত্রিপুরায় কংগ্রেস প্রাসঙ্গিকতা হারিয়ে ফেলেছে৷ সেই শূন্যস্থানের সুযোগ নিয়ে, বিরোধী শক্তি হিসেবে ত্রিপুরার মানুষের আস্থা অর্জন করতে চাইছে তৃণমূল কংগ্রেস। ইতিমধ্যে অভিষেক আর মুকুল রায়ের বোঝাপড়ায় সেই কাজ অনেক দূর এগিয়েছে বলে খবর। ত্রিপুরায় বিধানসভা নির্বাচনের এখনও দেড় বছর বাকি। সেদিক থেকে নিজেদের ঘাঁটি শক্ত করতে তৃণমূলের হাতে সময় রয়েছে৷ জানা গিয়েছে উত্তর ত্রিপুরা, উনকোটি, ধলাই-সহ বেশ কয়েকটি জেলায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কর্মী-সমর্থকরা তৃণমূলে যোগদান করতে শুরু করেছেন৷ এই অবস্থায় ত্রিপুরায় তৃণমূলের সংগঠনকে শক্তিশালী করার দায়িত্ব পড়েছে অভিষেকের উপর।
অন্যদিকে ২০২৪-এর লোকসভাকে পাখির চোখ করে তিন বছর আগে থেকেই প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছেন মমতা। এখন আবার তিনি সঙ্গে পেয়েছেন একসময়ে তৃণমূলের সেকেন্ড ইন কমান্ড মুকুল রায়কে। যাকে ইদানিং কালীঘাট থেকে শহিদ মঞ্চ সর্বত্র মমতার পাশে দেখা যাচ্ছে। একুশের মঞ্চে তাঁকে পাশে নিয়ে মমতার বক্তৃতা জাতীয় রাজনীতিতে নতুন বার্তা দিয়েছে বলেই মনে করছে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। ভিনরাজ্যে সংগঠন বাড়ানোর কাজ এর আগে মুকুল রায়ের নেতৃত্বে শুরু করেছিল তৃণমূল। ফলে কিছু যোগাযোগ মুকুল রায়ের রয়েছে। সেই যোগাযোগ কাজে লাগানোর পাশাপাশি তৃণমূল চাইছে মুকুল রায়ের অভিজ্ঞতা জাতীয় রাজনীতিতে কাজে লাগাতে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের ধারণা এবার বঙ্গ রাজনীতির চাণক্যকে দিয়ে মাস্টারস্ট্রোক দিতে চাইছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। আসন্ন বাদল অধিবেশনে তার গৌরচন্দ্রিকা করতে মুকুল রায়কে সঙ্গে নিয়ে দিল্লি সফরে যাচ্ছেন মমতা।
রাজধানী দিল্লি থেকে শুরু করে বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলি তৃণমূলের সফট টার্গেট হয়ে উঠেছে। ত্রিপুরা-অসম থেকে শুরু করে বাদ নেই মোদী-শাহের রাজ্য গুজরাট বা যোগী রাজ্য উত্তরপ্রদেশ। একুশে জুলাইয়ের শহিদ দিবসকে বাংলার গণ্ডী পেরিয়ে সারা দেশে ছড়িয়ে দিতে ভিনরাজ্যে সাম্রাজ্য বিস্তারের পরিকল্পনা নিয়েছে। সেই লক্ষ্যে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক করে অন্য রাজ্যে সংগঠন বাড়াতে উদ্যোগী তৃণমূল। ইতিমধব্যে মুকুল রায় ফিরে এসেছেন তৃণমূলে। ফলে এবার মুকুলকে নিয়ে আসরে নামতে চলেছেন মমতা। ফের রাজনীতিতে পুরনো জুটিকে দেখা যাবে দিল্লির আসন্ন বাদল অধিবেশন চলাকালীন। ২০২৪ লোকসভা ভোটে বিরোধী ঐক্য গড়ার লক্ষ্য নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দিল্লি যাচ্ছেন। এবার তাঁর দিল্লি সফরে সঙ্গী হতে চলেছেন মুকুল রায়। বিজেপি বিরোধী জোটকে সঙ্ঘবদ্ধ করতে মমতার দিল্লি সফরে উপস্থিত থাকছেন মুকুল রায়। একইসঙ্গে বিরোধী ঐক্য গড়ে তুলতেও জোর দিয়েছেন মমতা। ভিনরাজ্যের সংগঠনে অভিষেকের সঙ্গে মুকুল রায়ের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে চাইছে তৃণমূল, তেমনই বিরোধী ঐক্য গঠনেও মুকুল রায়কে কাজে লাগাতে চান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
তৃণমূল কংগ্রেস বিধানসভা ভোটে বিপুলভাবে জেতার পরেই গোটা দেশে অবিজেপি দল গুলিও নতুন করে উদ্যোম ফিরে পেয়েছে। একুশে জুলাইয়ে মঞ্চে সমাজবাদী পার্টি থেকে শুরু করে টিডিপি, এনসিপি, আপ, কংগ্রেস-সহ একাধিক অবিজেপি দলের সামিল হওয়া সেদিক থেকে যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। মাসের শেষে ২৭, ২৮ তারিখ করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দিল্লি যাবেন বলে জানিয়েছেন। দিল্লিতেই নির্ধারণ করা হবে ২০২৪-র রণকৌশল। মমতা যখন একুশের মঞ্চ থেকে বিজেপিকে সাফ করার ডাক দেন সেই সময় মঞ্চে তাঁর পাশে দেখা গিয়েছিল মুকুলকে। আর যখন তিনি বাদল অধবিবেশন চলাকালীন বিরোধীদের সঙ্গে আলোচনা করতে দিল্লি যাচ্ছেন তখনও তার সফর সঙ্গী মুকুল। রাজনৈতিক মহল বিষয়টিকে যথেষ্ট তাৎপর্যময় বলেই মনে করছেন।