বাংলায় তৃতীয়বারের জন্য সরকার গঠনের পরেই তৃণমূল সুপ্রিমোর টার্গেট দেশের একাধিক রাজ্যে সংগঠন বিস্তার। সেই লক্ষ্যে তৃণমূল প্রথমে ঝাঁপ দেয় পড়শি বাঙালি অধ্যুষিত রাজ্য ত্রিপুরায়। প্রসঙ্গত, তৃণমূল একসময় এই রাজ্যেই কংগ্রেস বিধায়কদের দলে টেনে এনে সংগঠন বাড়াতে চেয়েছিল। কিন্তু তৃণমূলের সেই প্রচেষ্টায় জল ঢেলে দেয় বিজেপি। বাংলার মাটিতে বিজেপির নিশ্চিত জয় রুখে তৃণমূল ফের কৌশলে ত্রিপুরায় সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধিতে মন দেয়। এবারও ঘাসফুল শিবির ত্রিপুরায় দল ভাঙিয়ে নিজেদের সংগঠন পোক্ত করতে শুরু করে। তৃণমূল নেতৃত্ব বাংলা থেকে প্রায় রোজই ত্রিপুরায় যাতায়াত শুরু করে। কিন্তু ত্রিপুরা বিজেপি তৃণমূলের সব প্রচেষ্টা বানচাল করতে সমস্ত দিক থেকেই বাধা দেয়।
তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষে লাগাতার অভিযোগ, বিজেপি ত্রিপুরায় তাদের সভা-সমাবেশ করতে জোর করে বাধা দিচ্ছে। ত্রিপুরা সরকার ও প্রশাসন এ ব্যাপারে বিজেপিকে সমর্থন যোগাচ্ছে। সভা-সমাবেশের অনুমতি না দেওয়া থেকে শুরু করে নেতাদের গ্রেফতার করা- সব রকমভাবেই বিজেপি তৃণমূলের সংগঠন বিস্তার আটকানোর চেষ্টা করছে। কিছুদিন আগে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মিছিলের অনুমতি না দিয়ে ত্রিপুরার বিজেপি সরকার মিছিল সংশ্লিষ্ট জায়গায় ১৪৪ ধারা জারি করে। শেষ পর্যন্ত হাইকোর্টের অনুমতি মেলে অভিষেকের সভার। অবশ্য রাজনৈতিক বিশেষঙ্গরা মনে করছেন, বিজেপির তৃণমূলকে এই ভাবে বাধা দেওয়ার ফল তৃণমূলের রাজনৈতিক ফায়দা হয়ে দাঁড়াবে। তাদের ব্যাখ্যা রাজনৈতিক ক্ষেত্রে যে দল যত বেশি বিরোধিতার সামনাসামনি হবে সেই দল তত বেশি প্রচার পাবে, ভবিষ্যতে তত বেশি লাভ পাবে। কারণ, নেতার গাড়ি ঘিরে বিক্ষোভ বা মারধর, গ্রেফতার ইত্যাদি ঘটনাগুলি কার্যত শাসকদলের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে বাধ্য। তাছাড়া ত্রিপুরা বিধানসভায় তৃণমূলের কোনও আসন নেই, ভোটও জুটেছে নামমাত্র সেখানে বিজেপির এ ধরণের বিরোধিতা তো তৃণমূলকে বেশ খিছুটা বাড়তি সুবিধে পাইয়ে দিচ্ছে বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশেষঙ্গরা।
এই অবস্থায় তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় রবিবার ত্রিপুরায় তাদের দলের নির্বাচনী সুর বেঁধে জানিয়েছেন, ত্রিপুরায় এখন খুঁটিপুজো হল। আগামী ২০২৩ সালে রাজ্যের বিজেপি সরকারের বিসর্জন হবে। সেই সঙ্গে তিনি আগামী ডিসেম্বরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ত্রিপুরায় সভা করবেন বলেও জানিয়েছেন। এদিন আগরতলার সভায় অভিষেক বলেন, ‘‘পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল যে সব প্রকল্প চালু করেছে, ক্ষমতায় এলে ত্রিপুরাতেও সেগুলি নেওয়া হবে। এমনকি দুয়ারে সরকার পৌঁছে দেবে।’’
প্রসঙ্গত, ত্রিপুরায় তৃণমূলের রাজনৈতিক কর্মসূচি নিয়ে বিগত কিছুদিন ধরেই টালবাহানা চলছিল। কখনো করোনা সংক্রমণের বিধিনিষেধের প্রসঙ্গ তুলে প্রশাসন প্রকাশ্যে সভা-সমাবেশ নিয়ে আপত্তি তুলেছিল। শেষ পর্যন্ত গত শনিবার ত্রিপুরা উচ্চ আদালতের নির্দেশে রবিবার তৃণমূল সভার অনুমতি পায়। সেই সভা থেকেই অভিষেক ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব দেবকে নিশানা করেন বলেছেন, ক্ষমতা থাকলে ঠেকান। বিপ্লব দেবকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বলেন, ২০২৩-এ বিপ্লব দেবের সরকার উপড়ে ফেলব।
দিনকয়েক আগে বিপ্লব দেব বলেছিলেন, বিবেকানন্দ ময়দানে সভা করে দেখান তৃণমূল কংগ্রেস। এদিন সেই প্রসঙ্গ সামনে এনে অভিষেক বলেন, আপনি বলেছিলেন, বিবেকানন্দ ময়দানে সভা করে দেখাতে, আপনার সেই ইচ্ছা তৃণমূল পূরণ করে দেবে। এরপরেই তিনি ডিসেম্বর মাসে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ত্রিপুরায় আসার কথা জানান। অভিষেক এও জানান, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সভা করবেন বিবেকানন্দ ময়দানে। এরপরেই তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক বলেন, ২০২৩-এর নির্বাচনের একবছর আগে থেকে ত্রিপুরাকেই তিনি ঘরবাড়ি বানাবেন। দলের নেতা-কর্মীরা যেখানে যাওয়ার জন্য বলবেন, তিনি সেখানেই যাবেন বলে দলের নেতাকর্মীদের আশ্বস্ত করেছেন। পাশাপাশি তিনি এও বলেন, ২৫ নভেম্বর পুরসভা নির্বাচনে সব আসনেই তৃণমূল প্রার্থী দেবে। নভেম্বর মাসে অন্তত দু থেকে তিনবার ত্রিপুরায় আসবেন বলেও জানান।
এই দফায় এ দিনই ত্রিপুরায় প্রথম বড় সভা করলো তৃণমূল। ত্রিপুরার নির্বাচন ঘিরে তৃণমূলের এই তৎপরতা বিজেপি নেতৃত্বকে যে কিছুটা হলেও চিন্তায় ফেলেছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ত্রিপুরায় ২০২৩ সালের বিধানসভা নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে গত কয়েক মাস ধরেই ত্রিপুরায় সংগঠন বিস্তারের চেষ্টা চালাচ্ছিল তৃণমূল। বারবার তাদের সাংগঠনিক কাজ বাধা পেলেও এদিন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব দেব তথা ত্রিপুরার বিজেপি সরকারকে খোলাখুলি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন।