আভিধানিক অর্থ যা মেঘের মত দেখতে। অভ্রকমের জন্ম মহর্ষি দধিচির হাড় থেকে। দধিচি, বৃত্রাসুরকে নিধন করতে নিজের হাড়ে বজ্র তৈরি করে ইন্দ্রকে উপহার দেন। বিপুল শব্দ সৃষ্টি করে বজ্র আকাশে উড়ে যাবার সময় যে স্ফুলিঙ্গ জ্বলে উঠেছিল, সেই ফুলকি পর্বতের ওপরে ছড়িয়ে যায়। সেই ফুলকিই অভ্র। মেঘের ওপর থেকে বিপুল শব্দ করে পাহাড়ে পড়েছিল, তাই তাঁর নাম অভ্রকম। আর যেহেতু আকাশ থেকে পড়েছিল তাই তাঁর নাম গগণম।
আভ্রকমকে ২২ ধরণের মাণিক্যে বিভক্ত করা যায়, হীরা (অভ্রকম), স্যাফায়ার, রুবি, এমারেল্ড, এগেট (agate), ব্লাড স্টোন, beryl, amethyst, vimalaka, royal gem (quartz), crystal, moon-gem, sugandhika, opal, conch, azure stone, topaz, brahma-gem, jyotirasa, sasyaka, pearl and coral. এই ক’টির মধ্যে চারটি আতীব গুরুত্বপূর্ণ হীরা, pearl, রুবি এবং এমারেল্ড।

অভ্রকম হলুদ বজ্র, ইয়লো মাইকা
অভ্রকম চারটি রঙের হয় — সাদা, লাল, হলুদ আর কালো। সাদা অভ্রকম রূপো তৈরিতে ব্যবহার হয়। লাল অভ্রকম কিমিয়াবিদ্যায় ব্যবহার হয়। স্বর্ণ তৈরিতে হলুদ অভ্রকম ব্যবহার হয়। কালো ব্যবহার হয় ওষুধ তৈরিতে। কালো অভ্রকম চার রকমের — দর্দুরম, নাগম, পীণাকম আর বজ্রম। কোনটি কোন অভ্রকম, তা নির্ণয় করা হয় পরীক্ষা নিরীক্ষার মাধ্যমে। এবং সে কাজ জেনে বুঝে করতে হয়। আগুণে দিলে যদি অভ্রকম ব্যাঙের মত আওয়াজ করে তাহলে তাকে দর্দুরম বলা হবে। যদি সাপেরমত শব্দ প্রকাশ করে তালে তার নাম হবে নাগম। যদি তীরের জ্যাএর মত আওয়াজ করে তাহলে এর নাম হবে পীণাকম আর আগুণে দিলে যদি বিক্রিয়া না করে তাহলে তাহলে তাঁর নাম হবে বজ্রম। বজ্রমেরই একমাত্র ওষুধেরগুণ রয়েছে। ভারতের উত্তরভাগের পর্বতগুলোতে প্রাপ্ত বজ্রকমের প্রকৃতি উজ্জ্বল এবং গুণ বহুবিধ। কিন্তু দক্ষিণের পর্বতের বজ্রকমের সম্বন্ধে সে কথা বলা যায় না।

অভ্রকম সাদা বজ্র, হোয়াইট মাইকা
যে অভ্রম নরম, মোটা পাতযুক্ত, চকচকে, ভারি, এবং স্তরগুলো সহজে আলাদা করা যায় সেগুলি ওষুধ তৈরির কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে। কিন্তু ব্যবহারের আগে সেগুলোকে পরিশোধন করতে হবে।
পরিশোধিত অভ্র নানান রোগ উপশম করতে পারে। অভ্রকে সেবনে দেহ শক্ত হয়, স্ফূর্তি বাড়ে,যৌবনাবস্থা বৃদ্ধি পায়। সন্তানেরা বীর্যবান হয়, প্রখ্যাত হয়। নিদানমত অভ্র সেবন করলে মৃত্যুর ভয় থাকে না।
ধান্যভ্রকম বিধি
পরিশোধিত অভ্রের সঙ্গে একচতুর্থাংশ পরিমাণে ধান মিশ্রণ করে একটি কাপড়ে মুড়ে তুষের জলে তিন দিন ধরে ডুবিয়ে রাখতে হবে। ভিজে মিশ্রণটি যখন নরম হয়ে যাবে তখন হাতের তালুর সাহায্যে শক্তি প্রয়োগ করে তাকে গুঁড়ো করতে হবে। ঐ পাত্রে অভ্রমের গুঁড়ো পড়ে যাবে। যতক্ষণ না সামগ্র অভ্রম গুঁড়ো পাত্রে না পড়ে যাচ্ছে ততক্ষণ হাতে ধরে এই গুঁড়ো করার প্রক্রিয়াটি চলতে থাকবে। তুষের জল থেকে অধঃপতিত অভ্রটি ছেঁকে বার করে নিতে হবে। একে বলে ধান্যভ্রকম।

অভ্রকম লাল বজ্র, রেড মাইকা
এই ধান্যভ্রকম পেষাই করে মাদার গাছের রসে সঙ্গে সারাদিন ধরে মিশিয়ে রেখে দিনের শেষে পেতে বিছিয়ে দিতে হবে। এই বিছানাকে মাদার গাছের পাতা দিয়ে ঢাকা দিতে হবে। একে আবার নিয়ে নতুন করে মাদার রসজুড়ে গুঁড়ো করতে হবে। অভ্র গুঁড়োর সঙ্গে বটের মূল ফুটিয়ে বার করা কাত্থ সঙ্গে মিশিয়ে আবার নতুন করে ফুটিয়ে তাতে হাওয়া দিতে হবে। এই স্ল্যাকিং পদ্ধতিটি (গুঁড়ো হওয়া দ্রব্য যখন আর্দ্র হলে ঝরে পড়ে) তিন বার চলবে। এবারে অভ্রকম ধুলোয় পরিণত হবে। এর বহু ব্যবহার রয়েছে। তার একটি ওষুধ তৈরি। বহু রোগ উপশম করে, আয়ু বাড়ায়, যৌবন দীর্ঘস্থায়ী করে।
পুরুষ প্রকৃতির অভ্রম সমসত্ত্ব প্রকৃতির, শেষের দিকে কোণাকার, খুব উজ্জ্বল, বিন্দুমাত্র ছোপ বিহীন। স্ত্রী অভ্রতে ছোপ রয়েছে, দাগও থাকতে পারে, অনেকটা ষড়ভূজাকৃতির। পুরুষাকার অভ্রম ওষুধ তৈরিতে খুব ব্যবহার হয়। প্রায় সব রোগের উপশম করে এবং যৌবন দীর্ঘস্থায়ী করতে সাহায্য করে। স্ত্রী প্রকৃতির অভ্র স্ত্রীদের শরীরে ব্যবহার করতে হবে। মহিলাদের শরীরের ঔজ্জ্বল্য বাড়াতে কাজে লাগে এই ধরণের অভ্রম। নপুংশক প্রকৃতির অভ্র খুব বেশি ব্যবহার নেই। সংশ্লিষ্ট প্রকৃতির অভ্র সংশ্লিষ্ট মানুষেরা ব্যবহার করলেই উপকারের মাত্রা বাড়বে। তবে পুরুষ প্রকৃতির অভ্র যে কেউ ব্যবহার করতে পারেন। তাতে কাজে স্ফূর্তি বাড়বে। বরাহমিহির তাঁর বৃহতসংহিতায় বলেছেন বজ্রমকে ওষুধের কাজে ব্যবহারের আগে অবশ্যই পরিশোধন করে নিতে হবে।

অভ্রকম কালো বজ্র, ব্লাক মাইকা
বৌধায়ন মুনি আভ্রকমকে ধাতু সর্বস্ব বলে আভিহিত করেছেন। আগেই বলেছি অভ্র চার প্রকারের সাদা, লাল, হলুদ এবং কালো। সাদা অভ্র ১৬ প্রকারের, লাল অভ্র ১২ প্রকারের কালো অভ্র ১৫ প্রকারের হলুদ অভ্র ৭ প্রকারের- মোট ৫০ প্রকারের অভ্র পাওয়া যায়।
শৌনকেয় বলছেন এই ৫০টি প্রকারের অভ্রকে আবার চারটি জাতিতে বিভক্ত করা যায় ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য এবং শূদ্র। ব্রাহ্মণ অভ্র ১৬টি প্রকৃতির, ক্ষত্রিয় অভ্র ১২টি প্রকৃতির, বৈশ্য অভ্র সাতটি প্রকৃতির, এবং শূদ্র অভ্র ১৫টি প্রকৃতির।
সাদা অভ্রকমঃ ভাভি, অম্বরম, ব্রজকম, শচিস্মাকম, পুণ্ডরীক, বিরিঞ্চিক, বজ্রগর্ভ, কিসম্বরম, স্বরচালে (sowachale), সোমাকম, অমৃতনেত্রম, সায়ত্যমুখ, কুরন্দম, রুদ্রশ্যাম, পঞ্চদরম (pancodaram), আর রুক্মগর্ভ।
লাল অভ্রকমঃ সুন্দরীকম, সম্বরম, রেখাস্যম, ওদুম্বরম, ভদ্রকম, পঞ্চস্যম, অংশুমুখম, রিক্তনেত্রম (না রক্তনেত্রম rektanetram), মণিগ্রহকম, রোহিনীকম, সোমামস্কম (somaamskam) আর কৌরমিক।

খনি থেকে অভ্রকম সংগ্রহ করা হচ্ছে।
হলুদ অভ্রঃ কৃষ্ণমুখম, শ্যামরেখম, গরলকোষম, পঞ্চধরম, অম্বরীক্ষম, মণিগর্ভম, কৌঞ্চশ্যাম (kuouncaasyam)।
কালো অভ্রঃ গোমুখম, কন্দুরকম, স্বন্দিকম, মুগ্ধ্যম, বিষগর্ভম, মন্দুকম, তৈলগর্ভ, রেখাশ্যম, পার্বনীকম, রাকামসুকম (raakaamsukam), প্রণোদম, দ্রৌণিকম, রক্তবন্ধকম, রসগ্রহকম, ব্রণহরিকম (vranahaarikam)।
উক্ত অভ্রগুলির ক্ষেত্রে প্রথম প্রকৃতির পুণ্ডরীক, দ্বিতীয় প্রকৃতির রোহিনীকমক, তৃতীয় প্রকৃতির পঞ্চধারা আর চতুর্থ প্রকৃতির দ্রৌণিকম বিমান (হাওয়া জাহাজ) তৈরির ক্ষেত্রে উপযুক্ততম।
সূত্রঃ
নানু পিল্লাই, টি এন আসান, রসরাজ চিন্তামণি,
জি আর জোসিয়ার, মহাঋষি ভরদ্বাজের বৈমানিক শাস্ত্র, পণ্ডিত সুব্বারাইয়া শাস্ত্রী দ্বারা পরিক্ষিত
রামকৃষ্ণ এম ভাট, বরাহমিহিরের বৃহৎসংহিতার দ্বিতীয় খণ্ড
এছাড়াও কৃতিকা বিমান এবং ত্রিপুর বিমান তৈরির ক্ষেত্রে অভ্র পরিষ্করণের পদ্ধতি।