মা বলে নিমগাছের হাওয়া খুব শুদ্ধ শীতল হয়। তাই রোজ দুপুরে ছাদের কোণে এসে দাঁড়ায় ছোট্ট রুশা। কিন্তু ও সব হাওয়া বাতাস ভুলে তার মন উড়ে বেড়ায় আকাশের দিকে। শীতকালে গুটি গুটি পায়ে রোজ দুপুরে এ সময়টা ছাদে এসে বসে সে… কত রকম পাখিরা একটু পরেই আসবে। তাদের ছাদ বাগানের গাছগুলোতে উঁকি দেবে লাল, হলুদ, সবুজ কত্ত নাম না জানা পাখিরা। সে শুধু চেনে ঘু ঘু পাখিদের… ছাদের মেঝেতে কি যে সব খুঁজে বেড়ায় আর খুঁটে খায় তারা!! রুশা চুপটি করে এক জায়গায় বসে ওদের দেখে। পাছে যদি ওরা বুঝে যায় যে, রুশা আছে… পলকে উড়ে চলে যাবে। তখন যে রুশার বড্ড মন খারাপ হবে!! এই বেশ লাগে… দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়, পাখিরা কেমন দল বেঁধে ঘরে ফেরে। এসবের মাঝে আবার এরোপ্লেনকেও উড়ে কোন কোথায় চলে যেতে দেখে সে।
রুশা কয়েকবার চড়েছে এরোপ্লেন… বেশ পাখির মতনই ব্যাপার,মেঘের মাঝে ভেসে বেড়ানো যায়। কিন্তু আবার এরোপ্লেনে চাপলে ঠিক পাখি হতে না পারার কষ্টও হয়!! পাখিরা চাইলে ঐ মেঘগুলোকে ছুঁয়ে যেতে পারে, ইচ্ছে হলেই নীচে নেমে গাছের ডালে বসতে পারে, আবার উড়ে মনের মত জায়গায় যেতে পারে। কিন্তু রুশার তো এরোপ্লেনে চেপে মেঘ ছোঁয়ার উপায় নেই, না আছে নিজের ইচ্ছে মত জায়গায় যাওয়ার স্বাধীনতা!! প্লেনের ঐ পাইলট লোকটা যেখানে নামাবে, সেখানে যাবে সে। তবে ঐ প্লেনে ওড়ার সময় আর নামার সময়ে শরীরে বেশ হালকা হালকা ভাব লাগে… ওটা রুশা খুব উপভোগ করে। আর এরোপ্লেনে সে যতবারই উঠেছে, ততবার তার অন্য আনন্দ হয়েছে। বাবা-মা আর সে… একসাথে ৫-৬ দিন কোন নতুন সুন্দর জায়গায় একসাথে ঘুরবে, খাবে, ঘুমাবে। বাবা বা মায়ের কারোর অফিসে যাওয়ার তাড়া নেই। সারাক্ষণ কি সব ক্লায়েন্ট কল নেই বাবার, মাও দিব্বি অফিসের কূট কাচালি গল্প থেকে দূরে থাকে। তাই ঐ দিনগুলো ভীষণ প্রিয় রুশার কাছে।
বিকেলটা বড্ড তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যায় এই শীতের দিনে। ঝুপ করে অন্ধকার নেমে আসে। এবার পালা বারান্দায় গেটের আওয়াজে কান পাতার। মায়ের বাড়ি ফেরার সময় চলে আসে। দুই একদিন যখন মায়ের বিকেল নাগাদ ফোন আসে, ঝুপ করে ঐ অন্ধকার নামার মত রুশার মনেও কেমন ছায়া ঘনায়। এই বুঝি মা বলবে, আজ একটু ফিরতে দেরি হবে রে রুশু সোনা, অফিসে চাপ আছে আজ… তুই কিছু খেয়ে নিস। বাড়ি ফিরে অনেক গল্প করবো আমরা। কিন্তু রুশা জানে, মা ফিরে এসে হয় ঐ অফিসের ঝামেলা নিয়ে ফোনে ব্যস্ত থাকবে, নাহলে ক্লান্তিতে গা এলিয়ে শুয়ে থাকবে। তবে মা বাড়ি ফিরলেই কেমন মনের মধ্যে ফুরফুরে হাওয়া বয়ে যায় রুশার। অফিস থেকে ফিরে মা স্নান করে ঘরে আসে যখন একটা হালকা মিষ্টি গন্ধে ঘর ম ম করে। ভালবাসার মত মিষ্টি মায়ের গন্ধ সেটা… মনে হয়, মা কে জড়িয়ে খুব আদর খাই। কিন্তু মা কে বলা হয় না সে কথা রুশার।
এরপর রাত বাড়ে, বাবার ফিরতে দেরি হয় রোজ। কোন কোনদিন মিটিং এত রাত করে চলে যে রুশার ঘুমানোর পরে বাবা ফেরে। তবে পৃথিবীর যত গোপন গল্প আবদার সবের ঝুলি ঐ বাবার কাছে। বাবা অবশ্য বাড়ি এলে পুরো সময়টাই রুশাকে দেয়। মায়ের মত অফিসের গল্প বাড়ি টেনে আনে না। বাবা মেয়ে গলা জড়াজড়ি করে কত্ত গল্প হয়, একসাথে টি ভি দেখা, নানারকম খেলা হয়। তবে বাবার সময় বড় কম… রুশা বোঝে যে, বাবার অফিসের চাপটা বড় বেশি। বাবা ভীষণ ক্লান্ত থাকে, তবু বাবা সেটা ওকে বুঝতে দেয় না।
এমন করেই দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়… রুশার স্কুল এখনো খোলে না। অনলাইনে ক্লাস চলে সকালে। কি এক রোগ এলো যে… ঘরে বসে থাকতে হচ্ছে বাচ্চাদের। কতদিন বন্ধুদের সাথে গল্প হয় না, স্কুলের মাঠে দৌড়াদৌড়ি নেই, খেলা করতে পারে না। শুধু ফোনে গল্প করে ওরা ৩ জন বন্ধু মাঝেমধ্যে। কিন্তু রুশার মন দিন দিন একাকি হচ্ছে। দুপুরবেলা এখন মাঝেসাঝে দোতলার ব্যালকনিতে বসে নানা রকম রঙ পেনসিল নিয়ে বসে হাবিজাবি এঁকে রঙিন করে সে। সেই সাথে কত কিছু রাস্তা দিয়ে যেতে দেখে… শুধু ওর মত বাচ্চারা বাইরে বেড়ায় না।
খাতায় ওর প্রিয় পরীর ছবি আঁকছিল রুশা। হঠাৎ এক ডুগডুগির মত আওয়াজ শুনতে পেল রুশা। তাকিয়ে দেখে ছোট্ট একটা বাঁদর নিয়ে ওর চেয়ে একটু বড় একটা ছেলে রাস্তা দিয়ে যাচ্ছে। কি মনে হতেই রুশা ডাক পারলো… কি গো, তোমার বাঁদর ছানার নাম কি?
উত্তর এলো… ওর নাম নাড়ুগোপাল! শুনে রুশার সে কি হাসি। বললো, দাঁড়াও আমি নীচের তলায় বারান্দায় আসি, তোমার নাড়ুগোপালকে সামনে থেকে একটু দেখবো।
বলেই সে এক লাফে নীচের বারান্দায় এলো। যদিও গেটে তালা দেওয়া আর ওর বাইরে বেড়োনো বারণ। তবু ঐ বারান্দা কার্ণিশে বসে দূর থেকেই শুরু হলো ওদের আলাপচারিতা।
ছেলেটার নাম নাকি লাটাই। ও থাকে রেল লাইনের ও পারে। কি সব জায়গার নাম বললো, সে সব থোড়াই চেনে। লাটাই বেশ মজার ছেলে। নাড়ুগোপাল নাকি ওর সাথে সবসময় থাকে, ঘুমায়, খায়, স্নান করে। নাড়ুগোপালকে নাচ করে খেলা দেখাতে বললো লাটাই। কি দারুণ বাঁদর নাচ দেখালো সে। একটু পরেই লাটাই বললো যে, ওর দেরি হয়ে যাচ্ছে ফিরতে, আবার পরে আসবে কখনো। এই বলে লাটাই আর নাড়ুগোপাল বিদায় নিলো। কি যে আনন্দ লাগলো সেদিন রুশার। ওদের দুজনের অনাবিল হাসি কখন যেন রুশাকেও ছুঁয়ে গেল। সেদিন রাতে মাকে আরেকটু বেশি করে আদর করতে মন চাইলো। সে গিয়ে হঠাৎ মাকে জড়িয়ে ধরলো পিছন থেকে। মা ওর গালে আলতো চুমু খেলো। কি যে আনন্দ হলো রুশার!! বাবা বাড়ি ফিরেছে সেদিন তাড়াতাড়ি, তাই আরো মন খুশ। দুজন মিলে দাবার গুটি নিয়ে বসলো, কিন্তু গল্প হতে লাগলো কত রকম। দিনটা বড় ভালো গেল আজ… মনে মনে ভাবলো রুশা।
পরের দিন দুপুর হতেই আবার ব্যালকনিতে বসে রঙের বাক্স আর খাতা নিয়ে বসলো, কিন্তু কান খাঁড়া করে শুনতে লাগলো।… যদি কোন ডুগডুগির আওয়াজ আসে!! আঁকার খাতা থেকে চোখ বারে বারে রাস্তার দিকে যেতে লাগলো। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলো… পাখিদের কলরবে ছাদ সরগরম। তবু রুশা ছাদে যায় না, অবচেতনে সে অন্য কিছুর অপেক্ষায় রয়েছে। তবু কিছুসময় পরে চোখে পড়লো, একটা ঘু ঘু পাখি উঁকি দিচ্ছে গ্রিলের ফাঁক দিয়ে। কখন যে ছাদ থেকে ঘরে ঢুকে পড়লো… ব্যালকনি থেকে উঠে সে দৌড়ে গেল ঘু ঘু তাড়াতে। ওর তাড়া খেয়ে ঘু ঘু পাখি তার সঙ্গীদের ভিড়ে আবার মিশে গেল। মনে মনে বেশ তৃপ্ত হলো রুশা। যদি ঘুঘুটা দলছুট হয়ে ওদের ঘরে ঢুকে পড়তো, আর অন্ধকার নামলে বাসায় ফেরার পথ পেতো না, না জানি কি মন খারাপ হত পাখিটার!! এই বেশ ভালো হয়েছে।
পরের দিন স্কুলের অনলাইন ক্লাস শেষ হতেই ললিপপ চুষতে চুষতে বারান্দায় গেল রুশা বল খুঁজতে। হঠাৎ কানে আসে সেই ডুগডুগির আওয়াজ। সঙ্গে সঙ্গে সে অধীর আগ্রহে গ্রিল ধরে দাঁড়ায়। লাটাই আজ একটা ঝোলা কাঁধে অদ্ভুতুরে পোষাক পরে এসেছে। সাথে নাড়ুগোপালকেও একটা ছোট্ট জামা পড়িয়েছে সে।
কি গো, কোথায় চললে তোমরা? মনে আছে আমাকে?
লাটাই বলে, ওতো সহজে ভুলি না গো আমরা কাউকে। তুমি তো আবার মিষ্টি একটা মেয়ে!!
শুনে কি খুশি হলো রুশা। নাড়ুগোপাল আর লাটাই এসে বসে ওদের বাড়ির বাইরের সিঁড়িতে। ঘর থেকে চট করে এসে ললিপপ একটা দেয় লাটাইকে। নাড়ুগোপাল খেতে পারে? — জিজ্ঞেস করে রুশা।
না গো, ওর গলায় বেঁধে যাবে…
রুশা এবার গল্প জুড়লো লাটাইয়ের সাথে… ওর স্কুলের বন্ধুদের সাথে কি কি খেলে ও। লাটাই তো এ সব ইংরিজি নাম শুনে অবাক চোখে তাকায়। বলে যে, তুমি এক্কা দোক্কা, ডাংগুলি, কিত কিত খেলো নি কখনো?
রুশাও কেমন গোল গোল চোখে তাকায়। এ সব নাম তো সেও কখনো শোনে নি। লাটাই যাওয়ার সময় বলে যায়, আরেকদিন এসে সে একটা একটা করে খেলা শিখিয়ে যাবে। নাড়ুগোপালকে নিয়ে বিদায় জানিয়ে লাটাই রাস্তার বাঁকে হারিয়ে যায়।
রুশার মন আজও বেশ ফুরফুরে। নতুন বন্ধু, তার নতুন জগতের কথা ভাবতে লাগলো সে। যদি সেও এমন লাটাইয়ের মত স্বাধীন হয়ে ঘুরতো, কত জায়গায় ঘুরতে পারতো… কি যে ভালো হত!!
এমন করে দিনের পরে দিন যায়। লাটাই, নাড়ুগোপালের সাথে রুশার বন্ধুত্ব জমে ওঠে। প্রায় রোজ এ পাড়ায় আসা শুরু করলো ওরা। রুশাও প্রাণ ভরে ওদের সাথে মনের সব কথা বলতে লাগলো। বাবা-মাকে ও কত ভালোবাসে। ওর ভাল লাগার বিষয়, খেলনা পাতি এনে এনে দেখাতো রুশা রোজ লাটাইকে।
লাটাই ছেলেটা বিচিত্র বেশ। খুব গরীর ঘরের হলেও লোভ লালসা বা বাজে চিন্তা ওকে ছুঁয়ে যেতে পারে না। শুধু ওর বাড়ির এত অশান্তি, দারিদ্র্যতা থেকে মুক্তি পেতে ও এমন করে বেড়িয়ে পড়ে বাড়ি থেকে। নিত্য নতুন মানুষের সাথে, বিশেষত বাচ্চাদের সাথে মিশতে ওর খুব ভালো লাগে। গল্পে গল্পে কত নতুন কথা জানতে পারে। বাইরে থেকে সুখী পরিবারের মত মনে হয় যাদের, কিন্তু বাস্তবে সেখানে বসবাস করা মানুষগুলোরও কষ্ট আছে। সে সব আবার অন্যরকম। বেশিরভাগ বাচ্চাগুলো একাকিত্বে ভোগে। লাটাইয়ের মনে হয় কিছু সময় সে যদি তাদের সাথে গল্প করে, নাড়ুগোপালকে দিয়ে খেলা দেখিয়ে মজা পাওয়ায়… তাতে ক্ষতি কি!! ওই ফুটফুটে সুন্দর বাচ্চাগুলোর মন তো তরতাজা হয়ে উঠবে।
কিন্তু এই এমন অনেক বাচ্চার মাঝে রুশা একটু অন্য রকম। খুব যত্ন নিয়ে খেয়াল রাখতে চায়, বন্ধু হিসেবে লাটাই আর নাড়ুগোপালকে আগলে রাখতে চায়। সেই কারণে লাটাইয়ের মত পাগলপারা মুক্তমনা কিশোরের মনেও মায়া জন্মে যায়। লাটাই বোঝে যে, এক দিন সে ঐ রাস্তায় না গেলে রুশার মন খারাপ হয়ে যায়। এই তো, সামনের সপ্তাহে রুশা নাকি কোথায় একটা পাহাড় দেখতে যাবে ওর বাবা মা-র সাথে। তার জন্য কত আগে থেকে সে লাটাইকে বলে রেখেছে… ঐ কয়দিন লাটাই আর নাড়ুগোপাল যেন এ রাস্তায় না আসে। নিজেদের খেয়াল রাখে। তাই সে অগ্রিম এক বাক্স চকলেট লাটাইকে দিয়ে রেখেছে। যদিও লাটাই সেটা নিতে একবারও রাজি হয় নি। সেই শুনে ছোট্ট রুশা কেমন গাল ফুলিয়ে বসে থাকলো। অগত্যা লাটাই নিয়ে নিলো সেই চকলেট বাক্স, অবশ্য মনে দ্বিধা রেখে অনেকখানি।
ওদিকে রুশার জীবনের অঙ্গ হিসেবে লাটাই আর নাড়ুগোপাল নীরবে ঢুকে গেছে। রুশার জীবনে ঐ কিছু মুহূর্তের খোলা হাওয়া অনেক পরিবর্তন নিয়ে আসে। যখন তখন সে অভিমানী হয়ে গাল ফুলিয়ে বসে থাকে না। মায়ের কথা মত সব পড়াশোনা মন দিয়ে করে। স্নানের সময়ে যে বায়না তালগুলো করতো কিংবা খাবার টেবিলে বসে এটা ওটা না খাওয়ার তাল খুঁজতো… সে সব অভ্যাস অনেকটা বদলেছে। বাবা-মাও বেশ অবাক হয় মেয়ের এই পরিবর্তনে। বাবা তো আরো বেশি মেয়েকে নিয়ে গর্বিত বোধ করে। তার রাগী জেদি মেয়ে যে এখন লক্ষ্মী মেয়ে!!
রুশার বাবার এবার হঠাৎ কয়দিন ছুটি প্রাপ্তি ঘটেছে। তাই ওরা প্লেনের টিকিট কেটে চিরকালের প্রিয় জায়গা দার্জিলিং এ কাটাবে বলে প্ল্যান করে। রুশাও বাবার কাছে মন দিয়ে শোনে, কি কি আছে ওখানে। অনেক ছোটবেলায় যখন সে কোলে ছিলো, তখন ওকে নিয়ে বাবা মা গেছিলো দার্জিলিং। তাই স্বাভাবিক ভাবে ওর কিছুই মনে নেই। ঘুরতে যাওয়ার দিন যত এগোতে লাগলো, লাটাইকে রুশা ওর ঘুরতে যাওয়ার জায়গায় কি কি আছে বলতে লাগলো। টয়ট্রেন কেমন হয়, বরফে ঢাকা পাহাড় দেখা যায়, ওখানে চা বাগানও আছে, আবার একটা চিরিয়াখানাও নাকি দার্জিলিং এ আছে। বাবার মুখে শোনা সব গল্প বলে রুশা জানায় যে, সে ফিরে এসে সব ফটো লাটাইকে দেখাবে। ও ঠান্ডা পোশাক নিয়েছে, ওর আলাদা এবার ব্যাগ দিয়েছে মা… কিছু বলার বাকি থাকে না। লাটাই ও অবাক হয়ে শোনে সে সব গল্প। যদি সে যেতে পারতো এমন জায়গায়। কলকাতায়ও একটা চিড়িয়াখানা আছে, শুনেছে সে। তাই দেখা হল না… আর এ সব দূর পাহাড়ি দেশে যাওয়া তো লাটাইয়ের অলীক কল্পনা। তবু মনে মনে সে খুব আনন্দ বোধ করে। রুশা ঘুরে এলে তো তবু ওর ফোনে লাটাই সেই স্বপ্নের জায়গার ছবি দেখবে।
লাটাইয়ের মুখে রুশা শুনেছে যে, লাটাই আর নাড়ুগোপাল অনেক নাম না জানা গলিতে রাস্তায় ঘোরে। কত বিচিত্র সব বাড়ি, আর সেখানে থাকা বাচ্চারা। তাদের মধ্যে কত কারোর সাথে লাটাইয়ের খুব ভালো বন্ধুত্ব। মাঝেমধ্যে নাকি লাটাই যায় ওদের সাথে দেখা করতে। তারা তখন কি কি ভালো খাবার খেতে দিয়েছিল, কোন খেলনা নিয়ে লাটাই ওদের সাথে খেলা করে এসেছে, নাড়ুগোপাল কোন বিশেষ নাচটা করে দেখিয়েছে… সে সব কথা শুনতে শুনতে কখন যেন রুশার মনে খুব হিংসা হয়। ঐ বাচ্চাগুলোর মধ্যে এমন কি আছে? যার জন্য এখনো লাটাইরা যায় দেখা করতে। ও তো মন থেকে লাটাই আর নাড়ুগোপালকে ওর সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু মনে করে। তবু লাটাইয়ের মুখে এত কেন বাকিদের কথা!! রুশা তো এখন ওর বন্ধুদের সাথেও তেমন কথা বলে না আলাদা করে, বড্ড এক রকম কথা আর খেলার গল্প ওদের। ওর কাছে লাটাইয়ের গল্প আর নাড়ুগোপালের কর্মকান্ড বেশি উপভোগ্য। কিন্তু লাটাইয়ের কাছে রুশা শুধুমাত্র ঐ নানারকমের বাড়ির এক একটা বাচ্চার মতই, লাটাইয়ের মনেও কোন বিশেষ বন্ধু নয়। এটা মনে মনে ওকে কষ্ট দেয়।
প্লেনে উঠার সময়ে রুশার মনে হলো… লাটাইকে যদি কখনো প্লেন চড়ানো যেত, ও বুঝতো যে… পাখির মত অনুভূতি কেমন হয়। তারপর দার্জিলিংএর ঘোরার জায়গাগুলোতেও ওর লাটাইকে নিয়ে আসতে ইচ্ছে হলো। কত্ত গরীর ওরা, কখনও ভাল মন্দ কিছু পায় নি জীবনে। পাহাড় সমুদ্র জঙ্গল এ জীবনে দেখার ভাগ্য হয় নি.. তাই রুশার ঘুরতে গিয়েও মন খারাপ হয় লাটাইয়ের জন্য। আবার মনে মনে ভাবে যে, ফিরে গিয়ে এত গল্পের পাহাড় জমাবে যে লাটাইও ওর সাথে সাথে ঘুরে নেবে দার্জিলিং।
বাড়ি ফিরে এসে দুপুর থেকে অপেক্ষায় বসে থাকে কখন ডুগডুগির আওয়াজ শুনবে ও। কিন্তু দুপুর পার করে সন্ধ্যা নামে। ওরা এলো না। লাটাইকে ও বারে বারে বলে দিয়েছিলো যে, শুক্রবার দুপুরে যেন ওরা অবশ্যই আসে। কারণ রুশারা আগের দিন রাতেই চলে আসবে। নিজের জন্য কিনে আনা একটা রঙিন মাফলার আর উলের টুপি আলাদা করে রেখেছে সে লাটাই এবং নাড়ুগোপালের জন্য। কিন্তু কেন এলো না ওরা? শরীর ঠিক আছে তো ওদের? সেদিন মন বেশ বিমর্ষ হয়ে পড়ে তার। বাবা বাড়ি ফিরলে মেয়ের এমন দুঃখী মুখ দেখে অবাক হয়। ঘুরে আসার পরে তো খুশি থাকার কথা… এত ভালো সময় কাটালো ওরা তিনজন!!
পরের দিনও লাটাইদের কোন খোঁজ মিললো না। ছোট্ট রুশার মন আরো উদাসী হলো। ৩ দিন পরে যখন বিকেলে ডুগডুগির আওয়াজ শুনলো রুশা, পাগলের মত ছুটে গেল। লাটাইকে দেখে ওর চোখ ছলছল করছে। খুব অভিমান মেশানো গলায় জিজ্ঞেস করলো… কোথায় ছিলে গো তোমরা? শরীর ঠিক আছে তো? বাড়ির সবাই ভালো আছে?
লাটাই খুব স্বাভাবিক স্বরে বলে, আমরা তো এই কয়দিন ধরে ঐ পাশের গলিতে যাচ্ছি। তাই এদিকে আর আসা হয় না। ও রাস্তায় থাকে ছোট্ট তিন্নি, সে বেশ অদ্ভুত স্বভাবের। নাড়ুগোপালের সাথে এক তালে নাচে গো সে… তাই ওখানে যাই এখন। আজ মনে হলো যে, তুমি তো ফিরেছো.. দেখা করতে এলাম তাই!!
মুহূর্তে রুশার মন কেমন বিষন্ন হয়ে পড়লো। সে কত গল্পের ঝুলি নিয়ে বসে ছিল। ভেবেছিল… লাটাই সব গল্প শুনবে মন দিয়ে। কিন্তু তা তো নয় ব্যাপারটা। রুশা ওদের জন্য নিয়ে আসা টুপি মাফলার টা দিলো লাটাইয়ের হাতে। কিছুতেই সে উপহার নিতে চাইলো না লাটাই। বললো যে, এত দামী জিনিস আমাকে দিও না বন্ধু, আমার অভ্যাস খারাপ করো না। তবু রুশার জোরাজুরিতে সে নিলো। আবার কবে আসবে জিজ্ঞাসা করতে, লাটাই বললো… যেদিন মন চাইবে।
অবাক হয়ে গেল রুশা, এত সহজে কি করে মানুষ বদলে যায়!! সপ্তাহ জুড়ে সে অপেক্ষা করে ডুগডুগির আওয়াজের, কিন্তু ওরা আর আসে না। ছোট্ট মেয়ের মনের প্রভাব ওর মুখেও স্পষ্ট। দিন দিন হাসিখুশি মেয়েটা কেমন ঝিমিয়ে পড়তে লাগলো। মা এসে রোজ এখন মোবাইল ছেড়ে ওকে আদর করে, মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। বাবা কত রকমের চকলেট, খাবার আনে রোজ। মেয়ে কিছুসময় খুব খুশি হয়। তিনজন মিলে থাকলে মন ভালো লাগে। কিন্তু দুপুর হলেই মনে ছায়া ঘনায়। কোথায় একটা মন আকুল হয়, বন্ধুরা আর আসে না কেন? কত গল্প, ওদের সাথে নতুন নতুন খেলা… সব কিছুকে ভীষণভাবে মিস করতে থাকে। কিন্তু লাটাই ওকে বলেছিলো যে, ও কোন গলিতে বেশিদিন আসা যাওয়া করে না।
বেশ কিছু দিন পরে এক দুপুরে আবার লাটাই-নাড়ুগোপাল এসে ডুগডুগি বাজিয়ে ওকে ডাকতে থাকে। মনমরা ছোট্ট মেয়ে এসে দাঁড়ায় ওদের সামনে। কোথায় যেন সেই চেনা ছন্দে হাসি ঠাট্টায় মাখা অনুভূতিটা মিলিয়ে গেছে। লাটাই জিজ্ঞেস করে… কি হয়েছে গো বন্ধু তোমার? হাসি কোথায়? দেখো নাড়ুগোপালও তোমাকে দেখে কেমন মুখ বেঁকালো। রুশা বলে… আমার একটা প্রিয় বন্ধু হারিয়েছে, তারা যেন কেমন হয়ে গেছে! তোমাদের কি একবারও মনে পড়ে না আমার কথা?
শুনে লাটাই জবাব দেয়… সব বুঝি, সব জানি, কিন্তু বন্ধু, তোমাকে বুঝতে হবে, আমার তোমার বন্ধুত্ব হয় না কখনো। একদিন তুমি বড় হলে বুঝবে যে, লাটাইরা তোমাদের চেয়ে আলাদাই।
এ কথার মানে রুশা কি বুঝলো কে জানে! অঝোরে চোখ থেকে জল পড়তে লাগলো তার। লাটাই শুধু বলে গেল… কখনও আবার ঘুরতে ঘুরতে এসে ওর খোঁজ নেবে, ললিপপ খেয়ে যাবে৷ কিন্তু এই রোজের বন্ধুত্ব এখানেই শেষ হলো।
রুশার দুপুরের নিস্তব্ধতা বাড়লো অনেকখানি। নিমগাছের পাশে গিয়ে দাঁড়ায় সে এখন মাঝে মধ্যে। মা মনে হয় ঠিকই বলে… বাড়ির গাছের শান্ত শীতল হাওয়ায় আনন্দ বেশ অনেকখানি। এ হাওয়া একান্ত আমার নিজের, গাছটা কখনো দূরে যাবে না। ঘু ঘু ময়না বুলবুলি পাখিরা যখন ছাদে ঘোরা ফেরা করে… ঐ দূর থেকে তাকিয়ে চুপচাপ বসে থাকাতেই শান্তি। বেশি কাছে যেতে গেলে ওরাও দেবে দূরদেশে পাড়ি।
এখনও বিকেলবেলায় কানে আসে ডুগডুগির আওয়াজ, সত্যি কি মিথ্যা কোনোটাই যাচাই করতে ব্যালকনিতে গিয়ে উঁকি দেয় না ছোট্ট রুশা। ঐ আওয়াজ যে বড্ড সর্বনেশে!!
লেখিকা : অঙ্কের শিক্ষিকা, উত্তর চব্বিশ পরগনার পৃথিবা রাধারাণী গার্লস হাই স্কুল, হাবড়া।