ছোটবেলার কচ্ছপ আর খরগোশের দৌড়ের গল্পটা মনে আছে? খুব পরিচিত একটি গল্প। ধীর আর দ্রুততার মধ্যে প্রতিযোগিতা। খরগোশ দ্রুত ছুটতে পারে বলে কচ্ছপের ধীর গতিকে নিয়ে মজা করত। একদিন কচ্ছপ রেগে গিয়ে খরগোশকে একটি দৌড় প্রতিযোগিতার চ্যালেঞ্জ করে বসে। দৌড় শুরু হয়। খুব দ্রুত দৌড়াতে পারা নিয়ে খরগোশ নিশ্চিন্ত ও গর্বিত ছিল তাই কিছুদূর গিয়ে একটা গাছের ছায়ায় ঘুমিয়ে পড়ে। কচ্ছপের ধৈর্য আছে, তাই চলার গতি না কমিয়ে একনাগারে চলে খরগোশের আগে গন্তব্যস্থলে পৌঁছে গেল। এর থেকে শিক্ষা পাওয়া গেল অলসতা ও অহংকার থাকলে কৃতকার্য হওয়া যায় না।

এতো গেল নীতিশিক্ষার গল্প এবার আসি বিশ্বের খবরে। আজ সারা বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে ওয়ার্ল্ড টার্টেল ডে অর্থাৎ বিশ্ব কচ্ছপ দিবস। ১৯৫৯ সালে আমেরিকা কচ্ছপ সংরক্ষণ আইন প্রচলন করে। আন্তর্জাতিক আইনের মধ্যে রাখা হয় ১৬০টি দেশকে, এর মধ্যে জাপান চীন ভারত মালয়েশিয়া সিঙ্গাপুর অস্ট্রেলিয়া শ্রীলঙ্কা ইন্দোনেশিয়া বিশেষ উল্লেখযোগ্য। ২০০০ সাল থেকে Susan Tellem এবং Marshall Thompson দ্বারা প্রতিষ্ঠিত আমেরিকান টরটয়েজ রেসকিউ (American Tortoise Rescue) নামক একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা এই দিবসটি পালনে উদ্যোগী ভূমিকা নিয়েছিল। কচ্ছপ পরিবেশের বন্ধু। সমুদ্র, নদী, খাল-বিলে বসবাসকারী এই সুন্দর শান্তস্বভাবের ধরিত্রীর সবচেয়ে প্রাচীন প্রাণী (২০০ মিলিয়ন বছর আগে থেকে পৃথিবীতে কচ্ছপের অস্তিত্ব ছিল) কুলকে রক্ষার জন্য এবং কচ্ছপ সম্পর্কে মানুষের মধ্যে জনসচেতনতা তৈরি, কচ্ছপ এবং তাদের অদৃশ্য হয়ে যাওয়া আবাসস্থলগুলিকে রক্ষা করতে এবং সেইসাথে তাদের বেঁচে থাকতে, প্রকৃতির অন্যান্য জীবের পাশাপাশি এই জীবের প্রতি সম্মান দেখানোর সম্পর্কে জ্ঞান বৃদ্ধির জন্য এই দিবসটি পালন করা হয়।

আজ যে দিবসটি আমেরিকানরা পালন করার চিন্তা করছে, বহুপূর্ব আগে হিন্দুরা কচ্ছপকে ভগবান বিষ্ণুর দ্বিতীয় অবতার রূপে মেনেছেন। সাগর মন্থনের সময় ভগবান বিষ্ণু কচ্ছপের অবতার গ্রহণ করেছিলেন। তাই এই প্রজাতিকে রক্ষার ধর্মীয় বাতাবরন ভারতেই সেই কোন যুগ থেকেই চলে আসছে। বাস্তুশাস্ত্র অনুসারে অনেকেই ঘরের উত্তর দিকে ধাতব বা কাঠের কচ্ছপের মূর্তি রাখে কারণ, এই দিকটি ভগবান কুবের দ্বারা শাসিত।
কচ্ছপ, কাছিম, কাঠা ( turtle, tortoise) যাই বলি না কেন, আকারে গোল সরীসৃপ মেরুদন্ডহীন উভচর প্রাণীটি মিষ্টি ও নোনা দু-ধরনের জলেই থাকে। বুকের উপর ভর দিয়ে ধীর গতিতে চলে। কচ্ছপের দেহের উপরের অংশকে ক্যারাপেস ও নিচের অংশকে প্লাসট্রোন বলে। এই দুটির মাঝে থাকে নরম শরীর। বাইরে থাকে মাথা ও চারখানা পা, প্রয়োজনে মাথা ও পা বিশেষ কৌশলে শরীরের মধ্যে ঢুকিয়ে রাখতে পারে। দাঁত নেই, শক্ত চোয়াল দিয়েই খাদ্য পিষে খায়। দীর্ঘজীবী প্রাণীটি দীর্ঘদিন না খেয়েই বেঁচে থাকতে পারে। কিন্তু কিছুতেই ধৈর্য হারায় না। কোন কোন প্রজাতির কচ্ছপ মাটিতে ঘন্টায় পাঁচ কিলোমিটার বেগে চলতে পারে।

আমাদের দেশে কচ্ছপকে কেঠো বা দূরও বলা হয় আকার ও কারুকার্য বুঝে। যেমন ধরুন চিতি কচ্ছপ, বালিকাঠা, গাং, ছোটা কচ্ছপ ইত্যাদি। আকারে ছোট কচ্ছপগুলি পাওয়া যায় প্রচুর পরিমাণে এবং এদের মাংস খুব সুস্বাদু তার ফলে সংখ্যায় ধীরে ধীরে কমে আসছে কচ্ছপের সংখ্যা। আরও একটি বিপর্যয়ের কারণ হলো উল্টে দিলে নিজে সোজা হতে আর পারে না কচ্ছপ। শীতে কচ্ছপের চাহিদা খুব বেশি থাকে। মালদা, উত্তর ২৪ পরগনার অনেকটা অংশ, বেহালা, সোনারপুর, বারুইপুর, বাঁশদ্রোনি ছাড়াও বিভিন্ন স্থানে কচ্ছপের মাংস বিক্রি হয় বেআইনিভাবে। এই মাংসের মূল্যও প্রচুর। চাহিদা মেটাতে ব্যবসায়ীরা চোরাপথের পথিক হয়। গ্রামাঞ্চলে রাত্রে পুকুর বা ডোবা থেকে কচ্ছপরা জল থেকে উঠে অন্য ডোবা বা মাঠে যেতে চায় খাবারের সন্ধানে। সুযোগ সন্ধানী মানুষ সেই সময় এদের ধরে নেয়। এছাড়া সৌন্দর্য বৃদ্ধি করার জন্য পুকুর বা জলাশয়ের পাড় আলো দিয়ে বাঁধানো হচ্ছে ফলে এদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় বাধা আসছে।
প্রতিটা মা কচ্ছপ একসঙ্গে ১৪০ টা ডিম পাড়তে পারে। ডাঙায় ওঠে এর জন্য সময় লাগে প্রায় চার ঘন্টা। বাচ্চা ফুটতে সময় লাগে ৬০ দিন। এরপর এরা দল বেঁধে জলের দিকে যায়। কচ্ছপের ডিমের চাহিদাও তুঙ্গে।

কচ্ছপ সংরক্ষণের চেষ্টায় বাংলার সুন্দরবনের সজনেখালীতে একটি কেন্দ্র খোলা হয়েছে। গাঙ্গেয় উপকূল, সুন্দরবনের নদ-নদীতে লুপ্তপ্রায় বাটাগুর বাসকা বা সোনাকাঠা কচ্ছপের সংখ্যা বাড়াতে ১০ বছর ধরে পাইলট প্রজেক্ট চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সুন্দরবন ব্যাঘ্র প্রকল্প এবং টার্টেল সারভাইভাল অ্যালায়েন্স অর্থাৎ (TSA)। সে উপলক্ষেই সুন্দরবনের সজনেখালিতে গতবছর আয়োজন করা হয়েছিল একটি বিশেষ কর্মশালার যেখানে কচ্ছপের সংরক্ষণ নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি একটি কচ্ছপের পিঠে ট্রান্সমিটার বসিয়ে নদীতে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। উদ্দেশ্য একটাই কচ্ছপদের জীবনযাত্রার প্রতি লক্ষ্য রাখা।
শেষে একটি অত্যাশ্চার্য তার থেকেও অত্যধিক দুঃখের কচ্ছপের একটি ঘটনা বলি। কচ্ছপটির নাম ওমসিন। বয়স ২৫। ব্যাঙ্ককের চুলালংকর্ন হাসপাতালে কচ্ছপের পেটে ছুরি-কাঁচি চালিয়ে অস্ত্রোপচার করে পাওয়া যায় ৯১৫ টি কয়েন, যার ওজন ৫ কিলোগ্রাম।

চোনবুরি প্রদেশের ছোট্ট একটি পার্কের ধরে বাস করতো ওমসিন। প্রতিদিন ভ্রমণকারীরা পুকুরে কয়েন ফেলতেন এই বিশ্বাসে যে কচ্ছপের মতোই কয়েন জলে ছুঁড়ে ফেললে তারাও দীর্ঘায়ু হবে। সেই কয়েন টপাটপ গিলেছে ওমসিন। হজম না হওয়া বছরের পর বছর কয়েন তার পেটকে পরিণত হয়েছে একটি জলজ্যান্ত পিগি ব্যাঙ্কে। পার্কের মালিক ওমসিনকে প্রাণী বিভাগে ভর্তি করেন। সাত ঘন্টা অস্ত্রপচারের পর পেটের কয়েন উদ্ধার হয়। কিন্তু কিছুদিন সুস্থ থাকার পর মৃত্যু তাকে ছিনিয়ে নেয়। সেই থেকে কয়েন ফেলার নিষেধ নোটিশ পরে পার্কে।
ক্রমশ কমছে কচ্ছপের সংখ্যা। পরিবেশের ভারসাম্য টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে কচ্ছপের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। চোরাশিকারীদের হাত থেকে কচ্ছপকে বাঁচাতে আরও কড়া আইন প্রণয়ন করা উচিত। এরজন্য জনসচেতনতাও প্রয়োজন। এই বিরল উভচরটিকে রক্ষা করতে পারলে তবেই হবে আমাদের বিশ্ব কচ্ছপ দিবস পালনের সার্থকতা।
চমৎকার প্রতিবেদন
আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই আপনাকে
শ্রী হরি বিষ্ণুর দ্বিতীয় অবতার *বর্মধারী অবলা জীব* যে হারিয়ে দিয়েছিলো দৌড়
প্রতিযোগিতায় খরগোশ কে, *কচ্ছপ* আস্তে আস্তে হারিয়ে শেষ হয়ে যাচ্ছে এই
সুন্দর পৃথিবী থেকে,ছবিতে গল্পে বেঁচে থাকতে থাকতে একদিন বিলুপ্ত হয়ে যাবে
স্মৃতিঘরেও ঠাই হবেনা তার বোধহয় আগামীতে।কেউ আগামীতে ছোট শিশুদের
পড়াতে বসে বলবেনা ” T- FOR TORTOISE* এই সুন্দর শান্ত জীবটিকে
কিছুদিন আরও রক্ষা করতে আসুন শপথ সঙ্কল্প নিই “আর কচ্ছপের মাংস খাবো
না,এদের কে রক্ষা করবো সাধ্যমত। বিশ্বের প্রাচীনতম প্রাণী দীর্ঘায়ু হোক।
সুন্দর প্রতিবেদনে মুগ্ধতা ভালোলাগা ভালোবাসা*
আপনার মূল্যবান মতামত আমাকে ঋদ্ধ ও অনুপ্রাণিত করে শ্রদ্ধেয়। অনেক ধন্যবাদ ????