কবি আবু হেনা মোস্তফা কামালের জন্মগ্রাম গোবিন্দা বর্তমানে সিরাজগঞ্জ জেলার উল্লাপাড়া থানার অন্তর্ভুক্ত। সে হিসেবে বলতে হয় কবির জন্ম সিরাজগঞ্জ জেলায়। আবু হেনা মোস্তফা কামালের প্রায় চল্লিশ বছরের কবি জীবনে কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ হয়েছে মাত্র তিনটি : আপন যৌবন বৈরী [১৯৭৪], যেহেতু জন্মান্ধ [১৯৮৪] এবং আক্রান্ত গজল [১৯৮৮]। আর এই তিনটি গ্রন্থেই তিনি শক্তিমান কবি হিসেবে বাংলা কবিতার ইতিহাসে স্থান নিশ্চিত করেছেন শিল্পীর রূপান্তরে বিশ্বাস করতেন আবু হেনা মোস্তফা কামাল, ব্যক্তির রূপান্তরের প্রতিও ছিল তার অগাধ আস্থা। তার মধ্যে প্রকৃত শিল্পীসত্তা ছিল বলেই এই দুইয়ের মধ্যে তিনি কোনো বিরোধ দেখেননি। সেই একই কারণে পারিপার্শ্বিক নানান সীমাবদ্ধতাকেও তার তুচ্ছ মনে হয়েছিল। কেননা, সীমাবদ্ধতার চেয়ে প্রকৃত শিল্পের শক্তিকেই তিনি আমৃত্যু বড় করে দেখেছিলেন। সে-কারণেই বলতে পেরেছিলেন, ‘একজন কবির অনেক সীমাবদ্ধতাই তুচ্ছ হয়ে যায়, যদি তার উচ্চারণে থাকে সত্যের জোর।’ এই যে যাকে তিনি বলেছেন, ‘সত্যের জোর’, সেটি তার সমস্ত সাহিত্যকর্মের প্রধান শক্তি। বলা যায়, সেই শক্তিকে অবলম্বন করেই তিনি তার মতো করে অগ্রসর হতে চেয়েছিলেন।
আবু হেনা মোস্তফা কামালের শিল্পীর রুপান্তর প্রবন্ধ গ্রন্থে নজরুলের (শব্দ ব্যবহার) ও রবীন্দ্রনাথের (গদ্য কবিতা) এর মূল্যায়ন বিষয়ক আলোচনা লিখেছেন তার সে প্রবন্ধ গুলোর মূল কথা নিচে আলোচনা করা হলো।

নজরুল : নজরুল কাব্যের শব্দ ব্যবহারের যে বিশেষ রীতি অনুসৃত হয়েছে ও তার পক্ষ ও বিপক্ষ নিয়ে যে সমস্ত আলোচনা ও সমালোচনা হয়েছে তা নিয়ে বিশদভাবে লিখেছেন। এ ব্যাপারে নজরুল তার আত্মপক্ষ সমর্পণ করে যে সমস্ত কথাবার্তা লিখেছেন তাও তিনি তুলে ধরেন। হিন্দু মুসলমানের ধর্ম বিষয়ক শব্দ ব্যবহার নিয়ে নজরুল বলেন, “আমি হিন্দু মুসলমানের পরিপূর্ণ মিলনে বিশ্বাসী তাই তাদের এই সংস্কারে আঘাত হানার জন্যই মুসলমানী শব্দ ব্যবহার করি বা হিন্দু দেব দেবীর নাম নিই” — আবু হেনা মোস্তফা কামাল তার শিল্পীর রূপান্তর প্রবন্ধ গ্রন্থে উল্লেখ করেন, “নজরুলের কবিতার শব্দ ব্যবহারের যে বৈশিষ্ট্য কারো চোখ এড়ায় না তা হল বিদেশি এ ক্ষেত্রে আরবি, ফার্সি শব্দের ব্যাপক ব্যবহার। আবু হেনার মতে তৎসম শব্দ দেশি কিংবা আরবি ফার্সি যাই হোক না বক্তব্যের অনিবার্য প্রয়োজনে তার আবির্ভাব হলো কিনা সেটাই বড় কথা। নজরুলের অনেক কবিতায় আবেগের অবারণ প্রশ্রয়ে শিল্পের চূড়ান্ত ফলশ্রুতি বিপন্ন হয়েছে, এ কথা যেমন সত্য, তেমনি অনেক চরণে ঠিক আসল শব্দটি আসল স্থানে সংগতি খুঁজে পেয়ে বিদ্যুতের মত ঝলসে উঠেছে, একথাও সত্য। যেমন —
খুঁজে ফিরি কোথা হতে এই ব্যথা ভারাতুর মদ গন্ধ আসে,
আকাশ বাতাস ধরা কেপেঁ কেঁপে উঠে শুধু মোর তপ্ত ঘন দীর্ঘশ্বাসে।
অথবা
আমি না বাসিতে ভালো তুমি আগে বেসেছিলে ভালো
কুমারী বুকের তব সব স্নিগ্ধ রাগ রাঙ্গা আলো
প্রথম পড়িয়াছিল মোর বুকে মুখে
ভূখারির ভাঙ্গা বুকে পুলকেরে বান ডেকে যায় আজ সেই সুখে। (পূজারিনী)
ব্যক্তিগত আবেগের সীমাবদ্ধতা অনেক সময় নজরুলকাব্যে যেমন মুক্তির অন্তরায় হয়েছে, তেমনি এই আবেগের আন্তরিকতাই তার কাব্যের পরম সম্পদ হয়ে উঠেছে, যেমন —
আমি গোপন প্রিয়ার চকিতে চাহনি ছল করে দেখা অনুখন
আমি চপল মেয়ের ভালবাসাতার কাঁকন চুরির কনকন।
আমি চিরশিশু, চির কিশোর,
আমি যৌবনভীতু পল্লীবালার আঁচর-কাঁচলি নিচোর।
আমি উত্তর বায়ু মলয় অনিল উদাস পুরবী হাওয়া,
আমি প্রতীক কবির গভীর রাগিনী বেনু বিনে গান গাওয়া।
বিদ্রোহী কবিতার প্যাটার্নের ভেতরে আবেগের আন্তরিকতা সুন্দরভাবে মিশে আছে। নজরুলের হিন্দু মুসলমান ধর্মীয় শব্দ সাহিত্যে ব্যবহার প্রসঙ্গে অধ্যাপক হুমায়ুন কবির বলেন, “ঐতিহ্যের লংঘন তিনি করেননি, পুরাতন পুঁথি সাহিত্যের আবহাওয়ায় লালিত বলে বাংলার বিপুল মুসলমান কৃষক সম্প্রদায়ের সঙ্গে তার সহজ আত্মীয়তা।…. পুরাতন ঐতিহ্যের পুনরোজ্জীবনের মধ্যেই তার পরিচয় মেলে”।
অধ্যাপক সৈয়দ আলী আশরাফ বলেন — “নজরুলের ভাষা ও ভাবধারায় হিন্দু প্রভাবই প্রবল, আরবি ফার্সি শব্দ ব্যবহার করলেও আশ্রয় খুঁজেছেন হিন্দু উপকথা থেকে সংগৃহীত উপমা ও চিত্রে”।
তবে একথারও অযথার্থতা নির্ণয় করতে হলে নজরুলের কবিতার কাছেই ফিরে যেতে হয়, —
আবছা মনে পড়ছে যেদিন, সিরাজবাগের গুলভুলি,
শ্যামল মেয়ের সোহাগ শ্যামার শ্যাম হলো ভাই বুলবুলি।
অথবা
নিদ্রা দেবীর মিনার চূড়ে মোয়াজ্জিনের শুনছি আরাব,
পান করে নে প্রাণ পেয়ালার যুগের আলোয় রোদ্র শরাব।
উষায় যারা চমকে গেল তরুণ রবির রক্তরাগে
যুগের আলো! তাদের বল, প্রথম উদয় এমনি লাগে।
কখনও নজরুলের ঐতিহ্য চেতনা কেবল ভারতীয় পুরাণ ইতিহাসের উপকরণকে আশ্রয় করে বিকশিত, কখনো তা পারসিক ঐশ্বর্য ও উল্লাসের প্রতি উল্লেখে কলরবমুখর। তাই দেখতে পাই প্রলয়োল্লাস কবিতায় —
আসছে এবার অনাগত প্রলশ নেশায় নৃত্য পাগল,
সিন্ধু পারের সিংহদ্বারে ধমক হেনে ভাঙল আগল।
মৃত্যু গহন অন্ধকূপে, মহাকালের চন্ডরুপে,
ধুম্র দুপে।
বজ্র শিখার মশাল জেলে আসছে ভয়ংকর
ওরে ওই হাসছে ভয়ংকর,
তোরা সব জয়ধ্বনি কর,
তোরা সব জয়ধ্বনি কর।

রবীন্দ্রনাথ : আবু হেনা মোস্তফা কামাল তার শিল্পীর রূপান্তর নামক প্রবন্ধ গ্রন্থে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গদ্য কবিতা এবং তার কাব্য গ্রন্থ পুনশ্চ নিয়ে আলোচনা করেছেন। আবু হেনা তার প্রবন্ধে উল্লেখ করেছেন পুনশ্চ আলোচনার কারণ ”রবীন্দ্রনাথের গদ্য কবিতার স্বরূপ ও সাফল্য বিচার করা”। রবীন্দ্রনাথ নিজেই বলেছেন — “গদ্য কাব্যে অতি নিরূপিত ছন্দের বন্ধন ভাঙ্গাই যথেষ্ট নয় গদ্যকাব্যের ভাষায় ও প্রকাশনরীতিতে যে একটি সসজ্জ সলজ্জ অবগুন্টন প্রথা আছে তা দূর করলে তবেই গদ্যের স্বাধীনক্ষেত্রে তার সঞ্চরণ স্বাভাবিক হতে পারে”।
অর্থাৎ যথার্থ গদ্য কবিতা কেবল পদ্যের ছন্দ শোষণমুক্ত হবে না, সঙ্গে সঙ্গে তা হবে গদ্যের মতোই ঋজু ও নির্ভার অবগুণ্ঠিত নয় উন্মুক্ত। জীবনের বিস্তৃততর ক্ষেত্রে কাব্যের অধিকার কে বাড়িয়ে দেয়ায় রবীন্দ্রনাথের উদ্দেশ্য ছিলো। সেদিকে লক্ষ্য রেখেই পুনশ্চ’র কবিতায় তরে, সনে, মোর প্রভৃতি গদ্যের অপাঙতেয় শব্দকে তিনি পরিত্যাগ করেছেন।
পুনশ্চ’র কয়েকটি কবিতার দৃষ্টান্ত —
কোপাই কবিতা
হাটে যাবে কুমোর/ বাকে করে হাঁড়ি নিয়ে,
পিছন পিছন যাবে গাঁয়ের কুকুরটা,
আর মাসে তিন টাকা মাইনের গুরু
ছেঁড়া ছাতি মাথায়।
নাটক কবিতায় বললেন —
“গদ্য এলো অনেক পরে, বাঁধা ছন্দের বাইরে জমালো আসর,
সুশ্রী কুশ্রী ভালো মন্দ তার আঙিনায় এলো ঠেলাঠেলি করে”।
পুনশ্চ’র কবিভাষা প্রধানত অসচ্ছন্দ কিন্তু অনলংকৃত নয়। পুনশ্চ’র সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য তার চিত্রলতা। প্যাশন প্লের অনুসরণে রবীন্দ্রনাথ যে চিত্রনাট্যটি লিখেছিলেন The Child. তারই বাংলাভাষ্য শিশুতীর্থ। বস্তুত শিশু তীর্থই পুনশ্চ কাব্যের জন্য লেখা রবীন্দ্রনাথের প্রথম ও শ্রেষ্ঠ গদ্য কবিতা। দু-একটি দৃষ্টান্ত —
যেখানে মানুষগুলো সব ইতিহাসের ছেঁড়া পাতার মতো/ ইতস্তত ঘুরে বেড়াচ্ছে —
মশালের আলোয়, ছায়ায় তাদের মুখে বিভীষিকার উলকি পড়ানো।
অথবা
মা বসে আছেন তৃণশয়্যায়, কোলে তার শিশু /উষার কোলে যেন শুকতারা।
পুনশ্চ’র কবিতাবলিতে চিত্র ধর্মিতার ভেতরে ছোটগল্পের আমেজ মেশানো হয়েছে কুশলী হাতে — কখনো আবার গোটা কবিতাই একটা ছদ্দবেশী ছোট গল্প। যেমন —
বাড়ির পিছন দিকটাতে শাক সবজির ক্ষেত
বিঘে দুই এক জমিতে হয় ধান,
আর আছে আম কাঁঠালের বাগিচা
আসশেওড়ার বেড়া দেওয়া,
সকালবেলায় আমার প্রতিবেশিনী,
গুনগুন গাইতে গাইতে মাখন তুলে দই থেকে।
তার স্বামী যায় দেখতে খেতের কাজ লাল টাট্টু ঘোড়ায় চড়ে।
গদ্যরীতিতে অবলম্বিত হয়েছে বলে পুনশ্চ’র কবিতায় কতকথা ও কথাভঙ্গিই প্রাধান্য। এক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ দুটি মাধ্যম ব্যবহার করেছেন, বাক প্রতিমা ও সাধারণ বর্ণনা। যেমন —
গলিটার কোনে কোনে জমে উঠে পঁচে উঠে
আমের খোসা, আঁটি, কাঁঠালের ভুতি
মাছের কানকা, মরা বেড়ালের ছানা
ছাইপাঁশ আরো কত কি যে!
আবু হেনা মোস্তফা কামালের শিল্পীর রুপান্তর প্রবন্ধে তিনি নানাভাবে, নানা দৃষ্টিকোন থেকে বাংলা সাহিত্যের বেশ কজন বিখ্যাত কবি লেখক তথা সাহিত্য শিল্পীর রুপান্তর তথা শিল্পী হয়ে ওঠার নানা কৃতিত্ব তিনি খতিয়ে দেখে তা ব্যাখ্যা করে নিজস্ব মতামতও দিয়েছেন। গ্রন্থটি গবেষণা কাজে সহায়ক হতে পারে বলে আমার বিশ্বাস।
আবু জাফর রেহমান, শিক্ষক, লেখক ও রাজনৈতিক কর্মী, সহকারী সম্পাদক ‘মাসিক ফটিকছড়ি’