কলেজে পড়ার সময়েই ডায়বেটিসে আক্রান্ত হয়েছিলেন আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়। ডায়বেটিসের কারনে কলেজ জীবন থেকেই দীর্ঘ পঞ্চাশ বছর ধরে ভাত খাওয়া ছেড়ে দু’বেলা রুটি খাওয়া শুরু করা ছাড়াও বাঙালি যুবসমাজকেও দু’বেলা ভাত খাওয়া থেকে বিরত থাকার পরমর্শও দিয়েছিলেন তিনি। সেই আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র আশি বছর বয়সে নিজের ভয়স্বাস্থ্য উদ্ধারের আশায় চল্লিশের দশকে বর্তমান পূর্ব মেদিনীপুর জেলার রামনগর থানার উপকূলবর্তী দাদনপাত্রবাড়ে এসে বেশ কিছুদিন কার্যত অজ্ঞাতবাসে কাটিয়ে ছিলেন। দাদনপাত্রবাড়ে থাকাকালীন বেঙ্গল সল্ট কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা ও ম্যানেজিং এজেন্ট মনুজেন্দ্র দত্তের অনুরোধে ও সেই সময় দাদনপাত্রবাড়ে কার্যত গমের অতুলতার জন্য পঞ্চাশ বছরের খাদ্যাভাস ছেড়ে ফের ভাত খাওয়া শুরু করেছিলেন। রুটির বদলে ভাত খাওয়া শুরু করা ও দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরের খাদ্যাভাস বদলে ফেলায় আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র এতটাই খুশি হয়েছিলেন যে মনুজেন্দ্র দত্তকে কলকাতায় ফিরে এক চিঠিতে তৃপ্তির সঙ্গেই জানিয়েছিলেন, “মনুজ, তোমার পাল্লায় পড়ে আমি আমার পঞ্চাশ বছরের পুরোনো রুটি খাওয়ার অভ্যাস বদলে ভাত খাচ্ছি এবং সুস্থ আছি”।

নিজের ভগ্নস্বাস্থ্য উদ্ধারের পাশাপাশি মনুজেন্দ্র দত্তের বিশেষ আগ্রহে বেঙ্গল সন্ট কোম্পানির পরিচালক সমিতির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান হিসেবে আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় ১৯৪১ সালে পূর্ব মেদিনীপুরের রামনগর থানার দাদনপাত্রবাড়ের বেঙ্গল সল্ট কোম্পানির লবণ কারখানা পরিদর্শনের জন্য যান। মহাত্মা গান্ধীর ১৯৩০ সালের লবণ সত্যাগ্রহ আন্দোলন ও ডান্ডি অভিযানে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন কলকাতার অজ্ঞাত পরিচিত এক শিল্পোদ্যোগী যুবক মনুজেন্দ্র দত্ত। ১৯৩১ সালে বেঙ্গল সন্ট কোম্পানি তৈরির বীজ রোপিত হয়েছিল যুবক মনুজেন্দ্র দত্তের মনে। ১৯৩৪ সালে দাদনপাত্রবাড়ের সমুদ্রপাড়ে আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল ‘বেঙ্গল সল্ট কোম্পানি লিমিটেড’ নামে সৌর আলোকে লবণ তৈরির কারখানার। তার কিছুদিন আগে মনুজেন্দ্র দত্ত সার্কুলার রোডে সায়েন্স কলেজে গিয়ে প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের সঙ্গে দেখা করে লবণ তৈরির কারখানা গঠনের মনোবাসনা জানিয়েছিলেন।
প্রফুল্লচন্দ্রের তখন সত্তর পেরিয়েছে সেই বয়সেও তরুণ শিল্পোদ্যোগী মনুজেন্দ্র দত্তের মনোবাসনাকে পূর্ণ সমর্থনের পাশাপাশি লবণ বারখানা তৈরির ব্যাপারে সর্বতোভাবে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন। মনুজেন্দ্র দত্ত তখন তাঁকে প্রস্তাবিত বেঙ্গল সল্ট কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা এবং পরিচালকমগুনীর চেয়ারম্যান হওয়ার আবেদন জানালে আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র সানন্দে তাতে সম্মতি প্রকাশ করে ১৯৩৪ সালের জুলাই মাস থেকে ১৯৪৪ সালের ১৬ জুন জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত টানা ১০ বছর ধরে বেঙ্গল সল্ট কোম্পানির চেয়ারম্যানের পদ অলংকৃত করেছিলেন। চেয়ারম্যান হিসেবে আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় বেঙ্গল সল্ট কোম্পানির অন্ততঃ ৩৫টি পরিচালক মন্ডলীর সভায় পৌরোহিত্য করেছিলেন।

১৯৪১ সালে আশি বছরে উপনীত হওয়ার কয়েক মাস আগে তখন অসুস্থ আচার্য। বয়সের ভারে ভারাক্রান্ত ও ন্যুজ শরীরে লাঠি- নির্ভরতায় কোনও রকমে চলাফেরা করেন। সেই সময় স্বাস্থোদ্ধার ও নিজের স্বপ্নের বেঙ্গল সল্ট কোম্পানি সশরীরে পরিদর্শনের জন্য মনুজেন্দ্র দত্তের ঐকান্তিক অনুরোধে ৪১ সালের এপ্রিল মাসে প্রথম ও শেষবারের জন্য দাদনপাত্রবাড় পরিদর্শনে যান এবং স্বাস্থ্যোদ্ধারের আশায় টানা বেশ কিছুদিন দাদনপাত্রবাড়ের উপকূলে বেঙ্গল সল্ট কোম্পানির অতিথি নিবাসে অবস্থান করেন।

আজকালকার মতো তখন কলকাতা থেকে দাদনপাত্রবাড় যাওয়া সহজগম্য ছিল না। কলকাতা থেকে ট্রেনে খড়্গপুর স্টেশন, সেখান থেকে গাড়িতে করে পিছাবনি খাল পর্যন্ত ও পিছাবনি খাল নৌকায় পেরিয়ে খালের অপর পাড়ে থাকা মোষের গাড়িতে করে মনুজেন্দ্র দত্তের সঙ্গে সমুদ্র উপকূলবর্তী দাদনপাত্রবাড়ে পৌঁছেছিলেন আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়। দাদনপাত্রবাড়ে এসে টানা কিছুদিন ধরে থাকার সময় লবণ কারখানায় লবণ তৈরির সৌর ইউনিটগুলি এবং বিশেষ করে তাঁর পরামর্শ মতো সমুদ্রতটে গড়ে ওঠা বড় বড় ভেড়ি তৈরি করে তাতে সমুদ্রের নোনা জল আটকে সূর্যতাপে তা ঘনীভূত করে বিনা জ্বালানিতে ক্রিস্টাল লবণ তৈরির প্রক্রিয়া ঘুরে দেখেন। বেঙ্গল সল্ট কোম্পানির উন্নতির লক্ষ্যে লবণ কারখানার প্রতিষ্ঠাতা মনুজেন্দ্র দত্তকে বিভিন্ন প্রস্তাব নানান উদ্ভাবনার উপদেশ দিয়েছিলেন বলে মনুজেন্দ্র দত্তের তৃতীয় পুত্র ও বেঙ্গল সল্ট কোম্পানির বর্তমান ম্যানেজিং ডিরেক্টর রথীন্দ্র দত্তের একটি লেখা থেকে জানা যায়। দাদনপাত্রবাড়ে বেঙ্গল সল্ট কোম্পানির কারখানার সৌর ইউনিটগুলি পরিদর্শন করে আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় ভীষন খুশি হন। কলকাতায় ফিরে গিয়ে তিনি ১৯৫১ সালের ৩ অগাষ্ট মনুজেন্দ্র দত্তকে এক চিঠিতে ‘তোমাদের ঐকান্তিক যত্ন ও পরিশ্রমে যে আমরা লুপ্ত লবণ শিল্পের উদ্ধার করতে পেরেছি এটাই আমার জীবন সন্ধ্যায় শান্তির কারণ হয়েছে’ বলে লিখে জানিয়েছিলেন।

লবণ কারখানা পরিদর্শনের পরেও নিজের ভগ্নস্বাস্থ্য উদ্ধারের আশায় প্রায় মাসাধিক কাল দাদনপাত্রবাড়ে গুপ্তবাসে থেকে যান। এই সময় প্রতি দিন বিকেলে লবণ কারখানার দুই কর্মী বয়সের ভারে ন্যুজ আচার্যকে একটি দড়ির খাটিয়ায় বসিয়ে নিয়ে সমুদ্রের পাড়ে গৌঁছে দিতেন। আচার্য সমুদ্র সৈকতে কিছুক্ষন হাঁটাহাটি করে সমুদ্রের দৃশ্য ও নির্জন সৈকতের সৌন্দর্য উপভোগ করতেন। সমুদ্রপাড়ে খাটিয়ায় বসেই আচার্য খাটিয়ায় সামনে মাটিতে বসা কালিন্দী অঞ্চলের বিভিন্ন থেকে এলাকা আসা গ্রাম্য যুবকদের সঙ্গে স্বদেশি শিল্প থেকে গ্রামের উন্নতি,খদ্দর পরা থেকে তাদের জীবনের লক্ষ্য, প্রেরণা নিয়ে তাদের মতামত শুনতেন এবং আলোচনা করতেন। আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের অনুপস্থিতিতে ‘কোথায় আচার্যদেব, স্যার, কোথায় স্যার’, রীতিমতো শোরগোল পড়ে যায় কলকাতায় তাঁর ছাত্রছাত্রী থেকে সহ-শিক্ষক ও গুণগ্রাহী মহলে। প্রায় মাসাধিক কাল দাদনপাত্রবাড়ে গুপ্তবাস কাটিয়ে কলকাতায় ফিরে এলে সকলের মধ্যে স্বস্তি ফিরে আসে।
ছবি সৌজন্য : রথীন্দ্র দত্ত