| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

অদামৃতকথা : আয়নার ভেতর কে? : অর্পণ চক্রবর্তী

Reporter
অর্পণ চক্রবর্তী / ১৩৪৩ জন পড়েছেন
আপডেট রবিবার, ১৪ মে, ২০২৩

জ্বর এলো। কমলো একটু। ব্রাত্য বসুর “অদামৃতকথা” পড়তে শুরু করলাম। বইটা হাতে পাওয়ার পরেও বেশ কদিন ধরেই পড়ব পড়ব করেও শুরু করিনি তার কারণ একটাই আগের মত একটানে ২৫০ পাতার বই পড়ে শেষ করার অভ্যেস আর ক্ষমতা আমার নেই বলেই ভেবেছিলাম। দেখলাম ভুল ভেবেছিলাম। রক্ত পরীক্ষা করে কোভিড ধরা পড়লো। আর আমি ধরা পড়লাম অর্ধেন্দু আর অমৃতকে নিয়ে পাতা ব্রাত্যর নিপুণ জালে।

বহু বহু দিন পরে এমন একটা আখ্যানের, এবং আখ্যান বলার ধরনের সামনে পড়তে হলো, যেখানে সতত সতর্ক থেকেও তবু জলে পড়ে যেতে হয়; বাংলা উপন্যাসপাঠের অভ্যাস ধাক্কা খায়।

সব থেকে বড় কথা উপন্যাস লেখার মধ্যবিত্তসুলভ নিরাপত্তাভিলাষী মানসিকতাটাই হেলায় এখানে ঠেলে ফেলে দেওয়া হয়েছে। ভাবটা এই, হে পাঠক, তুমি এটা উপন্যাস বলবে, নাকি ইতিহাস, নাকি অন্যকিছু, সেটা তোমার সমস্যা। বরং ধীরে সমীরে কলিকাতা শহরে, কী কী ঘটিতেছিল সেকালে কিছু বলি, শোনো, তারপর দেখো কাকে বলে উপন্যাস, কাকে বলে নবেল, কাকে বলে কী।

ব্রাত্যর আখ্যানে একটা সময়কে দেখা চলছে নানা দিক থেকে, ধরা পড়ছে বাংলাদেশের একটা বিশেষ সময়ের সমাজ সংস্কৃতি অর্থনীতি জাতীয়তাবাদী আবেগ। কে কে তার মূল পুরুষ? অর্ধেন্দু আর অমৃত। প্রেক্ষিত কী? উনিশ শতক। বাংলা থিয়েটারের অন্দরমহলের ঘাত প্রতিঘাত। ন্যাশনাল থিয়েটার এর প্রতিষ্ঠার কিছু আগে থেকে বেশ কিছু পরের সময়কাল।

এর মধ্যে ঢুকে যাচ্ছেন গিরিশ ঘোষ, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর, দীনবন্ধু মিত্র, বঙ্কিমচন্দ্র, সেই সময়ের কলকাতার তাবড় তাবড় লোকজন।

বইটা পড়তে পড়তে টের পেয়েছি, এ শুধু বহুদিনের গবেষণা নয়, বহুদিনের ভালোবাসার ফসল। বার বার রোদে শুকোতে দেওয়া দিদার হাতে তৈরি আমের আচারের মতো, না হলে এ স্বাদ হয় না।

এ আখ্যানে তিন ধরনের গদ্যের স্তর।

এক তো ন্যারেটর। গল্প সে বলছে। তার গল্প বলার মধ্যে সে স্বীকার করে নিচ্ছে বাঙ্গালা উপন্যাসের ঐতিহ্যকে। বঙ্কিমী ঢং-কে। প্রতি পরিচ্ছেদের শুরুতে থাকছে একটি উদ্ধৃতি। কখনো অমৃতলালের কবিতার পংক্তি, কখনো তারাসুন্দরীর কবিতার স্তবক।

ব্রাত্য অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে একে বাংলা উপন্যাসের ঐতিহ্যে অঙ্গীকৃত করে এবং ঐতিহ্যকে পেরিয়ে গিয়ে তাকে অধুনাতন করে নেন, হিন্দি সিনেমার গানের কয়েক লাইন একটি পরিচ্ছেদের শুরুতে রেখে।

“দৌলত অউর জওয়ানি /একদিন খো যাতি হ্যায়/ সচ কহতা হুঁ সারি দুনিয়া,

দুশমন হো যাতি হ্যায় / উমর ভর দোস্ত লেকিন সাথ চলতে হ্যায়।/ দিয়ে জ্বলতে হ্যায়, ফুল খিলতে হ্যায়।/ বড়ি মুশকিল সে মগর, দুনিয়ামে/ দোস্ত মিলতে হ্যায়” — নমকহারাম সিনেমার গানে আনন্দ বক্‌শির লেখা এই লাইনগুলি শুধু ঐ পরিচ্ছেদ নয়, উপন্যাসটির নির্যাসও বটে।

এসময়, যখন এক কথকের স্বর শুনছি আমরা, যে বলছে সর্বজ্ঞ ও সর্বগ হিসেবে, তখন গদ্যের সেই ঈর্ষণীয় চলন এরকম:

“সন ১৮৭২-এর ২৬ মার্চ। দিনটি মঙ্গলবার।

গতকাল দোলযাত্রা গেছে। দিনমণি সদ্য অস্তাচলে গমন করেছে। বারাণসীর ভাগীরথী তীরে, বিশ্বনাথ মন্দিরের অদূরে মণিকর্ণিকা ঘাটে, জননী-জাহ্নবীর সান্ধ্য জলকল্লোলে, সারি সারি বৃহৎ পোত-সমুদয় ভাসছে। নদীঘাটের সঙ্গে সংলগ্ন প্রশস্ত তীরে একটি বৃহৎ রক্তিম গম্বুজবিশিষ্ট মন্দির। সঙ্গে আরও বিপুল পরিমাণে ঘনসন্নিবদ্ধ বাড়ি। মন্দিরের উপরিভাগে লালবর্ণ মস্তকে একটি জয়োদ্ধত পতাকা সগৌরবে উড়ছে। তীরে অজস্র মানুষ দণ্ডায়মান। তাদের মুখে অপার আনন্দের মুগ্ধ প্রতিচ্ছবি। গতকালের সারা দিবসব্যাপী উন্মত্ত হোরিখেলার চিহ্ন হিসেবে, লৌহনির্মিত স্বর্ণালী রঙের সুদৃশ্য পিচকারিবাহিত, লোহিত, হরিদ্রাভ, অসিত, হরিৎ, গুলাবি ইত্যাদি বিবিধ রঙের চিহ্ন এবং আবিরলাঞ্ছিত বিবিধ কুঙ্কুম, ঘাটের চবুতরার অমসৃণ, চতুষ্কোণ অংশের রন্ধ্রে রন্ধ্রে শুষ্ক হয়ে গেলেও, এখনও তা পর্যাপ্ত জাজ্বল্যমান। আর সুরধুনীর অপর পার, নিবিড় অরণ্যসংকুল।”

তারপর উপাদান হিসেবে এলো দুধরনের বয়ান। একটা ইতিহাস পাঠের, গবেষকের, আরেকটা জীবনী / আত্মজীবনীমূলক ভাষ্য।

আখ্যানের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলোতে, মোড় ফেরার মুহূর্তে চরিত্রের সংলাপ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে আত্মজীবনী, বা সাক্ষাৎকারের অংশ।

একটা উদাহরণ দেওয়া যাক:

” অনন্তর, অমৃত তার ঝুলন্ত পাঞ্জাবির পকেটে লুক্কায়িত, মধ্যমাকৃতি; রক্তাম্বুদবিভূষিত, রম্-এর ডিক্যান্টার তথা একটি চ্যাপ্টা বোতল বার করল।

‘কালি, কলম, কাগজ ও একটি বোতল মদ লইয়া নবীন ও আমি নৌকায় উঠিলাম। বাবা বিশ্বনাথের চরণতলে আমি মদ খাইতে শিখিয়াছিলাম।’ (অমৃতলাল বসুর সাক্ষাৎকার)

অতঃপর বিষণ্ণ কবির, বঙ্গাল মুখমণ্ডলে ঈষৎ রসসঞ্চারকারী আর্দ্র হাস্য পরিলক্ষিত হল। কিন্তু সুরসিক অমৃতলাল, দুষ্ট রাঢ়ি অমৃতলাল, অধরে রহস্যময় পরান্মুখ নালিঘাসসম দলমালাময়ী হাস্য চেপে রাখা প্রফুল্লানন অমৃতলাল, বাবু নবীনচন্দ্রকে সহসা ঘাড় বেঁকিয়ে গঞ্জনাকণ্ঠে ভুনি হয়ে বললে, ‘লিখবে তো লেখ, নইলে মদ দেবো না। নবীন এক নিঃশ্বাসে বুড়ুয়ামঙ্গল লিখিয়া ফেলিল’।” (অমৃতলাল বসুর সাক্ষাৎকার)

এই যে আত্মজীবনী বা সাক্ষাৎকার ধরনের ডকুমেন্টের ব্যবহার সরাসরি চরিত্রের সংলাপ বা স্বগতোক্তি হিসেবে, এতে ইতিহাসের চরিত্রগুলির কাল্পনিক অবস্থায় সংস্থাপনের ভিত্তিটি অনেক বেশি যথার্থতা পাচ্ছে। যেন অমৃত বা অর্ধেন্দু বা নবীন সেন — এঁরা কথকের বলা গল্পের নির্দিষ্ট তারিখে, নির্দিষ্ট সকালে বা সন্ধ্যায় কী করছিলেন, ভাবছিলেন — সে সবই হয়েই আছে, কোথাও বানানো কিছু নেই, ন্যারেটরের কল্পনার ওপরে কিছু ছেড়ে দেওয়া নেই, সে যেন প্রম্পট করে যায় কেবল। এই সব জায়গায় ব্রাত্য সার্থক নাট্যকারের মনোভঙ্গীকে দুর্ধর্ষ ভাবে কাজে লাগিয়ে এমন একটা নৈর্ব্যক্তিক বাতাবরণ সৃষ্টিতে সক্ষম যেখানে বাংলা সাংস্কৃতিক জগতের সাধারণ থেকে অসাধারণ সবধরনের চরিত্রগুলি ইতিহাসের পাতা থেকে উঠে এসে পাঠকের সামনে নিজের যে দু’কথা বলে, পাঠক তখন ব্রাত্যর আখ্যানের ঐ কথকের হাত ছেড়ে দিয়ে নিজেই তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পেরেছে, পারছে, এমনটা বিশ্বাস করতে শুরু করে। আখ্যানের কথককে, উইথড্র করে নেওয়ার এই টেকনিক, বাংলা উপন্যাসে দেখেছি বলে মনে হয় না।

আবার কখনো আখ্যানের মধ্যে ঢুকে পড়ছে ইতিহাসের আঁকাড়া তথ্য, গবেষকদের তথ্যপ্রধান গদ্য, শুধু সংবাদ পৌঁছে দিয়ে যে গদ্যের কাজ শেষ। অনেক সময় ‘প্রসঙ্গকথা’ শিরোনামে লেখক/কথক নির্দ্বিধায় কাহিনীর মধ্যে জায়গা করে দিচ্ছে তাদের। এতো অবলীলায়, মনে হবে উপন্যাসে এটাও স্বাভাবিক। যেন ন্যারেটর, সে-ও এক পাঠক মাত্র, যে কাহিনী বুননের ফাঁকে ফাঁকে নিজেই তুমুল পড়াশুনায় ব্যস্ত।

আবার এই গবেষণালব্ধ তথ্যভূমি থেকে পাঠকের হাত ধরে সে আখ্যানের ভিতরে ঢুকে যায় এতো অনায়াসে যেন গ্রিন রুমের পর্দা সরিয়ে সরাসরি মঞ্চের ওপরেই নিয়ে যাচ্ছে কোন দর্শককে। এর একটা উদাহরণ দেওয়া যাক:

“যাই হোক, বিভার্লির এই জনগণনার সময় তা হলে রবীন্দ্রনাথের বয়স পনেরো, বিবেকানন্দের তেরো, দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ঊনষাট, বিদ্যাসাগরের ছাপান্ন, রামকৃষ্ণদেব চল্লিশ, বঙ্কিম আর কেশবচন্দ্রর আটত্রিশ। গিরিশচন্দ্র বত্রিশ বছর বয়সি, অর্ধেন্দুর ছাব্বিশ আর অমৃতলালের তেইশ। বিভার্লি দেখিয়েছেন কলকাতার মোট আয়তন তখন হাজার পাঁচেক একর। মূল ভিড়টা আছে উত্তর কলকাতায়। এ বছর থেকেই কলকাতা শহরে আঠারোটি ওয়ার্ডের মতো, ওয়ার্ডভিত্তিক আঠারোটি থানার পত্তন ঘটে। কিন্তু এসব ছেড়ে আমাদের আবার ফিরে যেতে হবে কলকাতার তৎকালীন এক নম্বর ওয়ার্ডে, বাগবাজারে গঙ্গার ঘাটে, সেখানে গঙ্গার হাওয়া সারা শরীরে মেখে অপেক্ষা করছে দু’জন আশ্চর্য যুবা। আমরা আপাতত তাদের কাছে যাব।”

বাগবাজার নিবাসী এই দুই যুবার একজন ভুবনমোহন নিয়োগী। ১৮৭২ সালের ৭ ডিসেম্বর শনিবার, ন্যাশনাল থিয়েটারের প্রথম শো নীলদর্পণ নাটকের যে অভিনয় হলো তার ব্যয় নির্বাহ ঘটেছে অনেকটাই এই ভুবনমোহনের অর্থে।

পরে এই ভুবনমোহন দেউলিয়া হয়ে প্রায় উন্মাদ হয়ে যাবেন, জেলও খাটতে হবে তাঁকে।

আরেকজন যুবা নগেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় — বাংলা থিয়েটারের অতি উৎসাহী সংগঠক, বড়ো মাপের অভিনেতা, বত্রিশ বছর বয়সেই মদ্যপ অবস্থায় বাড়ির ছাত থেকে পড়ে মৃত্যু হবে তাঁর। এসব তথ্যই কথক এ আখ্যানে পরে জানিয়ে দেবে, গল্প যেমন যেমন এগোবে।

কিন্তু ১৮৭২ সালের ৮ ডিসেম্বর রোববার, বাগবাজার ঘাটে এই দুজন যুবা, তাঁদের তুমুল বেঁচে থাকার সময়ে অপেক্ষা করছিলেন অন্য দুজন বন্ধুর। সে দুজনের একজন ধর্মদাস সুর, অন্যজন স্বয়ং অর্ধেন্দুশেখর মুস্তাফী। গতদিনের নাটকের সাফল্য উদযাপন করতেই এই অপেক্ষা।

এই সময় বাগবাজার স্ট্রিটের একটা বর্ণনা দেয় কথক। গবেষণার তথ্যের খুঁটিনাটি কিভাবে আখ্যানের সরস গদ্য হয়ে উঠে পুরোনো দিনের রাস্তাকে জ্যান্ত করে তুলতে পারে তার দৃষ্টান্ত হিসেবে এটি উল্লেখযোগ্য হয়ে পড়ে:

“প্রায় সঙ্গে সঙ্গে তারা তাদের সেই দুই বন্ধুকে দেখতে পেলে। দু’জনকে দূরে পুকুরের পারে বিন্দুবৎ দেখা গেল।

ওরা বাগবাজার স্ট্রিটের লাগোয়া বিরাট পুকুর, তার পাশে নানান দরমার ঘর, পৌরসভার জঞ্জাল ফেলার জন্য উলটোনো ঠেলা, কসাই পট্টি, ভিস্তিদের টানা বসতি, গঙ্গার মাছ ধরা জেলেদের দুপুরবেলা খুঁটিতে শুকোতে দেওয়া গিঁটমারা বৃহৎ জাল, চারটি বিশ্রামরত ওড়িয়া পালকিবেহারাদের ‘আড়া’ ও মাটিতে নামানো বৃহৎ পালকি, পেছনে কাঠের খুঁটিতে লেখা ‘প্যালানকিন স্ট্যান্ড’, ফুলেল তেলের ক্ষুদ্র বারোয়ারি দোকান ইত্যাদি পেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ভুবন-নগেনদের সামনে পূর্ণ শরীরে এসে উপস্থিত হল। দু’জনেরই মুখ জ্বলজ্বল করছে।”

কে কে এই উপন্যাসের মূল পুরুষ — এমন চিন্তাটা মনে এসেছিল, নামটা দেখে। অদা অর্থাৎ অর্ধেন্দু শেখর মুস্তাফি এবং অমৃত অর্থাৎ অমৃতলাল বসু, যিনি পরে রসরাজ বলে পরিচিত হবেন। এই দুজনের নাম নিয়ে অদামৃতকথা।

উপন্যাস যতো এগোবে তত স্পষ্ট হবে, এ নামকরণও লেখকের পরিকল্পিত ফাঁদ। অদা এবং অমৃতের কথা নয় এ আসলে অদা-সম্পর্কিত অমৃতের গোপন বেদনার, ভালোবাসার কথা। গোপন বলেই, মরণশীল হয়েও মরে না বলেই সে বেদনা আরো বেশি অমৃতকথা।

এ উপন্যাসে অর্ধেন্দুশেখর বা গিরিশ ঘোষ — বাংলা নব নির্মীয়মান থিয়েটারের এই ঘনসমাচ্ছন্ন সাসপেন্স, ভাঙাগড়ার রোমহর্ষক সময়কালে কোনো প্রবল প্রতাপান্বিত পুরুষই আসলে লেখক কথকের মূল উদ্দিষ্ট নন।

কে এই উপন্যাসের মূল পুরুষ? আমার এই খোঁজটাতেই গোড়ায় গলদ ছিল। এ আখ্যানের মূল এজেন্ট অমৃত এবং ভুনি।

ভুনি অমৃতের ডাক নাম। তাকেই এ আখ্যানে অমৃতের অন্তর্গত নারীসত্তার একটি প্রকাশের গলি পথ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। ভুনি নামটি সম্পর্কে শুরুতেই কথকের বয়ানটি তাতে ধোঁয়া দিয়েছে, যা দেখেই আগুনের অস্তিত্ব সম্পর্কে সচেতন হওয়া পাঠকের উচিৎ :

“এই কিশোরটির ডাকনাম ভুনি। ভুনি খিচুড়ির মতোই সে ঈষৎ তপ্ত, গব্য ও পরিপূর্ণ ব্যঞ্জনমণ্ডিত।”

কাশিতে মণিকর্ণিকা ঘাটে নবীনচন্দ্র সেনের সঙ্গে দন্ডায়মান অমৃতের যে বর্ণনা, তাতে, কথক, আখ্যানে প্রবেশের মুহূর্তেই তারটি বেঁধে দিয়েছিল:

“বাবু নবীনচন্দ্রের পাশে যে অন্যমনস্কভাবে দণ্ডায়মান, তাকে কিশোর বলাই সংগত। গৌরবর্ণ, হালকা মেয়েলি তনুময়তা,কুসুমকুমারিতমাধুর্যময়, কোমলালোকিত দেহ, ভাসা ভাসা বৃহৎ চক্ষুদ্বয় থেকে তার রাশি রাশি স্বপ্নমালা যেন হীরকচূর্ণবৎ প্রতিফলিত হচ্ছে। তার দীর্ঘ বেপথু কেশদাম অচ্ছিন্নাবস্থায় তার পৃষ্ঠদেশে, অংসে, বাহুদেশে, নতুবা বক্ষে সংসর্পিত হয়ে আছে। এরও পরনে মালকোঁচা-মারা ধুতি, গায়ে এমব্রয়ডারি করা সিল্কের পাঞ্জাবি, সঙ্গে হালকা সুতির একটি উড়নি তথা চাদর। পায়ে ক্যাম্বিসের পাম্প-শু। কিশোরের বয়ঃক্রম মাত্র উনিশ।

এই সময়ে কাশীতে ভাগীরথীতীরে শীতল, নৈদাঘ বায়ু প্রবাহিত হয়। শীতল বাতাসস্পর্শের ছুরিকার মতো সঞ্চালনে, কিশোরের ধবলপ্রস্তরনির্মিতপ্রায় কমনীয় শরীর ও ললিতলবঙ্গ হৃদয়, দুই-ই চঞ্চল ও সজল হয়ে, যাকে বলে থেকে থেকে কম্পমান হয়ে উঠছে।

কিশোরের নাম বাবু অমৃতলাল বসু। ”

রবীন্দ্রনাথের অনেক উপন্যাসে যেমন দুটি পুরুষ চরিত্র দেখা যায় দুই বন্ধু, সখা — গোরা-বিনয়, শচীশ-শ্রীবিলাস, নিখিলেশ-সন্দীপ, মনে হতে পারে এখানেও অর্ধেন্দু – অমৃত বোধহয় সেই ছকে এগোবে। কিন্তু সেই চেনা ছকে পেরেক পুঁতে, এঁদের দুজনের সম্পর্ক রসায়ন এ উপন্যাসের ঘটনাকে প্রত্যক্ষত কোনভাবে প্রভাবিত করে না। শুধু অমৃত অভিজ্ঞ হয়ে ওঠে, ভুনিকে চিনতে চিনতে বুঝতে বুঝতে। বিবাহিত জীবন যাপন করতে করতে, সন্তানের পিতা হয়েও ভুনিকে চেনা আর শেষ হয় না তার। অর্ধেন্দুর মৃত্যুর অনেক পরেও, খ্যাতি প্রতিষ্ঠা প্রাপ্তির পরেও রসরাজ অমৃতলালের ভুনিকথার শেষ হয় না।

এ উপন্যাসের শেষে অশীতিপর রসরাজ অমৃতলাল আয়নায় দেখতে থাকেন নিজের প্রতিবিম্ব ভুনিকে :

” …’আমি আমার মতো করে বেঁচেছি রে ভুনি। এবং এইভাবেই বাঁচব। আমি আর এই বয়সে নিজেকে বদলাতে পারব না। আমি এইরকমই। আমি তা বুঝে গিয়েছি। অনেক শোক-তাপ সয়েছি জীবনে। তুই চলে যা। আমাকে আর এই বুড়ো বয়সে জ্বালাস নে।’

কান্নার শব্দ ক্রমশ বেড়ে যায় বৃদ্ধ অমৃতলালের। তা চাপতে গিয়ে মুখে হাত দেন তিনি। তাঁর কাঁচাপাকা দীর্ঘ কেশযুক্ত মাথা কান্নার দমকে ক্রমে নিচু হয়ে যায়। আয়নার ভেতরে সুসজ্জিতা ভুনির চোখদুটো তখন এক মায়াময় কৌতুকে নেচে ওঠে। সে আয়না থেকে তার সুগোল, স্নেহসিক্ত হাত বার করে অমৃতলালের মাথায় রাখে। অমৃত কাঁদতেই থাকেন। ভুনি যে কখন অদৃশ্য হয়ে গেছে, তিনি তা আর খেয়ালও করেন না।”

অর্ধেন্দুর একটি চিঠি আছে ভুনির উদ্দেশ্যে। এ উপন্যাসে সেটুকুই অমৃতের অন্তর্গত ভুনির প্রতি অদার সচেতন দান, স্বীকারোক্তি। আর কী আশ্চর্য! তাতে ভুনি নয় বরং বারবার গিরিশ ঘোষের সঙ্গে অর্ধেন্দুর ব্যক্তিগত টানাপোড়েন, গিরিশ-এর প্রতি সমালোচনা ও শ্রদ্ধা, বেশি জায়গা পাচ্ছে।

শেষ কয়টি লাইন মাত্র বরাদ্দ থাকছে যেন ভুনি তথা অমৃতের জন্য : “ভাল থেকো ভুনি, মনে কোনও কষ্ট রেখো না। আমি নিশ্চিত জানি, তোমার-আমার সম্পর্কের মধ্যে মহাকালের কাছে কোনও জমা খরচ বাকি নেই। সব সমান সমান হয়ে গেছে। তুমিও জানো আর আমিও জানি, আমাদের মধ্যে যা যা কিছু ঘটেছে, তা একান্তভাবেই দু’জনের পারস্পরিক ভালবাসা আর বাঘনখের শোধবোধে একাকার হয়ে গেছে। ভাল থেকো ভাই। শিগগিরি দেখা হবে আমাদের। ঘোড়ায় চড়ে ছুটতে ছুটতে দেখা হবে। তখন সেই গল্প, আড্ডা, পুরনো স্মৃতি, বিষাদ, উচ্ছ্বাস থিয়েটারের সেইসব আশ্চর্য ওম, এ সবকিছু নিয়ে কথা হবে। ইতি, তোমার অদা”।

ভুনিকে লেখা হলেও এ চিঠি তাই ভুনির জন্যে নয়, ভুনি শুধু প্রাপক মাত্র। এ চিঠি যেন বস্তুত ভুনিকে, ভুনির আবেগকে সান্ত্বনা, যা প্রায় প্রত্যাখ্যানের ভিন্ন নাম। ভুনিদের নিয়তিই এই।

স্পষ্টত অমৃত নামক পুরুষের অন্তরে লুকিয়ে থাকা এক নারীর ‘অদা’-র প্রতি গোপন টান, শ্রদ্ধা ও বিনতি এ আখ্যানের অলিতে গলিতে বয়ে যাওয়া সেই চোরা স্রোত, যেখানে খেলা করে পৌরুষের বিরুদ্ধে, সমকামীর পক্ষে, অবদমিত আর্তির হয়ে আধিপত্যকামী স্বরের বিপক্ষে চটুল অথচ অসহায় সফরী মৎসের ঝাঁক।

পড়তে পড়তে মনে হয়েছে এ উপন্যাসটি বস্তুত ২৫০ নয় ৫০০ পাতার হওয়া উচিত ছিল। বহু বহু সম্ভাবনা রয়েছে এর প্রতি পাতার মাঝে। হয়তো এর সিকুয়েল লিখবেন ব্রাত্য। হয়তো এরকমই কোন এক গরমের দুপুরে সে আখ্যান পড়ে ফেলতে পারব। অদা আর অমৃত ততদিন না হয় ঘোড়ার পিঠে চড়ে ছুটতে থাকুক, উত্তর কলকাতার আশ্চর্য সব বিকেলগুলোর মধ্যে দিয়ে।

লেখক : অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, মৌলানা আজাদ কলেজ, কলকাতা

আপনার মতামত লিখুন :

One response to “অদামৃতকথা : আয়নার ভেতর কে? : অর্পণ চক্রবর্তী”

  1. SUDESHNA DUTTA says:

    খুবই তাৎপর্যপূর্ণ বিশ্লেষণ l বইটির প্রতি আগ্রহ তৈরি হলো l এরকম লেখা আরও প্রকাশিত হোক l অনেক অনেক শুভেচ্ছা l

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev