শিয়া বিনিয়োগ, ইহুদি পুঁজি আর ২৪-এর ভোটের বাধ্যবাধকতা আদানিকে পথে বসাল। তখনও গৌতম আদানির আদানি এন্টারপ্রাইজ স্বদেশি মুকেশ আম্বানিকে কয়েক ধাপ নামিয়ে দিয়ে ব্লুমসবারির বিশ্বের শ্রেষ্ঠ বিলিওনিয়ারদে তালিকায় তিন নম্বরে দাঁড়িয়ে। ভারতের শেয়ার বাজারের ইতিহাসে সব থেকে বড় ২০,০০০ কোটি টাকার এফপিও ছাড়ার জন্যে তাঁর পরিকল্পনা শেষ করে ভিডিও বার্তা দেওয়ার জন্যে তিনি তৈরি। সেই মুহূর্তে ভারতের মাটিতে অতর্কিতে আছড়ে পড়ল আমেরিকার ১০ জনের স্টক মার্কেট রিসার্চ সঙ্গঠন হিন্ডেনবার্গ রিসার্চের আদানি এন্টারপ্রাইজকে কাঠগড়ায় তোলা সমীক্ষা। আদানিদের বিরুদ্ধে শেয়ার বাজারে বেআইনি কাজকর্ম করা, অনৈতিকভাবে শেয়ারের দাম বাড়ানো, সরকারের অভয়হস্ত মাথায় নিয়ে আইন পাশকাটানো, শুধু আদানিদের স্বার্থপূরণে বড় টেন্ডারে অংশ নেওয়ার শর্ত ঢিলে দেওয়া, অভিজ্ঞতা না থাকলেও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় দুধরণের পোর্ট [জল আকাশ], খনি, রাস্তা, মোবাইল, বিদ্যুৎ-এর, সবুজ বিদ্যুতের মত বিশাল বিশাল ক্ষেত্রে সরব উপস্থিতি, বিপুল ফান্ড সাইফনড করে ট্যাক্সহেভেনের অফশোর কোম্পানিগুলোকে কাজে লাগিয়ে শেয়ার দাম ৯০% বাড়ানোর মত কয়েক শত অভিযোগ তুলেছে আমেরিকার শেয়ার বাজারে শর্ট সেলার হিন্ডেনবার্গ রিসার্চ।
একটা অভিযোগও নতুন নয়। পরঞ্জয় গুহ ঠাকুরতা-রবি নায়ারেরা আদানির ক্রোনি চরিত্র বিশ্লেষণ করে, হিন্ডেনবার্গদের বহু আগে একই অভিযোগ তুলেছেন দেশিয় বিদেশি পত্রিকায় চার পাঁচ বছর ধরে। সারা বিশ্ব দেখল পাস্তা থেকে পোর্ট ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করা আদানি তিনদিন পরে তিন নম্বর থেকে ৬ নম্বর আর মুহূর্তের মধ্যে ৬ থেকে ১১ নম্বর থেকে ১৬ নম্বরে টাল খাচ্ছে। স্বদেশী মুকেশ আম্বানি তার ঘাড়ের কাছে নিঃশ্বাস ফেলছে — স্টক মার্কেটে তার শেয়ারের দাম মাটি ধরেছে ২০,০০০ কোটি টাকার এফপিও ৩% বিক্রি হয়েছে, আদৌ এই অফার তাকে বাজার থেকে তুলে নিতে হবে কী-না ফান্ড ম্যানেজারেরা বুঝতে পারছে না। ২০,০০০ কোটি টাকার এফপিও বাজারে পুরোপুরি বিক্রি হবে কী না সে বিতর্কে যখন শেয়ার বাজারে রক্তক্ষরণ অব্যাহত, যখন আদানি গ্রুপের অধিকাংশ শেয়ার পতন হয়েছে ২০-৩০%, যে কোম্পানির এফপিও, জনগণ দূরস্থান, আদানি কোম্পানির ৫০%-এর বেশি কর্মী কিনছে না, সে সময় এক পুরুষের বেশি ব্যবসা করা আম্বানি, মিত্তল আর জিন্দল পরিবার সেই প্রথম জেনারেশনের কর্পোরেটকে বেলআউট প্যাকেজ দিল — অর্থাৎ ৪/৫টা পরিবার আম্বানি, মিত্তল, প্যাটেল, জিন্দল আর মেহতারা পারিবারিক সম্পদ নিয়ে আদানির পাশে দাঁড়াল! এটা তারা রাজনৈতিক চাপে করল কী না সেটা মিলিয়ন ডলার প্রশ্ন।
ভারতের সব থেকে বড় কর্পোরেট এফপিও, যখন ডুবতে বসেছে, তাকে উদ্ধার করতে এল জনগণ নয়, এশিয়ার ধনীতম পরিবারেরা। পাঁচ ধনী পরিবার যে জন্যেই হোক আদানি এফপিওকে বাঁচাতে টাকা ঢেলেছে। আমরা যেন ভুলে না যাই ইন্সটিটিউশনাল ইনভেস্টরেরা আদানির এফপিওতে বিনিয়োগ করেনি বিজেপির চরম চাপ সত্ত্বেও। কিন্তু তাতেও ২০,০০০ কোটি টাকা পূরণ হওয়ার সমস্যার সমাধান হল না। পরের দিন গৌতম আদানি ইসরায়েলে। প্রখ্যাত হাইফা বন্দরের বড় অঙ্কের শেয়ার আদানির পকেটে যাওয়ার কথা। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর নেতানইয়াহুর সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরের ছবি টুইট করলেন আদানি। তখনও বিদেশে থাকা গৌতম আদানির বকেয়া ফান্ড নিয়ে মাথা ব্যথা যায় নি। ইহুদি লবির চাপে আরব আমীরশাহীর শিয়াপন্থী রাজপরিবার বাকি ফান্ড দেওয়ার জন্যে এগিয়ে এল। কোম্পানি বেলআউটের শেষ টাকাটা এল ইসরায়েল মার্ফত। টিভিতে চিৎকার করে খবর পড়া চলছে আদানির এফপিও ওভার সাবস্ক্রাইবড। ফাণ্ড ম্যানেজারেরা হাফ ছেড়ে বাঁচল।

কিন্তু সবার জন্যে তখনও বেশ কয়েকটা সারপ্রাইজ বাকি ছিল। এফপিও তথাকথিত ওভার সাবস্ক্রাইবড হওয়ার পর দিনই প্রত্যেকের মাথা ব্যথা বাড়িয়ে গ্রুপের শেয়ার ৩০% পড়েছে। ফ্লোরের তলায় চলে গিয়েছে শেয়ারের দাম। ২০,০০০ কোটি টাকা পকেটে নিয়ে আদানির ফান্ড ম্যানেজারেরা চোখ কচলে কচলে দেখছে শেয়ার মার্কেটে তাদের স্টকের দাম পড়ার পরে আদানি ১১তম স্থানে দাঁড়িয়ে। বাজার থেকে ১২ লক্ষ কোটি টাকার সম্পদ হাওয়া। জীবন বীমা নিগম আর স্টেট ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়া আদানির বিশাল টক্সিক স্টক হাতে নিয়ে বসে আছে। বহু বৃদ্ধ, অবসর জীবনযাপন করা মানুষের জীবন হুমকির মুখে দাঁড়িয়ে। কিন্তু শেষ সারপ্রাইজের পালা তখনও উদয় হয় নি। আদানি কর্তৃপক্ষ রাত ১১টায় বোমা ফাটিয়ে বলল তারা ২০,০০০ কোটি টাকা ফেরত দিচ্ছে। তাদের শেয়ার যেভাবে পড়তে শুরু করেছে, তাতে আর তারা তাদের গ্রাহকদের ক্ষতি করতে চায় না। গৌতম আদানি আজ সকালে ভিডিও বার্তায় বললেন তিনি নীতিগতভাবে এই টাকা ফেরত দিচ্ছেন। ততক্ষণে আদানি বিশ্ব ধনীদের তালিকায় ১৬ নম্বরে নেমেগেছেন। সিঙ্গল ডিজিট থেকে তিন দিনেই ডবল ডিজিটে পৌঁছে গেছেন তিন নম্বরী আদানি।
কিন্তু কেন তাকে টাকা ফেরত দিতে হল? আমার ধারণা যে শর্তে এশিয়ার ধনীতম পরিবারগুলো তাদের হাতের ময়লা আদানি গ্রুপে ইনভেস্ট করেছিল, সেই শর্ত পূরণ হয় নি। তাদের টাকা ফেরত দিতে হয়েছে। ভারতের শেয়ার বাজারের ইতিহাসে ওভার সাবস্ক্রাইবড এফপিও পরের দিনই সব টাকা ফেরত দেওয়ার কোনও অতীত উদাহরণ নেই। কোম্পানির মুখে বিরাশী সিক্কার থাপ্পড়। অনেক দিন লাগবে আদানি এবং আদানির পাশে থাকা মানুষদের গাল থেকে এই দাগ মুছতে। তাছাড়া আমার আরও মনে হয় গুরুজীও সিঁদুরে মেঘ দেখছেন। জনগণের ধারণা গৌতম আদানি গুরুজীর অভয়হাত মাথায় নিয়ে ছক্কার পর ছক্কা মেরেছেন। গুরুজী ভাবেননি হাওয়া দিয়ে ফোলানো আদানির স্টকগুলো এত তাড়াতাড়ি ধড়ফড় করতে করতে মাটি ধরবে। তার ধারণা ছিল আদানি অন্তত ২০২৪-এর ভোট পর্যন্ত টিকবে। সেই ধারনাটা মাটি ধরল। তাঁরও ইমেজ রাখার ব্যাপার আছে। আদানিকে বাধ্য হতে হল টাকা ফেরত দিতে। কিন্তু আজ সকালে আরও বড় ঝটকা অপেক্ষা করছিল। বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ধনী রথসচাইল্ডদের ব্যাঙ্ক, সিটি ব্যাঙ্ক আদানির মাথার ওপর থেকে হাত তুলে নিল। তার কাছে বন্ধক হিসেবে আদানির বন্ডের দাম নেই। এটা আমার কাছে আদানির বড় পতনের ইঙ্গিত।
দেখাগেল আদানি দাঁড়িয়ে আছেন ১৬ নম্বরে। শেয়ার মার্কেটে পতনে আদানির কোম্পানির খুব কিছুই হবে না — কারন পাবলিকের হাতে খুব বেশি স্টক নেই — মূলত বড় ইনভেস্টর আর আদানিদের হাতে ধরা আছে। কিন্তু যে ইমেজটায় তার যে ধাক্কা লাগল, তাকে রিপেয়ার করা খুব কঠিন। ২৪-এর ভোট অনেক দূর কিন্তু আদানি সমস্যায় রাজনীতির রঙ লাগতে শুরু করেছে। সে কথা কাল।
ছবি : ইস্রায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানইয়াহু আর গৌতম আদানি হাইফা বন্দর চুক্তি সম্পাদনের পরে।