করাচীতে অবতরণ করিবামাত্রই আমি ভারতবর্ষের উপন্যাস-সম্রাট শরৎচন্দ্রের স্বর্গারোহণের শোকসংবাদ পাইলাম। জানিতাম, কিছুদিন হইতেই তিনি অসুস্থ। কিন্তু এমন কথা ভাবি নাই, তিনি এত শীঘ্র আমাদের পরিত্যাগ করিবেন। শেষবার যখন তাঁহার সহিত দেখা করিতে যাই তখন তাঁহাকে অতিশয় প্রফুল্ল ও প্রাণময় দেখিয়াছিলাম। কিন্তু তাঁহার অন্তিমকালে এত নিকট ইহা স্বপ্নেও কল্পনা করি নাই। শরৎচন্দ্র বাংলাসাহিত্যের যে আসনে প্রতিষ্ঠিত ছিলেন দীর্ঘকাল তাহা শূন্য থাকিবে। বাংলায় এমন কোন পরিবার নাই যেখানকার নরনারীর নিকট তিনি পরিচিত ও সমাদৃত নহেন।
কিন্তু কেবলমাত্র অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিককে হারাইয়াই যে আমরা শোকাভিভূত হইয়াছি তাহ নহে, শোকপ্রকাশের অপর কারণ তিনি ছিলেন কংগ্রেসের এক শক্তিস্তম্ভ। অসহযোগ আন্দোলনের প্রথম হইতেই তিনি বাংলার কংগ্রেসে যোগদান করেন। তাঁহার শ্রেষ্ঠদান তিনি হাওড়া জিলায় বিতরণ করিয়াছেন, সেখানে তাঁহার অভাব বিশেষভাবেই অনুভূত হইবে।
তাঁহার সহিত আমার অতি ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব ছিল। আমার বেদনা আজ অতি গভীর। তাঁহার মৃত্যুতে আমার ব্যক্তিগত ক্ষতি যে পরিমাণ হইল তাহা কোন দিনই পূর্ণ হইবে না।
শরৎচন্দ্র শুধু সাহিত্যিকই ছিলেন না, রাজনীতিক্ষেত্রেও তাঁহার দান ছিল এবং সেই সুবাদেই ১৯২১ খৃষ্টাব্দে শরৎচন্দ্রের সহিত আমার প্রথম পরিচয় ঘটিয়াছিল।
মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে ভারতব্যাপী অসহযোগ আন্দোলন প্রবর্তিত হইলে শরৎচন্দ্র সেই আন্দোলনে যোগদান করেন। কলিকাতায় এই সময়ে যে জাতীয় বিদ্যাপীঠ প্রতিষ্ঠিত হয় শরৎচন্দ্র তাহার অন্যতম উদ্যোক্তা ছিলেন। এই সময়ে একদিনের কথা আমার মনে আছে; একজন প্রসিদ্ধ সাহিত্যিক শরৎচন্দ্রকে বলিলেন— ‘কলম ছাড়িয়া রাজনীতিকের দলে ভিড়িয়া পড়া সাহিত্যিকের কর্ত্তব্য নহে।’ শরৎচন্দ্র তাহাতে হাসিয়া বলেন, ‘আমি কিন্তু কিছু দিনের জন্য কলম ছাড়িয়া চরকাই ধরিয়াছি।’
শরৎচন্দ্রের এই উক্তির অর্থ ছিল এই যে, দেশমাতা যখন বিপন্না তখন ব্যক্তিগত সমুদয় চিন্তা ও অভ্যাস পরিত্যাগ করিয়া তাঁহার রক্ষায় অবতীর্ণ হওয়াই সন্তানের কর্তব্য। দেশমাতৃকার প্রতি আন্তরিক প্রীতি তাঁহার আমরণ বিদ্যমান ছিল। বহু বত্সর যাবৎ তিনি নিখিল ভারত রাষ্ট্রীয় সমিতির ও বঙ্গীয় প্রাদেশিক রাষ্ট্রীয় সমিতির সদস্য এবং হাওড়া জেলা কংগ্রেস কমিটির সভাপতি ছিলেন। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের সহিত তাঁহার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। লাজুক ছিলেন বলিয়া তিনি সভাসমিতিতে বড় একটা যোগ দেন নাই বটে, কিন্তু সংশ্লিষ্ট যুবকেরা তাঁহার নিকট হইতে অনেক প্রেরণা লাভ করিয়াছে। স্বদেশপ্রেমিক শরৎচন্দ্রের এই দিকটার পরিচয় আজকার তরুণেরা তেমন জানে না। তাঁহার মন ছিল চিরসবুজ, তরুণ বাংলার আশা-আকাঙ্খার প্রতি তাঁহার পূর্ণ সহানুভূতি ছিল। যতদিন তিনি জীবিত ছিলেন, সরকার ও পুলিশ তাঁহার প্রতি তীক্ষ্ন দৃষ্টি রাখিত। তাঁহার ‘পথের দাবী’ নামক বিখ্যাত গ্রন্থ বাজেয়াপ্ত হইয়াছিল, তিনি কারারুদ্ধ হন নাই, ইহা বিস্ময়ের বিষয়। কারাবাসজনিত অভিজ্ঞতা লাভ করিলে সেই অভিজ্ঞতা দ্বারা তাঁহার সাহিত্য আরও সমৃদ্ধ হইতে পারিত। সমাজে যাঁহারা বর্জিত ও উপদ্রুত, তাঁহাদের প্রতি সমবেদনাই শরৎসাহিত্যের সর্বাপেক্ষা বড় প্রেরণা। নিজের জীবন তিনি দুঃখদৈন্য ও পরীক্ষার মধ্য দিয়া অতিবাহিত করিয়াছেন বলিয়াই এই প্রেরণা লাভ করিয়াছেন। জীবনের এই কঠোর পরীক্ষায় যাঁহারা মুহ্যমান হইয়া পড়েন, শরৎচন্দ্র তাঁহাদের দলে ছিলেন না। তিনি ছিলেন একজন বিদ্রোহী, তাঁহার সাহিত্যের মধ্য দিয়া জাতির যুবসমাজের নিকট এই বিদ্রোহের বাণীই তিনি ছড়াইয়াছেন। সত্যের প্রতি অটুট নিষ্ঠা তাঁহার সাহিত্যে সত্যপ্রচারের প্রেরণা যোগাইয়াছে।
আমাদের দেশে, বিশেষভাবে বাংলায়, হাস্যরসের বড় অভাব। শরৎসাহিত্যে এই হাস্যরসের প্রাধান্য দেখা যায়। দুঃখদৈন্য তাঁহাকে বিচলিত করিতে পারিত না বলিয়াই ঘোরতর দুর্দশা বর্ণনাকালেও তিনি হাস্যরসের নির্ঝর বহাইয়াছেন। এতগুলি গুণ একজন মানুষের সচরাচর সম্ভব হয় না—একাধারে তিনি ছিলেন একজন আদর্শ লেখক, আদর্শ দেশপ্রেমিক ও সর্বোপরি আদর্শ মানব।
সাহিত্যাচার্য শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের অকালমৃত্যুতে ভারতের সাহিত্যগমন হইতে একটি অত্যুজ্বল জ্যোতিষ্ক খসিয়া পড়িল। যদিও বহু বর্ষ তাঁহার নাম বাংলার ঘরে ঘরেই শুধু পরিচিত ছিল তথাপি তিনি ভারতের সাহিত্য জগতেও কম পরিচিত ছিলেন না। সাহিত্যিক হিসাবে শরৎচন্দ্র বড় ছিলেন বটে কিন্তু দেশপ্রেমিক হিসাবে তিনি ছিলেন আরও বড়। তাঁহার মৃত্যুতে বাংলার কংগ্রেসের সমূহ ক্ষতি হইয়াছে।
শরৎচন্দ্র চট্টপাধ্যায় শতবার্ষিকী সংকলন থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে।