প্রতিদিনের থেকে ভাইফোঁটার দিনটা অন্যরকম কাটে ওদের। ওদের মানে পূর্ব মেদিনীপুরের পাঁউশি অন্ত্যোদয় অনাথ আশ্রমের আবাসিক ছেলেমেয়েদের। আবাসিক মেয়েরা ভোরে ঘুম থেকে উঠে আবাসিক মেয়েরা ভাইফোঁটার জন্য অনাথ আশ্রমের চৌহদ্দির মধ্যেই সকলে দল বেঁধে বাগান থেকে শিশির স্নাত দুর্বা ঘাসের উপর ভোরের জমে থাকা শিশির, দুর্বা ঘাস সংগ্রহ করে আশ্রমে হই হই করে ফিরে সকলে স্নানে যায়। স্নান সেরে নতুন জামাকাপড় পড়ে ভাইদের কপালে ফোঁটা দেওয়ার জন্য চন্দন বাটা, কাজলপাতিতে মোমের শিখা লাগিয়ে কাজল তৈরির কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। ইতিমধ্যেই আশ্রমের আবাসিক ছেলেরাও স্নান সেরে নতুন পাঞ্জাবি, জামা পরে দিদি বা বোনদের কাছ থেকে ভাইফোঁটা নিতে হাজির হয়ে যায় নির্দিষ্ট জায়গায়। ভাইয়ের কপালে দিলাম ফোঁটা/যমুনা দেয় যাকে ফোঁটা/আমি দেই আমার ভাইকে ফোঁটা বলে অনাথ আশ্রমের দিদি বোনেরা দাদা ভাইয়ের কপালে ফোঁটা দেয়। ভাইফোঁটা অনুষ্ঠানে একে অপরের হাতে উপহার সামগ্রীও তুলে দেয়। রক্তের সম্পর্ক নয়, তবুও ঠিকানাহীন এই পৃথিবীতে খাদ্য,বস্ত্র আর মাথার উপর একটি নিশ্চিত নিরাপদ ছাদের লক্ষ্যে অন্ত্যোদয় অনাথ আশ্রমের আবাসিক হয়ে হাতে হাত আর কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে জীবন সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে। আশ্রমের সহ আবাসিক হিসেবে আত্মিক সম্পর্কের ভাইবোনেদের ভাইফোঁটা উপলক্ষে ভাইদের মঙ্গল কামনায় বোনদের ফোঁটা দেওয়াকে কেন্দ্র করে এক অনাবিল আনন্দঘন মুহূর্তের সৃষ্টি হয় পাঁউশী অন্ত্যোদয় অনাথ আশ্রমে।

অনাথ ছেলেমেয়েরাও একদিন সব বাধা তুচ্ছ করে জীবনে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে এই ভাবনাকে পাথেয় করে ১৯৯৫ সালে পূর্ব মেদিনীপুরের ভগবানপুর ২ব্লকের পাঁউশি গ্রামে এক অনাথ কে নিয়ে নিজের বাড়িতেই অনাথ আশ্রমের গোড়াপত্তন করেন বলরাম করণ। সেই আশ্রমেই আজ ১৬৪জন অনাথ ছেলেমেয়েদের আশ্রয়স্থল।
ভাইফোঁটা অনুষ্ঠানে যোগ দিতে প্রতিবছর স্বামী দের নিয়ে আশ্রমে উপস্থিত থাকে বিয়ে হয়ে যাওয়া আশ্রমের একসময়ের আবাসিক মেয়েরা। আশ্রমে থাকার সময় যাদের কন্যা স্নেহে নিজে দাঁড়িয়ে বিয়ে দিয়েছিলেন বলরাম করণ। ভাইফোঁটার দিন আশ্রমের অনেক শুভানুধ্যায়ী মানুষজন আশ্রমে উপস্থিত হন। আশ্রমের পক্ষ থেকে সকলকেই মধ্যাহ্ন ভোজন আপ্যায়িত করা হয়।

আশ্রমের আবাসিক ছেলেমেয়েদের মধ্যে আত্মিক এক অভিন্ন পারিবারিক বন্ধনের সৌহার্দ্যে আবদ্ধ রাখতে তিরিশ বছর আগে পাঁউশী অন্ত্যোদয় অনাথ আশ্রমে ভাইফোঁটা অনুষ্ঠান পালনের যে সূচনা করেছিলেন বলরাম করণ শুরু করেছিলেন তা আজও উৎসাহ উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে আজও চলে আসছে।