বাংলাদেশে মৌলবাদের দাপাদাপির প্রতিবাদে ও দক্ষিণ এশিয়াকে অশান্ত করার চেষ্টার বিরুদ্ধে সরব হল দেশ বাঁচাও গণমঞ্চ। শুক্রবার কলকাতা প্রেসক্লাবে গণমঞ্চের প্রতিনিধিরা বাংলাদেশ ও ভারতে ক্রমবর্ধমান সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে গর্জে উঠলেন। গণমঞ্চের পক্ষ থেকে পূর্ণেন্দু বসু জানান, দেশ বাঁচাও গণমঞ্চ তার জন্মলগ্ন থেকেই সমস্ত রকম মৌলবাদ এবং সাম্প্রদায়িকতার বিরোধী। মৌলবাদ এবং সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লড়াই করার লক্ষ্য নিয়েই গত তিন বছর ধরে দেশ বাঁচাও গণমঞ্চ পথ চলছে। আগামী দিনেও সেই লক্ষ্যেই আমরা পথ চলব।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ঘটনাবলী আমাদের উদ্বিগ্ন এবং আশঙ্কিত করেছে। ওই দেশে সাম্প্রদায়িক মৌলবাদী শক্তি যেভাবে ধর্মীয় সংখ্যালঘুসহ গণতন্ত্রকামী অসাম্প্রদায়িক মুক্তমনা মানুষদের ওপর আঘাত হেনেছে, তা যে কোনো গণতন্ত্রপ্রিয় অসাম্প্রদায়িক মানুষকেই ব্যথিত করবে। আশঙ্কিত করে তুলবে। বাংলাদেশে ধর্মীয় মৌলবাদীরা ছায়ানট, উদিচীর মতো রাবীন্দ্রিক প্রতিষ্ঠানকে আক্রমণ করেছে। অবাধে তাদের কার্যালয়ে ভাঙচুর চালিয়েছে। এর বিরুদ্ধে আমরা প্রতিবাদ জানাচ্ছি। বিশিষ্ট সাংবাদিক রন্তিদেব সেনগুপ্ত বলেন, সংবাদপত্রের অফিসে অগ্নিসংযোগ করেছে। এটা কখনোই মানা যায় না। দীপু দাস নামে সেদেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের এক যুবক এবং আয়েষা আক্তার নামে একটি শিশুকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবরের বাসস্থান এবারও তাদের লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠেছে। এমনকী বাঙালির রবীন্দ্রনাথ এবং নজরুলকে নিশানা করেছে তারা। যে স্বাধীনতা যুদ্ধের ভিতর দিয়ে বাঙালির অস্মিতা প্রকাশ পেয়েছিল, বাংলাদেশে আজ সেই ইতিহাসকেই বাংলাদেশের মৌলবাদী শক্তি মুছে ফেলতে সচেষ্ট হয়েছে।

শুধু ধর্মীয় সংখ্যালঘুরাই নয়, সেদেশে ধর্মনিরপেক্ষ প্রগতিশীল মুক্তমনা মানুষদের ওপরও প্রতিনিয়ত আঘাত হানা হচ্ছে। বাংলাদেশে এই নৃশংস মৌলবাদী তাণ্ডবকে আমরা ধিক্কার জানাই। তবে আশার কথা এই যে, ওই দেশের গণতন্ত্রপ্রিয় মুক্তমনা প্রগতিশীল লেখক শিল্পীরা এবং সাধারণ মানুষ এই মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমে পড়েছেন। আমরা আশা রাখছি, মানুষের এই প্রতিরোধের সামনে মৌলবাদী শক্তি পরাজিত হবেই। পার্থ ব্যানার্জী ও ডাঃ সিদ্ধার্থ গুপ্তা সাম্প্রতিক ঘটনাবলীর বিরুদ্ধে সরব হন। মনে রাখতে হবে বাংলাদেশের গণতন্ত্রপ্রিয় মুক্তমনা প্রগতিশীল মানুষদের প্রতি আমাদের সহমর্মিতা রইল। আমরা এও লক্ষ করছি, বাংলাদেশের এই দুঃখজনক ঘটনাবলীকে হাতিয়ার করে বিধানসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে এই বাংলায় বিজেপি আরএসএস এবং তাদের সহযোগী সংগঠনগুলি ঘৃণার পরিবেশ সৃষ্টি করতে বাজারে নেমে পড়েছে। এদের ধিক্কার জানাই।
নাজমুল হক, সুমন ভট্টাচার্য ও বর্ণালী মুখার্জি-রা সাংবাদিকদের জানান, বিজেপি এবং আর.এস.এস বাংলায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং শান্তি নষ্ট করার চেষ্টা চালাচ্ছে। এটি সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক চক্রান্ত ছাড়া আর কিছুই নয়। ঘৃণা এবং হিংসার কারবারিরা ঘোলা জলে মাছ ধরতে নেমে পড়েছে। এই কাজে তাদের সাহায্য করছে তাদের প্রোপাগান্ডা মেশিন এবং মোদি মিডিয়া। আমাদের সচেতন থাকতে হবে। মঞ্চে উপস্থিত সুশান রায়, অমিত কালি, সানোয়ার মোল্লা ও ডা. দেবাশিস বক্সি-রা বাংলাদেশে মৌলবাদের দাপাদাপির প্রতিবাদে গর্জে ওঠেন। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে জানান, এসআইআর-সহ দেশের নানাবিধ সমস্যা থেকে মানুষের দৃষ্টি ঘুরিয়ে দিয়ে সাম্প্রদায়িক বিভাজন সৃষ্টি করে ভোটের ময়দানে ফায়দা লোটাই এখন একমাত্র উদ্দেশ্য। আমরা পরিষ্কার বলতে চাই, বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক মৌলবাদীদের সঙ্গে এদেশের বিজেপি আরএসএসের মতো মৌলবাদী শক্তির কোনো তফাৎ নেই। বাংলাদেশে আজ মৌলবাদীরা যা করছে, বহুদিন আগে থেকেই এদেশে বিজেপি- আরএস এস সেই একই কাজ করে চলেছে।

উল্লেখ করা যেতে পারে বাংলাদেশের মৌলবাদীদের মতো এরাও দেশের প্রকৃত ইতিহাসকে মুছে দিয়ে বিকৃত ইতিহাস চালু করতে চাইছে। দুই দেশের মৌলবাদীদের ভিতরে আসলে কোনো তফাৎ নেই। আমরা বিস্ময়ের সঙ্গে আরও লক্ষ্য করছি, দীপু দাসের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পরও এদেশের হিন্দুত্ববাদী প্রধানমন্ত্রী সামান্য দুঃখপ্রকাশ করেও বিবৃতি দিতে পারেননি। তাঁর এই নীরবতার পিছনে রহস্য কী জানতে চাই আমরা। আসলে বাংলাদেশে এই সাম্প্রদায়িক উন্মাদনা বজায় থাকলে রাজনৈতিক লাভ বিজেপির। আমরা এই বাংলার মানুষের কাছে আবেদন করছি, বিজেপি এবং আরএসএসের এই ঘৃণ্য রাজনৈতিক চক্রান্তের ফাঁদে পা না দেওয়ার জন্য। সকল সম্প্রদায়ের মানুষকে আমরা সজাগ থাকতে অনুরোধ করছি। বাংলার হিন্দু, মুসলমান, শিখ, খৃস্টান, বৌদ্ধ ও জৈন সকল সম্প্রদায়ের মানুষ অতীতের মতো এখনো হাতে হাত ধরাধরি করে থাকবেন।