| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

আধুনিক দাস : ছোট গল্প লিখছেন মনজুরুল ইসলাম

Reporter
মনজুরুল ইসলাম / ৯১০ জন পড়েছেন
আপডেট বুধবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২১

হনহন করে হাঁটছেন গফুর। বাজারের উদ্দেশ্যে। হাঁটছেন শহরের মূল রাস্তা ধরে। তার নামের শেষে অনায়াসেই স্যার শব্দটি জুড়ে দেয়া যায়। যেহেতু বাজারে প্রবেশের সাথে সাথেই স্যার স্যার শব্দে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয় বিক্রেতাদের মাঝে। রুগ্ন চেহারা, অপরিচ্ছন্ন চুল, কাঁচা পাকা দাড়ি, সাদামাটা পোশাক। ‘যাদের টাকা বেশী তাদের চেহারা হয় মোটা নয়তো এমন শুকনোই হয়।’ এমন বিপরীতধর্মী কথোপকথনে সাধারণত গফুরের অর্থের প্রাচুর্য নিয়ে জমে থাকা সংশয় কেটে যায় বিক্রেতাদের। সপ্তাহে তিনদিন বাজার করেন গফুর। প্রতিদিনের মতো আজও তার দু’হাতে দুটি ব্যাগ। ব্যাগ হাতে নিয়েই হেঁটে হেঁটে চলে এলেন বাজারে। শুরুতেই এগিয়ে গেলেন মাংসের দোকানে। তাকে দেখামাত্রই স্যার স্যার সম্বোধনে অস্থির হয়ে উঠলো প্রত্যেক কসাই। হঠাৎ দাড়াঁলেন গফুর। তীক্ষè চোখ বুলালেন দোকানগুলির দিকে। গফুর স্যার হিসেবে সবার কাছে দীর্ঘদিনের পরিচিত তিনি। এবার টেবিলের উপর থরে থরে সাজানো মাংসগুলি দেখতে থাকলেন বের হওয়া আসা গোল গোল চোখ দুটি দিয়ে। অতঃপর দাঁড়ালেন শেষ দোকানটিতে। তার আগমনে খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠলো কালো বর্ণের স্থুলদেহী কোরবান কসাইয়ের মুখখানি। প্রকৃত নাম কোরবান হলেও সবাই ডাকে কুরবান বলে। হতাশ হয়ে কুরবানের দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো অপরাপর কসাই। ‘আহারে, পাঁচ কেজির কাস্টমার হাতছাড়া হয়ে গেল রে, হাতছাড়া হলো।’ একই অভিব্যক্তি সবার মননে সৃষ্টি করলো হতাশাগ্রস্থ এক প্রতিক্রিয়ার। অতিমাত্রায় সতর্ক হয়ে মাংস পরীক্ষা করা শুরু করলেন গফুর। আঙুল দিয়ে নেড়ে চেড়ে হাড়সমেত মাংস দেখতে দেখতেই জিজ্ঞেস করলেন দাম।

স্যার, পাঁচশো পঞ্চাশ।

‘‘পাঁচশো টাকার এক টাকাও বেশি দেবো না।’’ হাতের পাঁচটি আঙুল দেখিয়ে বললেন গফুর।

রাজী হলো কোরবান। কাটতে শুরু করলো মাংস।

‘শোন, কুরবান, খারাপ মাংস দিস না, ভালো দেখে দিস, বুঝলি। হাড় দিলে কিন্তু এবারেই শেষ।’ কসাইয়ের চোখে চোখ রেখে সাবধান করবার চেষ্টা করলেন গফুর।

‘কী যে কন স্যার, অনেক কষ্টে আইজ তোমাক পাইছি। কুরবান কসাইয়ের কাছ থাকি একবার কেউ মাংস নিলে মরনের আগ পর্যন্ত তাক ন্যাওয়া লাইগবে।’ কুরবানের মুখে গর্বের ভাবখানি ফুলে উঠলো বেলুনের মতো। মাংসল হাতে মাঝারি সাইজের দা নিয়ে কাটতে শুরু করলো মাংস। কাটবার সময় কুরবান কসাই তার হাত এত পরিমাণ উঁচু করলো যে বগলের চুলগুলি সহজেই দৃশ্যমান হয়ে এলো। ময়লা ছ্যান্ডো গেঞ্জির ছোট ছোট ফুটো দিয়ে থলথলে ভুড়ির কিছু অংশও দৃষ্টির আড়ালে রইলো না।

প্রত্যাশামতো মাংস পেয়ে ফুরফুরে মেজাজে হাঁটতে থাকলেন গফুর। প্রবেশ করতে থাকলেন বাজারের একদম ভেতরে। এসে দাঁড়ালেন খাসির মাংসের দোকানগুলির সামনে। এবারও স্যার স্যার সম্বোধনে গফুরকে আকৃষ্ট করবার চেষ্টা করলো সবাই। নীরবতার মূর্তি ধারণ করলেন তিনি। ভাবখানা এমন যে তিনি এই বাজারের জামাই। আদর যত্ন না করলে নীরব ভাবটির অবসান ঘটাবেন না। নিজের গুরুত্ব বৃদ্ধি করতে নিয়তই এমন করেন তিনি। দু’হাত কোমরে রেখে ঘাড় ঝুঁকে দাঁড়ালেন। চোখে যেন অনুবীক্ষণ যন্ত্র লাগিয়ে পর্যবেক্ষণ করতে থাকলেন মাংসের কোয়ালিটি। বেশ কিছুক্ষণ ভাববার পর মাথা নাড়ালেন। উৎসুক আগ্রহ নিয়ে তার দিকে তাকালো সবাই। কিন্তু তার দৃষ্টি নিবন্ধ হলো প্রথম দোকানের কসাইয়ের দিকে। আনন্দে ভরপুর হয়ে উঠলো জহিরের চোখের মনি দুটি। সুখের বৃষ্টি উছলে পড়তে থাকলো তার শুকনো সরু মুখ থেকে। ‘ইস! চার হাজার টাকা হাত থেকে ফসকে গেল রে, ফসকে গেল!’ অপরাপর প্রত্যেক কসাই পুড়তে থাকলো অসন্তোষে। দরকষাকষির পর একটি সিদ্ধান্তে আসলেন গফুর।

‘খাসি না ভেড়া? ভেজাল দিলে কিন্তু পরেরবার তাকাবোই না।’ কসাইয়ের একদম কাছাকাছি এসে সতর্ক করলেন গফুর।

‘তোমার কাছোত মাংস বিক্রি করবার পারমো এডা তো মোর কপাল। ভেড়া হলে ব্যবসা ছাড়ি দেইম।’ আস্থা নিয়ে বলবার পরপরই মাংস কাটতে শুরু করলো জহির। কেনাকাটার ব্যাপারে নিঁখুত থাকবার চেষ্টা করেন গফুর। সঙ্গত কারণেই কোনো দোকানীই তার সাথে প্রতারণার চেষ্টা করে না। অবশ্য কসাইরা যে ইচ্ছে করেই এক আধটু প্রতারণা করে সেটিও কিন্তু অনেকটা আরোপিত। একই দেশে জীবন মানের বৈষম্য যখন প্রকট আকার ধারণ করে তখন তার প্রভাব গিয়ে সব জায়গাতেই পড়ে। পরিমাণমতো মাংস নিয়ে আবারও হাঁটতে থাকলেন  গফুর। এবারের গন্তব্য মুরগির দোকান। চোখেমুখে ফুরফুরে আমেজটি অক্ষুণ্ণ রয়েছে তার। কম করে হলেও দশটি মুরগী কেনেন তিনি। পাঁচশ গ্রামের উপর হলে সেটি কোনোভাবেই বিবেচনায় নেন না। ‘কচি মুরগীর রোস্ট ও ঝোলসমেত মাংস খাওয়ার মজাই আলাদা।’ এমন ধারণা থেকেই হয়ত এই সিদ্ধান্ত। যথারীতি মুরগীর দোকানের কাছে আসলেন তিনি। কিন্তু এবার ঘটলো বিপরীত ঘটনা। স্যার, স্যার সম্বোধনে সবাই অস্থির হলেও কারো মধ্যে কোনো তাড়না লক্ষ করা গেল না তাকে আকৃষ্ট করবার। বরং মনে হলো ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করেই লম্বা সালাম ঠুকলো সবাই। কিন্তু সালাম দেয়া থেকে বিরত রইলো তাল গাছের মতো লম্বা ও পাতলা গড়নের গরীবুল্লাহ। কোনো কথা না বলে তার পছন্দমতো দশটি মুরগী কাটবার নির্দেশ দিলেন। নির্দেশটি পাবার পর বিদ্যুতর মতো যেন সচল হলো গরীবুল্লাহর দুটো হাত। মাথা হেলে অনবরত মুরগী প্রস্তুত করে চলেছে সে। অবিরাম লাফাতে থাকা জবাই করা কয়েকটি মুরগীকে সামলানোর চেষ্টাও করছে। তার দোকানের সামনেই এসে দাঁড়ালেন গফুর। অনেকটা বীরের মতো। তিনিই যেন এই বাজারের সর্বোচ্চ ক্রেতা- এই ভাবটিই স্পষ্ট হয়ে উঠলো তার অবয়বে। গফুরের দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত মুরগী বিক্রেতা গরীবুল্লাহ। প্রায় বছর পাঁচেক ধরে তার কাছ থেকেই মুরগী কেনেন তিনি। কোনোদিনই নিয়মের ব্যতিক্রম হয় না গরীবুল্লাহর। তবুও শাসানির স্বভাবটি ধরে রেখেছেন গফুর। স্বভাবজ ভঙ্গিতে বললেন-

‘এতক্ষণ ধরে এমন কুচকুচ করে কি কাটছিস, ব্যাটা। তাড়াতাড়ি কর।’ বলেই মাংসের ব্যাগ রেখে মাছের বাজারের দিকে এগুতে থাকলেন তিনি। কোনো উত্তর দিলো না গরীবুল্লাহ। ধবল রোগীর মতো ফর্সা মুখে কৃত্রিম হাসি ছড়ানোর চেষ্টা করলো, বোঝাতে চাইলো দ্রুতই হয়ে যাবে।

মাছবাজারে প্রবেশ করতেই বিড়ম্বনায় পড়ে গেলেন গফুর। তাকে দেখামাত্রই ছুটে এলো চার পাঁচজন মাঝি। এমনভাবে ঘিরে ধরলো যেন রাস্তা বন্ধ হবার উপক্রম। ‘এই পাশে আসেন স্যার, এই পাশে’। সান বাঁধানো মাছের দোকানে বসেই কয়েকজন চিৎকার করে আহ্বান জানাতে থাকলো গফুরকে। তার প্রায় গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা হতশ্রী মাঝির শীর্ণ মুখগুলি না দেখে পুষ্ট মাছগুলি দেখতে থাকলেন গফুর। বড় বড় মাছগুলি মাঝিরা এগিয়ে ধরলে টিপে দেখতে থাকলেন গভীর মনোনিবেশ সহকারে। প্রত্যেক মাঝিই গফুর স্যারের পরিচিত। সবার পরনেই কোকড়ানো ময়লা শার্ট ও ধূসর লুঙ্গি। মাছের মতো শিকার করতে চাইছে গফুরকে। পূর্বের মতোই চিন্তার গহ্বরে ডুবে গেলেন গফুর। ‘স্যার, ব্রহ্মপুত্র থাকি তোলা, একদম টাটকা, এইগল্যা মাছ তোমরা না খাইলে আর কাই খাবে।’ প্রাণগোপালের এই কথাকটি বেশ মনে ধরেছে গফুরের। এবার ওর দিকে তাকালেন তিনি। বিষয়ের মর্মাথ বুঝতে পারলো প্রাণগোপাল। তার এই তাকানোর ভঙ্গি দেখে অন্যান্য মাঝিদের বুকের ভেতরের অংশ ধক করে উঠলো। পরিস্থিতি বুঝে এক এক করে সরে যেতে থাকলো সবাই। দামের চিন্তায় উজ্জ্বল ফর্সা মুখটি উদ্বিগ্নতায় গরম পানির মতো টগবগ করে ফুটতে থাকলো প্রাণগোপালের। সুযোগ বুঝে যথাসম্ভব সস্তা দাম বললেন গফুর। কাচুমাচু করতে করতে আর সামান্য কিছু বাড়ানোর অনুরোধ করলো প্রাণগোপাল। তার অনুরোধে সাড়া দিয়ে প্রায় আট কেজি ওজনের বোয়াল মাছটি কিনলেন গফুর, বাজারের সবার পরিচিত গফুর স্যার।

মাছ ও মাংস কেনার পর মুদি ও ফলমুলের দোকান থেকে যথারীতি নিয়মমাফিক কেনাকাটা করে মূল সড়কে চলে আসলেন গফুর। আর্মি অফিসারের মতো দিক পরিবর্তন করলেন রাস্তার। তাকে অনুসরণ করতে থাকলো গরীবুল্লাহ ও প্রাণগোপাল। বাজার শেষে ফেরার সময় প্রাণগোপাল ও গরীবুল্লাহকেই সাথে নেন তিনি। দুজনকে পছন্দও করেন। এমনকি প্রাণগোপালের কাছ থেকে কোনোদিন মাছ না নিলেও সহায়তার জন্য ওকেই নির্বাচন করেন। চারটি বড় বড় ব্যাগ, আট কেজি ওজনের বোয়াল মাছটি বহনের জন্য নিলো তারা। সড়কে রয়েছে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ানো রিকশা। কিন্তু কখনই রিকশায় উঠেন না গফুর। এটি আগে থেকেই জানতো গরীবুল্লাহ ও প্রাণগোপাল। স্বভাবতই তার কমান্ড অনুসরণ করে হাঁটতে শুরু করলো ওরা। রিকশাওয়ালার দিকে না তাকালেও কান খাড়া রাখলেন গফুর। ‘দেখ দেখো রে, বিশ্ব কৃপণ যাবার লাগছে, দেখো। হাজার হাজার টাকার বাজার করে আর বিশ ট্যাকা খরচ করি রিকশ্যাত চড়ে না।’ ব্যাঙ্গাত্মক হাসিতে মেতে ওঠা রিকশাওয়ালার মুখচ্ছবিগুলোর দিকে তাকালেন না গফুর। শুরুর দিকে কথাগুলি আহত করলেও এখন আর তার মননে তেমন নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে না। এসব ভ্রুক্ষেপ না করে ভাঙা চোয়ালে হাসোচ্ছ্বল ভাবটি আবারো ফিরিয়ে আনবার চেষ্টা করলেন তিনি। হাঁটতে থাকলেন মাথা উঁচু করে ।

সময়টা ভরা জৌষ্ঠের। মধ্যগগনের কাছাকাছি সূর্য। মনে হয়, আগুনের কুন্ডলী পাকিয়ে শরীরে আঘাত করছে। রাস্তায় তুমুল কোলাহল। উপায় না দেখে হাঁটার গতি বাড়িয়েছে প্রাণগোপাল ও গরীবউল্লাহ। বিষয়টি বুঝতে পেরে গফুরও ওদের সাথে তাল মেলালেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই নিরিবিলি সড়কে চলে এলো তিনজনই। বাজার শেষে সবসময়ই গফুরকে নির্দিষ্ট রাস্তা পর্যন্ত এগিয়ে দেয় প্রাণগোপাল ও গরীবুল্লাহ। আজও গন্তব্যে এসে দাঁড়ালো। এখান থেকে আর একশত মিটারের মতো পথ এগুলেই কাক্সিক্ষত বাসা। গরীবউল্লাহ প্রায় পাঁচ বছর ধরে নিয়মিত হলেও প্রাণগোপালের পরিবর্তে কখনও হরিশ, কখনও বিকাশ কখনোবা অন্য কেউ থাকে। অসহ্য রোদের কারণে এখানেও দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে না কেউ। প্রাণগোপাল ও গরীবউল্লাহর শরীর থেকে ঝরছে ঘামের স্রোত। শরীরের সাথে লেপ্টে গেছে ওদের জরা জীর্ণ শার্ট। তবুও মুখে হাসি ফোটাবার চেষ্টা করছে গফুর স্যারের সামনে। অপেক্ষা করছে মাছ ও মাংসের দামের প্রত্যাশায়।

এখন পর্যন্ত ততটা ঘামেন নি গফুর। তবে ক্লান্তির ছাপ তার অবয়বজুড়ে স্পষ্ট। রাস্তা থেকে উপরের দিকে গরম ভাব বের হয়ে আসছে। আর এই ভাবটি যেন গফুর স্যারকে শক্তভাবে প্রভাবিত করছে। এবার প্রাণগোপাল ও গরীউল্লাহর একদম কাছাকাছি আসলেন তিনি। ব্যাগগুলি রাস্তায় রইলেও বোয়াল মাছটি শোভা পাচ্ছে প্রাণগোপালের বলিষ্ঠ হাতে।

‘কিরে, এতদিন ধরে এত এত বিক্রি করিস, কই তোদের তো কোনো উন্নতি দেখলাম না। ছেলেদেরকেও তো দেখছি তোদের সাথে সাথে হেল্পারি করতে। ওদেরকেও কি মাছ মাংসের ব্যবসায় ঢোকাবি না ভিন্ন কিছু চিন্তা করবি? গফুর স্যারের কথা শুনে কতকটা নীরব হয়ে গেল প্রাণগোপাল ও গরীবুল্লাহ। তাদের এমন নীরবতায় কণ্ঠস্বর আরও চড়াও করলেন গফুর। কিরে কথা বলছিস না কেন?’ উচ্চ স্বরে বলতে বলতেই পকেট থেকে টাকা বের করে ওদের বিদেয় করলেন। টাকা নিয়ে মাথা নিচু করে বাজারের দিকে হাঁটতে থাকলো প্রাণগোপাল ও গরীবউল্লাহ। কিন্তু বাজারের পথে হাঁটলো না তারা।  গফুরের আড়াল হয়ে অনুসরণ করতে থাকলো তাকেই। দীর্ঘদিনের পুষে রাখা কৌতূহল আজ পূর্ণ করতেই হবে। শুধু এমন একটি প্রত্যয়ী ভাব লক্ষ করা গেল তাদের মাঝে। যে লোক এত টাকার বাজার করেন সেই লোক মাত্র পঞ্চাশ টাকা বাঁচানোর জন্য কেন এতগুলি ব্যাগ নিয়ে হাঁটবেন! এই অনুসন্ধিৎসা থেকেই তাদের এমন সিদ্ধান্ত।

প্রাণগোপাল ও গরীবুল্লাহকে বিদায় দিয়ে ব্যাগগুলির দিকে তাকালেন গফুর। জান বের হয়ে যাবে আজ-প্রতিদিনের ন্যায় আজও বিড়বিড় করে উচ্চারণ করলেন। তাকালেন নিজের শীর্ণ হাতদুটির দিকেও। আশপাশ তাকাতেও ভুললেন না। কাউকে দেখতে না পেয়ে ফেললেন স্বস্তির নিঃশ্বাস । অবশ্য এমন কাটফাটা রোদে কারো থাকবার কথাও নয় এই সড়কে। বডি বিল্ডারের মতো নিজের হাতদুখানিতে কসরত করলেন। প্যান্টের পকেট থেকে বের করলেন একটি ছোট্ট রশি। ব্যাগের সাথে রশি দিয়ে বাঁধলেন মাছটিকে।  একশো মিটারের মতো পথ যেতে হবে। মনে মনে ভাবলেন; কোনো ব্যাপারই না। এমন ভাব নিয়ে বিষয়টিকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণের চেষ্টা করলেন। এবার দু’হাতে নিলেন চারটি ব্যাগ। নেয়ামাত্রই কোনো দিকে না তাঁকিয়েই দৌড়ানোর মতো করে হাঁটতে থাকলেন। ধীরে ধীরে ঘামতে শুরু করেছে তার শরীর। শরীর থেকে হাতদুটি আলাদা হতে চাইছে। হাতের আড়ে এসে মনে হচ্ছে কালো রংয়ের মোটা পিঁপড়ে কামড়াচ্ছে। পিঠে রোদ এসে চাবুকের মতো পেটাচ্ছে। কান থেকে আগুনের মতো বেরুচ্ছে গরম উত্তাপ। সহ্য করতে না পেরে নির্দিষ্ট দূরত্বে পৌঁছার পূর্বেই হাত থেকে ব্যাগগুলি ফেলে দিলেন গফুর। শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি দ্রæত উঠানামা করছে তার। ব্যাগের নিচে বোয়াল মাছটি পড়ে গেলে নষ্ট হতে পারে, এই আশংকায় হাত দিয়ে নিরাপদ জায়গায় রাখলেন মাছটিকে। এবার হাতের দিকে তাকাতেই আঁতকে উঠলেন। রক্তিম হয়ে গেছে হাতের পুরো তালু। চামড়া ফেটে বের হতে চাইছে রক্ত। দু’হাত একত্রিত করে ব্যথার পরিমাণটি কমাবার চেষ্টা করলেন। যন্ত্রণায় টনটন করে চলেছে কাঁধ। শরীরের স্বাভাবিকত্ব ফিরিয়ে আনবার চেষ্টা করলেন। নজর রাখলেন ব্যাগ ও মাছটির দিকে।

কিছুক্ষণ পর আবারও উঠে দাঁড়ালেন গফুর। মুখের মধ্যে ঘামের প্রাবল্য রয়েই গেছে। হাত দিয়ে একবার মুখটি মুছে নিলেন। ঘামের পানিগুলি দরদর করে আঙুল বেয়ে নিচের দিকে পড়তে থাকলো। বডি বিল্ডারের মতো এবার আর কশরত করলেন না। চোয়াল শক্ত করে দু’হাত ব্যাগের হাতলের মধ্যে দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। মুখে কী একটা দুবোর্ধ্য শব্দ উচ্চারণ করেই দৌড়ানোর মতো করে হাঁটতে থাকলেন। দ্রুততার সাথেই এবার চলে আসলেন বাসার সামনে। ‘মাগো, মরে গেলাম।’ এই আর্তনাদটি শুনতে পেল পেছন পেছন আসতে থাকা প্রাণগোপাল এবং গরীবুল্লাহ। গফুর স্যারের এমন ভঙ্গি দেখে কিছুই বুঝে উঠতে পারলো না তারা। পুনরায় অনুসরণ করতে থাকলো গফুর স্যারকে। ড্রইংরুমের সামনে এসেই ব্যাগ ও মাছ রেখে হাসফাঁস করতে থাকলেন  গফুর। বাজারের সবার পরিচিত গফুর স্যার। বাসার রাজকীয় সদর দরজা, দরজা পেরিয়ে দেশী-বিদেশী ফুলের সমাহার, থাই গ্লাসের চাকচিক্য কোনোকিছুই নজরে পড়লো না তার। বরং কোলা ব্যাঙের মতো গুটিয়ে এলো সমস্ত শরীর।

‘কিরে গোফরা, সাত সকালে আবার কে মরলো রে।’ ড্রইংরুমের ভেতর থেকে ভারী কণ্ঠে বলতে বলতে বাইরে এলেন ধবধবে ফর্সা রঙের টি-শার্ট ও সাদা পায়জামা পরিতি হাতির মতো চেহারার বাড়ীর মালিক কামরুল হাসান। ধবধবে সাদা হাতে ধরে আছেন একটি টকটকে লাল আপেল। হয়ত কিছুক্ষণের মধ্যে ভক্ষণ করবেন। ছোট ছোট চোখের মাংসে ভরা মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো গফুর। বাড়ীর বিশ্বস্ত চাকর। আয়েশের ভঙ্গিতেই গফুরকে দেখিয়ে দেখিয়েই আপেলের একটি অংশে কামড় দিতে থাকলেন কামরুল। আপেল চিবানোর খসখস শব্দটি বিষের মতো কানের ভেতর প্রবেশ করলো গফুরের।

‘সব ঠিকটাক নিয়েছিস তো?’ কামরুল সাহেবের ভারী কণ্ঠস্বর থেকে বেরিয়ে এলো কথাগুলি। এমন অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতি দেখে যেন আকাশ থেকে পড়লো গরীবুল্লাহ ও প্রাণগোপাল। হায় হায়, এ কি সর্বনাশ! ফিসফিস করে বলতে থাকলো একে অপরকে। এবং আড়াল করে রাখলো নিজেদের।

‘আপনার নির্দেশ অনুযায়ী কাজ করলে কি কখনো ভুল হয় স্যার, বলেন। বাজারে এমন ভাব নিয়ে থাকি যে কেউ ধরতেই পারে না আসল রহস্য।’ স্বতস্ফূর্ত জবাবই তার উজ্জ্বলতর দৃষ্টান্ত। বলবার মাঝেই মালিকের কাছে খরচের হিসেব বুঝিয়ে দিলো গফুর।

‘তা টাকাপয়সা মারিস নি তো?’ককর্শ কন্ঠে গফুরের দিকে তাকিয়ে বললেন বাড়ীর মালিক।

‘এগারো বছর ধরে কাজ করছি স্যার। কোনোদিন এক টাকাও এদিক সেদিক করি নি। তারপরও প্রতিদিন আপনার এই অভিযোগ কিন্তু আমার সহ্যের বাইরে চলে যাচ্ছে।’ কিছুটা ক্ষুব্ধতা নিয়ে বললো গফুর।

প্রকৃতই কোনোদিনও চুরি করে নি গফুর। মাত্র পঞ্চাশ টাকা বাঁচানোর জন্য যে মানুষ এত কষ্ট করতে পারে তার দ্বারা কি চুরি করা সম্ভব! সে যে চুরি করে না সেটিও ভালা করে জানেন কামরুল। তাই জেনে শুনেই খরচ করতে দেয় ওকে। শুধু স্বভাবজ কারণে সন্দেহমূলক কথা বলে শাসিয়ে থাকেন কামরুল যাতে মালিকের প্রতি ভীতির ভাবটি বজায় থাকে গফুরসহ প্রত্যেক চাকরের। প্রহার করতেও দ্বিধাবোধ করেন না কখনো। বরং চাকরদের প্রহার করা নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত হয়েছে কামরুলের। সঙ্গত কারণে অবচেতনাতেই অধিকারী হয়েছেন আগ্রাসী স্বভাবের। এটিকেই নিয়ত সঙ্গত মনে করে যাপন করে চলেছেন যাপিত জীবন। আর এই আচরণের শিকার হয়ে চলেছে গফুরের মতো দরিদ্র গৃহকর্মীরা। পরিবারের কথা ভেবে মালিকের সব অন্যায় আচরণ হজম করে চলেছে গৃহকর্মীরা, বাড়ীর মালিকদের অভিধানে যাদের বলে চাকর।

একমাত্র স্ত্রীকে নিয়ে বিশাল বাড়ীতে থাকেন কামরুল সাহেব। এমন কোনো দিন নেই দুজনের মধ্যে ঝগড়া দেখে নি বাড়ীর চাকর।  কামরুলের মতো স্ত্রীরও অধিক স্থুলাকৃতির চেহারা। খেতে খেতে এমন অবস্থা হয়েছে যে সোফা থেকে উঠতেই পারেন না। প্রত্যেক ছেলেমেয়েই থাকে বিদেশে। টাকা পাঠানো তো দূরের কথা, খোঁজ খবরও রাখে না। অবশ্য মালিকের যে পরিমাণ অর্থ তাতে সেটির প্রয়োজনও পড়ে না। নামকরা ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত ভবানীপুর শহরে। জীবনে যা চেয়েছেন তাই পেয়েছেন। শুধু পান নি পরিবার থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের ভালোবাসা। শারীরিক সমস্যার কারণে ব্যবসা ছেড়ে দিয়েছেন তিনি। সঞ্চিত অর্থ হাজার বছর খরচ করলেও হয়ত শেষ হবে না। হয়ত এটি বুঝতে পেরেই এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন মালিক। মনে মনে বাড়ীর মালিককে প্রচন্ড ঘৃণা করেন গফুর। উপায় না থাকায় সহ্য করে চলে। সহ্য করতে না পেরেই আজ গফুরের এই ক্ষুব্ধতা। সহ্য করতে পারেন নি বাড়ীর মালিকও। বস্তুত সহ্য করবার মতো ধৈর্য তৈরী হয় না এরকম ভোগবাদী মানুষদের। গলা ফাটিয়ে বললেন গফুরকে-

‘কি বললি, চোরের বাচ্চা, আর একবার বল দেখি?’ বলবার সময় কামরুলের গলার শিরাগুলি রাবারের মতো স্পষ্ট হয়ে উঠলো।

‘বললাম তো একদিনও চুরি করি নি। গরীব হলেও চুরি করা শেখায়নি আমার বাবা।’ জোরের সাথে উত্তরও দিলো গফুর।

‘ও তাই নাকি । দাঁড়া, তোকে জ্ঞান দেয়া শেখাচ্ছি।’ এই বলে অত্যন্ত উত্তেজিত হয়ে বাম হাত দিয়ে গফুরের চুলের মুঠি ধরলেন বাড়ীওয়ালা।

‘ইদানীং, বেশী বাড় বেড়েছে তোর, তাই না। মালিকের কথার উপর কথা বলিস।’ বলতে বলতে অনবরত প্রহার করতে থাকলেন গফুরের রোগা শরীরে।

‘চিৎকার শুরু করলো গফুর। প্রতিবাদ করবার সাহস পেলো না এবার। নিরুপায় হয়ে অনবরত হজম করতে থাকলো মালিকের প্রহার।’

বাসার অন্যান্য চাকর উঁকি দিয়ে দেখবার চেষ্টা করলেও মালিকের ভয়ে কাছে আসবার সাহস পেলো না কেউ। মননের গহীনে অব্যক্ত যন্ত্রণাকে যে কোনো মূল্যে মাটি চাঁপা দিয়ে আবৃত রাখতে হয় নিয়ত সবাইকে। গরীব হয়ে জন্মালে নাকি তাই করতে হয়। দীর্ঘদিন ধরে মালিকের কাছে এমন উপদেশ গিলতে গিলতে বিষয়টি অভ্যেসে পরিণত হয়েছে ওদের। তাছাড়া প্রতিদিনই কোনো না কোনো অজুহাতে চাকরকে প্রহার করা মালিকের একটি মানসিক রোগে পরিণত হয়েছে, বুঝতে পেরে সাবধানে থাকে প্রত্যেক চাকর। নিতান্ত প্রয়োজন না হলে কেউ মালিকের সামনে যায় না। তার চিৎকৃত ধ্বনি সহ্য করতে পারলো না গরীবুল্লাহ ও প্রাণগোপাল। বুকে ফেটে বেরিয়ে আসতে চাইলো ওদের হৃৎপিন্ড। কোনো দ্বিধা না করেই ভেতরে ঢুকলো অত্যন্ত দৃঢ়তায়। কামরুল সাহেবকে আগে থেকে চিনলেও এই মুহূর্তে ভয় পেল না তারা।

‘এ ভাই, তোমারা কি মানুষ না জানোয়ার। ছাড়েন কবার লাগছি, ছাড়েন।’ এই বলে গরীবুল্লাহ ও প্রাণগোপাল দুজনই মালিকের হাত থেকে ছাড়িয়ে নিলো গফুরকে। প্রচন্ড উত্তেজনা প্রত্যক্ষ হলো তাদের মাঝে। আপনাআপনি সহমর্মিতা ফুটে উঠলো ওদের চোখে মুখে।

তাদের উত্তেজনা প্রত্যক্ষ করে কিছু বললেন না মালিক। বরং হাঁপিয়ে উঠলেন তিনি। চেষ্টা করলেন তাদের চিনবার। তাদের চেহারা এবং গতিবিধি নিরীক্ষায় রাখলেন তীক্ষè দৃষ্টি।

‘তোমরা বাড়ীর মালিক, না। আগোত তোমাক তো ভালোয় মনে হইছিলো। কিন্তু তোমরা যে এত খারাপ তাক তো বুঝি নাই।’ কিছুটা থেকে আবারো তীব্র স্বরে বলতে থাকলো

‘এই গফুর ভাই আজ থাকি হামার সাথে কাজ করবে। মাটির মতো একটা মানুষ। তার উপর তোমরা আইজ যে অত্যাচার করলেন বাহে তার শোধ হামরা নিয়া ছাড়মো। বাজারের সব শ্রমিক আইজ একসাথে হবার লাগছি। তৈয়ার থাকেন।’

এই বলে গফুরকে সঙ্গে নিয়ে বাজারের দিকে হাঁটতে থাকলো গরীবুল্লাহ ও প্রাণগোপাল। পাথরের মতো শক্ত হয়ে ওদের সাথে হাঁটতে থাকলো গফুর। প্রাণগোপাল ও গরীবুল্লাহর কথোপকথন আপনাআপনি ওর শ্রবণে আঘাত করতে থাকলো। বাজারের একদম কাছাকাছি আসলো ওরা। গরীবুল্লাহর উত্তেজিত দরাজ কণ্ঠস্বর শুনতে পেয়ে জড়ো হলো বাজারের সকল শ্রমিক।

‘ওয় প্রাণগোপাল, মুখ বুজি সহ্য করি থাইকলে এমার অত্যাচার আরো বাইড়তে থাকপে, বুঝলু। এবার হামাকগুলাক কমর সোজা করি খাঁড়া হওয়া লাইগবে।’

‘ঠিক কছিস, গরীবুল্লাহ দা, তুই ঠিক কছিস। সারাজীবনে এত মাছ বেচানুং কিন্তু একটা ছায়াক মানুষ কইরবার পালুং না ট্যাকার জইন্যে। কারণটা কি আজ পর্যন্ত বুঝবার পালুং ন্যা। মোর ছাওয়াগুলার মাথা খুব ভালো আছিলোরে দাদা।’ মাথা ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে গরীবুল্লাহকে সমর্থন জানালো প্রাণগোপাল। মধ্যসত্তাভোগীর করাল গ্রাসের আধিপত্য যে তাদের এই দুদর্শার কারণ তা তারা বুঝতে পারে না। অথবা বুঝতে পারলেও নীরব থাকে। মুহূর্তেই ওদের তিনজনকে ঘিরে ধরলো প্রত্যেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। বিস্তারিত শুনবার পর সিদ্ধান্ত নিলো কঠোর প্রতিবাদের। প্রাণগোপাল ও গরীবুল্লাহর অবয়বে উপলব্ধ হলো একটি নির্ভার ভাব। যা কিছুই হোক অন্তত, আজকে একটি অন্যায়ের ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে তারা নিতান্তই অশিক্ষিত, মূর্খ এবং দরিদ্র হয়েও একটি বিদ্রোহের সৃষ্টি করতে পেরেছে। ভবিষ্যতে এই বিদ্রোহ যদি সারা দেশে বিপ্লবে রুপ নেয় তাহলেই হয়ত তথাকথিত আধুনিক রাষ্ট্রের দাসেরা মুক্তি পাবে অসহনীয় শোষণের কবল থেকে।

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev