আজ ৯ আগস্ট, আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস। জাতিসংঘ ১৯৮২ সালে সর্বপ্রথম আদিবাসীদের স্বীকৃতি দেয়। অধিকার বঞ্চিত আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করতে প্রথম ১৯৯৩ সালকে ‘আদিবাসী বর্ষ’ ঘোষণা করা হয়। ১৯৯৪ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে প্রতি বছর ‘৯ই আগস্ট’-কে ‘বিশ্ব আদিবাসী দিবস’ বা ‘আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস’ হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ১৯৯৫-২০০৪ এবং ২০০৫-২০১৪ সালকে যথাক্রমে প্রথম ও দ্বিতীয় আদিবাসী দশক হিসাব ঘোষণা করা হয়।
ভারতে প্রায় ১০ কোটি ৪০ লক্ষ আদিবাসী মানুষের বসবাস। পশ্চিমবঙ্গে ৪০টি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রায় ৬০ লক্ষ আদিবাসী বাস করেন।
সাধারণত প্রান্তিক অঞ্চলে বসবাস করা-সহ নানান কারণে বিভিন্ন দেশে আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর মানুষ এখনো বিভিন্ন মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। জোরপূর্বক আদিবাসীদের ভূমি দখল, বসতবাড়ি থেকে উচ্ছেদ, আদিবাসী নারীর প্রতি সহিংসতা বৃদ্ধি এখন আর কোন খবর নয়।

আদিবাসীদের অর্থনৈতিক অসচ্ছলতা, শিক্ষায় অনগ্রসরতা, পেশাগত বৈচিত্র্যের অভাব, ভূমিহ্রাস, অসচেতনতা ইত্যাদি বহুবিধ কারণে আদিবাসীদের উন্নয়ন থমকে গেছে অনেকটাই।
আদিবাসী ভাষা সমূহের ব্যবহার ও প্রয়োগ অত্যন্ত সীমিত। শিক্ষা ও জীবন-জীবিকার কারণে শহরে বসবাসরত আদিবাসী ও তাদের সন্তানদের নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি ব্যবহারের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এসকল নানাবিধ কারণে আদিবাসীদের ভাষা ও সংস্কৃতি আজ হারিয়ে যেতে চলেছে। স্ব-স্বাধীনতা হরণ করে তথাকথিত উন্নত সংস্কৃতির ঘেরাটোপে আনার কৌশল আদিবাসীদের স্বতন্ত্র অস্তিত্বকেই বিপন্ন করে তুলেছে।

এর সঙ্গে আছে জল জঙ্গল পাহাড়ের আদি বাসভূমি থেকে আদিবাসী মানুষদের উচ্ছেদের সরকারি, বেসরকারি পরিকল্পনা। অন্ধ্রপ্রদেশ, ঝাড়খন্ড, বিহার, ছত্তিশগড়, মহারাষ্ট্রের আদিবাসী অধ্যুষিত যে অঞ্চলকে একদা বলা হত দণ্ডকারণ্য সেখান থেকে প্রভূত খনিজ সম্পদ ও বনজ সম্পদ দেশের স্বার্থে ব্যবহার করার নামে চলছে আদিবাসী উচ্ছেদ।
অরণ্যের অধিকার থেকে আদিবাসীরা আজ বঞ্চিত। এ এক দীর্ঘ বঞ্চনার ইতিহাস যার শুরু সেই ১৮৬৫ ও ১৮৭৮ সালে লাগু হওয়া ব্রিটিশ অরন্য আইনের মাধ্যমে। একদিকে আদিবাসী বিরোধী অরন্য আইন আর এক দিকে রাম্পা, মুন্ডা, কোল, ভীল, সাওতাল আদিবাসীদের প্রতিরোধ লড়াই – চলছে সেই ব্রিটিশ যুগ থেকে। এখনও যা বহমান। তাই কোল ভীল মুন্ডা বিদ্রোহের ঐতিহাসিক চলাচল ; ধামসা মাদল শালগিরার ডাক এখনও আদিবাসী জনচেতনায় নিরন্তর বহমান। বিভিন্ন কর্পোরেট সংস্থার কাছে আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চলের জমি মূলত বক্সাইট, লোহা, মাইকা ইত্যাদির খনি ছাড়া আর কিছুই না। তার উপর ওই খনিজের ব্যবহারিক মূল্য যদি হয় ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার। এই জমি যদি আদিবাসীদের অধিকারে থাকে তবে তা ছিনিয়ে খাওয়ার রাজনীতি অর্থনীতিতে যারা পাকাপোক্তভাবে প্রতিষ্ঠিত তারা যে ঐ এলাকাগুলোকে নিজেদের মধ্যে মৌ-ভাগ করে নেবে তা বলাই বাহুল্য। এবং এটাই চলছে দেশ জুড়ে।

জমি আমার, এই জমি থেকে আমাদের উচ্ছেদ চলবেনা— এই ডাক দিয়েছিলেন বীরসা মুন্ডা, সিধু কানু। এখনও দেশের আনাচে কানাচে সেই এক ডাক ওঠে। আদিবাসী দিবস হয়তো ভবিষ্যতে এক অন্য কাহিনীর ইতিহাস হয়ে উঠবে!
খুব প্রাসংগিক মূল্যায়ন। কর্পোরেট পুঁজির আগ্রাসী থাবা আদিবাসীদের নাভিশ্বাসের কারণ, সাথে রাষ্ট্রের নির্লজ্য মদত।