এই প্রথম দেশের সর্বোচ্চ নাগরিক পদে বসলেন কোনও আদিবাসী মহিলা। তাঁর ঠিক আগে রাষ্ট্ৰপতি ছিলেন দলিত রামনাথ কোবিন্দ। তিনি ইউপিএ-র দলিত প্ৰাৰ্থী মীরা কুমারকে হারিয়ে নিৰ্বাচিত হয়েছিলেন। তখনও দলিত রাষ্ট্ৰপতি পেয়ে দেশের শোষিত, বঞ্চিত এবং পদে পদে লাঞ্চিত দলিতরা দীর্ঘদিনের সামাজিক অবিচার থেকে মুক্তির আশা দেখেছিল। কিন্তু কাৰ্যতঃ গত চার-পাঁচ বছরে দলিতদের আর্থ সামাজিক উন্নতির বদলে দলিতদের উপর সামাজিক নির্যাতন বেড়েছে বহুগুণ।
আজও আদিবাসী সাওঁতাল মহিলা দ্ৰৌপদী মুৰ্মুকে নিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের দরিদ্ৰ, যুগে যুগে বঞ্চিত আদিবাসী সমাজ স্বপ্ন দেখছে তাদের কঠিন বেঁচে থাকার কিছুটা সুরাহা মিলবে, কিন্তু আসলে একজন আদিবাসী রাষ্ট্রপতিকে সামনে রেখে কেন্দ্রের বিজেপি সরকার ও দল ভোট ব্যাঙ্কের ফায়দা তুলবে পক্ষান্তরে আদিবাসীদের জমি ও জংগলের উপর পুঁজিপতির অবাধ দখল নিশ্চিত করবে। ইতিমধ্যে বন সংরক্ষণ বিধি সংশোধন করা হয়েছে। এমনকি দেশের সর্ব্বচ্চ আদালত অন্তত ১৭টি রাজ্য থেকে ১০ লাখেরও বেশি বনবাসী উপজাতি ও অন্যান্য জনজাতি পরিবারগুলিকে উচ্ছেদের নির্দেশ দিয়েছে৷
তাছাড়া প্রশ্ন হল, বিজেপি হঠাৎ কেন আদিবাসী সমাজের এক মহিলাকে রাষ্ট্রপতি পদে বসালো। এখনও আদিবাসী সমাজের মধ্যে বিজেপির তেমন কোনও প্রভাব বা জনভিত্তি নেই। তা ছাড়া বিজেপি গোটা দেশে মহিলাদের ক্ষমতায়নের উপর বিশেষ জোর দিচ্ছে। সেদিক থেকেও বিজেপি এক ঢিলে দুই পাখি মারার চেষ্টা করেছে। কিন্তু আদিবাসী জনজাতিকে বোঝানোর চেষ্টা করছে তাদের কতটা গুরুত্ব দেয়। অন্যদিকে দেশের মহিলাদের বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করছে, তাঁরা মহিলাদের সামনের সারিতে নিয়ে আসতে কতটা আন্তরিক।
আসলে বিজেপি ভোটব্যাঙ্কের দিকে তাকিয়েই আদিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর চেষ্টা চালাচ্ছে। দ্রৌপদী মুর্মু ওড়িশার যে অঞ্চলের বাসিন্দা, সেখানকার মোট জনসংখ্যার ২৩ শতাংশ আদিবাসী সম্প্রদায় ভুক্ত। যে ঝাড়খণ্ডে দ্রৌপদী মুর্মু রাজ্যপাল ছিলেন, সেথানকার জনসংখ্যার ২৬ শতাংশ আদিবাসী সম্প্রদায়ভুক্ত। এছাড়া চলতি বছরেই রয়েছে গুজরাটে বিধানসভা নির্বাচন। সে রাজ্যের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৫ শতাংশ মানুষ আদিবাসী সম্প্রদায়ভূক্ত। গুজরাটে বিধানসভা নির্বাচনে ১৮২টি আসন। তার মধ্যে ২৭টি উপজাতি সম্প্রদায়ের জন্য সংরক্ষিত। গত বিধানসভা নির্বাচনে গুজরাটের ২৭টি সংরক্ষিত আসনের মধ্যে ১৫টিতে জয় লাভ করেছিল কংগ্রেস। বিজেপি পেয়েছিল ৯টি আসন। এবার ২৭টি সংরক্ষিত আসনে বিজেপি অধিকাংশ আসন ছিনিয়ে নিতে চায়। পরের বছর ছত্তিশগড়, রাজস্থান ও মধ্যপ্রদেশে বিধানসভা নির্বাচন। এই তিন রাজ্যের মধ্যে ছত্তিশগড়ে জনসংখ্যার প্রায় ৩৬ শতাংশ, মধ্যপ্রদেশে ১৭ শতাংশ, রাজস্থানে ১৪ শতাংশ মানুষ আদিবাসী সম্প্রদায়ের। সহজ হিসাবে বিজেপি আদিবাসী সম্প্রদায়ের আবেগকে দুর্বল করতেই রাষ্ট্রপতি পদে আদিবাসী দ্রৌপদীকে জিতিয়েছে!
এবার দেখা যাক এবার যাক আদিবাসী দ্রৌপদী রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগে তাঁর নিজের সম্প্রদায়ের প্রতি কতটা সহানুভূতিশীল ছিলেন। তিনি কি আদৌ কোনওদিন আদিবাসী নির্যাতন বা তাদের প্রতি সামাজিক বৈষম্যের বিরোধীতা করেছেন? উড়িষ্যায় বিজেডি-বিজেপি জোট সরকারের একজন বিধায়ক এবং মন্ত্ৰী থাকাকালীন উড়িষ্যা পুলিশ ১৩ জন আদিবাসীকে গুলি করে হত্যা করেছিল। কিন্তু আদিবাসী দ্রৌপদী সেই নির্মম ঘটনার প্রতিবাদে একটি শব্দ উচ্চারণ করেননি। ঝাড়খন্ডের রাজ্যপাল থাকাকালীন সে রাজ্যের বহু আদিবাসী তরুণকে মাওবাদী মাওবাদী তকমা সেঁটে গ্রেফতার করা হয়েছে, তখনও এই আদিবাসী রাজ্যপাল মুখে কুলুপ এঁটে ছিলেন। আদিবাসী দ্রৌপদী মুর্মু ঝাড়খন্ডের রাজ্যপাল থাকাকালীন তথাকথিত উন্নয়নের নামে আদিবাসীদের জমি থেকে, জঙ্গল থেকে উচ্ছেদ করা হয়েছে। তিনি কোনো প্রতিবাদ করেছেন বলে কেউ শোনেননি। আদিবাসী দ্রৌপদী যখন স্কুল শিক্ষক ছিলেন সেই সময় এক আদিবাসী স্কুল শিক্ষক সোনিসোরিকে মাওবাদী সন্দেহে পুলিশ হেফাজতে যেভাবে অত্যাচার করা হয়েছিল তা দেখে আদালতের বিচারক পর্যন্ত শিউরে উঠেছিলেন। অথচ আদিবাসী স্কুল শিক্ষিকা দ্রৌপদী ছিলেন নীরব। এবার তিনি রাষ্ট্রপতি হয়ে কি আদিবাসী মানুষের উপর অত্যাচারে সোচ্চার হবেন?
একজন আদিবাসী ক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছলেই কি তাঁর সমাজের উন্নয়ন হয় না তাদের উপর এতদিনকার সামাজিক নির্যাতন থেমে যেতে পারে। আদিবাদী বা পিছিয়ে পড়া মানুষকে ক্ষমতার শীর্ষে বসানোটা এক ধরনের চমক। ক্ষমতা দখলের রাজনীতিতে এ ধরণের চমক নতুন কিছু নয়। চরম হিন্দুত্ববাদীরা সেই পথেই পিছিয়ে পড়া সম্প্রদায়ের ভোট পাওয়ার সবার্থে নিজেদের মহানুভবতাকে হাজির করার চেষ্টা করছেন। তাতে যারা দুর্বল হবেন, আশার আল দেখবেন, তাদের সমূহ ক্ষতি। কোনও আশাই শেষ পর্যন্ত পূরণ হবে না। জঙ্গল-জমি থেকে আদিবাসী উচ্ছেদ চলতেই থাকবে। ঘটনাচক্রে দ্রৌপদী মুর্মু রাষ্ট্রপতি হওয়ার দিনই কেন্দ্র সরকার আইন এনেছে করপোরেট স্বার্থে জঙ্গল থেকে উচ্ছেদ করতে এখন আর আদিবাসীদের সম্মতিও লাগবে না। এমনিতেই দ্ৰৌপদী মুৰ্মু বিজেপি তথা আরএসএস-এর বিশ্বস্ত নেতা-কর্মী, রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর হিন্দুরাষ্ট্র নির্মাণে এখন থেকে তাঁর দায় আরও বাড়লো।