প্রচলিত বিশ্বাস এবং শস্যকাটার আনন্দোৎসবের নাম টুসু। টুসু যতটা পূজো ঠিক ততটাই পরব, যা অগ্রহায়ণ মাসের শেষ দিনে শুরু হয় ও শেষ হয় পৌষ সংক্রান্তির পুণ্যলগ্নে। সময়টা ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে আনন্দে মেতে ওঠার কেননা ‘ডালা যে তার ভরেছে আজ পাকা ফসলে’। এ যেন ফসল ঘরে এনে দেওয়ার জন্য মাটির প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের আয়োজন।
টুসু একটি লৌকিক দেবী যাঁকে কুমারী হিসেবে কল্পনা করা হয়। সাধারণত কুমারী মেয়েরা টুসু পুজোর প্রধান ব্রতী। পৌষ মাসে যখন ধান কাটা হয়, পিঠে পুলির আয়োজন চলে টুসুকে আলতা পরিয়ে সোনার খাটে হেলান দিয়ে রুপোর খাটে পা দিয়ে শুয়ে রাখা হয়। আসলে টুসু শস্য-ঐশ্বর্য্যের দেবী। তিনি দেবী হলেও জনমানসে টুসু কখনো সন্তান, কখনো সখী, কখনো যেন নিজেদেরই প্রতিভূ।
‘টুসু সিনাচ্ছেন, গা দলাচ্ছেন / হাতে তেলের বাটি / নয়ে নয়ে চুল ঝাড়ছেন / গলায় সোনার কাঠি।’

এযেন গাঁয়ের মেয়েদের মতোই গয়না, অলংকার দিয়ে সেজে নানা সাধ জাগে টুসু’ র মনে। আবার কখনো ঘরের আদরের মেয়েকে মা যখন আদর করে ডেকে তোলে, তেমনি স্নেহের সুর ঝরে পরে টুসুর গানে।
‘বেলা ওঠে ঝিকিমিকি, টুসুর ঘুমতো ভাঙে না / এখন ওঠো টুসু চেতন করো, জনমজ্বালা দিও না ‘।
এই উৎসব সাধারণত বাঁকুড়া, পুরুলিয়া ও বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমা ও তার সন্নিহিত হুগলী, বীরভূম, সিংভূমের অনেকটা অঞ্চল জুড়ে এবং ঝাড়খণ্ড রাজ্যের সাঁওতাল পরগনা, ধানবাদ, রাঁচি, হাজারীবাগ জেলার এবং ওড়িশা রাজ্যের ময়ূরভঞ্জ, সুন্দরগড়, কেন্দুঝর জেলার কৃষিভিত্তিক উৎসব। এখানে বর্ণহিন্দু ও আদিবাসী উপজাতির সমন্বয়ে জনবসতি গড়ে উঠছে। এই অঞ্চলগুলোতে মাটি যতই রুক্ষ, ঊষর ও কঙ্করময় হোক না কেন, এখানকার মানুষগুলোর মধ্যে রয়েছে অফুরন্ত প্রাণশক্তি তাই তারা নানা উৎসবকে কেন্দ্র করে আনন্দ-উপভোগে মেতে ওঠে। টুসু এখানে মানুষের কাজের সঙ্গী। রুক্ষ দেশের মাটি ছেড়ে চাষের কাজে ভাটিদেশে আসেন কিম্বা জীবিকার তাগিদে অন্য শহরে যান সখী টুসুকেও সঙ্গে ডাকেন মেয়েরা।

‘চল টুসু চল টাটা যাবো, / ধান হইলো না কি খাবো’।
টুসু নামটির উদ্ভব সম্পর্কে বিভিন্ন মত আছে। একমতে ধানের তুষ থেকে টুসু, অন্যমতে তিষ্যা বা পুষ্যা নক্ষত্র থেকে এই নাম। আরো মনে করা হয়, মধ্যপ্রাচ্যের প্রজনের দেবতা টেষুব থেকে এই নামের উদ্ভব।
একমাস ধরে পালিত হয় উৎসব। ধানের ক্ষেত থেকে এক গোছা নতুন আমন ধান মাথায় করে এনে খামারের পিঁড়িতে রেখে দেওয়া হয়। অগ্রহায়ণ মাসের সংক্রান্তির সন্ধ্যাবেলায় গ্রামের কুমারী মেয়েরা একটি পাত্রে চালের গুঁড়া লাগিয়ে তাতে তুষ রাখেন। তারপর তুষের ওপর ধান, কাড়ুলি বাছুরের গোবরের মন্ড, আলোচাল, দূর্বা ঘাস, আকন্দ-বাসক-কাচ ফুল, গাঁদা ফুলের মালা ইত্যাদি রেখে পাত্রটির গায়ে হলুদ রঙের টিপ দিয়ে পাত্রটিকে পিঁড়ি বা কুলুঙ্গির ওপরে রেখে দেওয়া হয়। প্রতিদিন সন্ধ্যাবেলায় এই পাত্রটি টুসু দেবী হিসেবে পূজিত হন।

কুমারী মেয়েরা দলবদ্ধভাবে তাদের দৈনন্দিন জীবনের সমস্যা, সুখ-দুঃখের কথা ও সামাজিক সমস্যা নিজেদের ভাষায় সুর করে বলেন। সব মেয়েরাই তখন যেন টুসু হয়ে ওঠে। গানের মধ্যেই স্পষ্ট ভাষায় ভনিতা ছাড়া মেয়েলি কলহ, ঈর্ষা, অভিলাষ, ঘৃণা ফুটে ওঠে।
দিদি তোর কাপড়ের পাড় ভালো
আলি বল্যে তাও দেখা হল্য
তোর মতো সাড়ি আছে দিদি আমারও আছে
আমি পরি না বাক্সায় আছে….
গ্রাম্য মহিলাদের এই সপ্রতিভ সৃজনশীলতার মধ্যে লুকিয়ে আছে নারী চেতনার সুপ্তবীজ। এরপর তারা দেবীর উদ্দেশ্যে চিঁড়ে, গুড়, বাতাসা, মুড়ি, ছোলা ইত্যাদি ভোগ নিবেদন করেন।
পৌষ মাসের শেষ চারদিন টুসু পালনের নাম— চাঁউরি, বাঁউড়ি, মকর ও আখান। গৃহস্থ বাড়ির মেয়েরা উঠোন গোবরমাটি দিয়ে নিকিয়ে পরিস্কার করে ফুল, মালা, আলো দিয়ে সাজায়। চালের গুঁড়ি তৈরি করে বানানো হয় নানা আকৃতির পিঠে। পিঠের পুর হিসেবে থাকে দুধের চাঁচি,তিল, নারকেল বা মিষ্টি। গুনে পরিমাণে পিঠের বহুল আয়োজন হলেও মেয়েদের গলার সুরে থাকে শ্বশুরবাড়ির কথা…
‘দিদি, সসুর ঘরের জলছ্যাকা পিঠা / আমি ভাগের বেলা পাই দুট্যা…’
দেখতে দেখতে এসে পড়ে মকর সংক্রান্তি। কোথাও কেনা হয় টুসুর মূর্তি, কোথাও বাঁশ বা কাঠের তৈরি রঙিন কাগজে সজ্জিত ভাসানের চৌদোল। ভোরবেলা প্রত্যেক টুসুদল একে অপরের টুসুর প্রতি বক্রোক্তি করে গান করেন।
আমাদের টুসু মুড়ি ভাজে চুড়ি ঝনঝন করে লো
উয়ার টুসু মুড়ি ভাজে হাতা ঠকঠক করে গো।
এবার আসে বিসর্জনের পালা— নদী বা পুকুরে টুসুকে ভাসিয়ে দিয়ে ভারাক্রান্ত মনে ঘরে ফেরার পালা।
‘তিরিশটি দিন রাখলাম মাকে
তিরিশটি ফুল দিয়ে গো
আর রাখিতে লারলাম মাকে
মকর আইলো বাদী গো—
টুসুধনকে জলে দিবো না
আমাদের মনে বড়ো বেদনা…’

টুসুর প্রানভ্রমরা এর গান। মাটির কাছাকাছি থাকা এই মানুষগুলোর সামাজিক জীবনের আশা-আকাঙ্ক্ষা, সংসারের টানাপোড়েন, ইচ্ছা পূরণের রূপ প্রতিফলিত হয় গানের মধ্যে দিয়ে।। টুসু গানে থাকে সাক্ষরতা অভিযান, পণপ্রথার বিরুদ্ধচারণ, পথ নিরাপত্তা, সমাজ সচেতনতার বার্তা, থাকে দেশের অবস্থা। এমনকি তৎকালীন মানভূম ভাষা আন্দোলনের সপক্ষে জনমত গড়ে তোলার জন্য টুসু গান ব্যবহার করা হয়েছিল। আজো মকর সংক্রান্তিতে মেঠো পথে টুসুর সুর জানান দেয় রাঢ়বঙ্গ এখানে তার বৈশিষ্ট্যকে হারিয়ে যেতে দেয়নি।
তথ্যঋণ : বাংলার ব্রতকথা — ড. শীলা বসাক, চন্দ্রা মুখোপাধ্যায়, ইন্টারনেট।
খুব ভালো লাগলো
ধন্যবাদ।
অজানা অনেক কিছু জানলাম, বাঙালি হয়েও বাংলার অনেক সংস্কৃতি থেকে অনেক দূরে, এমন সুন্দর উপস্থাপনা এর জন্য অনেক অনেক ধন্যবাদ জানাই, এই জন্যই যে হয়তো এমন সুন্দর বাংলার সংস্কৃতির স্পর্শ থেকে মৃত্যুর আগে পর্যন্ত হয়তো জানতে পারতাম না, খুব ভালো থাকবেন, এবং এমন আরো অজানা তত্ত্ব ও সংস্কৃতি আমাদের জানাবেন ????
অসংখ্য ধন্যবাদ আপনাকে এত সুন্দর একটি মতামতের জন্য।
কতো কিছু জানা গেলো। ।খুব ভালো লাগলো
থ্যাংক ইউ❤️
আমার মামাতো দিদিরা এই পুজো করতেন। খুবই ভালো লাগলো।
বেশ ভালো।
ধন্যবাদ????