বিভিন্ন দেশের শাসকরা তাঁদের বিপক্ষ দলের নেতাকে, মুক্তমনা বুদ্ধিজীবীকে, স্পষ্টবক্তা সৃজনশীল মানুষকে কারান্তরালে পাঠান তাঁদের মনোবল বিনষ্ট করার জন্য। কিন্তু সেসব মানুষ কারাবাসে বিমর্ষ না হয়ে সেখানে বসে তাঁদের মনোভাব সাদাকাগজের উপর কালো কলিতে লিপিবদ্ধ করে রাখেন। কেউ লেখেন আত্মজীবনী, কেউ লেখেন ইতিহাস, বাস্তবের পটভূমিতে কেউ লেখেন উপন্যাস। এদেরই বলে কারা সাহিত্য। কারাবাসে লেখা কিছু বইতো পৃথিবীতে বিখ্যাত হয়ে আছে। দান্তের ‘ডিভাইন কমেডি’, ভলতেয়ারের ‘হেনরিয়াদ’, জন বানিয়ানের ‘দ্য পিলগ্রিমস প্রগ্রেস’, বাট্রাণ্ড রাসেলের ‘ইনট্রোডাকশন টো ম্যাথমেটিক্যাল ফিলজফি’, হিটলারের ‘মেইন ক্যাম্প’, টম পাইনের ‘দ্য এজ অব রিজন’, নেলসন ম্যাণ্ডেলার ‘লং ওয়াক টু ফ্রিডম’, জওহরলাল নেহেরুর ‘গ্লিম্পসেস অব ওয়ার্ল্ড হিস্টি ‘ও’ডিসকভারি অব ইণ্ডিয়া’, মুজিবর রহমানের ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ — তারই উদাহরণ। এই তালিকায় এমন একটি বই আছে, যাকে আমাদের দোর্দণ্ডপ্রতাপ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বড্ড ভয় করেন। যদিও বইটি তাঁর রাজনৈতিক গুরু ও মেন্টর লালকৃষ্ণ আদবানির লেখা। এই মজার ব্যাপারটির উপর আলোকপাত করেছেন সাংবাদিক সুধেন্দ্র কুলকার্নি।
১৯৭৫ সালের ২৫ জুন ইন্দিরা গান্ধী সরকারের প্রস্তাব মতো সংবিধানের ৩৫২ ধারা প্রয়োগ করে জরুরি অবস্থা জারি করেন রাষ্ট্রপতি ফকরুদ্দিন আলি আহমদ। জয়প্রকাশ নারায়ণ, মোরারজি দেশাই, অটলবিহারী বাজপেয়ী, চন্দ্রশেখর, লালকৃষ্ণ আদবানিসহ বহু বিরোধীনেতা ও কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রুদ্ধ হয়। মানবাধিকার ক্ষুণ্ণ্ হয়। ১৯ মাস কারাগৃহে থাকার সময়কালে আদবানি যে ডায়েরি লিখেছিলেন, ১৯৭৮ সালে সেটি ‘আ প্রিজনার্স স্ক্র্যাপবুক’ নামে প্রকাশ করেন আর্নল্ড অ্যাসোসিয়েটস।
জওহরলাল নেহেরুর গণতন্ত্র সম্পর্কে ধ্যান-ধারণা পছন্দ করতেন আদবানি। সেই দৃষ্টির আলোকে তিনি ইন্দিরা গান্ধীর কাজের সমালোচনা করেছেন। জরুরি অবস্থা জারি করে ইন্দিরা কার্যত গণতন্ত্রকে হত্যা করেছেন। অন্যায় ও অগণতান্ত্রিক পদক্ষেপ নিয়ে্ তিনি সংবিধান ও আইনের দোহাই দিতেন। ঠিক যেমন করতেন জার্মানির হিটলার। ঐতিহাসিক বলেন, ‘Hitler always used to boast that he had done nothing illegal or un constitutional’. নরেন্দ্র মোদি প্রতি বছর ২৫ জুন ঘটা করে জরুরি অবস্থার কথা স্মরণ করিয়ে দেন দেশবাসীকে, গণতন্ত্র হত্যার জন্য ধিক্কার দেন কংগ্রেসকে। কিন্তু তিনিও আইন ও সংবিধানের দোহাই দিয়ে প্রতিনিয়ত হত্যা করেন গণতন্ত্রকে। মোদির রাজত্বে সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা হরণ করা হয়, সংবাদ মাধ্যমকে বশংবদ করে রাখার প্রয়াস চলে। বিভিন্ন এজেন্সিকে লেলিয়ে দেওয়া হয় বিরোধীদের বিরুদ্ধে। বিচার বিভাগের নিরপেক্ষতা ক্ষুণ্ণ করার চেষ্টা চলে।
রিপোটার্স উইদাউট বর্ডাসের তথ্যে সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতার সূচকে ২০২২ সালে ১৮০ টি দেশের মধ্যে ভারতের স্থান ১৫০। সাংবাদিকদের জন্য বিশ্বের যে ৫টি দেশ বিপজ্জনক সেগুলি হল : মেক্সিকো, আফগানিস্তান, ইয়েমেন, ভারত ও পাকিস্তান। অথচ মোদি নাকি সরকারের সমালোচনা পছন্দ করেন। ২০১৮ সালের ১৮ এপ্রিল একটি টুইটে তিনি বলেছিলেন : ‘I want this Govt. to be criticized’, কেননা ‘criticism makes democracy strong’ .প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যে অনুপ্রাণিত হয়ে ‘দৈনিক ভাস্কর’, ‘ভারত সমাচার’, ‘নিউজ ক্লিপ’ যেই সরকারের সমালোচনা শুরু করল, অমনি তাদের উপর জারি হল নিষেধাজ্ঞার খ্ড়্গ।
আদবানি বলেছেন জরুরি অবস্থা জারি বা গণতন্ত্র হত্যার ব্যাপারে মনে মনে বিরক্ত ছিলেন বহু কংগ্রেসী নতা ও কর্মী। কিন্তু ইন্দিরার মুখের উপর কথা বলার সাহস ও মেরুদণ্ড তাঁদের ছিল না। সেই একই অবস্থা কি এখন আমরা দেখছি না? মোদি-শাহ জুটিই রাজত্ব চালাচ্ছেন, নীতি নির্ধারণ করছেন, অন্যদের প্রশ্ন করার অধিকার নেই ‘ইউ আর নট টু কোশ্চেন হোয়াই’। নোটবন্দির কথা ভাবুন। মন্ত্রীসভার বহু সদস্য এ ব্যাপারে কিছু জানতেন না, জানতেন শুধু তিনজন।
ইন্দিরা গান্ধীর ছিল ঘোষিত জরুরি অবস্থা, আর মোদির আমলে দেখা যাচ্ছে অঘোষিত জরুরি অবস্থা। মুম্বাইএর আইনজীবী ইন্দিরা জেসিং বলেছেন ঘোষিত জরুরি অবস্থার বিরুদ্ধে লড়াই করা যায়, আদালতের শরণাপন্ন হওয়া যায়। কিন্তু মোদির জরুরি অবস্থা অঘোষিত এবং দৃশ্যত অদৃশ্য, এটা ‘much more subtle, affecting every sector of society, of Govt., of states.’ হতাশ হয়ে জেসিং বলেন, ‘I cannot fight an undeclared emergency.’
তাই বলছিলাম আদবানির জেলখানার ডায়েরি একটি আয়না। যে আয়নায় মোদি তাঁর নিজের মুখ দেখতে পান। হিটলারের মুখের সঙ্গে, জরুরি অবস্থার পথপ্রদর্শক ইন্দিরা গান্ধীর মুখের সঙ্গে তাঁর নিজের মুখের মিল খুঁজে পান তিনি। তাই আদবানির এই বইটিকে মোদি এড়িয়ে যান। শুধু বই কেন, তিনি আদবানিকেও ছেঁটে বাদ দিতে দ্বিধা করেন না। অথচ গুজরাট দাঙ্গার সময় অটলবিহারী বাজপেয়ী যখন মোদির উপর প্রচণ্ড বিরক্ত, তখন তাঁকে রক্ষা করেছিলেন লালকৃষ্ণ আদবানিই। পৃথিবীর সব ফ্যাসিস্টরা ‘আত্মরতির অন্ধকারে কাটায় দিন।’ আত্মরতির অন্ধকারে থাকতে থাকতে তিনি হয়ে ওঠেন একনায়ক। গীতায় কৃষ্ণ যেমন অর্জুনকে বলেছিলেন তেমনি তিনি মানুষকে বলেন, ‘সর্ব ধর্মান পরিত্যজ্য মামেকং শরণং ব্রজ’; সব ধর্ম পরিত্যাগ করে শুধু আমাকেই স্মরণ করো, আমি তোমাদের সব সমস্যা, সব পাপ থেকে উদ্ধার করব, ‘অহং ত্বাং সর্বপাপেভ্যো মোক্ষয়িষ্যামি মা শুচঃ’।
লেখক সিনিয়র ফেলোশিপপ্রাপ্ত গবেষক