| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

বাংলা সাহিত্যে নন্দনতত্ব : বিমূর্ত চেতনায় আত্মলীন (দ্বিতীয় পর্ব) : স্বপনকুমার মণ্ডল

Reporter
স্বপনকুমার মণ্ডল / ১২৯০ জন পড়েছেন
আপডেট মঙ্গলবার, ৭ ডিসেম্বর, ২০২১

শিল্প-সাহিত্যের উদ্দেশ্য হিসাবে কলাকৈবল্যবাদী মতবাদটি স্বাভাবিকভাবেই বিতর্কের পরিসরে প্রসারিত হয়। সেখানে গ্রহণে-বর্জনের মধ্যেও সৌন্দর্যচেতনায় শৈল্পিক সত্তার স্বরূপ নির্ণয়ের অবকাশ উঠে আসে। তাতেই ইতালির দার্শনিক বেনোদাত্ত ক্রোচের ভূমিকা স্মরণীয় হয়ে ওঠে। তাঁর মাধ্যমে বিশ শতকে নন্দনতত্বের চর্চার পরিসর নতুনমাত্রা লাভ করে। তিনি কলাকৈবল্যবাদী মতবাদকে সমর্থন জানিয়েও তা থেকে সরে আসেন। অবশ্য তাতে সত্য বা মঙ্গলের যোগ নেই, আছে কল্পনার প্রকাশ নিয়ে স্বতন্ত্র মূল্যবোধ। সেখানে ক্রোচে কান্টেরও সমালোচনা করেছেন। তাঁর মনে হয়েছে শিল্পসৃষ্টির জন্য কান্ট বিশুদ্ধ কল্পনার স্বরূপ উপলব্ধি করতে পারেননি। কাণ্টের কাছে কল্পনা অনুভবের বিষয় (facts of sensation)। সেখানে শিল্পসৃষ্টির কোনো একক বৃত্তির কথা উঠে আসেনি। অন্যদিকে কলাকৈবল্যবাদীদের শিল্পীর প্রকাশ নিয়ে Impression ও Expression-এর চেতনার আলোর মধ্যেই ক্রোচের নন্দনতত্ব স্বতন্ত্র হয়ে উঠেছে। শিল্পী প্রকৃতির রূপসুধাকে হুবহু Express বা রূপায়িত করে না। মনে তার যে Impression বা ছাপ ফেলেছে, তাই শিল্পীর প্রকাশের মূলধন। প্রকৃতির রূপের অপূর্ণতা বা দোষত্রুটিকে মনের মাধুরী দিয়ে পরিহার করে শিল্পী যা প্রকাশ করেন, তার সঙ্গে প্রকৃতির বাহ্যিক রূপ নবরূপ লাভ করে। অবশ্য এরূপ তত্বে কোনো নতুনত্ব নেই। এরিস্টটলের অনুকরণ তত্বেই তার পরিচয় বর্তমান। মনের রঙে রাঙানোর কথা রোমাণ্টিক সাহিত্যতত্বেও উঠে এসেছে।

অন্যদিকে ক্রোচেও এবিষয়ে সহমত পোষণ করেও স্বতন্ত্র অভিমুখে অগ্রসর হয়েছেন। তাঁর মতে, Impression অনুভূতিসাপেক্ষ। সেক্ষেত্রে একই জিনিস একেক জনের কাছে একেক রকম মনে হয়। তার মূলে আছে Intuition বা স্বজ্ঞা বা প্রতিভান। এজন্য Impression যখন Intuition বা স্বজ্ঞায় রূপান্তরিত হয়, তখন তা মনের মধ্যেই Express বা প্রকাশে মূর্ত হয়ে ওঠে। সেক্ষেত্রে ছবি আঁকা, গান গাওয়া বা কথা বলা এগুলি আর্টের বাইরের জিনিস। সুন্দর ছবি, ভাস্করের মূর্তি বা সঙ্গীত শিল্প নয়। তাঁর কাছে আর্ট বা শিল্প হল মনের গহনে যে সৌন্দর্যানুভূতি হল, তারই অভিজ্ঞতালব্ধ আনন্দ। Intuition- Impression-ই আর্টের প্রাণ। সেখানে  এই Intuition- Impression তত্বের মাধ্যমে ক্রোচে তাঁর নন্দনতত্বের ভিতকে স্বতন্ত্র করে তুলেছেন। সেখানে ‘বুদ্ধি’ (intellect) জাত বৌদ্ধিক জ্ঞান বা Logical Knowledge নয়, ‘কল্পনা’(imagination)জাত কল্পনাত্মক জ্ঞান বা intuitive knowledge-ই শিল্পকলার সঙ্গে সম্পৃক্ত। প্রথমটির ‘সামান্য’ জ্ঞানে যেখানে সংজ্ঞা (concept) সৃষ্টি করে, দ্বিতীয়টির ‘বিশেষ’ জ্ঞানে সেখানে প্রতিরূপ (image) সৃষ্টি হয়। এজন্য intuitive knowledge বিশেষ শ্রেণির জ্ঞানক্রিয়ায় শিল্পকলার উপস্থিতির কথা বলেছেন ক্রোচে। এজন্য তাঁর মতে, ‘Art is intuition’ এবং সেখানে intuition আর Expression সমার্থক হয়ে যায়। ‘Art is expression’-এ ক্রোচের শিল্পের সংজ্ঞা নবরূপ লাভ করে। অন্যদিকে তাঁর শিল্পের স্বরূপে কল্পনাকে আধার করেছেন, পরিকল্পনার কোনো স্থান নেই। সেদিক থেকে ক্রোচের শিল্পচেতনায় নব উন্মেষশালী বৌদ্ধিক প্রভাব বা logical activity অস্বীকৃত হয়েছে। তাঁর মাধ্যমেই বিশ শতকে Aesthetics তত্বটি নতুন রূপে ক্রমবিকশিত হয়। তাঁর বইয়ের নামও ‘Aesthetics’। সেদিক থেকে বোমগার্টেনের প্রদেয় নামটিই সুদীর্ঘ সময়ান্তরে ক্রোচে এসে স্বনামধন্য হওয়ার অবকাশ পেল। অথচ তার প্রভাব বাংলা সাহিত্যে কোনো রকম বিস্তার তো করতেই পারেনি, উজ্জীবিতও তো দূরস্থান ! অবশ্য যেখানে কলাকৈবল্যবাদের প্রভাবই সেখানে নিবিড়তা লাভ করেনি, সেখানে নন্দনতত্বের প্রত্যাশা না জাগানোই স্বাভাবিক।

উনিশ শতকে পাশ্চাত্য শিক্ষা-সংস্কৃতির আলোয় আধুনিক বাংলা সাহিত্যের পথচলা। সেখানে পাশ্চাত্য সাহিত্যের রূপরীতি ছায়া যেমন কায়া বিস্তার করেছে, তেমনই প্রাচ্য ও লোকায়ত ঐতিহ্যও তাতে সংযুক্ত হয়েছে। অবশ্য পাশ্চাত্য দৃষ্টিভঙ্গি সেক্ষেত্রে প্রাধান্য লাভ করেছে। সেদিক থেকে পাশ্চাত্য ভাবধারায় পুষ্ট বাংলা সাহিত্যে কলাকৈবল্যবাদের প্রভাব বিস্তার অস্বাভাবিক ছিল না। ইতিমধ্যে রোমান্টিক সাহিত্যের প্রভাবে কবিকণ্ঠে স্বকীয় চেতনার পরিসর বাংলা সাহিত্যেও লক্ষণীয়। বাংলা সাহিত্যের প্রথম আধুনিক কবিকণ্ঠ মাইকেল মধুসূদন দত্তের মধ্যে তা প্রতীয়মান। তার আগে ঈশ্বর গুপ্তের কবিচেতনায় কবিতা ছিল পাকা ফলের মতোই উপাদেয়, ‘কবিতা কমলা কলা পাকা যেন কাঁদি/ইচ্ছা হয় যত পাই পেট ভরে খাই।’ তাতে তার কল্পনার বাস্তবায়ন প্রসারিত হলেও কল্পনায় অসীমের হাতছানি ছিল না। মাইকেল মধূসূদন দত্তের নামীয় পরিসরেই তাঁর মিশ্র অস্তিত্ব প্রতীয়মান। সেখানে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের অপূর্ব মিলনসেতু বর্তমান। পাশ্চাত্য রূপরীতিই শুধু নয়, তার ভাবৈশ্বর্যকেও মধুসূদন আত্মস্থ করে প্রাচ্যের সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছিলেন। সেখানে তাঁর আগমনে বাংলা সাহিত্যের ‘অলীক কুনাট্য রঙ্গে’ মজে থাকা বাঙালির ‘তনু মনঃ’ ভালো রাখার প্রতিশ্রুতি উঠে আসে। শুধু তাই নয়, মধুসূদনের সাহিত্যচর্চায় যেভাবে দেশহিতৈষণার পরিচয় উঠে এসেছে, তাতে আপাতভাবে তাঁর মধ্যে ‘জীবনের জন্য শিল্প’-এর দাবিই মূর্ত হয়ে ওঠে।

‘মেঘনাদবধ কাব্য’-এর প্রথম খণ্ড প্রকাশের পর বিদ্যোৎসাহিনী সভা থেকে সংবর্ধিত হওয়ার পর তাঁর ভাষণে সেকথা তিনি অকপটে জানিয়েছেন। ‘স্বদেশের উপকার করা মানবজাতির প্রধান ধর্ম্ম’-এর প্রতি তাঁর গভীর আস্থা ঝরে পড়েছে। শেষে তিনি জানিয়েছেন, ‘কিন্তু জগদীশবরের নিকট আমার এই প্রার্থনা যেন আমি যাবজ্জীবন আপনার এবং এই সামাজিক মহোদয়গণের এইরূপ অনুগ্রহভাজন থাকি।’ সেক্ষেত্রে সামাজিক দায়বদ্ধতাই তাঁর সাহিত্যের অভিমুখ ছিল আজীবন। অথচ তাঁর মনেও রোমান্টিক কবিসত্তার পরিচয় বর্তমান। সনেটের মধ্যে মনের অর্গল খুলে বলার অবকাশে তাঁর ‘কবি’ সনেটে তাঁর কবিসত্তাও মূর্ত হয়ে উঠেছে।  সেজন্য তিনি ‘ঘটকালি করি’  ‘শবদে শবদে বিয়া দেয় যেই জন’ তাঁকে কবি মানেননি, মেনেছেন যাঁর হৃদয়ে কল্পনাসুন্দরীর অধিষ্ঠান হয়, ‘সেই কবি মোর মতে, কল্পনা সুন্দরী/যার মনঃ-কমলেতে পাতেন আসন্‌….’। সেদিক থেকে মধুসূদনের কবিসত্তায় রোমান্টিক কল্পনার প্রকাশ সত্যসুন্দর হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে তাঁর সাহিত্যে শিল্পের জন্য শিল্পের প্রভাব সক্রিয় না হওয়াই স্বাভাবিক। বাংলা সাহিত্যে তার অবকাশও ছিল না। সেখানে রোমান্টিক চেতনা নানাভাবে ছড়িয়েছে। অথচ সাহিত্যের অভিমুখটি শিল্পসর্বস্ব হয়ে ওঠেনি। গীতিকবিতার একক চলনেও তাঁর পরিচয় পাওয়া যায় না। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ভোরের পাখি’ কবি বিহারীলাল চক্রবর্তী থেকে অক্ষয়কুমার বড়াল প্রমুখ গীতিকবিদের কবিসত্তাতেও কলাকৈবল্যবাদের পরিচয় নেই। শূন্য দৃষ্টি থাকলেও তাঁদের পা ছিল মাটিতে। আর কবিমানসে ছিল জীবনের প্রতি তীব্র অনুরাগ। সেদিক থেকে ‘শিল্পের জন্য শিল্প’-এর প্রভাব উনিশ শতকের আধুনিক পরিসরেও সক্রিয় হতে পারেনি। অন্যদিকে শিল্প-সাহিত্যের মানবিক মুখও উনিশ শতকের আধুনিকতাকে নিবিড় করে তোলে। পাশ্চাত্য মানবতাবাদী বিভিন্ন ভাবধারা সেক্ষেত্রে বাংলা সাহিত্যকে প্রভাবিত করেছে। সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সাহিত্যভাবনাতেই তা প্রতীয়মান। তাঁর মাধ্যমেই আধুনিক বাংলা সাহিত্যের স্বরূপ প্রথম উন্মোচিত হয়েছে। আর সেখানেই কলাকৈবল্যবাদের পরিচয় যেমন উঠে এসেছে, তেমনই তার অস্তিত্বের সীমাবদ্ধতাও প্রকাশিত হয়েছে।

বঙ্কিমচন্দ্র উনিশ শতকের আলোয় আলোকিত সাহিত্যিক। পাশ্চাত্য শিক্ষা-সংস্কৃতির পরশে তিনি পুষ্ট হওয়ার অবকাশ পেয়েছিলেন। তাঁর জীবনাদর্শ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে পাশ্চাত্যের প্রগতিশীল চিন্তা-চেতনার ভূমিকা সক্রিয় হয়ে উঠেছিল। সেখানে এদেশে সমাগত পাশ্চাত্য মানবতাবাদী চিন্তকদের প্রতি তাঁর আকৃষ্ট হওয়াটা অত্যন্ত স্বাভাবিক মনে হয়। জেরামি বেন্থামের হিতবাদ, আগস্ট কোঁতের ধ্রুব্বাদ বা জন স্টুয়ার্ট মিলের দর্শনের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন তিনি। শুধু তাই নয়, ম্যাথু আর্নল্ড, চার্লস ডারুইন, হার্বাট স্পেন্সার প্রমুখের মতবাদেও তিনি সুপরিচিত ছিলেন। অবশ্য সেগুলির সবই তিনি গ্রহণ করেছেন, বা মেনে নিয়েছেন, তা নয়। তাঁর স্বকীয় নীতি-আদর্শ গড়ে তোলায় সহায়কের ভূমিকায় তার গ্রহণ-বর্জন ছিল অনিবার্য।

অন্যদিকে পরাধীন দেশে স্বাজাত্যবোধ জাগরণে বাংলা সাহিত্যের উন্নয়নের সদিচ্ছা তাঁর সম্পাদিত ‘বঙ্গদর্শন’-এর মাধ্যমে মূর্ত হয়ে ওঠে। স্বাভাবিক ভাবেই তার মূর্তি থেকে প্রতিমার রূপান্তরে তাঁর সাহিত্যের স্বরূপ অভিভাবকত্ব লাভ করে। আর সেখানেই বঙ্কিমচন্দ্রের সাহিত্যতত্বের পরিচয় নানাভাবে প্রকাশিত হয়েছে। ‘বাঙ্গালার নব্য লেখকদিগের প্রতি নিবেদন’ প্রবন্ধে তার পরিচয় নিবিড়তা লাভ করেছে। সেই ‘নিবেদন’-এর ১২টি নির্দেশিকার ৩নং-এ ‘জীবনের জন্য শিল্প’ মতাদর্শের বিকল্পে ‘শিল্পের জন্য শিল্প’র আদর্শ প্রকট হয়ে উঠেছে। বঙ্কিমচন্দ্রের চেতাবনি : ‘যদি মনে এমন বুঝিতে পারেন যে, লিখিয়া দেশের বা মনুষ্যজাতির কিছু মঙ্গল সাধন করিতে পারেন, অথবা সৌন্দর্য্য সৃষ্টি করিতে পারেন, তবে অবশ্য লিখিবেন। যাঁহারা অন্য উদ্দেশ্যে লেখেন, তাঁহাদিগকে যাত্রাওয়ালা প্রভৃতি নীচ ব্যবসায়ীদিগের সঙ্গে গণ্য করা যাইতে পারে।’ সেদিক থেকে সাহিত্যরচনার বিকল্প উদ্দেশ্যে ‘অথবা সৌন্দর্য্য সৃষ্টি’র বিষয়টি আপনাতেই কলাকৈবল্যবাদের আবেদনকে সক্রিয় করে তুলেছে। অথচ তার পরের নির্দেশিকাতেই বঙ্গিমচন্দ্র তা অস্বীকার করেছেন। তাঁর কথায় : ‘সত্য ও ধর্মই সাহিত্যের উদ্দেশ্য। অন্য উদ্দেশ্যে লেখনী-ধারণ মহাপাপ।’

নিবন্ধটি ‘প্রচার’-এ বেরয় ১২৯১-এর মাঘে অর্থাৎ ১৮৮৫-তে। সেদিক থেকে ১৮৭২-এ ‘বঙ্গদর্শন’-এর প্রকাশের তেরো বছর পরে বঙ্কিমচন্দ্র প্রয়োজনবোধে যেভাবে বাংলা সাহিত্যের দিগ্‌নির্দেশনা করেছেন, তার মধ্যেই সেকালের সাহিত্যের স্বরূপে যেমন কলাকৈবল্যবাদের উপস্থিতি বর্তমান, তেমনই তাতে দ্বিধা-দ্বন্দ্বের অবকাশও স্পষ্ট। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, বঙ্কিমচন্দ্র জীবনের অপরাহ্নে তাঁর শিল্পসত্তায় ধর্মীয় চেতনায় উদ্দীপ্ত হয়েছিলেন। এজন্য তাঁর সাহিত্যতত্বেও সেই ধর্মীয় পবিত্র আনন্দের যোগ নিবিড় হয়ে আসে। তার পরিচয় পাওয়া যায় বছরখানেক পরে ‘প্রচার’(১২৯২-এর পৌষ)-এ বঙ্কিমচন্দ্রের ‘ধর্ম্ম এবং সাহিত্য’ প্রবন্ধে। সেখানে ‘সাহিত্যও ধর্ম্ম ছাড়া নহে’ বলেই ক্ষান্ত হননি তিনি, ‘সাহিত্য ত্যাগ করিও না, কিন্তু সাহিত্যকে নিম্ন সোপান করিয়া ধর্ম্মের মঞ্চে আরোহণ কর’ বলে আজ্ঞা দিয়েছেন। ঈশ্বর সৃষ্ট বস্তুবিশ্বকে অনুকারী হিসাবে কবির নকলকারীর ভূমিকায় আপনাতেই সৌন্দর্যচেতনার প্রাধান্যও উবে যায়। কেননা ‘নকল কখন আসলের সমান হতে পারে না।’ তার অব্যবহিত বাক্যে আরও স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, ‘ধর্ম্মের মোহিনী মূর্ত্তির কাছে সাহিত্যের প্রভাব বড় খাটো হইয়া যায়।’ অথচ প্রথমদিকে বঙ্কিমচন্দ্রের সাহিত্যের চেতনায় রোমান্টিক সাহিত্যতত্বের অসাধারণ অভিব্যক্তিও লক্ষণীয়।

লেখক : প্রফেসর, বাংলা বিভাগ, সিধো-কানহো-বীরসা বিশ্ববিদ্যালয়, পুরুলিয়া-৭২৩১০৪।

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev