| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

বাংলা সাহিত্যে নন্দনতত্ব : বিমূর্ত চেতনায় আত্মলীন (শেষ পর্ব) : স্বপনকুমার মণ্ডল

Reporter
স্বপনকুমার মণ্ডল / ৮০১ জন পড়েছেন
আপডেট বুধবার, ৮ ডিসেম্বর, ২০২১

সাহিত্য সম্পর্কে নানা সময়ে বঙ্কিমচন্দ্র যেভাবে তাঁর মতামত প্রকাশ করেছেন, তাতে পাশ্চাত্য সাহিত্যের হালহদিশও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সেখানে যে প্রচলিত ছকবাঁধা পথ ছেড়ে সাহিত্যের নান্দনিক অভিমুখ ক্রমশ সমাজমনস্কতা কাটিয়ে স্বতন্ত্র পরিসরে সক্রিয় হয়ে উঠেছে, তা সহজেই অনুমেয়। অন্যদিকে উনিশ শতকেই শিল্প-সাহিত্যের মানবিক মুখে ঐশ্বরিক চেতনার পরিবর্তে বৃহত্তর মানবসেবায় মহত্তর মানবতায় ‘বহুজন হিতায়, বহুজন সুখায়’-এর সামাজিক দায়বদ্ধতা আধুনিক প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক চেতনায় আরও তীব্রতা লাভ করে। সেক্ষেত্রে জীবনের সঙ্গে শিল্পের যোগ বিচ্ছিন্নতাবোধে আরও নিবিড়তা লাভ করে। এজন্য রোমান্টিক সাহিত্যের আবেদনকে স্বীকার করে নিলেও তার আবেদনে সাড়া দেওয়ার ক্ষেত্রে দ্বিধা-দ্বন্দ্বের অবকাশ আপনাতেই নানাভাবে প্রকাশিত হয়েছে। বঙ্কিমচন্দ্রের ক্ষেত্রেও তা প্রতীয়মান। তাঁর সাহিত্যবিষয়ক প্রথম প্রবন্ধ ‘উত্তরচরিত’ (‘বঙ্গদর্শন’, ১৮৭২)-এর মধ্যেই ‘অতএব সৌন্দর্য সৃষ্টিই কাব্যের মুখ্য উদ্দেশ্য’ বলে বঙ্কিমচন্দ্র স্পষ্ট অনুসিদ্ধান্ত জানিয়ে দিয়েছেন। শুধু তাই নয়, সেই সৌন্দর্যচেতনাতেও রোমান্টিক সাহিত্যাদর্শ প্রকট হয়তে উঠেছে। বস্তুবিশ্বকে অনুকরণেই সেই সৌন্দর্য সীমাবদ্ধ নয়, বা তার অতিরিক্ত প্রকাশেই তা নিঃশেষ হয়ে পড়ে না, সৃষ্টিশীলতায় অবিনব রূপে সৌন্দর্য বিস্তার করে। স্বভাবানুকারী, স্বভাবতিরিক্ত থেকে সৃষ্টিকৌশলসম্পন্ন সৌন্দর্যের কথা বলেছেন বঙ্কিমচন্দ্র। যা সৌন্দর্যবিশিষ্ট তাই সুন্দরের নিদানে স্বাভাবিক ভাবে রোমান্টিক সাহিত্যাদর্শ স্বমূর্তি ধারণ করে। সেখানে মানুষের চিত্তোৎকর্ষের লক্ষ্যে যেভাবে সৌন্দর্যকে মাধ্যম করা হয়েছে, তাতে বঙ্কিমচন্দ্রের রোমান্টিক সাহিত্যাদর্শের প্রতি পক্ষপাত স্বাভাবিক মনে হবে। অথচ সেই ‘চিত্তশুদ্ধির বিধান’-এ ধর্মীয় নীতি-আদর্শের প্রাধান্য বিস্তারে সৌন্দর্যের মাধ্যমটিও প্রান্তিক হয়ে পড়ে, সাহিত্যও মানুষের জীবনের দায়বদ্ধতার শরিক হয়ে ওঠে। সেখানে বঙ্কিমচন্দ্রের আদর্শে ‘বাঙ্গালা সাহিত্য, বাঙ্গালার ভরসা’র স্বাভাবিক মনে হয়। শুধু তাই নয়, সময়ান্তরে সেই সৌন্দর্যচেতনাও জনহিতে সামিল হয়ে পড়ে। কমলাকান্তরূপী রসিক বঙ্কিমচন্দ্রের দার্শনিক প্রজ্ঞায় তার পরিচয় নিবিড় হয়ে উঠেছে।

‘কমলাকান্তের দপ্তর’ (১৮৭৫)-এর প্রথম সংখ্যাতেই নিঃসঙ্গ কমলাকান্ত জনবিচ্ছিন্নতায় সরব হয়েছেন। তাঁর চেতাবনি, ‘কেহ একা থাকিও না।’ আর সেই সূত্রেই তাঁর জীবনদর্শনের পরশে সৌন্দর্যের আলো সত্য ও মঙ্গলে একাত্ম হয়ে ওঠে। কমলাকান্তের কথায় : ‘পুষ্প আপনার জন্য ফুটে না। পরের জন্য তোমার হৃদয় কুসুমকে প্রস্ফুটিত করিও।’ সেদিক থেকে বঙ্কিমচন্দ্রের সাহিত্যতত্বে রোমান্টিক সাহিত্যের সৌন্দর্যবিলাস শেষপর্যন্ত হিতৈষী চেতনায় জীবন সমন্বিত, ধর্মীয় সত্তায় মানবমুখী। আসলে বঙ্কিমচন্দ্রের সাহিত্যতত্বের মধ্যে তাঁর জীবনবোধের ছায়া কায়ারূপ লাভ করেছে। সেখানে তাঁর মতামত গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও লক্ষ্যাভিমুখী চেতনায় নানা পরিবর্তন অনিবার্য হয়ে ওঠে। সেক্ষেত্রে রোমান্টিক সাহিত্যাদর্শ থেকে ক্লাসিক চেতনায় ফেরা বা ক্লাসিক সাহিত্যের আদর্শে রোমান্টিকের পরশ ছড়িয়ে দেওয়া সবেতেই তাঁর সন্ধানী মনের অতৃপ্তিবোধ ও স্বকীয় মনীষায় আদর্শায়নের প্রয়াস লক্ষ্যণীয়। তাঁর জীবনধর্মী সাহিত্যও তাঁর একান্ত চিন্তনের ফসল। মানবপ্রেম থেকে দেশপ্রেমে তাঁর সাহিত্য নিবিড় হয়ে ওঠে। সেখানে কলাকৈবল্যবাদের আদর্শ আপনাতেই উপেক্ষিত মনে হয়।  তাঁর ‘ধর্মতত্ব’(১৮৮৮)-এর একাদশ অধ্যায়ের ‘ঈশ্বরে ভক্তি’-তে গুরুর কথার মধ্যে বঙ্কিমচন্দ্রের স্বকীয় মননের অস্থির চলন স্পষ্টবাক্‌মূর্তি লাভ করেছে। গুরুর মুখে সেই জীবনজিজ্ঞাসা : ‘অতি তরুণ অবস্থা হইতেই আমার মনে এই প্রশ্ন উদিত হইত, “এ জীবন লইয়া কি করিব ?” “লইয়া কি করিতে হয় ?” সমস্ত জীবন ইহারই উত্তর খুঁজিয়াছি।’ স্বাভাবিক ভাবেই স্বজাত্যবোধে সক্রিয় দেশহিতৈষী বঙ্কিমচন্দ্রের সাহিত্যাদর্শে কলাকৈবল্যবাদ স্থায়ী হতে পারেনি। আর সে অবকাশ বাংলা সাহিত্যেও বিস্তার লাভ করেনি। সেক্ষেত্রে রোমান্টিক কবির মুখে শোভিত রবীন্দ্রনাথও তাঁর স্বকীয় তত্বে শুধু স্বতন্ত্র হয়ে পড়েননি, কলাকৈবল্যবাদীদের আদর্শেও একাত্ম হয়ে ওঠেননি। এজন্য বাংলা সাহিত্যে তাঁর অবিসংবাদিত অবিভাবকত্বে তার বিকাশের সম্ভাবনা সক্রিয় হতে পারেনি।

রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য চেতনায় রোমান্টিকতার পরশ নানাভাবে প্রকাশমুখর। সেখানে কল্পনাসত্যের বিস্তার ছড়িয়ে পড়েছে। তাতে বাস্তবের যোগের অভাববোধে রবীন্দ্রবিরোধিতায় কল্লোলীয় ঢেউ আছড়ে পড়েছিল যা বাংলা সাহিত্যে আধুনিকতার নবদিগন্তের সূচনা করেছিল। সেদিক থেকে রবীন্দ্রনাথের রোমান্টিক প্রকৃতি যেভাবে নেতিবাচক চেতনায় সক্রিয়তা লাভ করে, তাতে তার প্রভাবে তাঁর কলাকৈবল্যবাদের পরিচয়ও অস্পষ্ট থেকে যায়। আসলে তাঁর রোমান্টিক তত্ব পাশ্চাত্য বাহিত ভাবধারা প্রভাবিত হলেও তা যেমন স্থায়ী হয়নি, তেমন সেই তত্বের উত্তরণ সেই ভাবধারা থেকে দূরত্ব রচনা করে স্বতন্ত্রতা লাভ করেছে, তাও সাধারণ্যে অগোচরে থেকে যায়। সেখানে কবি স্রষ্টা হয়েও বিশ্বস্রষ্টার থেকে স্বতন্ত্র, আনন্দ লক্ষ্য হলেও লীলার চেতনায় তা পরিব্যপ্ত। অন্যদিকে আনন্দবাদী রবীন্দ্রনাথকে আবার কলাকৈবল্যবাদীও বলা যায় না। কেননা তাঁর সাহিত্যতত্বে ‘সহিত’ত্বে বা মিলনের মধ্যে ‘মানবপ্রকাশে’র পরিচয় নিবিড় হয়ে ওঠে যা সৌন্দর্যের বিলাসের বা কল্পনার অভিসারের আদর্শকে ঠাঁই দেয় না। সেদিক থেকে রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যতত্বে ‘শিল্পের জন্য শিল্প’-এর ভূমিকাই অস্বীকৃত হয়েছে। সেখানে বৃহত্তর ও মহত্তর চেতনায় মানুষের কল্যাণকামী চেতনা বর্তমান। ‘মানুষের ধর্ম’-এ দেহে ভিন্ন হলেও মনে ঐক্যপ্রত্যাশী মানুষের কাছে সাহিত্যের আবেদনে কল্যাণকামী মূর্তি আপনাতেই হাতছানি দিয়ে ওঠে। সেদিক থেকে রবীন্দ্রনাথের প্রভাবে বাংলা সাহিত্যে রোমান্টিক সাহিত্যের আবেদন যাও-বা বিস্তার লাভ করেছে, কলাকৈবল্যবাদে তারও অবকাশ হয়নি। অন্যদিকে প্রমথ চৌধুরীকে কলাকৈবল্যবাদী বলে অভিহিত করা হলেও তাঁর তত্বচিন্তায় জনবিচ্ছিন্ন সাহিত্যের পরিচয় আবেদনক্ষম হয়ে ওঠেনি। সেখানে সাহিত্য ফুল হলে সমাজ তার মূল। অবশ্য কবির মন সাহিত্যের উৎস হতে পারে।

অন্যদিকে সাহিত্যের সামাজিক দায় না থাকলেও বা তার লক্ষ্য আনন্দ দান করা হলেও তাতে যেমন মনোরঞ্জনের লক্ষ্য থাকে না, তেমনই তার বিষয় মূলত মানব প্রকৃতি। সেখানে সুন্দর-অসুন্দর সমান প্রাসঙ্গিক। তারফলে প্রমথ চোধুরীর সাহিত্যতত্বে শিল্পের জন্য শিল্পের মৌল ভাবনা মানবিক মুখে স্বতন্ত্র হয়ে পড়েছে। এতে তাঁর স্বরচিত তত্বে কলাকৈবল্যবাদের দেহটি স্পষ্ট হলেও তার প্রাণের পরিচয় আপনাতেই প্রভাবশালী হতে পারেনি। তাছাড়া সময়ান্তরে বিশ শতকে রবীন্দ্রবিরোধী আবহে রোমান্টিক সাহিত্যচেতনায় বাস্তবতার অভাববোধ যেভাবে বাংলা সাহিত্যে তীব্রতায় মানবমুখী চেতনা বিস্তার লাভ করে, তখন ‘শিল্পের জন্য শিল্প’ ধারণায় নেতিবাচক তীব্রতা স্বাভাবিক হয়ে আসে। শুধু তাই নয়, রোমান্টিক সাহিত্যতত্ব বিলাসী দৃষ্টিভঙ্গিবোধে যেমন উপেক্ষিত হয়ে পড়ে, তেমনই কলাকৈবল্যবাদে জনবিচ্ছিন্ন মানববিমুখতার পরিচয়টি অপ্রাসঙ্গিক মনে হয়। সেখানে সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের মতো কবিতেও সৌন্দর্যের নান্দনিক বিহার সময়ান্তরে মিলিয়ে যাই, তাঁর মানবিক আর্তিই আবেদনে সাড়া জাগায়। অন্যদিকে রবীন্দ্রোত্তর আধুনিক বাংলা সাহিত্যের চেতনায় শুধু মানবমুখী বাস্তবতাই মুখর হয়ে ওঠেনি, সময়ের দাবিতেও তার জীবনের যোগ সুনিবিড় মনে হয়। দুই বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ পরিণতিও বাংলা সাহিত্যকে আরও জীবনঘনিষ্ট করে তুলেছে। মার্ক্সবাদী চেতনা থেকে প্রগতিশীল চিন্তার ধারায় বাংলা সাহিত্যের অভিমুখ শুধু ‘জীবনের জন্য শিল্প’-তেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, এস ওয়াজিদ আলীর ভাষায় ‘আর্ট ফর হিউম্যানিটি’স সেক’-এ উন্নীত হয়েছে। সেখানে রবীন্দ্রোত্তর আধুনিক কবিকণ্ঠে মানুষের সমস্যাই প্রাধান্য লাভ করেছে।

স্বয়ং জীবনানন্দ দাশ তাঁর ‘কেন লিখি’র কথায় মানুষের সমস্যা নিরসনের উপায় বা তা উত্তরণের দিশা না দিলেও সেই সমস্যাকে তুলেধরার কথা উপেক্ষা করেননি। তাঁর কথায়, ‘কবিতার ঐতিহ্যের সংস্পর্শে এসে বুঝে নিতে পারা যায় যে কবিতা মানুষের জীবনের কল্যাণমানসকে অপরোক্ষ ভাবে চরিতার্থ করবার সুযোগ না দিয়ে বরং জীবনের স্বর্গ ও আঘাটা সবেরই ভয়াবহ স্বাভাবিকতা ও স্বাভাবিক ভীষণতা আমাদের নিকট পরিস্ফুট করে’। যে কবি জনমানসে প্রভাব (impression) বিস্তারের চেয়ে প্রকাশের (expression) প্রতি সনিষ্ট ছিলেন আজীবন, সেই জীবনানন্দও ‘শিল্পের জন্য শিল্প’-এ আস্থাশীল হতে পারেননি। সেদিক থেকে যেখানে কলাকৈবল্যবাদই বাংলা সাহিত্যে স্থায়ী প্রভাব বিস্তারে অসফল হয়েছে, সেখানে বেনোদাত্ত ক্রোচের নন্দনতত্বের আবেদন সচল না হওয়াই দস্তুর। তাছাড়া তত্ব হিসাবেও তার আবেদন বাংলা সাহিত্যের দরবারে দীর্ঘদিন আলোচনার বাইরেই ছিল। রবীন্দ্রনাথই তাঁর উল্লেখ করেছেন মাত্র। অবশ্য বেনোদাত্ত ক্রোচের এস্থেটিক তাঁর জীবিতকালের শেষের দিকে নিস্তেজ হয়ে পড়ে। অন্যদিকে তত্বটির আত্মলীন হওয়ার অবকাশ প্রথমাবধি সচল ছিল।

শিল্প-সাহিত্যে নন্দনতত্বের ধারণাটিতে স্বচ্ছতার অভাব বর্তমান। এজন্য তার সংজ্ঞা ও স্বরূপ নিয়ে বিতর্কের অবকাশ প্রথমাবধি সচল রয়েছে। সেখানে ‘নন্দন’-এর ‘নন্দ’-এ আনন্দের আস্বাদনে কল্পনা ও সৌন্দর্যবোধ নিয়ে শুধু মতৈক্যের অভাবই নেই, তার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠে আসে। কান্ট যেখানে কল্পনাকে ‘নন্দনতাত্বিক অভিজ্ঞতা’র সঙ্গে একাত্ম করে দেখাতে চেয়েছেন, সেখানে ক্রোচে সেই মানস কল্পনায় নিয়ন্ত্রণের পক্ষপাতী। সাধারণত কল্পনার বিস্তারে ঐশী চেতনা, ভাব্বাদী দর্শন, অধ্যাত্মবাদ থেকে শাশ্বতের বৈশ্বিক ব্যাপ্তি প্রভৃতির ভূমিকা নানা ভাবে প্রাসঙ্গিকতা লাভ করে। সীমায়ত বস্তুবিশ্বের অভাবপুরণে মননবিশ্বের অসীমের হাতছানি সেখানে কল্পনাকে উজ্জীবিত করে। বস্তুলীন সৌন্দর্য আত্মলীন বিশ্বে আপনাতেই কল্পনার ডানা মেলে। সেখানে ক্রোচের শিল্পসৃষ্টিতে প্রাকৃত ঘটনা বা বস্তুধর্মের কোনো স্থান নেই। তাঁর মতে, শিল্পকর্ম স্বজ্ঞা বা অন্তর্জ্ঞানের সাহায্যে পুষ্ট। সেই স্বজ্ঞা নিয়ন্ত্রিত কল্পনায় আবেগও সংযমী। ক্রোচের মতে, শিল্পী যতটা আবেগে অভিভূত হয়েছেন, ততটা প্রকাশ করতে পারবেন না। কোনোভাবেই তা প্রদর্শিত হবে না। সেক্ষেত্রে কল্পনার অভিব্যক্তিতে যে সংযমী প্রকৃতি বর্তমান, তাতে তার সঙ্কীর্ণ পরিসরে সৌন্দর্যের বিস্তার আপনাতেই কৃত্রিম হয়ে পড়ে। তাছাড়া তাতে বস্তুবিশ্বকে যেভাবে অস্বীকার করা হয়েছে, তাতে অভিজ্ঞতার সোপানটিতেও অস্বীকৃতি নেমে আসে। অথচ সৌন্দর্যের চেতনায় অভিজ্ঞতাই মূলাধার।

রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘মানুষের সর্ববিধ কর্মের ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে জড়িত হয়েই সৌন্দর্যবোধের প্রকাশ। আর সেক্ষেত্রে তার রূপ ও অভিজ্ঞতা দুই পার্শবমুখ হিসাবে বিবেচিত।’ মার্ক্সবাদী নন্দনতাত্বিক দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় মনে করেন, নন্দনতত্বের মূল কথা নান্দনিক অভিজ্ঞতা। অথচ সেই অভিজ্ঞতার সঞ্চয়ে বস্তুবিশ্বকে অস্বীকার করা যায় না। অন্যদিকে শুধু কল্পনাতেই মানুষের মনন তৃপ্ত হয় না, তার অতৃপ্তিবোধে মননের চলন সক্রিয় হয় ওঠে। সেখানে বৌদ্ধিক চেতনাকে অস্বীকার করে শুধুমাত্র স্বজ্ঞা বা প্রতিভান দিয়ে তাকে সীমাবদ্ধ করায় ক্রোচের নান্দনিক চেতনা স্বাভাবিক ভাবেই ভাল-মন্দ লাগা বা সুন্দর-অসুন্দরের চেতনা তাৎক্ষণিক ও সঙ্কীর্ণ হয়ে পড়ে। তাছাড়া বিশেষ মুহূর্তের সৃষ্টিকে শিল্পী আর করতে না পারলেও সময়ান্তরে সেই শিল্পীই তার মননের বিস্তারে তার আরও একাধিক মনোহর সৃষ্টিতে নিজেকে মেলেধরতে পারেন। এজন্য মানুষই সৌন্দর্যের আধার হয়ে ওঠে। অথচ ক্রোচের নন্দনতত্বে তার কল্পনা যেমন নিয়ন্ত্রিত, পরিকল্পনাও অস্বীকৃত হওয়ায় তাঁর তত্ব আধুনিক মননশীল সাহিত্যের ধারায় আপনাতেই উপেক্ষিত হয়ে পড়ে। যেখানে বিশ শতকের সূচনা থেকেই বাংলা সাহিত্যের মননের আঁতের ঘরের কারখানায় সাহিত্যের কারবার শুরু হয়েছিল, সেখানে নান্দনিক দৃষ্টির চেয়ে তার প্রায়োগিক বাস্তবতা অনেকবেশি সক্রিয়তা লাভ করে। শুধু তাই নয়, সাহিত্যের মানবমুখী চেতনার উৎকর্ষে তার নান্দনিক বিমুখতা অনিবার্য হয়ে ওঠে। তার সৌন্দর্যচেতনাতেও রয়েছে মননের সৌকর্য। সেক্ষেত্রে সেই নান্দনিক আস্বাদনে ফাঁক ও ফাঁকি অত্যন্ত স্বাভাবিক। সেদিক থেকে এস্থেটিক বা নন্দনতত্বের তাত্বিক অস্তিত্ব মূল্যায়নের ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিকতা পেলেও এবং তার প্রায়োগিক পরিসর অন্যান্য শিল্পের ক্ষেত্রে প্রসারিত হলেও আধুনিক বাংলা সাহিত্যে বিমূর্ত চেতনায় আত্মলীন হয়ে রয়েছে।

প্রবন্ধে অনুল্লেখিত তথ্যঋণ :

১। নন্দনতত্ব, সুধীরকুমার নন্দী, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পুস্তক পর্ষৎ।

২। বিশ শতকের সাহিত্যতত্ব, আফজালুল বাসার, বাংলা একাডেমী, ঢাকা।

৩। এরিস্টটলের পোয়েটিক্‌স্‌ ও সাহিত্যতত্ব, সাধনকুমার ভট্টাচার্য, দে’জ।

৪। সাহিত্য সমালোচনায় বঙ্কিমচন্দ্র ও রবীন্দ্রনাথ, সত্যেন্দ্রনাথ রায়, দে’জ।

৫। পাশ্চাত্য সাহিত্যের সমালোচনার ধারা, এস পি সেনগুপ্ত, দিপালী পাবলিশার্স।

লেখক : প্রফেসর, বাংলা বিভাগ, সিধো-কানহো-বীরসা বিশ্ববিদ্যালয়, পুরুলিয়া-৭২৩১০৪।

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev