| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

বাংলা সাহিত্যে নন্দনতত্ব : বিমূর্ত চেতনায় আত্মলীন (প্রথম পর্ব) : স্বপনকুমার মণ্ডল

Reporter
স্বপনকুমার মণ্ডল / ১৭৯২ জন পড়েছেন
আপডেট সোমবার, ৬ ডিসেম্বর, ২০২১

শিল্প-সাহিত্যের সূচনা থেকেই তার স্বরূপ নিয়ে চলে যেমন নানা মনির নানা মত, তেমনই তার উপযোগিতায় উঠে আসে রকমারি মতামত। সেখানে শিল্পরূপ থেকে শিল্পিসত্তা সবই অনায়াসে বিতর্কের রসদে পরিণত হয়। শিল্পের অস্তিত্বে যেমন সৃষ্টি বনাম নির্মাণের অবকাশ তৈরি করে, তেমনই তাতে শিল্পীর সত্তায় ঈশ্বর বনাম স্রষ্টার ভূমিকা সক্রিয় হয়ে ওঠে। শুধু তাই নয়, সেখানে শিল্পী ও শিল্পের সমন্বয়ে নীতি-আদর্শের মাঙ্গলিক চেতনার বহুমুখী সক্রিয়তায় তার নান্দনিক অভিমুখ স্বতন্ত্র আভিজাত্যে প্রকাশমুখর হতে পারেনি। সেদিক থেকে জনমানসে শিল্পকে মানবিক আদর্শে বাঁধতে গিয়ে তার নান্দদিক আবেদনও উপযোগিতার আধারে সঙ্গোপনে থেকে যায়। অবশ্য প্রকাশের স্বাধীনসত্তায় শিল্পরূপের স্বকীয় অস্তিত্বের মূলটি মননের আধারে সুগভীরে থাকলেও তার হার্দিক হাতছানির বিস্তারও প্রথমাবধি সচল ছিল। এজন্য শিল্পরূপে শিল্পীর মননের সঙ্গে হৃদয়ের যোগ নিবিড় না হলেও তার প্রকাশের অভিমুখ একেবারেই রুদ্ধ হয়ে পড়েনি। শুধু তাই নয়, সেখানে বন্ধনমুক্তির চেতনার চেয়ে তার স্বতন্ত্র অস্তিত্বের সোপানে আভিজাত্য লাভের প্রয়াস স্বাভাবিকতা লাভ করে। সময়ান্তরে নানা রূপে, নানা রঙে তার পরিচয় নানাভাবে উঠে এসেছে। শুদ্ধতায় তার চলন, বিশুদ্ধতায় তার প্রকাশ স্বাভাবিক হয়ে ওঠে।

আধুনিক সাহিত্যতত্বের আধারে তার আবেদন আপনাতেই প্রাসঙ্গিকতায় ফিরে আসে। সেখানে বিষয়ের সীমাবদ্ধতাকে প্রকাশের বহুমুখী বিস্তারে অতিক্রমের প্রয়াসই শুধু নয়, তার প্রকাশের আভিজাত্যবোধেই শিল্পরূপের আবেদনমুখর প্রকৃতি সময়ান্তরে সবুজ সজীবতা লাভ করে।  এজন্য শিল্পরূপে নীতি-আদর্শের দৃষ্টিভঙ্গিতে আসে পরিবর্তন। ‘ভঙ্গি’ প্রান্তিক হয়ে পড়ে, ‘দৃষ্টি’ শক্তি লাভ করে। শিল্পে বিষয়ের চেয়ে তার আঙ্গিকের প্রকাশের অভিমুখে সেই দৃষ্টিশক্তির সক্রিয়তায় নান্দনিক আবেদনে নন্দনতত্বের পরিসর ক্রমশ বিস্তৃত হতে থাকে। সেদিক থেকে শিল্প-সাহিত্যের নান্দনিকতাবোধে তার তত্বের পরিচয় বিশ শতকে আলোকিত হলেও তার উন্মেষ-বিকাশের পরিসরেই সে-বিষয়ে চর্চার অবকাশ তৈরি হয়েছিল। বাংলা সাহিত্যেও তার পরিচয় বর্তমান। অবশ্য নন্দনতত্ত্বের আবেদন বাংলা সাহিত্যের মুখর হওয়ার অবকাশ পায়নি। সেখানে তার বিস্তার প্রকাশের বিমুখতায় অগ্রসর হতে পারেনি। আর তা না-হওয়াটা অস্বাভাবিকও নয়। সেক্ষেত্রে কলাকৈবল্যবাদী চেতনায় বাংলা সাহিত্যের অভিমুখই যেখানে সক্রিয় হয়ে ওঠেনি, সেখানে নান্দনিকতাসর্বস্ব নন্দনতত্বের বিস্তারও অপ্রত্যাশিত মনে হয়। অথচ তার সম্ভাবনাও ছিল। এজন্য নন্দনতত্বের আধারটি একবার ফিরে দেখা প্রয়োজন।

পাশ্চাত্য ‘Aesthetics’ শব্দটি বাংলা পরিভাষায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দৌলতেই ‘নন্দনতত্ব’ হয়ে ওঠে। তিনিই প্রথম পরিভাষাটি ব্যবহার করেন তাঁর ‘আধুনিক কাব্য’ প্রবন্ধে (‘পরিচয়’, ১৩৩৯)। বাংলায় নন্দনতত্বের চর্চায় স্বনামধন্য তাত্ত্বিক সুধীরকুমার নন্দী আরও একাধিক নামের অবতারণা করেছেন। সেগুলি হল ‘রসতত্ব, শিল্পতত্ব, সৌন্দর্যতত্ব’ প্রভৃতি। বিস্তৃতি ও ব্যঞ্জনার আধারে তিনটি পরিভাষাতে শুধুমাত্র সমার্থকের অভাববোধই জেগে ওঠে না, প্রকৃতিতেও ভিন্নতর আবেদন বয়ে আনে। অন্যদিকে আরও একটি পরিভাষা উল্লেখ্য। সেটি হল ‘বীক্ষাশাস্ত্র’। সেদিক থেকে ‘নন্দনতত্ব’-এর গ্রহণযোগ্যতা আপনাতেই মুখর। ‘Aesthetics’ বা ‘নন্দনতত্ত্ব’টি দার্শনিক আধার থেকে শিল্প-সাহিত্যের পরিসরে বিস্তার লাভ করেছে। জার্মান দার্শনিক Alexander Gottilieb Baumgarten (১৭১৪-১৭৬২) ‘Aesthetics’ পরিভাষাটি ১৭৫০-এ শিল্পের তাত্ত্বিক আলোচনায় প্রথম প্রয়োগ করেন। তাঁর বইয়ের নামই ‘Aesthetica’ (১৭৫০) শুধু তাই নয়, সৌন্দর্যকে তিনি নতুন করে সংঙ্গায়িত করেন। পূর্ণতাই সৌন্দর্য। চেতনার আধারে সৌন্দর্যের পরিচয়কে বোমগার্টেন নিবিড় করে তোলেন। সেখানে তাঁর নন্দনতত্বে বোদ্ধিক জ্ঞানের পরিবর্তে শুধুমাত্র চেতনার মাধ্যমে মূল্যায়নের কথা উঠে আসে। সৌন্দর্যের চেতনায় ভালো-মন্দের আস্বাদন প্রকৃতিতে শিল্পকলার বিদ্যায় ‘Aesthetics’ নবরূপ লাভ করে। সেক্ষেত্রে পূর্ণতায় পৌঁছানোর জন্য তাঁর ত্রিতত্বে সৌন্দর্যের স্থিতি সবচেয়ে উঁচুতে। ‘Good, Truth and Beauty’-র লাভের উপায় হিসাবে নৈতিক ইচ্ছা (the moral will), যুক্তি (the reason), চেতনার (the sense) কথা উঠে আসে। সেদিক থেকে শিল্পরূপের মূল্যায়নে চেতনার আলোয় সৌন্দর্যের নান্দনিক ভূমিকা আপনাতেই গুরুত্ব লাভ করে।

অবশ্য বোমগার্টেনের ‘Aesthetics’ ধারণায় নান্দনিক চেতনার অপূর্ণতাবোধে তাঁর অগ্রদূতের ভূমিকাটি নিয়ে বিতর্কের অবকাশ তৈরি হয়েছিল। বিশ শতকে যাঁর মাধ্যমে এস্থেটিকের ধারণাটি উচ্চকিত হয়ে উঠেছে সেই বেনোদাত্ত ক্রোচেই বোমগার্টেনের পথিকৃতের ভূমিকাটি অস্বীকার করেছেন। তাঁর মতে জামবাতিস্তা ভিকোই প্রথম এস্থেটিক জগতের স্বাতন্ত্র প্রদান করেন এবং তাঁর ‘নব বিজ্ঞান’বা ‘সায়েঞ্জা নুয়োভা’ (১৭২৫) থেকেই তার যাত্রা শুরু হয়েছে। সেক্ষেত্রে বোমগার্টেনে সৃজনী কল্পনার (Creative imagination) স্বতন্ত্র স্বীকৃতির অভাবকেই ক্রোচে দায়ী করেছেন। সেদিক থেকে নামীয় অস্তিত্বে বোমগার্টেনের স্বীকৃতি নিয়ে বিতর্কের অবকাশ না থাকলেও তাঁর তত্ব নিয়ে সমালোচনার পরিসর বিস্তৃতি লাভ করে। অবশ্য অষ্টাদশ শতকে শিল্পসাহিত্যের স্বরূপ নিয়ে যে জোয়ার এসেছিল, তাতে বোমগার্টেনের নন্দনতাত্ত্বিক তত্বকে উপেক্ষা করাও সম্ভব হয়নি। বিশেষ করে ইমানুয়েল কাণ্ট তাঁকে প্রথমে অস্বীকার করলেও নয় বছর পরে তাঁর ‘Critique of Judgment’ (১৭৯০)-এ তা গুরুত্ব লাভ করে। অন্যদিকে কাণ্ট নন্দনত্বের ধারণাটিকে স্বচ্ছ করায় এগিয়ে আসেন। তাঁর মতে, শিল্প স্বগুণেই সুন্দর, আধারের জন্য নয়। ঘোড়ার মাঠে দৌড়ানোর মধ্যে মাঠের আধারের জন্য ঘোড়ার সৌন্দর্য নয়, মাঠ নিরপেক্ষ সৌন্দর্যই ঘোড়াতে বর্তমান। সেই সৌন্দর্যচেতনায় রয়েছে ‘disinterested satisfaction’। এতে বিজ্ঞান, নীতি এবং প্রয়োজনবোধের কোনো সম্পর্ক নেই। সেদিক থেকে তত্বগত ভাবে এস্থেটিকের স্বরূপ চর্চার পরিসরে এলেও তার শৈল্পিক প্রকাশ তখনও অধরা মাধুরী।

আসলে আধুনিকতার সোপানে শিল্প-সাহিত্যের বৈচিত্রমুখী বিকাশের পাশাপাশি তার স্বরূপ নিয়ে তাত্ত্বিক আলোচনার পরিসর আপনাতেই বিস্তার লাভ করেছে। অথচ তা যতক্ষণ শিল্পরূপের মাধ্যমে আবেদনক্ষম না হয়ে ওঠে, ততক্ষণ তার পরিসর অনালোকিতই থেকে যায়। সেখানে তত্বের চেয়ে প্রয়োগের আবেদন মুখর হয়ে ওঠে। অষ্টাদশ শতকের শেষে ‘Lyrical Ballads’(১৭৯৮)-এর মাধ্যমে রোমাণ্টিক সাহিত্যের আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে তত্ব ও তার প্রয়োগের অবকাশে সাহিত্যতত্ব হিসাবে তার আবেদন নিবিড়তা লাভ করে। অথচ ক্লাসিক সাহিত্যের বিপ্রতীপেই রোমান্টিক সাহিত্যের তত্বটি সংগুপ্ত ছিল। সেদিক থেকে নন্দনতত্বের প্রয়োগের অভাব স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। আর তা ছাড়া তার অভিমুখ শিল্প-সাহিত্যের স্বতন্ত্র স্বরূপে। সেখানে সৌন্দর্য চেতনাই তার নিদান। সেক্ষেত্রে শিল্প-সাহিত্যের সত্য-সুন্দরের যুগলমূর্তির রূপটি তখন সমান সক্রিয়। ঐশ্বরিক জগৎ থেকে সরে এসে স্বকীয় বিশ্বে বিচরণ করলেও রোমান্টিক সাহিত্যের মধ্যেও সত্যসুন্দরের প্রতি অনাস্থা আসেনি, বরং সেখানে সত্য-সুন্দর হরগৌরীয় একাত্মতাই প্রতীয়মান। শুধু তাই নয়, রোমাণ্টিক কবিদের মধ্যেও দৈবী অনুপ্রেরণায় বিশ্বাস ছিল। শেলীতে যেখানে সত্যম-শিবম-সুন্দরম চেতনা বর্তমান, সেখানে সুন্দরের পূজারী কীটস ছিলেন শাশ্বত অবিনশ্বর সৌন্দর্যের উপাসক। তাঁর কাছে সত্য ও সুন্দর পারস্পরিক সত্তায় অবিচ্ছিন্ন। সেদিক থেকে রোমাণ্টিক সাহিত্যের স্বরূপে ইন্দ্রিয়জ মুগ্ধতাবোধে স্বাভাবিকভাবেই আধার নিরপেক্ষ সৌন্দর্যের আবেদন স্বমূর্তি ধারণ করেনি। সেখানে কাণ্ট কথিত ‘disinterested satisfaction’-এর অবকাশ নেই। অন্যদিকে নন্দনতত্বের অভিমুখে শিল্প-সাহিত্যের স্বরূপে আস্বাদনের বিষয়টি প্রাধান্য লাভ করায় তার মূল্যায়নে নতুন দিক সূচিত হলেও প্রায়োগিক ক্ষেত্রে প্রভাবশালী হতে পারেনি। বিশেষ করে শিল্প-সাহিত্যের উদ্দেশ্যের ক্ষেত্রে সেই তত্বের ভূমিকা সক্রিয় না হওয়াই স্বাভাবিক। অথচ তার মধ্যে নতুন অভিমুখ রচনার রসদ ছিল। এজন্য উনিশ শতকে শিল্প-সাহিত্য যত বাস্তবানুগ ও মানবিক অভিমুখে সক্রিয় হয়েছে, ততই তার স্বতন্ত্র পরিসর সক্রিয় হয়ে উঠেছে। তারই ফসল ‘Art for art’s sake’ বা ‘কলাকৈবল্যবাদ’।  এই ‘কলাকৈবল্যবাদ’ নন্দনতত্বের অভিমুখে শিল্প-সাহিত্যের স্বরূপে সৌন্দর্যে আধারিত স্বতন্ত্র ধারাকে প্রকট করে তোলে।

‘কলা হি কেবলম্‌’ তার আসল ও একমাত্র উদ্দেশ্য। ফ্রান্সের শিল্পী ও সাহিত্যসমালোচক থিওফিল গোতিয়ে (Theophile Gautier) তাঁর উপন্যাস ‘Mademoiselle de Muupin’(১৮৩৫)-এর ভূমিকায় মতবাদটি প্রচারের আলোতে নিয়ে আসেন। ১৮৪৫-এ ফ্রান্সের ভিক্টোর কুঁজা (Victor cousin) তাঁর ‘Revue des Mondes’ রচনায় ‘L’art pour L’art’কথাটি ব্যক্ত করেন যার থেকেই ‘Art for art’s sake’-এর জন্ম হয়েছে। শিল্পের জন্যই শিল্প মতবাদটির মধ্যে শিল্প-সাহিত্যের সঙ্গে মানুষের মাঙ্গলিক যোগের বিষয়টি অস্বীকৃত হয়ে পড়ে। শুধু তাই নয়, সেখানে জীবনের উদ্দেশ্যে বা প্রয়োজনে শিল্প-সাহিত্যের যোগও নিঃস্ব হয়ে যায়। বিশুদ্ধ সৌন্দর্যের আলোকে শিল্প-সাহিত্যের স্বতন্ত্র স্বরূপ তাতে নতুন মাত্রা লাভ করে এবং তার প্রভাব দেশান্তরে ছড়িয়ে পড়ে। ইংল্যাণ্ডের ভিক্টোরিয়ান নীতি-আদর্শের বিরুদ্ধে কলাকৈবল্যবাদ সক্রিয়তা লাভ করে। এভাবে  ফ্রান্সের বোদলেয়ার, আমেরিকার এড্‌গার অ্যালান পো, ইংল্যাণ্ডের ওয়াল্টার পেটার, অস্কার ওয়াইল্ড, ব্রাডলে, হুইসলার এবং ইতালির বেনোদাত্ত ক্রোচে প্রমুখ এই আন্দোলনের শরিক হয়ে ওঠেন। শিল্প-সাহিত্যের স্বরূপ নিয়ে দ্বিমতের অবকাশে ‘শিল্পের জন্য শিল্প’ মতবাদটি বিকল্প তত্ব হিসাবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। অথচ তার আধারে নন্দনতাত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি সক্রিয় হয়ে উঠেছে।

শিল্প-সাহিত্যের স্বতন্ত্র পরিসরে নন্দনতাত্বিক চেতনা বিস্তার না হলেও তার পরিসর যে প্রকারন্তরে আবেদনক্ষম হয়ে উঠেছিল, তার পরিচয় কলাকৈবল্যবাদী মতবাদেই বর্তমান। সেখানে কাণ্টের শিল্পে ‘Purposiveness without purpose’ বিষয়টি আপনাতেই প্রকট হয়ে ওঠে। ‘Aesthetic Attitude’ বা নন্দনতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গিতে ‘উদ্দেশ্যহীন উদ্দেশ্য’ই সক্রিয়তা লাভ করে। সেদিক থেকে কলাকৈবল্যবাদী তত্বে শিল্প-সাহিত্যের স্বরূপের উদ্দেশ্যগত বিশেষত্বেই তার সৌন্দর্যচেতনার প্রাধান্যের বিস্তারে যেমন বিতর্কের পরিসর শ্রীবৃদ্ধি লাভ করে, তেমনই তত্বের বিকল্পের আধারে তার স্বতন্ত্রতা ক্রমে গ্রহণযোগ্যতা লাভ করলেও শৈল্পিক সত্তায় আবেদনক্ষম হয়ে ওঠেনি। শিল্পকে শিল্পের উদ্দেশ্যে বাধঁতে গিয়ে তার সৌন্দর্যসর্বস্বতায় সত্য ও মঙ্গলের যোগ ছিন্ন হয়ে পড়ে। আপাতভাবে শিল্প-সাহিত্যের প্রকাশে সৌন্দর্যের চেতনা কুসুমিত হলেও তার সত্তায় সত্য ও নৈতিকতায় মঙ্গলের চেতনা আপনাতেই আবেদনক্ষম হয়ে ওঠে। সেখানে শুধু মাত্র শিল্পের উদ্দেশ্যকে চরিতার্থ করতে গিয়ে তার অন্যদুটিকে অস্বীকার করার মধ্যে মূল্যবোধের অভাবে স্বাভাবিক ভাবে বিতর্ক তৈরি করে। তাতে শিল্প-সাহিত্যের সঙ্গে মানবিক যোগ শিথিল হয়ে পড়ে। শিল্পের ব্যবহারিক মূল্যই সেখানে উপেক্ষিত। শুধুমাত্র সৌন্দর্যের বিলাসে তার সত্য সত্তায় স্বেচ্ছাচার নেমে আসে, নীতি-আদর্শের অভাবে মাঙ্গলিক চেতনা লুপ্ত হয়ে যায়। স্বাভাবিক ভাবেই তাতে শিল্পের সঙ্গে জীবনঘনিষ্ট চেতনার দ্বার রুদ্ধ হয়ে পড়ে। সেক্ষেত্রে যাঁরা কলআকৈবল্যবাদী তত্বে সামিল হয়েছিলেন, তাঁদের অনেকেই তা থেকে সরে দাঁড়ান। বোদলেয়ার, পো, ওয়াল্টার পেটার প্রমুখেরা সেই মতবাদ থেকে স্বকীয় বিশেষত্বেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন।

অন্যদিকে অস্কার ওয়াল্ডই কলাকৈবল্যবাদীর প্রচারের প্রমুখ হয়ে ওঠেন। পেটার এবং জে এ সাইমণ্ডের শিষ্য অস্কার ওয়াইল্ড গুরুতে স্থিত না থেকে ‘শিল্পের জন্য শিল্প’র মতবাদে আজীবন অবিচল ছিলেন। সেখানে ‘মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে আর্ট বেঁচে থাকে’র প্রতি তাঁর অটল বিশ্বাস। সেখানে ‘আর্টের উদ্দেশ্য নির্জলা নির্ভেজাল সত্যকে উপেক্ষা করে নতুন কিছু সৃষ্টি করা।’ তাতে তাঁর মতে, ‘ইতিহাস যদি বিকৃত হয় হোক।’ অথচ অস্কার ওয়াইল্ডের সাহিত্যেও মানবিক অভিমুখ ব্যাহত হয়নি, নৈতিক আদর্শই প্রকট হয়ে উঠেছে। সেদিক থেকে তাঁর কলাকৈবল্যবাদী আদর্শও সৌন্দর্যের আধারেই নিঃশেষ হয়ে পড়েনি, সত্য ও মঙ্গলদীপে আলোকিত হয়ে উঠেছে। তাঁর দুটি জনপ্রিয় গল্পের দিকে দৃষ্টি দিলেই তা সহজবোধ্য হয়ে ওঠে। ‘The Happy Prince’ গল্পে সুখী রাজপুত্রের সুখের পরিচয়কে মূর্ত করে তুলতে গিয়ে গল্পকার সেবা ও ত্যাগের চিরায়ত মানবিক আদর্শকেই তার অভিমুখ করে তুলেছেন। রাজপুত্র তাঁর মৃত্যুর পর শহরের মাঝখানে সুউচ্চ মহার্ঘ মূর্তিতে সুশোভিত হয়ে জীবিতকালে প্রাচীরবেষ্টিত সুখস্বাচ্ছন্দমুখর জীবনের সঙ্গে বাইরের সাধারণ্যে যন্ত্রণাকাতর অসহায় দুঃখী মানুষের পার্থক্য গভীর ভাবে উপলব্ধি করতে পারেন। এজন্য তার নিরসনে মিশরগামী হয়ে তাঁর দু’পায়ের ফাঁকে আশ্রিতা ছোট্ট সোয়ালো পাখির সাহায্যে নিজের সর্বস্ব দিয়ে গরীব দুঃখী মানুষকে সাহায্য করতে করতে একসময় তাঁরা দেহত্যাগ করেন। রাজপুত্রের মূর্তি ও ছোট্ট পাখির মাধ্যমে অলৌকিক গল্পকে বাস্তবের সঙ্গে মিলিয়ে মহত্তর চেতনায় উদ্দীপ্ত করে যেভাবে তার সমাপ্তি টানা হয়েছে, তাতে শুধু শৈল্পিক চেতনাকেই সৌন্দর্যমুখর করে তোলেনি, বরং সত্যনিষ্ঠায় ও নৈতিক আদর্শের মেলবন্ধনে অপূর্ব সুন্দর মূর্তি মানবিক প্রতিমায় সুরভিত হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে অস্কার ওয়াইল্ডের ‘The Selfish Giant’ গল্পের মধ্যে শিশুদের সঙ্গে প্রকৃতির একাত্মতার নিবিড়তার পরিচয়েও মানবিক অভিমুখই আবেদনক্ষম মনে হয়। সেখানে স্বার্থপর দৈত্যই হার মেনে দয়ালু হয়ে ওঠেন। এই হারই শুধু সৌন্দর্যকেই দীপিত করে না, সত্য ও মঙ্গলকেও প্রদীপ্ত করে তোলে। সেক্ষেত্রে কলাকৈবল্যবাদী মতবাদটি উদ্দেশ্যের প্রেক্ষিতে সক্রিয়তা পেলেও শৈল্পিক সত্তায় আবেদনমুখর হয়ে ওঠেনি। অন্যদিকে তার পরিসরে নন্দনতাত্বিক চেতনা আলোকিত হওয়ার অবকাশ লাভ করে।

লেখক : প্রফেসর, বাংলা বিভাগ, সিধো-কানহো-বীরসা বিশ্ববিদ্যালয়, পুরুলিয়া-৭২৩১০৪।

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev