শোনা যায় যৌবনে বাপ-ঠাকুর্দার ওপর রাগ করে প্রথমে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর আর পরে রবীন্দ্রানাথ ঠাকুর দু-জনেই দ্বারকানাথের ব্যবসা সংক্রান্ত অধিকাংশ কাজগপত্র পুড়িয়ে দিয়েছেন। ‘প্রিন্স’রূপী দ্বারকানাথকে নতুন করে উপস্থিত করার অন্য উপায়ও আজ আর নেই। রবীন্দ্রনাথ, দ্বারকানাথের গুরু রামমোহনের স্মৃতি তর্পণ করলেও জ্ঞানতঃ দ্বারকানাথের উপাসনা তো করেনই নি, খুব কম তাঁর নাম উচ্চারণ করেছেন। এমনই ছিল ঠাকুর্দার প্রতি রবীন্দ্রবিতৃষ্ণা।
কোম্পানির পলাশী উত্তর সময়ে বাংলা দখল আর লুঠের পর নজর পড়ল চিনের সম্পদে। বাংলার আফিম চিনে বিক্রি করে সেই অর্থে চিনাংশুক আর পোর্সেলিন আর চা কেনার পরিকল্পনা করে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য। দ্বারকানাথ ঠাকুর তখন নীলের সঙ্গে আফিম ব্যবসা ধরলেন। যদিও ভারত-চিন আফিম ব্যবসায় বাংলার অংশিদারি ছিল খুবই কম। সব থেকে বেশি আফিম যেত মাদ্রাজ থেকে যার নাম মালওয়া আফিম। মূল ব্যবসাটার নিয়ন্ত্রণ ছিল পার্সিদের হাতে। সেই উদ্বৃত্ত অর্থে গড়ে উঠেছে আধুনিক মুম্বই (ওমর ফারিকি— দ্য ওপিয়াম সিটি)। কলকাতায় সাধারণ নাবিকের অবস্থা থেকে শুরু করে রুস্তমজী কাওয়াসজী তখন বিশাল ব্যবসায়ী। তাঁকে পাল্লা দিতে বিপুল অর্থ নিয়ে বাণিজ্যে নামলেন দ্বারকানাথ। দ্বারকানাথের তিনটি জাহাজ কলকাতা থেকে ক্যান্টন যেত। ১৮৩১ সালে কলকাতায় তৈরি ৩৬৩ টনের ওয়াটারউইচ কলকাতা-ক্যান্টন মাত্র ২৫ দিনে সফর করেছিল।

দ্বারকানাথ ছটি ক্লিপারের একটি বড় অংশিদারি অর্জন করেছিলেন। এরমধ্যে প্রধাণতমটি ছিল ৩৬৩টনের ওয়াটারউইচ। খিদিরপুর ডকে পরিকল্পনা করে বানানো। এটির অর্ধেক অংশিদারি ছিল তাঁর আর অর্ধেক ছিল দুই ইংরেজ উইলিয়ম স্টর্ম আর এন্ড্রু হেন্ডারসনের। এটি কলকাতায় তৈরি তৃতীয় ক্লিপার। এর আগে যে দুটি তৈরি হয়েছে হাওড়া ডকে সে দুটি হল বম্বের আফিম ব্যবসায়ী গুরু রুস্তমজী কাওয়াসজীর জন্য ১৮২৯-এর রেড রোভার আর ১৮৩১-এর সিল্ফ। সেই শতকের ত্রিশের দশকে চিনে অবৈধ আফিম চালানের পরিমান প্রায় তিনগুন হয়ে যায় এই ক্লিপারের দ্রুত পরিবহনক্ষমতায়। এবং উত্তর-পূর্ব বাতাস বয়ে ক্লিপারগুলি মাত্র ২৫ দিনে শীতের মধ্যেই যখন চিনে পৌঁছত সেখানে আফিমের দাম থাকত চড়া। এবং ক্লিপারের অনেকবেশি বোঝা নেওয়ার ক্ষমতার জন্যও আফিম ব্যবসায়ীদের কাছে ক্লিপার প্রধাণ পরিবহন হয়ে ওঠে।
দ্বারকানাথের আরও দুটি আফিম ক্লিপার ছিল ৩৭১ টনের ১৮৩৭ সালে খিদিরপুরে তৈরি এরিয়েল এবং ১১২ টনের মাভিজ। এরিয়েল চিনে আফিম ব্যবসা করতে গিয়ে প্রথম আফিম যুদ্ধে চিনা কমিশনার লিন-এর হাতে ধরা পড়ে। এরিয়াল চিন দখল করে এবং ভাড়ায় নেয়। আর একটি জাহাজ মাভিস বজ্রপাতে ধ্বংস হয়।

কলকাতায় তখন তাঁর নাম অহিফেন ঠাকুর। একইসঙ্গে মনেরাখতে হবে দ্বারকানাথের ব্যবসাগুলির মধ্যে আফিম ব্যবসার পরিমান বেশ কম ছিল।
আফিম বিষয়ে আরও কিছু মন্তব্য
১) নীলের মতই আফিম বাংলা-বিহারের খুব পুরোনো উৎপাদন। ব্রিটিশপূর্ব সময়ে বাংলা যে বিপুল কৃষি এবং শিল্প পণ্য একচেটিয়া রপ্তানি করত, তার একটা ছিল আফিম।
২) এশিয়াজুড়ে আফিম ছিল মূলত সামাজিক ব্যবহারের জন্যে — অর্থাৎ চিকিৎসকেরা টারমিনাল রোগী, যারা মৃত্যুপথযাত্রী, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা ইত্যাদিদের জন্যে আফিমের নিদান দিতেন। আফিমের মূল কাজই চিকিৎসার উদ্দেশে নিবেদিত। অশ্যই নেশ দ্রব্য হিসেবে পরিচিত ছিল, কিন্তু তার ভূমিকা খুবই গৌণ। আমার ছোটবেলায় দেখেছি বৃদ্ধবৃদ্ধারা সন্ধ্যের পরে দুধের সঙ্গে আফিমের গুলি খেয়ে ঝিমোতেন সকাল অবদি।

৩) পশ্চিম যেমন সব উৎপাদন বাজারের নিরিখে দেখা শুরু করল — তার আগে কোনও পণ্যই শুধু বাজারের নিরিখে তৈরি হত না, তারা নানান ডায়মেনশন থাকত, উতপাদকেরা পণ্যটিকে একটি জীবিত বস্তু হিসেবে পণ্য করত, সমাজে তার আলাদা স্থান ছিল — তারা প্রথম আফিমকে শুধুই নেশাদ্রব্য হিসেবে, বাজারি পণ্য হিসেবে বিক্রি শুরু করল। এবং নীলের আগেই আফিম হয়ে উঠল তাদের বিপুল লাভ করার হাতিয়ার।
৪) পলাশীর পরে বাংলার একটি টাকাও ইওরোপ থেকে না এনে, বাংলার রাজস্ব বিনিয়োগ করে সরকারি বলপ্রয়োগ করে ন্যুনতম মূল্যে বাংলার কাপড় আর আফিম দিয়ে সিল্ক, চা, পোর্সেলিনের মত হাজারো চিনা পণ্য কিনত ব্রিটিশ, সেই পণ্য তারা উচ্চদামে বিক্রি করত লন্ডনের বাজারে। চক্রটা দেখুন — বাংলায় প্রায় বিনামূল্যে পণ্য দখল এবং কিনেও বিনামূল্যে উচ্চমানের পণ্য দখল করে সেগুলি বিক্রি হত ইওরোপের বাজারে, ফলে ইওরোপের আজ যে চাকচিক্য দেখি সেটা শুধু বাংলা লুঠেই আসে নি, সেটা প্রায় বিনা অর্থ বিনিয়োজিত বাণিজ্যের উদ্বৃত্তেও তৈরি হয়েছে।
৫) ভারত থেকে চিনে আফিম যেত মূলত বম্বে হয়ে, বম্বের উত্থান ঐভাবেই পারসিদের হাত ধরে — আজ যে পারসিরা ধনী তার কারণ বম্বে হয়ে ব্রিটিশ হংকং হয়ে আফিম চিনা হংকং [সম্মানীয়] ব্যবসায়ীদের বিক্রি করে বিপুল অর্থ উপার্জন করেছে। টাটাদের অর্থ জোগাড় হয়েছে এইভাবেই। এপ্রসঙ্গে অমর ফারুখির দ্য ওপিয়াম সিটি মেকিং অব আর্লি বম্বে বইটা দেখতে পারেন — সেখানে যদিও টাটারা অনুপস্থিত।
তথ্য সমৃদ্ধ চমৎকার লেখা!
বেশ ভালো লাগল এই লেখাটি । অনেক তথ্যই অজানা ছিল । ধন্যবাদ ।
এই চর্চা হওয়া দরকার আরো বেশী করে। এই কালে বাংলায় এই কাজটা আপনি শুরু করেছেন। ধন্যবাদ।