আজ ২৫ আগস্ট সন্ধ্যায় এই লেখাটি লেখবার সময়ে অনেকেই ভাবছেন, আগামীকাল, ২৬ আগস্ট কেন্দ্রীয় সরকারের ডাকা আফগানিস্তান বিষয়ক সর্বদলীয় বৈঠকে কী বলা হবে। কেন্দের সরকার তাদের বিদেশনীতির ধ্বংসস্তূপের কী ব্যাখ্যা হাজির করেন, সামনের দিনগুলোতে কোন ধরনের কূটনীতি অনুসরণের দিশা দেন, সেটা জানতে আগ্রহী সংশ্লিষ্ট মহলের সবাই। জানা যাচ্ছে, এখনও সে দেশে আটকে আছেন বহু ভারতীয়। কিন্তু যাঁদের ভারতে ফিরিয়ে আনা গিয়েছে, এমন মানুষজন, যাঁরা ১৫ আগস্ট তালিবানের কাবুল দখলের দিন সেখানেই ছিলেন, তাঁদের বয়ানে কেমন যেন অন্য সুর।
সম্প্রতি আফগান দেশ থেকে ফিরেছেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক সর্বজিৎ মুখোপাধ্যায়। ফেরার পরে তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন সাংবাদিকরা। নানা সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত বা সম্প্রচারিত হয়েছে সর্বজিৎ মুখোপাধ্যায়ের কথা। তিনি কিন্তু পরিষ্কার বলছেন, তাঁর উপরে কোনো নিপীড়ন হয়নি, চোখেও পড়েনি তেমন কিছু। একটি খবরের কাগজের প্রতিবেদন জানাচ্ছে, দেশে ফেরার আগে নৈশভোজের নিমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন ছাত্রছাত্রীরা। তবে পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে সেই আমন্ত্রণ রক্ষা করা হয়নি সর্বজিতের। কাবুলের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকের পেশায় থাকা সর্বজিৎ বলেছেন, ‘তালিবানি নির্যাতনের মুখে পড়িনি একেবারেই। তেমন হলে আজ এখানে এসে দাঁড়াতে পারতাম না।’ সর্বজিৎ কলকাতায় পৌঁছেছেন ২২ আগস্ট রবিবার। ঠিক তার পরের দিন তিনি নিজের বাড়িতে দাঁড়িয়ে সংবাদমাধ্যমে বলেছেন, গণমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়ায় সাম্প্রতিক তালিবান নির্যাতনের একাধিক ভিডিও ও ছবি ভাইরাল হলেও তাঁকে অবশ্য সেরকম কোনো অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হতে হয়নি। তাঁর সাফ কথা, ‘ও দেশে এখন অন্যরকম সময় চলছে। তবে তেমন অভিজ্ঞতা কিছু হয়নি।’
একটি টিভি চ্যানেলে প্রথম শোনা যায় তমাল ভট্টাচার্যের অভিজ্ঞতা। তিনি আফগান দেশে কাদার্ন ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে ইংরেজি ও বিজ্ঞানের শিক্ষকতার কাজ করতেন। ফেরার আগে চারদিন তাঁকে এবং অন্যদের তালিবান ঘেরাটোপে কাটাতে হয়েছিল, জানিয়েছেন তমাল। তবে সেই ঘেরাটোপ তাঁদের সুরক্ষা দিতেই, এমনটাই মত ওই শিক্ষকের। নিমতার বাসিন্দা এই মাস্টারমশাইয়ের কথায়, ‘তালিবান মানেই নৃশংসতা ও আতঙ্ক, তা কিন্তু নয়। বরং ওঁরা আমার সঙ্গে ভালো ব্যবহারই করেছেন। ক্রিকেট খেলেছি, ইংরেজি ভাষা রপ্ত করার পদ্ধতি ও কম্পিউটার সায়েন্স নিয়ে আলোচনা করেছি।’

এমন আরও বয়ান মিলছে। এখন প্রশ্ন হলো, যে ভয়াবহ নৃশংসতার বিবরণ টিভিতে দেখছি, সেটা কোথায় হচ্ছে? একটা সন্দেহ অনেকের মনেই দানা বাঁধছে, আমাদের যা বোঝানো হচ্ছে, ঘটনা ঠিক তেমনই তো? এখন সবাই জেনে গিয়েছেন, ২০০১ সালে টুইন টাওয়ার আক্রমণকে কেন্দ্র করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তথা তাদের নেতৃত্বাধীন মিলিটারি অ্যালায়েন্স ন্যাটো বা নর্থ অ্যাটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাজেশন আফগান দেশে সশস্ত্র হস্তক্ষেপ করে। দীর্ঘ বিশ বছর মূলত মার্কিন সেনা দেশটি দখল করে ছিল। দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানরা সবাই ছিলেন মার্কিনিদের বসানো ব্যক্তি, যাকে বলে পুতুল সরকীর। সেই বছরগুলিতে পশ্চিমি প্রচার ছিল, অসভ্যতা, বর্বরতা থেকে বের করে নিয়ে এসে আফগান দেশকে সভ্য গণতান্ত্রিক সমাজে রূপান্তরিত করার মহান দায়িত্ব পালন করছেন মার্কিনিরা। আমেরিকা, ব্রিটেন বা জার্মানির পছন্দ অনুযায়ী শিক্ষাব্যবস্থা, সমাজের নিয়মকানুন এমনকী শিল্প-সংস্কৃতিও গড়ে তোলা হচ্ছিল। এটা সে দেশের মানুষ কতটা মেনে নিচ্ছেন, তা নিয়ে মাথা ঘামাবার অবকাশ পাননি কেউই। তাছাড়া বিদেশি সেনারা কতটা আত্যাচার চালাচ্ছিল, সেটাও প্রচারের আলো পায়নি। এর একটা কারণ অবশ্যই এটা যে, ১৯৯৫ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত তালিবান আফগানিস্তানে মধ্যযুগীয় বর্বরতা চালিয়েছে। তাই তাঁদের কথা শোনার তাগিদ বোধ করেনি বিশ্ব জনমত। কিন্তু তলিয়ে দেখলে বোঝা যাচ্ছে, তালিবানও সে নৃশংসতার সময়কে হয়তো অতীতেই ফেলে এসেছে। দু’য়েকটা সহজ প্রশ্নের সামনে দাঁড়ালেই তাই কেমন যেন ধাঁধা লাগে।
মাত্র তিন সপ্তাহের মধ্যে কীভাবে ওইরকম পাহাড়-উপত্যকা-খড়স্রোতা নদনদীঘেরা পুরো দেশটা দখলে নিল তালিবরা? সরকারি সেনাবাহিনী কোথায় গেল? মনে করা হয়, মার্কিন মদতপুষ্ট সেনাবাহিনীতে তিন লক্ষ সেনা ছিলেন, যাঁদের হাতে ছিল অত্যাধুনিক অস্ত্র সম্ভার। আর তালিবানদের সংখ্যা? চার ভাগের এক ভাগ, মাত্র পঁচাত্তর হাজার। বোঝাই যাচ্ছে, আফগান সেনারা লড়েনি। আর সাধারণ মানুষ? জনপদে জনপদে সাধারণ মানুষ বাধা দিলে কী এমন বিদ্যুৎ গতিতে তালিবানদের এগোনো সম্ভব? এসব দেখে মনে হয়, সাধারণ মানুষের সমর্থন এবার তালিবরা পেয়েছে।
তাহলে পালাচ্ছে কারা? এবং কেন? ও দেশ থেকে সম্প্রতি ফিরে আসা লোকজন বলছেন, যাঁরা মার্কিন মদতপুষ্ট সরকারের নানা কাজে যুক্ত ছিলেন, তাঁরাই যে করে হোক পালাবার চেষ্টা করছেন। এঁদের উপর যে তালিবান অত্যাচার করেছে, বা গুলি চালিয়েছে, তেমন কোনো প্রমাণ মিলছে না। কাবুলে বিমানবন্দরের চারপাশে তাহলে কয়েক হাজার মানুষ জমে থাকতে পারতেন না। ১৯৯৫-২০০১ সময়ের দুঃসহ স্মৃতির জন্যই এই অংশের মানুষেরা সাংঘাতিক ভয় পেয়ে গিয়েছেন। আবার যাঁরা পালাতে চাইছেন, তাঁদের একটা ক্ষুদ্র অংশ হয়তো মার্কিন মদতে কিছু কিছু খারাপ কাজের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন।
একটা বিষয়ে সাবধান হওয়া দরকার। এ দেশে হিন্দুত্ববাদীরা আফগান বিষয়ে একটা বয়ান, একটা ধারণা, একটা ন্যারেটিভ ছড়িয়ে দিতে চাইছে। সেটাই মেইনস্ট্রিম মিডিয়া থেয়ে নিয়েছে। গত দশ-বারো দিনে সেটাকেই সত্যি বলে ধরে নিয়েছেন আম-জনতা। মনে রাখা দরকার, একজন বিজেপি নেতার কাঁটাছেড়া (ফোটোশপে এডিট করা) করা ভিডিও ‘খবর’ হিসেবে চালিয়ে দেয় একটা টিভি চ্যানেল, আর তাকে সম্বল করে একজন ছাত্রনেতাকে ইউএপিএ ধারায় জেলে ভরে দেওয়া হয়, মাসের পর মাস জেলে পচছেন তিনি। এ দেশের অনেকেই তখন ওই টিভি চ্যানেলের বয়ান বিশ্বাস করেছিলেন। পরে যখন এই কাঁটাছেড়া করার অপরাধটা এখন ধরা পড়েছে, কতজন জানছেন? হিন্দুত্ববাদীরা তালিবানদের তথা মুসলিমদের নৃশংসতা প্রচার করতে চায়। এঁরা নিজেরাও কিন্তু চায় মধ্যযুগীয় ধারণার বিস্তার। মুসলিম বিদ্বেষ ছড়ানোটা উত্তরপ্রদেশ, পাঞ্জাব ইত্যাদি রাজ্যের নির্বাচনে কাজে লাগানোর চেষ্টা হতে পারে আরএসএস-বিজেপি। এই ফাঁদে পা দেওয়া কিন্তু বিপদের। মনে রাখুন তমাল ভট্টাচার্যের বয়ানটা, ‘আমাদের সঙ্গে চা খেতে বসে প্রত্যেককে ভাই ও অতিথি বলে সম্বোধন করে তালিবান জানালো, ওরা শিক্ষিত আফগানিস্তান গড়তে চায়। সেই শিক্ষার জন্য আমাদের দরকার। তাই চাইলে থাকতে পারি, কিংবা ফিরেও যেতে পারি।’