এতদিন লরির ছাদে মানুষ দেখেছি, এবার দেখলাম প্লেনের ছাদে মানুষ! ছোটবেলা থেকে বাসে বাদুড়ঝোলা মানুষ দেখে ভয় পেতাম, ঝুলন্ত অবস্থায় পড়ে গিয়ে মৃত্যুর ঘটনাও ঘটতো। তা বলে প্লেনের চাকা ধরে লোক ঝুলছে এ দৃশ্য কি কেউ কল্পনা করতে পেরেছিলাম! ট্রেন কিংবা বাসে ঝুলতে ঝুলতে পড়ে গিয়ে মৃত্যুগুলি ছিল নিছক দুর্ঘটনা এবং অপদার্থ সরকারের প্রশাসনিক ব্যর্থতা। আর প্লেনের চাকা থেকে হাত ফসকে মৃত্যুর ঘটনা দেখিয়ে দিল এক প্রতিবেশী রাষ্ট্রের আচমকা পালাবদল। রাজনৈতিক নেতা এবং রাষ্ট্রনায়কদের দুর্নীতি ও পদস্খলন নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই, কিন্তু একজন রাষ্ট্রপতির দেশের মানুষকে বর্বর, ধর্মান্ধ দখলদারদের হাতে ফেলে দিয়ে ডলার বোঝাই হেলিকপ্টার ও গুটিকয় বিশ্বস্ত অনুচরকে নিয়ে পালানোর ছবি আবার বলে দিল— এদের কাছে কিছু আশা করলে ঘোড়ায়ও হাসবে। রাজনীতির দিক থেকে সাধে মানুষ মুখ ফেরায়নি!

একদা আফগানিস্তান থেকে বিদায় নিতে বাধ্য হওয়া এই ধর্মান্ধ জীবগুলির আবার ক্ষমতায় ফেরার পিছনে একটা কারণ স্পষ্ট— তা হল তাদের সরিয়ে যারা ক্ষমতায় এসেছিলেন তারাও প্রকৃত অর্থে দেশকে একটা জনমুখী সরকার ও প্রশাসন উপহার দিতে পারেনি। মালাইলা ইউসুফজাই নিশ্চয়ই একটা উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। কিন্তু ঘানির জমানায় দেশের মেয়েদের অবস্থার খুব একটা উন্নতি হয়নি। সাধারণ মানুষও যে খুব সুখে ছিলেন তা নয়। দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের মাপকাঠিতে সদ্য প্রাক্তন হয়ে যাওয়া প্রেসিডেন্ট আশরাফ ঘানিকে ব্যর্থই বলা চলে।
তার পালানোর ধরণও প্রমাণ করে দিয়েছে, দেশের প্রতি তার ভালবাসা কেমন? এরপরে হয়তো তাকে আমেরিকার মত কোন বৃহৎ শক্তির অনুগ্রহভাজন হয়ে বেঁচে থাকতে হবে। ক্ষমতায় থাকতে আফগানিস্তানের উন্নতির জন্য প্রায় কিছুই না করা মানুষটিকে দেশে দেশে গিয়ে তালিবান অপশাসনের বিরুদ্ধে গরম গরম বক্তৃতা দিয়ে বেড়াবেন। অথচ আফগানিস্তানের মানুষের অভিজ্ঞতা রক্তপাত এড়াতে নয়, ধর্মান্ধ তালিবানদের মোকাবিলার সাহস নেই বলে আমেরিকার গুড বুকে থাকা এই কাপুরুষটি পালিয়েছেন।

ভারতের পক্ষে এটা খানিকটা খারাপই হল। কারণ চিন ও পাকিস্তানের মত ভারত বিরোধী শক্তিগুলি এরফলে আমাদের দেশকে কোণঠাসা করার কাজে আরও তৎপর হবে। আরও প্রবল হবে তাদের ভারত বিরোধিতা। দুটো দেশই আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে কোণঠাসা, তালিবানদের ধর্মান্ধ রাজনীতিকে তারা ভারত বিরোধিতার কাজে লাগাবে। ইমরান তো ইতিমধ্যেই আস্তিন গুটিয়ে ময়দানে নেমে পড়েছেন। চিন তো সদা প্রস্তুত। কারণ আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে তার প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী আমেরিকা ও ভারতকে কোণঠাসা করতে তালিবানরাই এখন তাদের তুরুপের তাস। চিনা মার্কসবাদ এখন ধর্মান্ধ তালিবানদের সঙ্গে হাত মেলাবে।
আফগানিস্তানের এই ঘটনার একটা শিক্ষা আছে। অত্যাচারী শাসককে দেশ থেকে তাড়ানো মানে কোন বিদেশী মদতপুষ্ট জনবিচ্ছিন্ন পুতুল সরকারকে বসানো নয়। কারণ স্রেফ লুঠপাট এবং ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ ছাড়া মানুষের প্রতি তাদের কোন দায় থাকেনা। সেই দায় নেই বলে দোরগোড়ায় তালিবানের ছায়া দেখে টাকাকড়ি যতটা পারা যায় নিয়ে একটা তৃতীয় শ্রেণীর তস্করের মত দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন ঘানি।