৪৬ তম আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলা শুরু হয়েছে। এখন বইমেলা এলে ভয় করে। যখন বইমেলা শুরু হয় তখন যে আশা, আনন্দ ও উত্তেজনা ছিল, এখন তা নেই। মনে পড়ে ১৯৭৬ সালের কথা। কলকাতা বইমেলা শুরু হয়েছিল ৫ মার্চ। ভিক্টোরিয়ার উল্টোদিকে। মাত্র ৩৪ জন প্রকাশক এসেছিলেন সে মেলায়। বই-এর স্টল হয়েছিল ৫৬টি। তখনকার শিক্ষামন্ত্রী মৃত্যুঞ্জয় বন্দ্যোপাধ্যায় উদ্বোধন করেন সে মেলা। মনে পড়ে বিমল ধরের কথা। অ্যাকাডেমিক পাবলিশার্সের বিমল ধর। তিনি যেতেন ফ্রাঙ্কফুর্টের বইমেলায়। সেখানকার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়েছিলেন কলকাতা বইমেলায়। বইমেলাকে কেন্দ্র করে তিনি ‘গ্রন্থপরিচয়’ নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করেন। বছরখানেক আমি তার সম্পাদনা করেছি। ১৯৮৪ সালে কলকাতা বইমেলা লাভ করে আন্তর্জাতিক বইমেলার স্বীকৃতি।
কিন্তু বইমেলা হলে ভয় করে কেন?
ভয় করে কয়েকটি কারণে।
প্রথমত, আমাদের বইপড়ার অভ্যেস দ্রুতহারে কমে যাচ্ছে। বাংলা বই-এর প্রতি আগ্রহ আরও বেশি কমছে। বইপড়ার অভ্যেসকে ধাক্কা দিচ্ছে টিভির হরেক রকম চ্যানেল, স্মার্টফোন, ইউটিউব। রসিকতা করে বলা যায়, আমরা যতটা বই দেখি, ততটা বই পড়ি না। বিয়ে বা জন্মদিনে এখন আর কেউ বই উপহার দেয় না। আমাদের বইপড়ার অভ্যেস নিয়ে একটা বিজ্ঞানসম্মত সমীক্ষা করার কথা কেউ গুরুত্ব দিয়ে ভাবেন না।
দ্বিতীয়ত, বাংলা বই-এর ভবিষ্যত ভাবলে ভয় করে। ‘মাতৃভাষা মাতৃদুগ্ধের মতো’ বাক্যটি শুনতে ভালো লাগে। বাস্তবে বাংলা ভাষা এখন নিম্নমধ্যবিত্ত আর প্রান্তিক মানুষের ভাষা হয়ে উঠছে। ইংরেজি আর হিন্দির দাপটে বাংলার প্রাণবায়ু নিঃশেষিত হচ্ছে প্রতিনিয়ত। বাংলা বাক্য ও বাক্যাংশে হিন্দি ও ইংরেজি শব্দ ও বাক্যাংশ ব্যবহার করা হচ্ছে নির্বিচারে। ছাপার খরচ ক্রমাগত বাড়ছে বলে বই-এর দামও বাড়ছে, তাই কমছে বিক্রির হার। জেলা বইমেলাগুলিতে বাংলা বই কিছুটা বিক্রি হলেও কলকাতা বইমেলায় ইংরেজি বই-এর দাপট বেশি বলে মনে হয়। মেলায় বিভিন্ন ধরনের যে সব বই বিক্রি হয়, মেলার কর্তারা তার পরিসংখ্যান দিলে বাস্তব অবস্থাটা বোঝা যাবে।
তৃতীয়ত, ই-বুকের আবির্ভাব। প্রযুক্তির বৈপ্লবিক পরিবর্তন হচ্ছে। সিডি খুন করেছে ভিনিয়েল ও টেপ রেকর্ডারকে, এমপিথ্রি খুন করেছে সিডিকে, ই-মেইল খুন করেছে পোস্টকার্ড-ইনল্যাণ্ড-এনভেলপকে, ইউটিউব খুন করেছে টেলিভিশন চ্যানেলকে আর ছাপা বইকে খুন করতে যাচ্ছে ই-বুক। এখনও পর্যন্ত ই-বুক পেছিয়ে আছে মুদ্রিত বই-এর কাছে। ৫টি দেশের ছাপা বই ও ই-বুকের পরিসংখ্যান এই রকম :
চিন —৩২% – ২৪.৪%
যুক্তরাষ্ট্র — ৪৪.৫% – ২২.৭%
যুক্তরাজ্য — ৪৮.৭% – ২০%
জাপান — ৪০.১% – ১৭.৩%
ভারত — ২৪.৫% – ৫.৬%
প্রযুক্তির রাক্ষুসে অভিযানের কথা ভাবলে বলতেই হবে মুদ্রিত বই-এর দিন ঘনিয়ে এসেছে। তাই ভয়। তখন কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলার নাম কি হবে? নাম হবে : কলকাতা আন্তর্জাতিক ডিজিটাল ভার্চুয়াল বইমেলা। বইমেলার জন্য আর কোন জায়গা লাগবে না, বই-এর স্টল তৈরির দরকার হবে না, বই কিনতে নগদ পয়সা লাগবে না।
লেখক সিনিয়র ফেলোশিপপ্রাপ্ত গবেষক