একুশের বাংলা বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি মুখ থুবড়ে পড়ার পর থেকেই রাজ্য বিজেপির নেতা, বিধায়ক, সাংসদরা দল ছেড়ে তৃনমূলে আসা শুরু করেছিলেন। যার শুভসুচনা করেছিলেন মুকুল রায়। এরপর এক এক করে হাতছাড়া হয় পঞ্চায়েত, জেলাপরিষদ। তখন প্রায় প্রতিদিনই রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে গেরুয়া শিবির ছেড়ে ঘাসফুল শিবিরে যোগদানের হিড়িক দেখা যায়। উত্তরবঙ্গের ময়নাগুড়িতে গণইস্তফা দেন বিজেপি নেতারা। দলীয় কোন্দল জোরালো হয়ে ওঠে শুভেন্দু অধিকারীর খাসতালুক নন্দীগ্রামে। মন্ডল সভাপতি বদল নিয়ে সেখানকার বিজেপি নেতা, কর্মীরাও গণ ইস্তফার হুশিয়ার দিয়েছে। তাতে রাজ্যে বিজেপির ভাঙনের সম্ভাবনা আরও প্রকট হয়েছে। ইতিমধ্যে তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে গিয়েছিলেন যে সমস্ত হেভিওয়েটরা, তাঁদের মধ্যে মুকুল রায়, রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায়, সব্যসাচী দত্ত, ইতিমধ্যেই ঘর ওয়াপসি হয়েছেন। তাদের অনুগামী ছাড়াও আর অনেকে তৃণমূলে কামব্যাক করেছেন। লাগাতার দলবদলের ঘটনায় এ রাজ্যে বিজেপি এখন প্রায় রক্তশূন্য।
এই ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির মধ্যেই গত রবিবার ব্যারাকপুরের সাংসদ অর্জুন সিং বিজেপি ছেড়ে চলে এসেছেন তাঁর পুরনো দল তৃণমূলে। এই ঘটনা বঙ্গ বিজেপির পক্ষে যে বিরাট ধাক্কা তাতে কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু এখানেই কি শেষ? পদ্ম শিবির ছেড়ে পুরনো দলে ফিরে এসেই অর্জুন জানিয়েছেন, বিজেপির জন্য আরও বড় ধাক্কা ও ভাঙ্গন অপেক্ষা করছে। ব্যারাকপুরের সাংসদের তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য, ‘ওয়েট অ্যান্ড সি। আরও অনেকে আসবে’ দল বদলের জল্পনাকে আরও এক ধাপ বাড়িয়ে দিয়েছে। কেবল তাই নয়, বিজেপি ছেড়ে কারা তৃণমূলে যোগ দিতে চলেছেন, সেই তালিকাও নাকি অর্জুন তৈরি করে ফেলেছেন। যদিও তিনি তাঁদের নাম প্রকাশ্যে আনেননি।

নাম না উচ্চারণ করলেও জল্পনার এই তালিকায় শোনা যাচ্ছে বিষ্ণুপুরের বিজেপি সাংসদ সৌমিত্র খাঁর নাম। উল্লেখ্য, সম্প্রতি রাজ্য বিজেপিকে নিয়ে বিষ্ণুপুরের সাংসদ প্রকাশ্যেই ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন। ক’দিন আগেই তিনি রাঢ় বাংলা ও জঙ্গল মহলকে নিয়ে পৃথক রাজ্য গঠনের দাবি তুলেছিলেন। বিজেপি রাজ্যভাগ চায় না বলেই দাবি করে আসছে। সেই কারণে রাজনৈতিক মহল দলীয় লাইনের বাইরে গিয়ে বিজেপি সাংসদের এই ধরণের বক্তব্যকে যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছে। আর সেখানেই প্রশ্ন উঠেছে তাহলে সৌমিত্রও কি অর্জুনের পথ অনুসরণ করে তৃণমূলে ফিরতে চলেছেন? যদিও বিষ্ণুপুরের বিজেপি সাংসদ তৃণমূলে ফেরার সম্ভাবনাকে সম্পূর্ণ উড়িয়ে দিয়ে বলেছেন, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় যতদিন তৃণমূলে থাকবেন ততদিন তিনি তৃণমূলে ফিরবেন না। তবে অর্জুন সিঙের হাত ধরে তৃণমূলে ফেরার প্রশ্নে তার সাফ জবাব, অর্জুন সিঙের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত সম্পর্ক খুবই ভালো। কিন্তু, ব্যক্তিগত সম্পর্ক আর রাজনৈতিক সম্পর্ক এক নয়।
অর্জুন সিংয়ের দলবদলের পর যে মহাজল্পনা শুরু হয়েছে তাতে আর যেসব বিজেপি নেতার নাম নিয়ে চর্চা তুঙ্গে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য নাম রাজ্য বিজেপির অন্যতম সাধারণ সম্পাদক লকেট চট্টোপাধ্যায়। অবশ্য বিজেপি থেকে তৃণমূলে আসা নিয়ে তাঁর নাম অনেকদিন ধরেই ঘোরাফেরা করছে। উল্লেখ্য, পাট শিল্পে বঞ্চনার অভিযোগ নিয়ে লকেট চট্টোপাধ্যায় অর্জুন সিঙের সঙ্গেই লড়াই করছিলেন বলে জোর খবর। একুশের নির্বাচনে পর্যুদস্ত হওয়ার পর থেকেই তিনি বঙ্গ বিজেপির সঙ্গে দূরত্ব রেখেই চলেছিলেন। অভিযোগ বঙ্গ বিজেপি তাঁকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়নি। ফলে দলবদলের জল্পনায় লকেটের নাম প্রথম থেকেই ছিল।
বাবুল সুপ্রিয় তৃণমূলে যোগ দেওয়ার সময় থেকেই ‘বাবুল-ঘনিষ্ঠ’ হিসাবে পরিচিত লকেটের দলবদল নিয়ে জল্পনা তুঙ্গে উঠেছিল। তাতে রাজ্য বিজেপিতে হুগলির সাংসদের গুরুত্ব সে ভাবে কমেনি। নতুন সভাপতি সুকান্ত মজুমদার দিলীপ ঘোষ জমানার রাজ্য সংগঠনে অনেক বদল এনেছেন কিন্তু লকেটের পদ একই থেকে গিয়েছে। তাছাড়া লকেট বরাবরই কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের পছন্দের। সেই সূত্রেই উত্তরাখণ্ড বিধানসভা নির্বাচনের দায়িত্ব পান। তবে লকেট রাজ্য বিজেপিতে থেকে বাদ-পড়া সায়ন্তন বসু, জয়প্রকাশ মজুমদার, রীতেশ তিওয়ারিদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। সাংগঠনিক বৈঠকেও সরব হয়েছিলেন। সে কারণেই তাঁর নাম ফের দলবদলের জল্পনায় এসেছে। তাছাড়া মাঝে কিছুদিন তিনি সে ভাবে সাংগঠনিক কাজেও অংশ নিচ্ছিলেন না। এখন তিনি আবার রাজ্যে সক্রিয়।

দলবদলের জল্পনায় আরেকটি নাম হল অনুপম হাজরা। মুকুল-ঘনিষ্ঠ অনুপম সম্প্রতি নিজের দলের সমালোচনা করতে পিছপা হচ্ছেন না। তাছাড়া তাঁর টুইট মাঝেমধ্যেই যেভাবে বর্ষিত হচ্ছে তাতে রাজনৈতিক মহল মনে করছেন যে তিনিও দলবদলের লাইনে রয়েছেন। তাঁকে বাংলায় বা বিহারে দলীয় কর্মসূচিতেও দেখা যায় না। একাধিকবার বিজেপির অস্বস্তি বাড়ানো অনুপম অবশ্য জানিয়েছেন, তিনি কোনওদিন ‘দলবদলু’ হতে পারবেন না। অনুপম তৃণমূল থেকে বিজেপিতে এসেছিলেন তৃণমূল সাসপেন্ড করেছিল বলে। সাসপেন্ড হয়ে তিনি বেশ কিছুদিন রাজনীতি থেকে সরেছিলেন পরে বিজেপিতে যোগ দেন। এখন আবার তাঁকে ঘিরে জল্পনা শুরু হয়েছে যে তিনি তৃণমূলে ফিরছেন।
অন্যদিকে তৃণমূল ছেড়ে যাওয়াদের দলে ফেরত নেওয়া কিংবা বিজেপি থেকে আসা নেতাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো নিয়ে দলের অন্দরে ক্রমশই অসন্তোষ বৃদ্ধি পাচ্ছে। যা নিয়ে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় হলদিয়ায় দলের শ্রমিক সংগঠনের সভা থেকে স্পষ্টবার্তা দিয়েছেন। তিনি প্রকাশ্যে জানিয়েছেন, যাঁরা প্রথম থেকে তৃণমূল করছেন, তাঁরাই টিকিট পাবেন। দলের মধ্যে যে এ নিয়ে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে, অনেকেরই ক্ষোভ তৈরি হয়েছে সে ব্যাপারে তিনি অবগত বলেও জানান। তাঁর স্পষ্ট মত, অন্য দল থেকে এই দলে এলে, একজনও টিকিট পাবে না। যাঁরা প্রথম থেকে তৃণমূল করেছেন, তাঁরাই টিকিট পাবেন।.