আজ প্রথম পিরিয়ডে বোর্ডে চোখ পড়তেই দেখলাম, লেখা আছে তারিখ…২৩/৩/২০২০। সেই দিনক্ষণ মুছে নতুন লেখা…১২/২/২০২১… এই দিয়েই শুরু হল আমাদের শিক্ষার নতুন পদক্ষেপ।
গতকাল রাত থেকে চাপা একটা উদ্বেগ মনের মধ্যে কাজ করছিলো, ১১ মাস তো কম সময় নয়। অভ্যাস হয়েছে নতুন অনেক কিছুর। সেসব থেকে বেড়িয়ে এক নতুন পরীক্ষামূলক কর্মজীবনে ফেরা। ঘুম একটু কমই হলো আর সাতসকালে উঠে তড়িঘড়ি ঘরোয়া কাজ শেষ করে নতুন করে প্রস্তুতি শুরু পুরনো রাস্তায় হাঁটার।
হ্যাঁ, আমি একজন সরকারি উচ্চমাধ্যমিক স্কুলের শিক্ষিকা। শেষ একবছরে যে পেশার মানুষেরা সবচেয়ে বেশি সমাজের কটুকথার শিকার, যারা রোজগেরে মানুষ হিসেবে নিয়মিত হাসিঠাট্টার পাত্র হয়েছে। আমি সেই তথাকথিত অলস অপদার্থ শিক্ষক সমাজের প্রতিনিধি।

কিন্তু যে বা যারা বলেছেন বা বলেন আমাদের পেশা নিয়ে, তাদের পরিবারের ছোট সদস্যটি কিন্তু আমাদের তত্ত্বাবধানেই দিনের একটা বড় সময় থাকে। আমাদের কাজটা— এক ঘরে সর্বনিম্ন ৪০-৫০ জন (মাঝেমধ্যে ১০০ জনেও) নাবালক কিংবা নাবালিকাকে নিয়ে, যাদের চুপ করানো থেকে শিক্ষা দেওয়া, ঝগড়া ঝামেলা মেটানো— সবই পালন করতে হয়। আবার পরীক্ষা ব্যবস্থা, মূল্যায়ন পদ্ধতি সুষ্ঠভাবে পরিচালনা করাও আমাদের কাজ। এই এক বছরে প্রতিটি ছেলে মেয়েদের ঘরে তাদের বরাদ্দ চাল-ডাল, সাইকেল, মাস্ক, বই-খাতা, ড্রেস পৌঁছেছে সময়মত। তবু ফাঁকিবাজির তকমাটা আমাদের কপালে জোটে সবার আগে। কিন্তু আদি অনন্তকাল জুড়ে শিক্ষক সমাজ না থাকলে এই সমাজের বুদ্ধিমান বুদ্ধিজীবিদের মুখের ভাষা, এত বিশ্লেষণী ক্ষমতা কি এত পরিণত হত? তাদের প্রত্যেকের এই উত্তরণের পিছনে কোন না কোন শিক্ষকের ভূমিকা আছেই।

সে সব কথা থাক না হয়— আজ নতুন করে শুরু হলো এক পদক্ষেপ। আমি এক গ্রামের স্কুলের শিক্ষিকা— নবম, দশম, একাদশ, দ্বাদশ মিলিয়ে ৬০০-৬৫০ জন ছাত্রী আমাদের। সকাল থেকে চাপা উত্তেজনা ছিল, সবাইকে সুশৃঙ্খলভাবে বসানো যাবে কিনা। স্কুলের বাইরে করোনা বিধিনিষেধ সব টাঙানো, থার্মাল স্ত্রিনিং করে, স্যানিটাইজার দিয়ে মেয়েদের ব্যবধান রেখে তাদের নির্দিষ্ট ঘরে বসানো গেল। প্রতিটা ক্লাস চার ভাগে ভাগ করা আলাদা ঘরে— প্রতি বেঞ্চে ২ জন করে বসানো, প্রার্থনা সঙ্গীত যার যার নিজস্ব ক্লাসে করা হলো। ফলে আমাদের রোজের ক্লাস সংখ্যা একই রকম, কম নয় কিন্তু। আজ স্কুলে ৩০০ মত মেয়ে এসেছে। তবে এ এক অন্য জগৎ— ছাত্রীরাও সচেতন, ওরা মাস্ক খোলে নি, মাঝেমধ্যে হাতে নিজের আনা স্যানিটাইজার ব্যবহার করছে, কেউ কারোর জলের বোতলও ভাগ করছে না। বই খাতা পেনগুলোও কেউ কাউকে দিচ্ছে না। অন্যরকম অভিজ্ঞতা হলো— যারা পাশে বসে কানাকানি করতে ব্যস্ত থাকতো, বই খাতা নিয়ে টানাটানি করতো কিংবা খাবার নিয়ে ভাগাভাগি— তারাও এই করোনার ভয়াবহতাকে বুঝেছে। তাই বেশ বাধ্য মেয়েদের মত কথা শুনে প্রথম দিনটা কাটালো বেশ।

কিন্তু স্কুলের পরিবেশ অন্য রকম, কি নিশ্চুপ টিফিনের সময়— হই হুল্লোড় নেই— গল্প করতে করতে একে অপরকে জড়িয়ে ধরা নেই। আমরাও কেমন কাছে গিয়ে ওদের গালটা টিপে বলতে পারলাম না যে— কি রে, কেমন ছিলি এত কাল? বোর্ডে অংক করতে করতে কাছে টেনে কোন মেয়েকে বাকি অংশটা করতে বলার সাহস জুটলো না। এক নীরব কষ্টের অনুভব হলো— সব তো শুরু হলো, কিন্তু কেমন ছন্নছাড়া সব!! আবার কিছু সুখানুভূতিও হচ্ছে— নিশ্চয়ই ছন্দে ফিরবে পুরনোসময়ের মত, শুধু যেন সব কচি প্রাণগুলো সুস্থ থাকে। আমাদেরও কিন্তু মন কেঁদেছে, আমরাও কিন্তু কেউ ভালো ছিলাম না এমন বাধ্যতামূলক নির্বাসনে— কাজ না করে উপার্জন, যে কোন সুস্থ মানুষের বিবেককে দংশনই করে। আমরাও চিন্তা করেছি, আমাদের মেয়েগুলো সুস্থ আছে তো, ওদের কোন অত্যাচার হচ্ছে না তো, কারোর গোপনে বিয়ে হয়ে যায় নি তো, কেউ কঠিন ব্যধিতে পড়ে বিনা চিকিৎসায় নেই তো— এসব কাজ স্কুল খোলা থাকলে ছাত্রদের মাধ্যমে আমাদের কারোর না কারোর কানে পৌঁছে যায়, আর তার সমাধান স্কুল কর্তৃপক্ষ করেই। কিন্তু আমরা সরকারি নিয়মে বাঁধা ছিলাম— এই ভয়ানক সংক্রমণের হাত থেকে তবু তো বাচ্চাদের রক্ষা করা গেল, তার বিনিময়ে না হয় জুটলো সমাজের অনেক নেতিবাচক কথা!
তবু আজ শুরু নতুন অধ্যায়— মাস্ক পরিহিত ছাত্রী-শিক্ষিকা সম্পর্কের নতুন পথ চলা— আবারও বাচ্চারা খোলা হাওয়ায় তাদের খুনসুটির দিনে ফিরুক এটাই কাম্য।
লেখিকা : পৃথিবা রাধারাণী গার্লস হাই স্কুল (উচ্চমাধ্যমিক) অঙ্কের শিক্ষিকা