বাংলার প্রায় প্রতিটি বনেদি বাড়ির পুজোতে কিছু না কিছু নিজস্ব রীতি ছিল, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে আজও টিকে রয়েছে। যেমন, পয়লা বৈশাখে ভগবতী যাত্রার দিনে প্রতিমার পাট পুজো, রথের দিন দেবী প্রতিমার নির্মাণ শুরু, ষষ্ঠীতে দেবীকে বোধন করে হোমের আগুন জ্বালানো এবং দশমী শেষে হোমের আগুন নেভানো ইত্যাদি। পুরনো বাড়ির সদস্যরাই সেই পুরোনো রীতি টিকিয়ে রেখেছেন। পূর্ব পুরুষদের সেই রীতি মেনে মহালয়ার পরদিন থেকে আজও দুর্গাপুজো শুরু হয় দক্ষিন ২৪ পরগনার সোনারপুর থানার কোদালিয়ার বসু পরিবারে। এলাকার মানুষের কাছে যে পুজোটি নেতাজীর বাড়ির পুজো বলেই পরিচিত। অন্যদিকে মহিষাদল রাজবাড়ির দুর্গাপুজোও শুরু হয় মহালয়ার পরদিন অর্থাৎ প্রতিপদের দিন।
মাহিনগরের বসু পরিবার স্থায়ীভাবে কোদালিয়ায় বসবাস শুরু করে ১৭০৭ সাল থেকে। ১৮২০ সালে তাঁরা প্রথমবার ওই বাড়িতে দুর্গাপুজোর প্রচলন করেন। কথিত গৃহকর্তা যাদবচন্দ্র বসু স্বামীহারা বোনের অনুরোধেই বাড়িতে দুর্গা পুজোর আয়োজন করেছিলেন। বংশানুক্রমে একসময় সেই পুজোর দায়িত্বভার এসে পড়ে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর পিতা জানকীনাথ বসুর উপর। সেই সূত্রেই তাঁর পুত্র নেতাজি সুভাষচন্দ্র তাঁর মায়ের সঙ্গে পারিবারিক পুজোয় অংশ নিতে ১৯২৮, ১৯৩৭ ও ১৯৩৯ সালে কোদালিয়ার এই বাড়িতে এসেছিলেন। কোদালিয়ার বসু বাড়ির পুজো এলাকার বাসিন্দাদের কাছে তারপর থেকেই নেতাজির বাড়ির পুজো বলেই পরিচিত।

বর্তমানে বসু পরিবারের বেশীরভাগ সদস্য দেশে ও বিদেশের বিভিন্ন জায়গায় থাকেন। তবে পুজোর সময় অনেকেই সামিল হন কোদালিয়ার বাড়িতে। কয়েক বছর ধরে বসু পরিবারের সদস্য সুপ্রিয় বসু ও চিত্তপ্রিয় বসু এই পুজোর দায়িত্বে রয়েছেন। এখনও কিন্তু বসু বাড়ির পুজো ঠিক আগের নিয়ম মেনেই হয়। সাবেকি প্রথা মেনে আজও বসু পরিবারে মহালয়ার পরদিন থেকেই শুরু হয়ে যায় দুর্গাপুজো। কেবল তাই নয়, দিন বদলালেও পুরোহিত থেকে প্রতিমা শিল্পীরও বদল হয়নি। বংশপরম্পরায় সেই একই পুরোহিত পরিবার পুজো করে আসছেন এবং প্রতিমাশিল্পীও একই পরিবারের রয়েছেন। বর্তমান পুরোহিত সুনীল চক্রবর্তী ১৯৭৫ সাল থেকে নেতাজির বাড়ির দুর্গাপুজো করে আসছেন। তার আগে ওঁর বাবা সুনীল চক্রবর্তী কোদালিয়ার বসু পরিবারের পুজো করতেন। আবার সোনারপুরের হরহরিতলার তুষ্টুপদ মিশ্র বিগত ৪২ বছর ধরে বসু পরিবারের নেতাজীর বাড়ির প্রতিমা বানিয়ে আসছেন। সাবেকি একচালা মাতৃমূর্তির কাঠামোটির বয়স দু’শো বছর।

আর পাঁচটা রাজবাড়ির মতো মহিষাদল রাজবাড়ির জৌলুসও অনেকটাই ফিকে হয়ে এসেছে, কমেছে আড়ম্বর-আয়োজনও। কিন্তু রীতি বা নিয়ম নীতির বদল ঘটেনি। সেই ঐতিহ্য মেনে প্রতিপদে ঘট স্থাপন করে শুরু মহিষাদল রাজবাড়ির দুর্গাপুজোও শুরু হয় মহালয়ার পরের দিন। এদিন কুলদেবতা মদনগোপাল জিউয়ের মন্দির সংলগ্ন পুকুর থেকে নটি ঘট উত্তোলনের মাধ্যমে শুরু হয় পুজো। মহালয়ার পর থেকে নবমী পর্যন্ত রাজবাড়ির দুর্গামণ্ডপ লাগোয়া অশ্বত্থ গাছের তলায় ঘট ওঠে। ঘট উঠে যাওয়ার পর ওখানে মাটির একটি মঞ্চ তৈরী করে নানারকম শস্য ছড়িয়ে দেন মহিষাদল রাজবাড়ীর শরিকেরা। পুজো শেষে দেখা হয়, ওই শস্যগুলো থেকে কেমন পরিমাণ গাছ হয়েছে। অতীতে এই পরিমাণের ওপর নির্ভর করেই বছরের রাজস্ব নির্ধারণ করা হত। আজ জমিদারি চলে গেলেও এই প্রথাটি রয়ে গিয়েছে। মহালয়া থেকে প্রতিদিনই ঘটপুজো হয়। সপ্তমী থেকে হয় মূর্তি পুজো। প্রতিমার একপাশে ঘট, অন্যপাশে ধান রাখা হয়।’ শোনা যায়, এই দুর্গাপুজো করার পরই শুষ্ক গ্রামে ধান ফলেছিল। তাই ভালো ফসলের আশায় আজও দেবীর পাশে ধান রাখা হয়।

রাজা আনন্দলাল উপাধ্যায়ের স্ত্রী জানকীদেবীর হাত ধরে ১৭৭৮ সালে মহিষাদল রাজবাড়ির দুর্গাপুজো শুরু হয়েছিল সম্পূর্ণ বৈষ্ণব পদ্ধতিতে। পুজোয় ১০৮টি নীল পদ্ম দেওয়ার চল রয়েছে। আগে মহিষাদল রাজবাড়ির দুর্গাপুজোয় ঠাকুরদালানে যাত্রাপালা হত, রাজবাড়ির মহিলারা পর্দার আড়াল থেকে যাত্রা দেখতেন। কামান দেগে সন্ধিপুজো হত, কামান দাগায় নিষেধাজ্ঞা জারি করায় সেটা ইতিহাসের খাতায় চলে গিয়েছে। এখন কামান দাগার পরিবর্তে আতসবাজির রোশনাইয়ের মধ্যে দিয়ে সন্ধিপুজো করা হয়। পুজোর দিন অনুযায়ী ভোগ রান্না হত। ষষ্ঠীতে ছ’মন, সপ্তমীতে সাত মন, অষ্টমীতে আট মন, নবমীতে ন’মন চালের প্রসাদ তৈরি করে বিতরণ করা হত। পুজোর দিনগুলিতে অবশ্য এখনও ভোগ রান্না করা হয়। কিন্তু তা যৎসামান্য। দশমীতে বড় নৌকায় করে শোভাযাত্রা বেরোত এবং রাজবাড়ির সামনে দিয়ে বয়ে যাওয়া হিজলি টাইডাল ক্যানেল হয়ে গেঁওখালিতে রূপনারায়ণ নদীতে প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হত। এখন সে সবই অতীত। এখন রাজবাড়ি লাগোয়া রাজদিঘিতেই প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়। তবে আড়ম্বর কমলেও ঐতিহ্যের টানে আজও বহু মানুষ মহিষাদল রাজবাড়ির দুর্গাপুজোয় সামিল হন।