এযুগের ছেলেমেয়েরা কলের গান নামটার সাথে পরিচিত নয়। কিন্ত আমাদের ছোটবেলায় গান শোনার বাক্স ছিল একমাত্র কলের গান, যার পোশাকী নাম গ্রামোফোন। আমাদের গ্রামে সুবোধ বাবুর বড় সাইজের একটা সুন্দর গ্রামোফোন ছিল। কালো রঙের থালার সাইজের গোলাকার রেকর্ড, রেকর্ড চাপিয়ে পাশের হ্যান্ডেল ঘুরিয়ে দম দেওয়ার পর একটা দন্ডের সাথে গ্রামোফোনের পিন লাগিয়ে তা রেকর্ডের উপর বসিয়ে দিলেই রেকর্ড ঘোরার সাথে সাথে গান বেজে উঠতো। বড় বাক্সের সাইজের গ্রামোফোনে আবার মাইকে চোঙের মতো চোঙ লাগানো, দেখতে যেন প্রস্ফুটিত ধুতরো ফুলের বড় সংস্করণ। সাধারণ মানুষেরা বলতো কলের গান। কলের গান নামটার আড়ালে গ্রামোফোন নামটা হারিয়েই গেল একদিন। দু’দশ গ্রাম খুঁজেও একটা কলের গান পাওয়া যেত না, আমাদের এলাকায় সবে ধন নীলমণি সুবোধ বাবুর কলের গানটি নিয়ে অনেক গ্রামে যেতেন।
গ্রামের দিকে কলের গানের একছত্র রাজত্ব ছিল ষাটের দশকের আগ পর্যন্ত। গড়াই নদীর ওপারে কেওয়াগ্রামে আমার মেসো ডাক্তার জ্যোতিষ পালের বাড়িতে একটা কলের গান ছিল। হাইস্কুলে নিচু ক্লাশে পড়াকালে ছুটিছাটায় ওখানে যেতাম। ওখানে গেলে আমার একমাত্র কাজ ছিল কলের গানটা বাজিয়ে শুনা। তবে তেমন বেশি রেকর্ড ছিল না, যাত্রাপালার মধ্যে ছিল প্রহ্লাদ চরিত্র। সেকালে গ্রামোফোন ছিল ঐতিহ্যের প্রতীক।
তারপর গ্রামে এলো রেডিও। হাইস্কুলে পড়াকালে লাঙ্গলবাঁধ বাজারের মালিথীয়ার সৈয়দ আহম্মদের কাপড়ের দোকানে একটা মাত্র ট্রানজিটর রেডিও ছিল। তখন দুপুর দেড়টার দিকে আকাশবাণী কলকাতা রেডিও থেকে অনুরোধের আসর হতো। টিফিনের সময় অনেক ছাত্রই ওখানে অনুরোধের আসর শুনতে যেত। আমিও দু-একদিন গিয়েছি। পরে বাজার থেকে চাঁদা তুলে তহশিল অফিসে একটা রেডিও কেনা হয়। তখন কারো রেডিও থাকা মানে বিরাট ব্যাপার। তখন তহশিলদার ছিলেন গফুর তরফদার সাহেব, তিনি আমার বাবার বন্ধু মানুষ, আমাদের বাড়িতে এলেন একটা অনুষ্ঠানে রেডিও নিয়ে, অনেক লোকই প্রথম রেডিও দেখল তা থেকে গান শুনলো।
আমার মাসতোত বোন গীতাদির বিয়েতে মেসো মশাই একটা রেডিও এবং বড় ব্যাটারী যৌতুক দিয়েছিলেন জামাইকে, ওটার সাইজ ছিল খুবই বড়সড় একটা বাক্সের মতো। মনে করলাম যাক রেডিও শুনতে হবে, কিন্ত শোনা হল না কারণ বড় বাশের মাথায় এন্টিনা লাগাতে হবে।
আমাদের বারইপাড়ার মেসো রনোজিৎ সিকদার সৌখিন মানুষ, তিনি প্রথম একটা ট্রানজিস্টর রেডিও কিনলেন। তখনকার দিনে ট্রানজিস্টর রেডিও নিয়ে আত্মীয় বাড়িতে যাওয়া একটা আভিজাত্যের পর্যায়ে পড়তো। তিনিও আমাদের বাড়িতে এলেন রেডিও নিয়ে, লোকজন রেডিওয়ের গান ও খবর শুনতে গ্রামের লোক পটল ভাঙল।
এক সময় আমাদের বাড়িতে রেডিও এলো। তখন আমি কলেজে সেকেন্ড ইয়ারে পড়ি যশোরে। গরমের ছুটিতে বাড়ি এসে প্রায় সময়ই রেডিও শুনি, পড়াশোনায় একটু ব্যাঘাত তো ঘটলো।
সে সময় গ্রামগুলোর মানুষের মধ্যে প্রীতির সম্পর্ক ছিল, সন্ধ্যার পরে আমাদের পাড়ার লোকজন আমাদের কাচারীতে এসে বসবার আগেই বাবা ট্রানজিস্টর নিয়ে বসতেন। টেবিলের ওপর রেডিওতে গান কিংবা খবর হচ্ছে, টেবিলের ওপরে রাখা হেরিকেনের আলোতে আঁধার কেটে গেছে।

আমার বাবার নামে ডাকে দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকা আসতো, তা পাওয়া যেত কমপক্ষে তিন চার দিন পরে, তাই রোজকার খবরের জন্য রেডিওই ভরসা, আর সেটা ৬৫ সালের পাকিস্তান ও ভারতের যুদ্ধের খবর জানার জন্য সবাই উদগ্রীব। সন্ধ্যার পর কাচারি ভর্তি শ্রোতায়। আকাশবাণী, কলকাতা কেন্দ্রের অনুষ্ঠান শোনা নিষেধ করে ফরমান আয়ুব সরকার। তবুও ঝুঁকি নিয়ে কলকাতা বেতারে যুদ্ধের খবর শোনা হতো।
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে রেডিও এর ভূমিকা কথা বলে শেষ করার নয়। শর্ট ওয়েভ রেডিও এর বিবিসি এর বাংলা খবর দিয়েছিল সঠিক খবর। বিবিসি বাংলা বিভাগ মুক্তিযুদ্ধের আগের উত্তাল দিলগুলোর খবর প্রচার করেছিল বস্তুনিষ্ঠ ভাবে, ৭ মার্চের বঙ্গবন্ধুর ভাষণ আংশিকভাবে ঔদিন রাতেই প্রচার করে। পরদিন সকালের দিকে তৎকালীন রেডিও পাকিস্তানের ঢাকা কেন্দ্র থেকে তা প্রচারিত হয়।
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময়ে আকাশবাণী, কলকাতা ও বিবিসি বাংলার ভূমিকা কোন দিনও ভুলবার নয়। আকাশবাণী কলকাতার দেবদুলাল বন্দ্যোপাধায়ের আবেগ মথিত সুললিত কণ্ঠের সংবাদ ও সংবাদ সমীক্ষা পাঠ যেন আমাদের মনে আজও ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হয়।
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে রেডিও যে অবদান রেখেছিল তা বলে শেষ করার নয়। সে সময় প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার কলকাতায় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র স্থাপন করে যুদ্ধের খবরাখবর ও দেশাত্মবোধক গান প্রচারের মাধ্যমে বিশেষ ভূমিকা রাখে।
এক সময় রেডিও প্রয়োজনীয়তা কমতে থাকে যখন টিভি, ভিসিআর বাজারে এলে। ফিতে ওয়ালা ক্যাসেট, গানের জগতকে দখল করে নিলেও কম্পাকক্ট ডিস্ক এক সময় ফিতের ক্যাসেটের যুগের সমাপ্তি ঘটল। কম্পিউটার পিসি অনেক এলো তা সাধারণের ধরা ছোঁয়া বাইরে ছিল। তারপর বাজারে এলো মোবাইল ফোন। গান, সিনেমা এবং ভিডিও এখন মানুষের পকেটে। গ্রামোফোন ও রেডিও থেকে মোবাইল ফোনে উত্তরণ এক যুগান্তকারী উলম্ফন। তবুও আজ বিশ্ব বেতার দিবসে স্মরণ করি বেতার বা রেডিও এর অবদানকে।
মনোজিৎকুমার দাস, প্রাবন্ধিক ও কথাসাহিত্যিক, লাঙ্গলবাঁধ, মাগুরা, বাংলাদেশ।