| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

আগুন নিয়ে খেলা : ছোট গল্প লিখেছেন শুভমানস ঘোষ

Reporter
শুভমানস ঘোষ / ৫৭৮ জন পড়েছেন
আপডেট শনিবার, ২৯ জানুয়ারি, ২০২২

কয়েক দিন আগে অনলাইন পাবলিশার অভ্রদীপ আমার কাছে কালাজাদুর ওপর একটা গল্প চেয়েছিল। সে একটা সংকলন বের করছে। তাতে অনেকের সঙ্গে আমার লেখাও পেতে চাইছে।

শুনে তো আমি তাজ্জব। বলেছিলাম, ‘তোমাদের ম্যানুস্ক্রিপ্ট থেকে এডিটিং, এডিটিং থেকে প্রুফরিডিং, এমনকী, পাঠকের কাছে ডেলিভারি পর্যন্ত সবই তো অনলাইন। তোমরাই আবার অফলাইনে যাচ্ছ কেন অভ্র? এসব লোকে এখন বিশ্বাসও করে না। পড়েও না।’

উত্তরে অভ্রদীপ ভারি ইনটারেস্টিং একটা কথা বলেছিল।

কোভিড নাইট্টিন অর্থাৎ করোনা ভাইরাসের পৃথিবীজুড়ে সংক্রমণের পরে লোকে আবার এদিকেই মুখ ফেরাতে শুরু করেছে। অর্থভাণ্ডার আর বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক জ্ঞানভাণ্ডারের নাজেহাল দশা দেখেই আমাদেরই প্রাচীন শক্তিভাণ্ডারের খোঁজে নেমেছে। ইউ টিউবে যেভাবে স্রোতের মতো এসবের ওপর ভিডিও আসছে তা দেখেই তারা উজ্জীবিত হয়েছে।

বেশ কিছুদিন আগে দ্বিজুদার কাছে এরকমই একটা গল্প শুনেছিলাম। সেটা ‘পিশাচবাণ’ নাম দিয়ে লেখার সময় প্রগতিশীলরা আমায় কী ভাববে এই ভেবে অস্বস্তিই হচ্ছিল। দ্বিজুদা আমায় আশ্বস্ত করেছিল।

অভ্রদীপের জোরাজুরিতে আবার তার কাছেই ছুটতে হল। অন্যদিন দ্বিজুদাকে অনেক খেলাতে হয়। আজ আমার সাবজেক্ট শুনেই বলল, ‘ব্ল্যাক ম্যাজিক? হানাবাড়ি হাজারটা হলে, এটার ওপর কম করে পাঁচশো ঘটনা আছে আমার স্টকে। তন্ত্রমন্ত্র যে কী জিনিস যারা মানে না খোঁজাখুঁজির পরিশ্রমটা না-করেই তারা মানে না। আর যারা মানে তারাও সবটা খুঁজেই দেখেনি। তবে একটা ঘটনা বলি শোনো!’

দ্বিজুদা একটু চুপ করে থেকে ঘটনাটা ভাল করে ভেবে শুরু করল, ‘আমি যে-স্কুলে চাকরি করতাম সেখানকার এক ছোকরা মাস্টারমশাই ভবনাথের মুখে শুনেছিলাম ঘটনাটা।

ভবনাথের গ্রামে একজন লোক থাকত। সবল-পুষ্ট চেহারা। পরিষ্কার রং গায়ের। লোককে দরকার মতো অ্যালোপ্যাথ-হোমিওপ্যাথ-কবিরাজি-জড়িবুটি-টোটকা দিত। অর্শ-ভগন্দর-বাতবেদনার মাদুলি দিত। সাপে-কুকুরে কামড়ানোর বিষ নামাত।

এসব বললে লোকে এখন বিশ্বাস করবে না। বিজ্ঞান মঞ্চের লোকেরা তাকে পরীক্ষা করতে গিয়ে ফেল মেরে যাওয়ার সময় স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছিল, সামথিং ইজ দেয়ার।’

আমার কৌতূহল হল, ‘কী করে বিষ নামাত দ্বিজুদা?’

দ্বিজুদা বলল, ‘পরে বলব। ঘটনাটা বলি আগে। লোকটার সবই ভাল ছিল। দোষ ছিল একটাই। শুনে আঁতকে উঠবে। লোকটা মানুষের মাংস খেত। তাই গ্রামের লোকজন তাকে আড়ালে মড়িখেগো ডাক্তার বলত।’

আমি আঁতকে না-উঠলেও চমকালাম, ‘মানুষের মাংস খেত?’

দ্বিজুদা বলল, ‘অবাক হলে? এখনও সব জায়গায় ইলেকট্রিক চুল্লি হয়নি। গ্রামেগঞ্জে খুঁজেপেতে দ্যাখো, এমন লোক এখনও পাবে। এরা কেউ মরেছে খবর পেলেই যেখানেই থাকুক, কাজ ফেলে শ্মশানে ছোটে।

সেখানে গিয়ে শ্মশানযাত্রীদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে মড়া পোড়াতে লেগে যায়। লোকজনের সঙ্গে খোশগল্প জুড়ে তাদের অন্যমনস্ক করে চিমটে দিয়ে জ্বলন্ত মড়ার গা থেকে টুক করে একখাবলা মাংস তুলে দে দৌড়। ভবনাথের গ্রামের লোকটি যতই হোক কোয়াক ডাক্তার। এর ব্যাপারটা ছিল একটু আলাদা।’

আমি সোজা হয়ে বসলাম, ‘ইনটারেস্টিং ব্যাপার তো! কিছু ধর্ম সম্প্রদায়ের লোকজন একসময় নরমাংস খেত বলে শুনেছি। এখনও হয়তো খায়। তবে চেনা মুশকিল। তারাও এখন পোশাক-আশাক পরে ফিটফাট হচ্ছে বলে পড়েছি বইতে।’

‘হ্যাঁ। তাদের বিষ্ঠা-পরমান্নে সমজ্ঞান। খান-পান-স্থান কোনও কিছুরই বিচার করে না। পরিপূর্ণ ভেদবুদ্ধিহীন। জপধ্যানের বিচারসর্বস্ব পথ ঈশ্বরের কাছে পৌঁছনোর সদর পথ আর এদের পথ হল খিড়কির পথ। জমাদার তা দিয়ে আসা-যাওয়া করে। ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণই বলেছিলেন।

কিন্তু লোকটা তো তা ছিল না। বউ ঘেন্নায় তাকে ছেড়ে গেলে কী হবে? গ্রামের রীতিমতো মান্যগণ্য লোক। তার ওপর পয়সাওয়ালা। বিপদে-আপদে লোকে তার কাছেই ছোটে। তাই লোকে আড়ালে যা-ই বলুক, সামনাসামনি তাকে ঘাঁটাতে সাহস পেত না।

কেউ মরলে মৃতদেহ শুদ্ধির নাম করে চলে যেত শ্মশানে। ঝাড়ফুঁক করে, পিণ্ডি-টিন্ডি গিলিয়ে চিতায় তুলে মৃতদেহে আগুন দেওয়ার পর চিমটে দিয়ে একখণ্ড মাংস দক্ষিণা হিসাবে তুলে নিয়ে চলে যেত। লোকে ভয়েই কিছু বলতে পারত না।

নরমাংসাহার করায় লোকটার স্বাস্থ্য ভাল ছিল। রোগভোগও ছিল না। কিন্তু যতই হোক গরুছাগল তো নয়, মানুষের মাংস বলে কথা, তার ঠেলা সামলানো মুখের কথা?’

আমি আইডিয়া লাগালাম, ‘তোমাদের স্কুলের ভবনাথ নিজের চোখে দেখেছিল বুঝি মড়িখেগো ডাক্তারের পরিণতি?’

‘হাঁকপাক করো না অলীক! এক-এক করে সব আসবে।’ দ্বিজুদা আমায় ধমক দিয়ে থামিয়ে শুরু করল, ‘ভবনাথের মুখে ডাক্তারের কথা শুনে আমি ধরে বসলাম তাকে। আমি যাব। নিজের চোখে তাকে দেখে আসব। কিন্তু ভবনাথ আজ যাবে, কাল যাবে করতে লাগল। গেল না।’

আমার সন্দেহ হল ছোকরা বানিয়ে বলছে না তো? ভূতের গল্প দিয়ে আমি স্টাফরুম মাতিয়ে রাখি। ইয়াং মাস্টারমশাইরা আমাকে দেখলেই ‘ভূত! ভূত!’ করে ঘিরে ধরে। আমাকে টেক্কা দেওয়ার জন্য কথাটা বলেছিল ভেবেছিলাম। পরে বুঝেছিলাম ব্যাপার অন্য।

আসলে যতই শহরের স্কুলের শিক্ষক হোক, গ্রামে থাকে। ঘরদোর-পাড়া-প্রতিবেশী দেখে পাছে আমায় ধারণা খারাপ হয়, তাকে নিয়ে হাসাহাসি করি, অন্য মাস্টারমশাইকে বলে বেড়াই তার জন্যই আমায় এড়িয়ে যাচ্ছিল।

কিন্তু আমার তখন জেদ এসে গিয়েছে। সে কোথায় থাকে তার একটা আন্দাজ আগেই ছিল। তার সঙ্গে কথা বলে কায়দা করে ভাল করে ঝালিয়ে দুম করে একদিন চলে গেলাম তার গ্রামে।

সেদিন ছুটির দিন ছিল না। কাজেই ভবনাথ বাড়ি নেই। স্কুলে বেরিয়ে গিয়েছে। ট্রেন-বাস-ট্রেকার ঠেঙিয়ে, কিছুটা পথ পায়ে হেঁটে এগারোটা নাগাদ পৌঁছে গেলাম।

মাস্টার কেন ভয় পাচ্ছিল জানি না। মুণ্ডেশ্বরী নদীর তীরে ভারি সুন্দর গ্রাম। গাছপালায় ঠাসা নদীবাঁধের ওপর দিয়ে সরষেখেতের চোখ-জুড়ানো শোভা দেখতে-দেখতে গ্রামে পৌঁছে ডাক্তারের খোঁজ করতে শুরু করলাম।

গ্রামের লোক শহরের মানুষ দেখলেই চিনতে পারে। মুহূর্তমধ্যে ‘কে গো? কে?’ বলে অনেকে জুটে গেল। কে আমি। কোথায় বাস। ডাক্তারদাদুর খোঁজ করছি কেন জানার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়ল।

সত্যি বললে ভবনাথের কানে গেলে পাছে অসন্তুষ্ট হয়, নামধাম বানিয়ে জানালাম, ডাক্তারবাবুর কাছে অর্শের মাদুল নিতে এসেছি আমি।

লোকজন আর কথা বাড়াল না। ডাক্তারদাদুর বাড়ি দেখিয়ে দিল। গিয়ে দেখি ডাক্তার কাজে ব্যস্ত। কুকুর কামড়ের পেশেন্ট এসেছে। আমার প্রয়োজন শুনে ও শহরের মানুষ দেখে সমীহ করে ঘরেই চেয়ারে বসতে বলে নিজের কাজে লেগে গেল।

ডাক্তারের বয়েস কম করে ষাট। পরে শুনেছিলাম আশি। খালি গা। গা-ভরতি কুচকুচে কালো চুল। মাথার চুল একটাও পাকেনি। তবে গায়ের চুলের মতো ততটা কালো নয়। কামানো মুখ। নাভির তলায় মালকোঁচা-মারা ধুতি।

ঘরে পাখার বালাই নেই। কাজ করতে-করতে দরদর করে ঘামছে। ফরসা বুকের লোমে এঁকেবেঁকে ঘাম গড়াচ্ছে।

যাকে কুকুরে কামড়েছে তার বয়েস বেশি নয়। চব্বিশ-পঁচিশ বছরের ছেলে। আদুড় গা। পিঠে আঠার মতো আটকে আছে একটা থালা। সেই অবস্থায় তাকে একটা মাটির সরায় দাঁড় করিয়ে ডাক্তার মন্ত্র পড়তেই সরাটা বনবন করে ঘুরতে আরম্ভ করল।

দেখে তো আমার চোখ ঠিকরে গেল। একসঙ্গে এতগুলো অবিশ্বাস্য ঘটনা চোখে দেখিনি অলীক।

প্রথম হল থালাটা তার পিঠে আটকে আছে কী-করে? মাটির সরায় দাঁড়ালেই সেটা ভেঙে যাওয়ার কথা। ভাঙছে না। তার চেয়েও অবাক কাণ্ড, সেটা তাকে নিয়ে ঘুরছে! অবিশ্বাস্য বললে সবটা বলা হয় না। আমার মনে হচ্ছিল চোখের সামনে অলৌকিক ঘটনা ঘটছে।

চেয়ে থাকতে-থাকতে হঠাৎ দেখি ছেলেটা মাথা ঘুরে পড়ে গেল ডাক্তারের কোলে। মন্ত্র পড়ে সরা থামিয়ে ডাক্তার তাকে একটু জিরিয়ে নিতে বলল। একটু জিরোতে দিয়ে আবার তাকে সরায় তুলে ঘুরিয়ে দিল সরা।

এইভাবে থেমে-জিরিয়ে কয়েকবার তাকে সরায় ঘোরানোর পর হঠাৎ ফটাস করে সরাটা ভেঙে গেল। সঙ্গে সঙ্গে তাকে টেনে সরিয়ে তার পিঠের থালাটা খুলে জিনিসপত্র সব সাইড করে ডাক্তার কপালের ঘাম মুছে বলল, ‘বাড়ি যা! বিষ নেমে গিয়েছে।’

ছেলেটা আর দাঁড়াল না। বাইরে অপেক্ষায় বসে-থাকা লোকজনকে ডেকে দক্ষিণা দিয়ে চলে গেল।

ডাক্তার ঘরের তার থেকে গামছা পেড়ে গায়ের ঘাম মুছতে-মুছতে এবার তাকাল আমার দিকে। খুঁটিয়ে দেখে শুরুতেই দিল ধাক্কা আমায়। বলল, ‘অর্শের মাদুলি চাই? না, অন্য মতলব?’

আমি চমকালেও বাইরে তা প্রকাশ না-করে বললাম, ‘মাদুলি নিতেই এসেছি ডাক্তারবাবু।’

‘দেখে তো মনে হচ্ছে না!’ লোকটা সামনে এসে দাঁড়াল, ‘বিজ্ঞান মঞ্চের লোক বলেই ঠাওর হচ্ছে আপনাকে। আবার পরীক্ষা করতে এসেছেন? এখনও শিক্ষা হয়নি আপনাদের?’

আমি বললাম, ‘নিজের চোখে যা-দেখলাম, পরীক্ষা করলেও পাস করতে পারব না। পায়ের তলায় ঘুরন্ত সরা। পিঠে থালা। সরাও ভাঙছে না। থালাও খসছে না। অবিশ্বাস্য ব্যাপার!’

ডাক্তার দেখছিল আমায়। একটু যেন বিশ্বাস হল তার আমাকে। বলল, ‘থালা খসবে কী করে? বিষ যদি লাগে তবেই চুম্বকের মতো পিঠে সেঁটে যাবে। যতক্ষণ বিষ থাকবে পঞ্চাশজন পালোয়ান মিলে টানলেও খুলবে না। দেখলেন তো, বিষ নামার পরই খুলে এল। সরাও ভেঙে গেল।’

‘দেখলাম। এসব বিদ্যা শিখেছিলেন কোথায়?’

ডাক্তার খুশি হল। বাইরে থেকে চেয়ার এনে আমার পাশে বসে বলল, ‘এ আমার দাদুর কাছে শেখা। দাদু শিখেছিল আমাদের শ্মশানের এক সাধুবাবার কাছে। তিনি ছিলেন মড়িখেগো সাধু।’

মড়িখেগো সাধু! এ যে মেঘ না-চাইতেই জল! যে-লাইন ধরতে এসেছি পেয়ে গেলাম।

‘মড়িখেগো সাধু! সব্বোনাশ!’ বোকার মতো বলেই বসলাম, ‘তারা তো ভয়ংকর শুনেছি। শ্মশানে থাকে। মানুষের মাংস খায়।’

‘বেশ করে খায়!’ গায়ে লাগল ডাক্তারের, ‘নরমাংস ভক্ষণ করলে মানুষ দীর্ঘায়ু হয় জানেন?’

আমি দেখলাম বেশি কায়দা মারলেই বিপদ। চুপ করে রইলাম। এমন ভাব করলাম মড়িখেগো সাধুদের ভয়ংকর বলে মহা অপরাধ করেছি।

ডাক্তার একটু চুপ করে রাগ হজম করে জানাল, নরমাংস সকলের পেটে সয় না। আমাদের মতো গ্রীষ্মপ্রধান দেশের লোকের পেটে তো নয়ই। দীর্ঘকালের অভ্যাস অথবা বিশেষ বিদ্যা ছাড়া খাওয়া বিপজ্জনক।

আমি জানতে চাইলাম, ‘ওই বিশেষ বিদ্যা কি আপনার দাদু ওই সাধুর কাছ থেকেই শিখেছিলেন?’

ডাক্তার মাথা নাড়াল, ‘না! না! দাদুর দৌড় ছিল ঝাড়ফুঁক-টোটকা, তেলপড়া, জলপড়া, বাটিচালান, বিষনামান থেকে বড়জোর কপালকথন কি কপালক্রীড়া।’

আমি জিগ্যেস করলাম, ‘কপালকথন আর কপালক্রীড়া কী?’

ডাক্তার উত্তর দিল, ‘কপাল মানে নরকপাল। মন্ত্রপূত নরকপালের কাছে ভবিষ্যৎ জানা। কপাল নড়লে উদ্দেশ্য সিদ্ধ হবে। না-নড়লে হবে না। আর কপালক্রীড়া মানে মড়ার খুলির একটার সঙ্গে অন্যটার লড়াই লাগিয়ে দেওয়া। গড়াতে-গড়াতে এসে তারা ঠকাঠক, ঠকাস ঠক করে নিজেদের মধ্যে লড়াই জুড়ত। মজার ব্যাপার! ওসব শিখতে গেলে শ্মশানক্রিয়া করতে হয় বলে দাদু আমায় শেখায়নি। বিশেষ বিদ্যাও দাদু জানত না।’

‘তবে কার কাছ থেকে শিখেছিলেন আপনি?’

‘সিঙ্গুরের এক প্রেতসিদ্ধ সাধুর কাছ থেকে।’

‘তিনি কি এখনও বেঁচে আছেন?’ আমার কৌতূহল হল।

উত্তরে আমায় হতাশ করে ডাক্তার জানাল, ‘সে কি আজকের কথা? বিশ বছর হয়ে গেল মারা গিয়েছেন উনি। এক আমবাগানে পঞ্চমুণ্ডির আসন করে আশ্রম করে বসেছিলেন। একসময় রেগুলার যাতায়াত করতাম সেখানে। সাক্ষাৎ পিশাচসিদ্ধ। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে তবে আদায় করেছিলাম বিশেষ বিদ্যা।’

আমি অবাক হয়ে চেয়ে রইলাম তার দিকে। কিন্তু তখন কি জানতাম অলীক, তেমন পাল্লায় পড়লে বিশেষ বিদ্যাও ফেল মেরে যায়! ব্যাখ্যারও যেমন বড় ব্যাখ্যা হয়, বিদ্যার চেয়েও বড় বিদ্যা ঘাপটি মেরে বসে থাকে।’

দ্বিজুদা থামল।

একবার ধমক খেয়েছি। নরমাংস খাওয়ার বিদ্যা কী করে ফেল মারে নিজেই বলবে ভেবে কৌতূহল দমন করে চেয়ে রইলাম।

দ্বিজুদা আমার ধৈর্যের পুরস্কার হিসেব সোফা থেকে উঠে কিচেনে গিয়ে চা আর চিনেবাদাম নিয়ে চলে এল। সঙ্গে থিন অ্যারারুট বিস্কুট খান দুই। বেলা করে খেয়েছি। তার ওপর মড়া-খাওয়ার গল্পের যা-চোট, খাওয়ার ইচ্ছেই হল। বাদাম রেখে শুধু চায়ে চুমুক দিলাম।

দ্বিজুদার ভাবান্তর নেই। দিব্যি একমুঠো বাদাম মুখে ফেলে চিবোতে-চিবোতে শুরু করল, ‘সেদিন আর বিশেষ কথা এগোল না। অর্শের মাদুলি নিয়ে চলে আসছি, ডাক্তার বলল, ‘আমার পরিচয় কার কাছ থেকে পেলেন?’

এমন প্রশ্ন ফেস করতে হবে বলে আগেই উত্তর বানিয়ে রেখেছিলাম। তারকেশ্বরে আমার এক আত্মীয় থাকে। তার নাম বললাম। ডাক্তারের বিশ্বাস হল। মাথা নাড়াল। আমি ফিরে এলাম।

বাড়ি ফিরে কাজকর্ম সেরে খেয়েদেয়ে শবভক্ষণের আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যার ওপর বইপত্র খুলে বসলাম। সাধনার অঙ্গ হিসাবে কেন নরমাংস ভক্ষণের বিধান আছে তার ব্যাখ্যা পড়ে চমকে গেলাম। বুঝলাম ডাক্তার আগুন নিয়ে খেলছে।

হুঁ, ঠিক তাই। হাতেনাতেই প্রমাণ পেলাম বছরখানেক পরে ভবনাথের কাছে। আমাকে নিয়ে যাবে বলেও যায়নি। তাই ভয়ে ভয়েই আমায় একদিন বলল, ‘যাব-যাব করে যাওয়া হল না দ্বিজুদা। মড়িখেগো ডাক্তার যে মরে ভূত হয়ে গেল গো!’

আমি চমকে উঠলাম, ‘সে কী! ডাক্তার ডেড?’

‘হুঁ। সে যা-কাণ্ড ক’দিন ধরে! এখনও রাতে গ্রামে ভাল করে কারও ঘুম হয় না! ডাক্তারদাদু প্রেত হয়ে গ্রামের শ্মশানে ঘুরছে।’

এই বলে ভবনাথ যা-জানাল শিউরে উঠলাম।

ক’দিন আগে শ্মশানে মড়ার মাংস খেয়ে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছিল ডাক্তার। ভিনগ্রামের ডেডবডি ছিল। কীসের বডি, কী করে মরল জানা ছিল না। তার মাংস খেয়েই শরীরটা বেঁকে-তুবড়ে গিয়েছিল তার। চোখ গলে, চামড়া খসেফেটে শরীর দিয়ে রসরক্ত গড়াচ্ছিল। ভয়ে তার ঘরের ধারেকাছেই কেউ ঘেঁষছে না-দেখে একদিন নিজেই বেরিয়ে এল ঘর থেকে।

সাক্ষাৎ প্রেতাত্মার মতো শরীর কিলবিলিয়ে কাঁপতে-কাঁপতে হাঁটছিল আর হুংকার দিচ্ছিল। ইংরেজি মুভিতে যেমন বীভৎস চেহারার শয়তানদের দেখা যায় অবিকল সেই মূর্তি! দেখে ‘বাবাগো! মাগো’ বলে গ্রামের লোকজন লাগাল ছুট।

খবর পেয়ে থানা থেকে ছুটে এল পুলিশ। ততক্ষণে হাঁটতে-হাঁটতে ডাক্তার চলে গিয়েছে নদীর ধারের শ্মশানে। চিতায় শুয়ে গায়ে আগুন লাগিয়ে দিয়েছে। দাউদাউ করে জ্বলছে তার বডি। দেখতে-দেখতে পুড়ে ছাই হয়ে গেল।’

দ্বিজুদার মুখচোখের ভঙ্গি ও জীবন্ত বর্ণনা শুনে আমি যেন চোখের সামনেই দৃশ্যটা দেখতে পাচ্ছিলাম। গায়ে কাঁটা দিচ্ছিল। কিন্তু দ্বিজুদার হেলদোল নেই। বাদাম শেষ করে চা টেনে আরাম করে কাপে চুমুক দিয়ে বলল, ‘ডাক্তার কার মাংস খেয়েছিল আইডিয়া করতে পারো অলীক?’

‘কার?’

‘বলছি।’ দ্বিজুদা ধীরসুস্থে চা খেয়ে কাপটা প্লেটে রেখে ব্যাখ্যা জুড়ল, ‘বিশেষ বিদ্যার সাহায্যে নরমাংসভক্ষণের ক্ষেত্রে কিছু বিধি-নিষেধ মেনে চলতে হয়। আত্মঘাতে-অপঘাতে-অস্ত্রাঘাতে-সর্পাঘাতে-বজ্রপাতে-প্রেতাবেশে মৃত শব সাধকদের খাদ্য হিসাবে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। নারীসাধক হলে পুরুষ শব, পুরুষ হলে নারীশব গ্রহণও নিষিদ্ধ।

কিন্তু যাঁরা সাচ্চা সাধক তাঁদের কোনও বিধি-নিষেধ নেই। কারণ তাঁরা স্থূলদেহ নয়, ভক্ষণ করেন শবের সূক্ষ্মদেহ। শবের মানসিক ভাব নিজের শরীরে গ্রহণ করে নিজের ভাবকে নাশ করেন। যেমন বিষ দিয়ে হোমিওপ্যাথি বিষকে মারে, ঠিক তাই।’

আমি বললাম, ‘মোবাইল ফোনে সফটওয়ার চার্জ করে যেমন হার্ডডিস্ক সাফ করি আমরা, এটাও কি তাই?’

‘না! না। তাতে মোবাইলে তোমার ডেটাগুলোই শুধু ডিলিট হয়। মোবাইল তো নষ্ট হয় না। এক্ষেত্রে দেহ-মোবাইলটাই লুপ্ত হয়ে যায়। মহামুক্তি হয় সাধকের। যাকে বলে মহাপরিনির্বাণ।’

‘মানে মোক্ষমুক্তি?’

‘ঠিক তাই। জন্ম জন্ম ধরে তাঁদের আত্মায় লক্ষকোটি ভাবের যে-জামাটা টাইট হয়ে চেপে বসেছিল তা পরের ভাবে জর্জরিত হয়ে খসে যায়। আর জন্মাতে হয় না তাঁদের।’

দ্বিজুদা থামল।

তার কথার অর্ধেকই আমার মাথার ওপর দিয়ে বেরিয়ে গেলেও একটা জিনিস বুঝলাম। আন্দাজও করলাম। কপাল ঠুকে বলেই ফেললাম, ‘মড়িখেগো ডাক্তার কি ভূতেধরা ডেডবডির মাংস খেয়েছিল দ্বিজুদা?’

দ্বিজুদা চমকে গেল, ‘অ্যাঁ! কী করে বুঝলে?’

আমি উদ্দীপ্তভাবে বললাম, ‘ওই যে প্রেতাবেশ কথাটা বললে? ঝট করে মাথাটা খুলে গেল।’

দ্বিজুদা সায় দিয়ে বলল, ‘তখন অবশ্য জানা যায়নি। অনেক পরে জানা যায়। ভিন-গাঁ থেকে যে-লোকটার বডি শ্মশানে এসেছিল তার মৃত্যু হয় এক প্রেতিনীর হাতে।

প্রেতিনীটা ছিল তারই বউ। তার কুষ্ঠরোগ হওয়ায় লোকটা তাকে ঘর থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিল বলে সে গায়ে আগুন দিয়ে মরেছিল। দু-দু’জন ওঝা মিলে চেষ্টা করেও লোকটার ঘাড় থেকে তাকে নামাতে পারেনি। তাই দুইয়ে দুইয়ে চার। ডাক্তারকেও সেভাবেই মরতে হয়েছিল। মরার পরে শ্মশানেই থাকে এখন। অনেকেই তাকে দেখেছে বলে ভবনাথই জানিয়েছিল।’

দ্বিজুদা থামল। মুখে আমার কথা নেই দেখে মুচকি হেসে বলল, ‘কী বুঝলে অলীক?’

আমি বললাম, ‘বুঝলাম কালজাদু মানে আগুন নিয়ে খেলাই বটে!’

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev