| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

আহমাদ মোস্তফা কামাল-এর ছোটগল্প ‘সুশীল সমাজ’

Reporter
আহমাদ মোস্তফা কামাল / ৫৩৯ জন পড়েছেন
আপডেট বুধবার, ১৫ মার্চ, ২০২৩

আমার খুব চুষিল অইতে মন চায়, কী করন যায় ক তো দুস্ত!’—পরীবাগের কোনায় দাঁড়িয়ে চা খেতে খেতে খুব আন্তরিক গলায় এবং সিরিয়াস ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করল শাজাহান। ওর ঠাট্টা-দুষ্টুমি আর সিরিয়াসনেসের ভেতরে পার্থক্য নির্ণয় করা যে-কারো পক্ষেই খুব কঠিন। সিরিয়াস ভঙ্গিতে ঠাট্টা করা আর ঠাট্টার ভঙ্গিতে সিরিয়াস আলোচনা করা ওর পুরনো স্বভাব। সারাক্ষণ আমুদে মুডে থাকে বলে কারো পক্ষেই বোঝা সম্ভব হয় না, কথাগুলো সে সিরিয়াসলি বলছে নাকি দুষ্টুমি করছে! আনোয়ার ব্যাপারটা বোঝার জন্য একটু নির্লিপ্ত গলায় বলল—

‘এই যে বাক্যটা বললি তাতেই প্রমাণিত হয়ে গেল—তুই জীবনেও কোনোদিন সুশীল হতে পারবি না!’

‘ক্যান, ক্যান? পারুম না ক্যান? সমস্যাডা কী?’

‘সমস্যাটা হলো তোর ভাষা!’

‘বাষা! আমার বাষা কী দুষ করলো?’

‘এইরকম বর্বর ভাষা নিয়ে সুশীল হওয়া যায় নাকিরে গাধা? কোনো সুশীলকে এই ভাষায় বথা বলতে শুনেছিস?’

‘তা শুনি নাই। তাই বইলা তুই আমার বাষারে বর্বর কইলি? এইটা তো তোরও বাষা।’

‘বাষা না ইডিয়ট, শব্দটা ভাষা!’

‘ওই অইলো আর কি! তাই বইলা তুই বর্বর কইবি!’

‘বলবো না কেন? সুশীল শব্দটাকে তুই বললি চুষিল! একজন শিক্ষিত মানুষ হয়ে তুই এরকম কথা বলিস কীভাবে? ছি!’

‘কী করুম ক, খালি মনে অয় উনারা সব রস চুইষা খাইতেছেন, আর আমাগো জন্য বরাদ্দ রাখতেছেন ছোবড়া!’

‘এই মেন্টালিটি নিয়ে তুই সুশীল সমাজের সদস্য হতে চাস! ছি। ছিহ!’

‘ছি ছি করস ক্যান? খারাপ কী কইলাম?’

‘ভালো-খারাপের প্রশ্ন না, প্রশ্নটা মানসিকতার। মনের মধ্যে সুশীল সমাজের প্রতি এইরকম ঘৃণা নিয়ে তো ওই সমাজের সদস্য হওয়া যায় না! একটু শ্রদ্ধা-ভক্তি তো থাকা দরকার!’

‘সেইটা আছে দুস্ত। খোদার কসম। ঘিন্না-টিন্না নাইক্কা, বিশ্বাস কর। আছে এক্কেরে বিশুদ্ধ মুগ্ধতা আর নির্ভেজাল শ্রদ্ধা। কেমনে তারা সব সুবিধা ভোগ কইরা নিজেরা সুশীল সাজছে, আর আমাগো ঠেইলা দিছে প্রান্তিক সীমায় ভাইবা টাস্কি খায়া যাই! মানে উনারা সুশীল, দেশের বাদবাকিরা সব কুশীল। উনারা সিভিলাইজড, আমরা সবাই আনসিভিলাইজড! এই সিভিলাইজডরা যে প্রিভিলাইজ ভোগ করতেছেন, আমারও সেইটা ভোগ করতে মন চায়, সেইজন্যই তো সুশীল অইতে চাই।’

‘পারবি না, কোনোদিন পারবি না।’

‘মন ভাইঙা দিস না দুস্ত, আমি তো কুনু দুষ করি নাই, তাইলে পারুম না ক্যান?’

‘ওই যে বর্বর ভাষা…’

‘আইচ্ছা, আর চুষিল কমুনা, তাইলে অইবো?’

‘উহু, হবে না। এই যে ভাষাকে বললি ‘বাষা’, দোষকে বললি ’দুষ’, দোস্তকে বলিস ‘দুস্ত’—এইরকম আঞ্চলিকতাদুষ্ট ভাষা নিয়ে সুশীল হওয়া যায় না।’

‘কী করুম ক! ফিরাইতে পারি না। বাপদাদার বাষা…’

‘সুশীল যে হতে পারবি না, এটাও তার আরেকটা প্রমাণ।’

‘আবার কী করলাম? কোনডার কতা কস?’

‘এই যে বাপদাদাকে ভুলতে পারিস না, উনাদের ভাষাকে এখনো নিজের ভাষা হিসেবে বহন করে চলেছিস! সুশীল হতে হলে তো এইসব ঝেড়ে ফেলতে হবে বন্ধু।’

‘হ। তা অবশ্য ঠিকই কইছস! আমাগো নিয়াজও তো কী সুন্দর সব ঝাইড়া ফেলতেছে!’

‘নিয়াজ আবার কী করলো?’

‘না, কিছু করে নাই। কইলাম নিজের শরীল থিকা চিহ্নটিহ্ন সব মুইছা ফেলতেছে। সুশীল হওয়ার দৌড়ে ও অনেক আগায়া গেলরে দুস্ত।’

‘বুঝলাম না! হঠাত্ ওর পেছনে লাগলি কেন আবার?’

‘সামনে লাগার মতো ওর কিছু নাই তো, তাই পিছনে লাগি।’—বলে অশ্লীল ভঙ্গিতে খ্যাক খ্যাক করে হাসতে থাকে শাজাহান।

‘হারামি। তুই আর মানুষ হইলি না! তোর সাথে কথা বলাই পাপ। বসে বসে আঙুল চোষ, আমি যাই।’—বিরক্ত হয়ে বলে আনোয়ার।

‘আহা খেপিস না দুস্ত। ক্যান কতাডা কইলাম সেইডা শুন।’

‘বল।’

‘আমরা তিনজনই তো একই এলাকা থিকা আইলাম। তিনজনেরই আঞ্চলিকতার টান আছিলো কথাবার্তার ভিত্রে। তুরা দুইজন কী সুন্দর ম্যানেজ কইরা ফেলাইলি, আমি পারলাম না। আবার দ্যাখ, তুই এত শুদ্ধ ভাষায় কথা কয়াও সুবিধা করবার পারতেছস না, সুশীলও হইতে পারতেছস না। আর নিয়াজ! মাথা ধইরা ঝাঁকি দিলে ঠনঠন কইরা বাজে, ঘিলুতে কিচ্ছু নাইকা, তাও স্টার! টকশো স্টার! কেমনে অইলো? শুদ্ধ বাষায় কতা কওন ছাড়া ওর কতাবার্তার মধ্যে আর আছেটা কী? যেই থোড়-বড়ি-খাড়া সেই খাড়া-বড়ি-থোড়।’

‘তুই জেলাস! নিয়াজকে তুই হিংসা করিস!’

‘হ করি তো! আমিও তো ওইরকম হইতে চাই। পারতেছি না। হিংসা করুম না ক্যান?’

দুই

তারা তিনজন—শাজাহান, আনোয়ার আর নিয়াজ সত্যিই একই শহর থেকে পড়তে এসেছিল ঢাকায়। মফস্বল শহর, তবে তখনও গ্রামের আবহ থেকে বেরোতে পারেনি সেটি। সন্ধ্যার পরপরই নিঝুম হয়ে যেত সারা শহর, তারা তিনজন আরো কয়েক বন্ধুর সঙ্গে একটু আড্ডাবাজি করে বাড়ি ফিরলে মায়ের বকুনি খেতে হতো—‘রাত দুইফরে উনি ফিরলেন! না ফিরলেই অইতো! রাইতটা বাইরে গিয়া ঘুমাইলেই পারস!’ অথচ তখন হয়তো দশটাও বাজেনি!

এইচএসসি পরীক্ষায় তিনজনেরই রেজাল্ট বেশ ভালো হলো। এতটা ভালো হবে, তারা ভাবতেও পারেনি। অবশ্য এসএসসি পরীক্ষায়ও রেজাল্ট ভালো হয়েছিল—তখন সেটাকে মনে হয়েছিল দুর্ঘটনা, মানে হঠাত্ ঘটে যাওয়া ঘটনা। ফলে শহরের একমাত্র সরকারি কলেজে ভর্তি হতে পেরেই খুশি হয়েছিল তারা। কিন্তু পরপর দু’বার বোর্ড পরীক্ষায় ভালো রেজাল্টকে নিশ্চয়ই দুর্ঘটনা বলা যায় না! এবার আর তাদেরকে ওই শহরে থাকতে দেয়া হলো না। মানে, স্কুল-কলেজের শিক্ষকরা প্রায় নিয়মিত বাড়িতে আসতে শুরু করলেন, মা-বাবাকে বোঝাতে লাগলেন, সাহস দিতে লাগলেন, কলেজের প্রাক্তন ছাত্রদের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দিলেন, তারপর প্রায় জোর কারে পাঠিয়ে দিলেন ঢাকায়। ঢাকা তাদের কাছে অচেনা শহর, কী থেকে কী করতে হবে, বুঝতেই পারছিল না। প্রায় কিছুই না-জেনে না-বুঝে তারা বসল ভর্তি পরীক্ষার যুদ্ধে, এবং বিস্ময়করভাবে তিনজনেই ‘টিকে গেল’ একসঙ্গে! সত্যিই ‘চান্স’ পেয়েছে জেনে তাদের বিস্ময়ের সীমা রইল না। নিয়াজ ইকোনমিক্সে, আনোয়ার ফিজিক্সে আর শাজাহান সোশিওলোজিতে। তিনজন তিন ডিপার্টমেন্টে, তাদের প্রত্যেকেরই আলাদা আলাদা বন্ধুবৃত্ত হলো, একজনের বন্ধু মানে অন্য দুজনেরও বন্ধু, কিন্তু এই অনাত্মীয় শহরে তিনজন একসঙ্গে আসার পর যে আত্মার সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল, সেটি অক্ষুণ্নই রইল। এতদিন পরও সেটি অক্ষুণ্নই আছে। তারপর কত কত বছর পার হয়ে গেল, একেকজনের জীবন বেঁকে গেল একেকদিকে, তবু পুরনো দিনগুলোর কথা ভোলেনি তারা। এখনো আগের মতোই ঝগড়াঝাঁটি হয়, তর্কবিতর্ক হয়, আবার নিজেদের গোপন কথাগুলো কেবল তিনজনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। যদিও ব্যস্ততা আর বাস্তবতা, রুচি আর পছন্দ এখন তিনজনকে এক বিন্দুতে মেলাতে হিমশিম খেয়ে যায়, তবু সুযোগ পেলেই তারা পুরনো দিনের মতো আড্ডায় মাতে।

পড়াশোনা শেষ করে আনোয়ার যোগ দিলো বিশ্ববিদ্যালয়ে, নিয়াজ একটা গবেষণা প্রতিষ্ঠানে, আর শাজাহান এসবরে কিছুই করবে না বলে ব্যবসা শুরু করল। নিয়াজ আর আনোয়ার দুজনেই বিদেশ থেকে ঘুরে এসেছে, গলায় ঝুলিয়েছে পিএইচডি ডিগ্রি, পোশাক-আশাকেও এসেছে পরিবর্তন, বিশেষ করে নিয়াজের। তার চাকরিটাই এমন যে সর্বক্ষণ নাকি টাই পরে থাকতে হয়। এই নিয়ে শাজাহান তাকে নিয়মিতই খেপায়, বলে—‘দুস্ত, তুই টাই পইরা আসিস না। টাই পরা দেখলেই আমার গলায় দড়ি লাগানো গরুর কতা মনে পইড়া যায়, মনে অয়—দড়ি ধইরা টাইনা গোয়াল ঘরে রাইখা আসি।’ ওর এইসব টিপ্পনি সহ্য করা ছাড়া উপায় নেই নিয়াজের, যেমন ছিল তেমনই আছে শাজাহান, কথায় কথায় টিপ্পনি কাটবেই। যদিও বড় ব্যবসায়ী, কিন্তু হাবভাবে তার প্রকাশ নেই শাজাহানের। জিজ্ঞেস করলে বলে—

‘করি ফাটকাবাজির ব্যবসা, চেহারার পরিবর্তন কেমনে হইবো ক?’

‘ফাটকাবাজির ব্যবসা আবার কী?’

‘ওই শেয়ার বাজারের ব্যবসা। ফাটকাবাজি ছাড়া ওইটারে আর কী কওন যায়?’

‘শেয়ার ব্যবসা ফাটকাবাজি?—নিয়াজ রাগ করে—‘সারা পৃথিবীতে এটা দিয়ে দেশের অর্থনীতির সূচক পরিমাপ করা হয়, জানিস?’

‘সারা দুনিয়ার কথা বাদ দে। বাংলাদেশের কথা ক। আর বইয়ের ভাষায় কথা কইস না দুস্ত।’

‘বাংলাদেশ দুনিয়া থেকে আলাদা নাকি?’

‘হ আলাদা। এত পড়াশোনা কইরা এইটা বুঝস নাই? গরু কোনহানকার!’

‘এই, গালাগালি করবি না!’

‘গালাগালি করলাম নাকি? গরু তো একটা উপকারী প্রাণী। তোগো অর্থমন্ত্রীর চেয়ে উপকারী। তোরে কিন্তু অর্থমন্ত্রীর থিকা বেশি সম্মান দিছি দুস্ত।’

‘শালা! জানোয়ারই রয়ে গেলি।’

‘এখন তো তুই গালি দিতেছস!’

‘তোকে গালিই দেয়া উচিত। এত বড়ো ব্যবসায়ী হয়েছিস অথচ এখনো চাষাভূষার মতো কথা বলিস। তোর মতো টাকাপয়সাওয়ালা লোকজন সমাজের কোথায় উঠে গেছে, এখন তাদের ইচ্ছেতেই দেশ চলে, আর তুই…’

‘বেশি চিল্লাইস না নিয়াজ। তোগো মতো চুষিলরাই এই অবস্থা তৈরি করছে!’

‘সুশীল সমাজের কী দোষ? রাজনীতিবিদরা ব্যর্থ হলে কাউকে না কাউকে তো কথা বলতে হবে।’

‘হ! কথা তো না, হালুয়া-রুটির ধান্দা করা।’

‘সুশীল সমাজ ওইসব ধান্ধা করে না।’

‘চুষিলগো অবস্থা দেখলেই তো সেইটা বুঝা যায়! হক্কলের বাপদাদাই মাঠের কৃষক বা কলকারখানার শ্রমিক, কুলি-মিন্তি-দিনমজুর আছিল। আর এগো অবস্থা দ্যাখ। গলায় একখান টাই বান্ধে, মুখে বইয়ের বাষা, দ্যাশের তাবত্ সমস্যা তেনারা একলাই সমাধান কইরা দিতে পারেন বইলা মনে লয়! কে কইবো যে ইনাগো অরিজিন পইড়া রইছে মাঠেঘাটে, গ্রামগঞ্জের ধুলায় গড়াগড়ি খাইতেছে ইনাগো পূর্বপুরুষগো স্মৃতি!’

‘তো? গ্রাম থেকে এলে গ্রামেরই রয়ে যেতে হবে নাকি? পূর্বপুরুষরা ধুলায় গড়াগড়ি খেতো বলে উত্তরপুরুষরাও খাবে নাকি? ইডিয়ট!’

‘হ, আমি ইডিয়টই। তুই গিয়া সুশীলগিরি চোদাইতে থাক!’

তিন

তাদের এইসব তর্ক চলতে থাকে দিনের পর দিন। যেন অন্তহীন, যেন কোনোদিনই শেষ হবার নয়। ওদিকে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। দুই বড়ো দল মুখোমুখি যুদ্ধে লিপ্ত, ক্ষমতাসীন দল চায় পুতুল তত্ত্বাবধায়ক সরকার দিয়ে নির্বাচন করিয়ে নিতে আর বিরোধী দল সঙ্গত কারণেই তা মানবে না কিছুতেই। সারাদেশে উত্তেজনা আর সংঘাত। আর এই সুযোগে সুশীল সমাজ নানারকম তত্ত্ব নিয়ে হাজির হলেন। রাজনীতিবিদদের দিয়ে যে কিছুই করা সম্ভব নয়, রাষ্ট্র পরিচালনায় সুশীল সমাজের অংশগ্রহণ যে খুবই জরুরি, সেকথা বলতে বলতে তারা প্রায় মুখে ফেনা তুলে ফেললেন। যোগ্য প্রার্থী আন্দোলন, সত প্রার্থী আন্দোলন ইত্যাদি নাম দিয়ে ক্রমাগত প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে তারা এ কথা বিশ্বাস করাতে সক্ষম হলেন যে, সুশীল সমাজই এদেশের প্রকৃত কাণ্ডারি হওয়ার যোগ্য। দেশের গরিব মানুষেরা এদের কথায় কান না দিলেও শহুরে মধ্যবিত্ত-উচ্চবিত্তরা এইসব কথাবার্তা অবলীলায় বিশ্বাস করল। একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের দেশীয় শাখা এক রহস্যময় গবেষণায় বারবার এদেশের কপালে ‘শীর্ষ দুর্নীতিবাজ’ নামক কলঙ্ক-তিলক এঁকে দিয়ে এটাকে এক অকার্যকর রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের কাছে পরিচয় করিয়ে দিতে লাগল। যে দেশের নব্বইভাগ খেটে খাওয়া মানুষের দুর্নীতি করার কোনো সুযোগই নেই, নানারকম প্রাকৃতিক ও মনুষ্যসৃষ্ট দুর্যোগ-দুর্বিপাকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে, উদয়াস্ত পরিশ্রম করে যারা ফসল ফলায়, অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে কলকারখানা চালায়, তারা বিনা কারণেই এই কলঙ্ক-তিলক তাদের কপালে বহন করতে লাগল বছরের পর বছর ধরে।

যাহোক, সুশীল সমাজের এতসব সোরগোলের ধারাবাহিকতায়, নানা ঘটনা-দুর্ঘটনা পেরিয়ে দেশে এল এক সুশীল সরকার। আর তারা যে শক্ত সমর্থন নিয়েই এসেছেন, তাদের ক্ষমতা যে আকাশচুম্বি সেটা বোঝানোর জন্য এসেই সরকার প্রধান জানালেন, তারা আর্মি ব্যাকড গভর্মেন্ট! আর কী লাগে! আর্মির সমর্থন থাকলে তো আর জনগণের সমর্থন দরকার হয় না। বাই ডিফল্ট ধরে নেয়া হয়, জনগণ তাদেরকে সমর্থন করতে বাধ্য!

এইসব নিয়ে শাজাহানের বিরক্তির সীমা ছিল না। বকাবাজির জন্য নিয়াজকে আর পাওয়াই যায় না, সে এখন খুব ব্যস্ত, টেলিভিশনে এই সরকারের প্রশংসা-কীর্তনে এক নাম্বার জায়গাটা দখল করার জন্য অতি ব্যগ্র। আর হবেই বা না কেন? তার বস যে এখন সরকারের মন্ত্রী, মানে উপদেষ্টা। শাজাহান তাই আনোয়ারের সঙ্গে গজর গজর করে।

‘দেখছস দুস্ত, সুশীলরা কী খেইলডা দেখাইতেছে!’

‘কোনটার কথা বলছিস?’

‘সব কিছুর কথা কইতেছি। দ্যাখোস না, ষোল কলা এক্কেরে পূর্ণ হয়া গেছে! দ্যাশে কোনো সমস্যাই আর নাই।’

‘না থাকলে তো ভালোই।’

‘হ ভালো। গত ছয় মাসে কী অবস্থা হইছে দেখছস? সবকিছুর দাম কয়েকগুণ বাড়ছে। গরিব মানুষরা কাজ হারাইছে। একদিকে পাওয়ার সিস্টেম ভাইঙ্গা পড়ছে আর অন্যদিকে বিদ্যুত্ সচিব কইতেছেন—দেশে বিদ্যুতের নাকি কোনো সংকটই নাই! একদিকে গরিব মানুষ খাইতে পাইতেছে না, ওইদিকে খাদ্যসচিব আরো এক ডিগ্রি বেশি কইতেছেন—দাম বাড়লেও মানুষের ক্রয়ক্ষমতা নাকি বাড়ছে। তিনি আবার উদাহরণও দিছেন—রিকশা ভাড়া বাড়ছে বইলা নাকি রিকশাওয়ালারা এখন সিটের ওপর আরাম কইরা বইসা ফিলটার টিপড সিগারেট খাইতেছে! অতএব আমরা যত সংকটের কথা কইতেছি, গরিব মানুষ নাকি সেইডা ফিল করতেছে না! এইসব কথা শুনলে কেমন লাগে ক? চান্দি গরম হয়া যায় না?’

‘তোর এত চান্দি গরম করার দরকার কী? দিনকাল খারাপ, চুপ করে থাকতে পারিস না?’

‘কেমনে চুপ থাকুম? জেনারেল সাহেব জনগণরে ভাতের উপ্রে থিকা চাপ কমাইতে কইছেন! ভাত বেশি খায় বইলা নাকি এই জাতি আগাইতে পারতেছে না! তাই তিনি আলু খাওয়ার পরামর্শ দিছেন। শালা! ভাত দেয়ার মুরোদ নাই, ভাতার হওয়ার শখ!’

‘তুই তো আর আলু খাচ্ছিস না! তোর এত মাথাব্যথা কেন?’

‘সেইডা তো কতা না, কথা হইলো—উনারা এইগুলা কওয়ার কে? উনারা জনগণরে ভাত দেন?’

‘আরে দোস্ত, এত কথা ধরতে নাই! বাদ দে।’

‘না ধইরা উপায় আছে? জেনারেলের আহ্বানে সাড়া দিয়া জনগণকে আলু খাইতে উত্সাহিত করনের লাইগা সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীরা টেলিভিশন ক্যামেরা ডাইকা কাঁটাচামচ দিয়া আলু খাওয়ার অভিনয় করতেছেন! ভাবতে পারস? আর একটা সাংবাদিকও জিগাইলো না—গরিব মানুষ না হয় আলু জোগার করলো, তাগো কাঁটাচামচ সরবরাহ করবো কে? নাকি কাঁটাচামচ শুধু আপনেগো জন্য, গরিবগো জন্য তো হাতই যথেষ্ট!’

হ্যাঁ, আনোয়ার নিজেও এগুলো খেয়াল করেছে। স্বাভাবিকভাবেই তার মনেও প্রশ্ন জেগেছে—জনগণকে নানাভাবে অপমান করা এবং জনগণকে নিয়ে ঠাট্টা-মশকরা বা তামাশা করার অধিকার তাদেরকে কে দিয়েছে? নাকি এটা তারা জন্মগতভাবে প্রাপ্ত হয়েছেন? হতেও পারে! সুশীল সমাজ নামটির মধ্যেই তো কেমন একটা সুশীল সুশীল ভাব আছে! কিংবা সিভিল সোসাইটি নামটির মধ্যে একটা সিভিলাইজড সিভিলাইজড ভাব! অর্থাত্ এই সুবিধাভোগী, দুধ-ননী-ঘি খাওয়া কতিপয় সুশীল ছাড়া আর সবাই কুশীল! আনসিভিলাইজড! শাজাহান ভুল বলে না।

চার

শাজাহান এইসব কথাবার্তা বন্ধুবৃত্তের বাইরেও বলা শুরু করেছিল কি না আনোয়ার তা জানে না। সময়টা খারাপ, সরকারের সমালোচনা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে, গণমাধ্যমগুলো পর্যন্ত নিতান্তই ভদ্র সেজে সরকারের গুণকীর্তন করে চলেছে—যেমনটি সব আর্মি সরকারের সময়ই ঘটে থাকে। এইরকম ক্রিটিকাল সময়ে ওরকম উল্টোপাল্টা কথাবার্তা বললে যে বিপদে পড়তে হবে তা তো জানা কথাই। শাজাহান পড়লোও। এক গভীর রাতে তার বউ আনোয়ারকে ফোন করে ভীতসন্ত্রস্ত কণ্ঠে জানাল, শাজাহানকে একদল লোক এসে ধরে নিয়ে গেছে। বউয়ের মিনতিতে কান না দিয়ে দরজা খুলেছিল, লোকগুলো কেনো কথা বলারই সুযোগ দেয়নি। আনোয়ার বুঝে গেল, ভয়াবহ বিপদে পড়েছে শাজাহান। এই সময়ে কে যে ধরা খাচ্ছে, কে যে নিখোঁজ হয়ে যাচ্ছে, তার কোনো ঠিকঠিকানা নেই। কারা ধরে নিয়ে গেছে সেটা আন্দাজ করা গেলেও নিশ্চিত কোনো প্রমাণ নেই, প্রমাণ থাকলেও কিছুই করা যেত না, হয়তো যাবেও না। তবু নিয়াজকে ফোন করে ঘটনা জানাল আনোয়ার। নিয়াজ চিন্তিত গলায় বলল—‘ও তো কোনো কথা শোনে না। কত বলেছি, উল্টাপাল্টা কথা বলিস না। তবু ও বলবেই। যাকগে, দেখা যাক খোঁজ পাই কি না।’ কিন্তু নিয়াজও পরদিন কোনো খোঁজ বের করতে পারল না। তারপর দিনও নয়। তৃতীয় দিনে সে খোঁজ আনল। বলল—

‘বেঁচে আছে এখনো। ছাড়িয়ে আনতে টাকা পয়সা লাগবে।’

‘অ্যারেস্ট করেছে নাকি?’

‘আরে না। অ্যারেস্ট করলে তো ভালোই হতো।’

‘তাহলে কারা ধরেছে? কোথায় রেখেছে?’

‘বুঝতেই পারছিস! আর না বুঝলে চুপ করে থাক। কথা বলে বিপদ ডেকে আনিস না।’

‘কত টাকা চায়?’

‘চেয়েছে তো এক কোটি!’

‘এক কোটি! বলিস কী!’

‘শাজাহান ব্যবসায়ী মানুষ, বেশি তো চাইবেই।’

‘এটা কোন ধরনের কথা? তোর না এত জানাশোনা? একটা ব্যবস্থা করতে পারলি না?’

‘নো ওয়ে ফ্রেন্ড। মার্শাল ল’র সময়ে সিভিলিয়ানদের কানাকড়িও মূল্য নেই।’

‘এখন মার্শাল ল’ চলছে নাকি?’

‘গাধার মতো কথা বলিস না। এই সরকার তো একটা মুখোশ মাত্র। কয়েকজন সিভিলিয়ানকে সামনে রেখে মার্শাল ল’কে জায়েজ করা।’

‘তবু তুই এই সরকারকে সাপোর্ট করিস?’

‘করব না কেন? যে দেশে রাজনীতি পচে গেছে সে দেশে মার্শাল ল’ই সমাধান।’

‘শাজাহানের মতো একটা নিরীহ লোককে ধরে নিয়ে গেছে, কোথায় আটকে রেখেছে কেউ জানে না। ছাড়াতে এক কোটি টাকা লাগবে, এই তোর সমাধানের ধরন? এই তোদের দুর্নীতির বিরুদ্ধে জেহাদ?’

‘এটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা। জগতে টিকে থাকতে হলে কৌশলী হতে হয়। শাজাহান ইডিয়টের মতো আচরণ করেছে বলেই এই ঝামেলায় পড়েছে…’

‘প্রশ্নটা তো শাজাহানকে নিয়ে নয়। নৈতিকতার প্রশ্ন এটা। শাজাহানের মতো আরো অনেক লোকই হয়তো সাফার করছে।’

‘ওই একই ব্যাপার। কৌশলী হতে পারেনি তারা। মার্শাল ল’র সময়ে তুমি উল্টাপাল্টা কথা বলবা আর তোমারে তারা চুমা দেবে, এইটা ভাবা বাড়াবাড়ি।’

‘তুই সত্যিই সুশীল হয়েছিস নিয়াজ। লেগে থাক। তোর হবে।’

‘কী হবে?’

‘এই দেশে বারবার আর্মি আসবে। আরেকটু বয়স হলে তুই এরকম এক সরকারের মন্ত্রী হতে পারবি!’

‘টিটকারি করিস না। শাজাহানের ব্যাপারে কী করা যায় বল!’

‘আমার মাথায় কিছু ঢুকছে না। এত টাকা…’

‘এটা ওর কাছে তেমন বড়ো কোনো অ্যামাউন্ট না।’

‘অবশ্যই বড়ো অ্যামাউন্ট। বেচারা যে কী অমানুষিক পরিশ্রম করেছে ব্যবসা করতে গিয়ে…’

‘তাতে কী! এই টাকা দিয়ে বেরিয়ে আসবে। তারপর লাইনঘাট করে আরো বড়ো অ্যামাউন্ট কামিয়ে নেবে।’

‘ও তা করবে না।’

‘করুক না করুক সেটা পরের ব্যাপার। এখন কী করবি বল!’

‘এত টাকা কোত্থেকে আসবে? ও তো নাই, টাকা জোগাড় করবে কে?’

‘ওর বউ পারবে মনে হয়। দেখা যাক।’

এরপর কীভাবে কী হলো আনোয়ার আর বুঝতে পারেনি। তবে কয়েকদিন পর বাসায় ফিরে এল শাজাহান। খবর পেয়ে আনোয়ার দেখা করতে এল। আর দেখেই মন খারাপ হয়ে গেল তার। শাজাহানের সারা শরীরে মারের চিহ্ন, মার খেয়ে কাহিল হয়ে পড়েছে সে। ঠোঁটে হাসি নেই, সার্বক্ষণিক ফূর্তিতে থাকতে যে পছন্দ করে, এখন তার চোখে-মুখে ভয় আর শঙ্কার চিহ্ন, অপমান আর বেদনার চিহ্ন। আনোয়ারকে দেখে সে কেবল এইটুকু বলতে পারল—‘সুশীল হতে চাইছিলাম দুস্ত। কিন্তু এত চেষ্টা কইরাও শরীর থিকা ঘাম আর মাটির গন্ধ দূর করতে পারি নাই। সেজন্যই আইজকা আমার এই দশা…’

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev