অনেকদিন আগেই চিকিৎসক আর পরিবেশবিদরা জানিয়েছিলেন, আমরা যে বাতাসে শ্বাস-প্রশ্বাস নিচ্ছি, সেই বাতাস দূষণের কারণে আমাদের মৃত্যুর কারণ হয়ে উঠছে। গোটা বিশ্বের বাতাসের মান পরীক্ষা করে আমেরিকার হেল্থ এফেক্ট ইনস্টিটিউট জানিয়েছিল, শুধুমাত্র বায়ুদূষণের কারণে প্রতি বছর গোটা পৃথিবীর প্রায় ৫০ লক্ষ মানুষের মৃত্যু ঘটছে। তাদের সমীক্ষায় এও জানা গিয়েছিল, আমাদের দেশে বায়ুদূষণের কারণে প্রতি বছর ১২ লক্ষেরও বেশি মানুষ মারা যান। অর্থাৎ সারা বিশ্বের ৯.৮৭ শতাংশ মানুষের মৃত্যুর জন্য দায়ী বায়ুদূষণ। ওই প্রতিষ্ঠানের সমীক্ষায় জানায়, বায়ুদূষণের কারণে মৃত্যুর তালিকায় সবার উপরে রয়েছে ভারত ও চিন।

হেলথ এফেক্ট ইনস্টিটিউট এবং ইনস্টিটিউট ফর হেলথ মেট্রিক্স অ্যান্ড এভালুয়েশন- আমেরিকার এই দুটি গবেষণা কেন্দ্রের গবেষণা জানাচ্ছে, বায়ু দূষণের কারণে আমাদের দেশে গত কয়েক বছরে এক লাখ ১৬ হাজারেরও বেশি শিশুর মৃত্যু হয়েছে৷ সাব সাহারায় এই সংখ্যা প্রায় দু’লাখ ৩৬ হাজার৷ গবেষকদের বক্তব্য, এসব শিশুদের মৃত্যু হয়েছে জন্মের একমাসের মধ্যে৷ গবেষকেরা এও জানান, শিশুদের মায়েরা গর্ভাবস্থায় উচ্চ মাত্রায় বায়ুদূষণের সংস্পর্শে আসার কারণে শিশুদের ওজন কম হয় এমনকি প্রি ম্যাচিওর বেবির জন্ম হওয়ার সংখ্যা বেড়ে যায়। গবেষকরা তাদের গবেষণায় দেখেছেন, রান্নায় ব্যবহৃত জ্বালানির বিষাক্ত ধোঁয়া শিশু মৃত্যুর একটি বড় কারণ। প্রি ম্যাচিওর এবং ওজনে কম শিশুর জন্মের জন্য জ্বালানির বিষাক্ত ধোঁয়া খুব বেশি দায়ী।
গোটা বিশ্বজুড়ে বায়ু দূষণ বাড়ছে মাত্রাতিরিক্ত হারে। সম্প্রতি ‘সায়েন্স অ্যাডভান্সেস’ জার্নালে প্রকাশিত একটি সমীক্ষা জানিয়েছে, গত ১৪ বছরে গ্রীষ্মপ্রধান শহরগুলিতে অতিরিক্ত মাত্রায় বায়ুদূষণের কারণে প্রায় ১ লক্ষ ৮০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। যদি বায়ু দূষণ বৃদ্ধির দ্রুত গতিকে এড়াতে ব্যবস্থা নেওয়া হত, তাহলে এই বিপুল সংখ্যক মানুষের মৃত্যু এড়ানো যেত। কিন্তু গ্রীষ্মমণ্ডলীয় দেশগুলি এ ব্যাপারে মোটেও সচেতন নয়, এমনকি তারা ওই বায়ু দূষণের দ্রুত গতিবৃদ্ধি রুখতে এখনও কোনও ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। গবেষকেরা জানাচ্ছেন, বিশ্বের প্রায় সমস্ত গ্রীষ্মপ্রধান শহরগুলিতেই অতিরিক্ত হারে নাইট্রোজেন ডাই অক্সাইড এবং সূক্ষকণা বাড়ছে। তাঁরা এও বলছেন, নাইট্রোজেন ডাই অক্সাইডের জন্য ১৪ শতাংশ এবং সূক্ষ্ম কণার জন্য ৮ শতাংশ পর্যন্ত স্বাস্থ্যের বিপদ বাড়ে। তবে বায়ু দূষণ বৃদ্ধির জন্য কেবলমাত্র নাইট্রোজেন ডাই অক্সাইড এবং সূক্ষ্ম কণা নয়, বাতাসে মিশ্রিত অ্যামোনিয়ার জন্য ১২ শতাংশ পর্যন্ত স্বাস্থ্যের বিপদ বাড়ে।

দ্রুত গতিতে বায়ু দুষণের কারণ কি? গবেষকরা গতি বৃদ্ধির কারন ব্যাখ্যায় দ্রুত গতিতে শিল্প বিস্তার, রাস্তার ট্র্যাফিক, বর্জ্য পোড়ানো, কাঠকয়লা ও জ্বালানী কাঠের ব্যাপক ব্যবহারকে দায়ী করেছেন। সম্প্রতি একটি গবেষনায় দেখা গিয়েছে, অবাধে জমি ব্যবহারের ছাড়পত্র, কৃষিজমির বর্জ্য সাফ করার জন্য উন্মুক্তভাবে বায়োমাস পোড়ানো ইতিমধ্যেই গ্রীষ্মমন্ডলীয় অঞ্চলগুলিকে অপ্রতিরোধ্যভাবে দুষিত করে ফেলেছে। বিজ্ঞানীরা বিশ্বের ৪৬টি শহরে গবেষণা চালিয়ে দেখেছেন যে নাইট্রোজেন ডাই অক্সাইড এবং পিএম ২.৫-এর মতো সুক্ষ্মকণা বৃদ্ধিরর জন্য বায়ু দূষণের মাত্রা ১.৫ থেকে ৪ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর সঙ্গে রয়েছে জনসংখ্যা বৃদ্ধি। এই দুই কারণে বায়ুমানের দ্রুত অবনতি ঘটছে এবং দূষণের মাত্রা বেড়েই চলেছে। পাশাপাশি অনুসারে বায়ু দূষণের কারণে বাড়ছে অকালে মৃত্যুর সংখ্যা।
গবেষনায় দেখা গিয়েছে অকালে মৃত্যুর সংখ্যা সবথেকে বেশি দক্ষিণ এশিয়ার শহরগুলিতে। বিশেষ করে ঢাকা ও বাংলাদেশে মোট ২৪ হাজার জন এবং ভারতের মুম্বই, ব্যাঙ্গালোর, কলকাতা, হায়দরাবাদ, চেন্নাই, সুরাট, পুনে ও আহমেদাবাদ মোট ১ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। অন্যদিকে দেখা গিয়েছে আফ্রিকার গ্রীষ্মমন্ডলীয় শহরগুলিতে মৃত্যুর সংখ্যা কমেছে। এখনই যদি ব্যবস্থা নেওয়া না হয় তাহলে আগামী দিনে বায়ু দূষণের কারণে মানুষের স্বাস্থ্যের উপর আরও খারাপ প্রভাব ঘটবে। অথচ আমরা অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা না নিয়ে এবং দ্রুত শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটাতে এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে বায়ু দূষণ বাড়িয়েই চলেছি। ২০১৭ সালে সারা পৃথিবীতে যত মৃত্যু ঘটেছে, তার ১৫ শতাংশ ঘটেছে দূষণের কারণে। ভারতে দূষণের মৃত্যুর পরিমাণ সবচেয়ে বেশি, ২৩ লক্ষ।

২০১৯ সালে যত মানুষের মৃত্যু হয়েছে তার মধ্যে ৬৬ লক্ষেরও বেশি মানুষ মারা গিয়েছে স্রেফ বায়ু দূষণের কারণে৷ সাম্প্রতিক একটি রিপোর্ট জানাচ্ছে, আমাদের দেশে বায়ু দুষণের কারনে মৃত্যুর সংখ্যা ভারত সর্বোচ্চ ১.৬৭ মিলিয়ন৷ অকাল মৃত্যু ১৭.৮ শতাংশ৷ রিপোর্ট জানাচ্ছে, এর আগে জল দূষণের কারণে ১.৩৬ মিলিয়ন মানুষের অকাল মৃত্যু ঘটে৷ সীসা ব্যবহারের কারণে আরও ৯ লক্ষ। জৈব্যবস্তু পোড়ানো দূষণের অন্যতম কারণ! আশচর্যের বিষয় আমাদের দেশে দূষণের উৎসগুলি নিয়ন্ত্রণ করার জন্য যন্ত্র এবং নিয়ন্ত্রক ক্ষমতা তৈরি হয়েছে কিন্তু দূষণ নিয়ন্ত্রণ প্রচেষ্টা নেই বললেই চলে৷ বায়ু দূষণের কারণে আমাদের দেশে কার্ডিওভাসকুলার রোগ বেড়েই চলেছে! প্রসঙ্গত, ভারতে বায়ু দূষণের কারণে ১.৬৭ মিলিয়ন মৃত্যুর মধ্যে ০.৯৮ মিলিয়ন পিএম২.ফাইভ দূষণের কারণে। পিএম-২.ফাইভ দূষণ মানে অতি-সূক্ষ্ম কণার উচ্চ ঘনত্বকে বোঝায় যা সাধারণত কোনও কিছু পোড়ানোর সময় তৈরি হয়৷ এই কণাগুলি ফুসফুসের গভীরে পৌঁছে রক্তপ্রবাহে প্রবেশ করে, যার পরিণতি কার্ডিওভাসকুলার রোগ।