গাছের নীচে স্বভাব-কবি। তার আঙুল চলে বাতাসে। লিখে চলে এক পৃথিবী মহাকাব্য। আকাশের দিকে তাকায়। নীল ইজেলের গায়ে আগুনঝরা সূর্য। গালে হাত মানুষটার। কবিসত্তা উধাও। এখন সে মাটির গন্ধমাখা লেখক। এবার ভুরু কুঁচকে তাকায় আকাশের দিকে। গনগনে রোদ জ্বালা ধরাচ্ছে গায়ে। উঠে পড়ে ও। হনহনিয়ে হাঁটা লাগায় বাড়ির পথে।
ইনাই আর বিনাই সকালে ক্ষেতে লাঙল টেনে এসে গোয়ালে খানিক জিরেন দিচ্ছিল। কত্তামা জাবনা দিয়ে গেল। খানিকটা চনমনিয়ে উঠে পরমসুখে ঘাড় নেড়ে জাবনায় মুখ দিয়েও ওরা চিবোতে ভুলে যায়। বাইরে থেকে আসা গরম হাওয়ার দিকে তাকায়। চোখের কোণ বেয়ে জল পড়ে। স্বভাব-কবি থুড়ি লেখক উঠে এসে ওদের মাথায় হাত বুলোয়।
মাধবীলতার কুঞ্জে ফুলের কলিগুলো এখনও পাপড়ি মেলতে দ্বিধাগ্ৰস্ত। এই বুঝি সৌরভ হারিয়ে যায় হাওয়ায় মাঝে কিংবা রোদের তাপে মলিন হয়ে যায় রঙের বাহার! মানুষটা এসে বসে রাস্তার ধারে তারকের সাইকেল সারানোর দোকানে। রিং-এ টায়ার লাগাতে লাগাতে কপালের ঘাম মোছে তারক। মানুষটার চোখ যায় রাস্তা পেরিয়ে দূরে আল বাঁধা ক্ষেতের জলে। কচি কচি ধানের চারা ওকে দেখে হেসে ওঠে। বলে আমরাও আছি, সময় হলেই আসব। মানুষটা তো স্বভাব-কবি, অনায়াসেই ওদের কথা শুনতে পায়। নিজের মনেই হাসে। বলে, “সবাই কি আর সময়ে আসতে পারে?”
তারক মৃদু ধমক দেয়, “আবার বকবকানি শুরু করেছ?”
মানুষটার যেন ঘোর লাগে। কোথায় হারিয়ে যায়। বলে, “আষাঢ়ের আকাশ দেখে রাধারাণী ব্যাকুল হলে তবেই কদম ফোটে। তখনই তো সবার আসার পালা। সে ওই ক্ষেতের চারার বুকে ক্ষীর জমানো ধান হোক বা তিনি।”
“তিনি আবার কে?” হাতের কাজ সরিয়ে তারক জিজ্ঞাসা করে। বিরক্ত হয় মানুষটা। উঠে যায়। কালভার্টের রেলিংয়ের ওপর গিয়ে বসে। পাশে জলে অযত্নে ফোটা বড়ো বড়ো পদ্ম পাপড়ির চামর দোলাচ্ছে। কানের কাছে বোঁওও করে পাক খেয়ে যায় ভ্রমর। ডানার আওয়াজে মানুষটা শুনতে পায়, ঐ যে তিনি আসছেন।
ধম্মেকম্মে স্বভাব-কবির তেমন একটা মতি নেই। দেব-দ্বিজের সামনে হাতজোড় করতে হয়, করে। তবে প্রসাদে তার অটল ভক্তি।
পাশেই ননীকাকার চায়ের দোকানে কেটলি থেকে ধোঁয়া উঠছে। মনে মনে ধোঁয়াগুলোকে নিজের কাছে টেনে নেয় মানুষটা। তারপর ধোঁয়াগুলোকে নিজের আঙুলে জড়িয়ে রোদের চাদরে মেঘ আঁকতে চায় ও। ধোঁয়াগুলো ফুস্ করে আঙুল ছেড়ে পালায়। মেঘ আর জমে না। খুব খারাপ লাগে ওর। টেরিয়ে টেরিয়ে ননীকাকাকে দেখে। লোকজনকে ভাঁড়ে ভাঁড়ে চা দিচ্ছে। লোকগুলো ভাঁড়ের চা শুদ্ধু ধোঁয়াগুলো সব মুখের ভেতরে ঢুকিয়ে পেটের মধ্যে চালান করে দিচ্ছে। মানুষটা ভাবে, ধোঁয়া না থাকলে মেঘ জমবে কিভাবে? চা খাওয়া লোকগুলোকে খুব খারাপ মনে হয় ওর।
ওর ভাবগতিক দেখে ননীকাকা জিজ্ঞেস করে, “কি ব্যাপার?” স্বভাব-কবি বলে, “আসবে কি করে?”
ননীকাকার সব তালগোল পাকিয়ে যায়। বলে, “কে?”
“আষাঢ়েই তো সবার আসার কথা।”, বলেই উঠে পড়ে মানুষটা।
ওর কথা সবকিছু বুঝতে না পারলেও মানুষটাকে বেশ লাগে ননীকাকার। তাই তাড়াতাড়ি বলে, “বসো বসো। সে তো আসবেই। তুমি বরং চা খাও।” এগিয়ে এসে ওর হাতে একটা চায়ের ভাঁড় ধরিয়ে দেয় ননীকাকা।
হাতে ভাঁড় নিয়ে ও আবার নিজের জায়গায় এসে বসে। ভাঁড়টা পাশে রাখে।
একটা চড়াই লাফালাফি করছিল ভাঁড়ের আশেপাশে। মজা পেয়ে স্বভাব-কবির মাথা দুলছিল। চড়াইটা গেল উড়ে। মানুষটা দেখল চড়াই ওর দুটো ঠোঁটের মধ্যে ধোঁয়াকে বন্দী করে হুস্ করে উড়ে গেল আকাশকে দেবে বলে।
স্বভাব-কবি আঙুল নাড়িয়ে হাওয়ায় কবিতা লেখে
ধোঁয়া জমছে , মেঘ ভাসছে, সে আসবে, দাগ রাখবে।
নেড়িটা ওর লেখার আওয়াজ শুনতে পায়। ডাক ছাড়ে, ভোওওওউ ভৌউউউ। মানুষটা হাসে। বোঝে ওর কথা। উত্তর দেয়, “কোথায়? শোন্ বলি, দাগ পড়বে পথে, মনে।”
ভোওওওউ, ডাক ছেড়ে নেড়িটা সরে যায়।
“যাঃ যাঃ, তোকে এসব বুঝতে হবে না।” হাত নাড়িয়ে নেড়িটাকে তাড়ায় ও।
অল্পবয়সী দুটো ছেলে এসে ওর পাশে দাঁড়ায়। চোখ কুঁচকে ওদের দিকে তাকায় ও। ওরা হাসে। মনটা নরম হয় স্বভাব-কবির। বলে, “সে আসবে।” ওরা আবারও হাসে। বলে, “রথে চড়ে”। মানুষটা খুশি হয়। ঘাড় নাড়ে। ওরা বলে, “বৃষ্টি নামলে পরে তবেই রথ আসবে। আবার রথ চলে গেলে বৃষ্টিও থেমে যাবে।” মানুষটার মুখটা করুণ হয়ে ওঠে। বলে, “আমি তো চেষ্টা করেই চলেছি।” ছেলেদুটো হাসে। বলে, “চেষ্টা তো তিনিই করবেন।”
মুখ ঘুরিয়ে নেয় মানুষটা।
ক্ষেত পেরিয়ে আকাশ ফুঁড়ে যেখানে দুটো তালগাছ মাথা ঠোকাঠুকি করছে চড়াই উড়ে গেল সেখানে। পাতার ফাঁকে ফাঁকে ছড়িয়ে দিল ঠোঁটে বন্দী ধোঁয়াগুলোকে। ধোঁয়ার গন্ধে ভয় পেয়ে নিজের বাসা ছেড়ে বেরিয়ে এল বাবুই। থরথর করে কাঁপছে ও। চড়াই খুশির কিচিরমিচির আওয়াজ তুলে ওর পাশে লাফিয়ে বেড়ায়। আশ্বস্ত হয় বাবুই। ধোঁয়া মেখে তালপাতা দুলে ওঠে। সরসর আওয়াজ হয়। পাতার নাচনে বেজে ওঠে হাজার ঝাঁঝর। ধোঁয়াগুলো কালো কুণ্ডলী পাকিয়ে পাতা ছেড়ে আকাশের গায়ে ছড়িয়ে পড়ে। নিমেষে চরাচরে আঁধার নামে। বাবুই ফুড়ুৎ করে বাসায় ঢুকে যায়। অন্ধকারে জোনাক পিদিম জ্বালতে হবে যে!
মেঘ গড়িয়ে বৃষ্টি নামে। বৃষ্টিস্নাত ধরায় আবেগের কল্লোলধ্বনি, তিনি আসছেন। মাধবীলতার কুঞ্জে কলির দল পাপড়ি মেলে দেয় ঊচ্ছ্বাসে। তার সুবাসে মাতোয়ারা হাওয়া। মাতাল হয় স্বভাব-কবির মন। ভেতর থেকে ডাক আসে, তিনি আসছেন।
অঝোরবৃষ্টি মাথায় নিয়ে মানুষটা পথের পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। সামনে দিয়ে চলেছে বলভদ্রের রথ। মাঝেমাঝেই থামছে। রাস্তায় শুয়ে পড়ে প্রণাম জানাচ্ছে ভক্ত। মানুষটার সবকিছু কেমনযেন গুলিয়ে যায়। ভাবে, এমনও হয়! কিসের টানে পথের মাঝে লুটিয়ে পড়ছে ভক্তের দল! ভাবতে ভাবতেই রথ চলে যায়। পেছনেই সুভদ্রার রথ। নাম সংকীর্তনে মেতে উঠেছে সবাই। গোটা জগৎ যেন আজ আত্মহারা। লাগামছাড়া। অবাক হয় স্বভাব-কবি। বৃষ্টিধারায় শুচিস্নাত হতে হতে নিজেরই অজান্তে পথের মাঝখানে এসে দাঁড়ায় সে। তার বুকের ভেতরে যেন সপ্তসাগরের ঢেউ ভাঙছে। ঐ দেখা যাচ্ছে তিনি আসছেন। রথের ওপরে আসীন নয়নমনোহর প্রভু জগন্নাথদেবকে দেখে দুহাত বাড়িয়ে হাপুস-নয়নে কাঁদতে থাকে মানুষটা। মনের ভেতর এক অজানা আনন্দের বাঁধ ভেঙেছে।
আজ যেন সব সংশয়ের অবসান ঘটে যায়। প্রভু পথে নেমেছেন শুধুমাত্র এই মানুষটাকেই দেখতে। মানুষটার শূন্য মন পূর্ণ হয় ভক্তিতে, ভালোবাসায়। সবকিছু দুহাত ভরে নিয়ে বুকের কাছে জড়ো করে হাতদুটো। যেন সবকিছু অন্তরের সিন্দুকে জমা করতে চায়। স্বভাব-কবি আকুল হৃদয়ে বলে ওঠে, “পৃথিবীময় ছড়িয়ে আছ তুমি। কখন কোন্ রূপে সামনে আস কে জানে!” রথ চলে যায় ঘড়ঘড়িয়ে। মানুষটার মনে দাগ এঁকে দেয় রথের চাকা।।
অপূর্ব লেখনি, লেখাটা পড়ে ছোটবেলায় পড়া রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গীতাঞ্জলির একটি কবিতার কথা মনেপরছিল। খুব সুন্দর আমার আন্তরিক শুভেচ্ছা নেবেন ভালো থাকবেন।
অসংখ্য ধন্যবাদ জানাই আপনাকে।
ভক্তের আকুল আর্তিতে ঈশ্বরকেও পথে নামতে হয় । ভক্ত আর ভগবানের হৃদয়ের আবেগ জমা হয় রথের রশিতে । টান পড়ে, চাকা ঘোরে, মিশে যায় ভক্ত আর ভগবান । খুব সুন্দর লাগলো লেখাটা
অসংখ্য ধন্যবাদ জানাই।
মন্তব্যে আপ্লুত।অসংখ্য ধন্যবাদ জানাই।
সুখপাঠ্য!জয় জগন্নাথ।
জয় জগন্নাথ????
মৌসুমী ,উত্তর দিতে অনেকটা দেরি হয়ে গেলো ।
অনবদ্য লেখনী তোমার …. পড়তে পড়তে কি এক অমোঘ টান অনুভব করছিলাম । আর লেখা পড়ার আশায় রইলাম ।
অসংখ্য ধন্যবাদ অরুন্ধতীদি, ভালোবাসা নিও।
“তাইতো তুমি হেথায় এলে নেমে
তোমার এ প্রেম ভক্তপ্রাণের প্রেমে”,
তোমার এ গল্প আগের সব গল্পকে ছাপিয়ে গেল! ঈশ্বর জগদীশ্বর হয়ে উঠলেন!
পরম প্রাপ্তি। ভালোবাসা নিও।