স্বামীজীর চরণধূলার তলে নত নমস্কারের পাশেই কিন্তু মাথা তুলে আছে একালের এই প্রখর জিজ্ঞাসা — তিনি এমন কী করেছেন, যার জন্য তাঁর প্রতি এই উচ্ছ্বসিত বন্দনা? যথার্থতঃ তিনি কী ছিলেন? সমকালের মানুষ তাঁকে ঠিক কীভাবে গ্রহণ করেছিল? পরবর্তীকালের প্রতিফলিত আলোকেই কি তাঁর পশ্চাতের মূর্তি ভাস্বর হয়ে ওঠেনি? উত্তর দাও হে মুগ্ধ ভক্তগণ!
আমার জীবনে বাল্যেই বিবেকানন্দের আবির্ভাব। তখনো ভারত স্বাধীন হয়নি, ত্যাগ ও সেবার অপরিসীম মূল্য তখনো স্বীকৃত ছিল জনমানসে — আর বিবেকানন্দ ছিলেন ত্যাগ, সেবা ও শক্তির মূর্তি। আমার প্রথম বয়সের কল্পনাকে অধিকার করে রেখেছিল অধিকন্তু বিবেকানন্দের ক্লাসিক দেবতার মত আকার, বাণীর অপরিমেয় মহিমা, ব্যক্তিত্বের বিচ্ছুরিত দ্যুতি। কিন্তু তারপর যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা সমাপ্ত করে আনছি, তখন আমার বিবেকানন্দ-অনুরাগকে আঘাত করেছিল একালের ঐ প্রশ্নগুলি, যা বলতে চেয়েছিল — অজস্র অবতারের দেশে বিবেকানন্দের জন্য মন্দির তৈরী করা সহজ, কিন্তু তাঁকে ইতিহাস-নিয়ামক পুরুষ বলে প্রমাণ করতে হলে চাই বাস্তব তথ্য, যা পাওয়া যায় নি যথেষ্ট পরিমাণে।
আমার সমস্ত চেতনা বিক্ষুব্ধ হয়েছিল। সমগ্র ভারতের আনন্দ ও বেদনাকে মথিত করে যিনি আবির্ভূত হয়েছিলেন, যাঁর একক জীবনে আবর্তিত হয়েছিল বহু যুগের সাধনা ও সিদ্ধির ইতিহাস — হাঁ, তাঁকেও দেখতে হবে খণ্ডকালের ঐতিহাসিক পটভূমিকায়, তাঁর কর্ম ও কীর্তির হিসাবের খাতা খুলে দেখাতেই হবে — নচেৎ নিরস্ত হবে না একালের আত্মবুদ্ধিতে পরিতৃপ্ত অহঙ্কৃত জিজ্ঞাসা!
ঐ প্রশ্নের উপযুক্ত উত্তর সন্ধানের চেষ্টা আমি করেছি। আমার জীবনের পঞ্চাশ বছর ইতিমধ্যে তাতে কেটেছে। ভারতের নানাস্থানে ঘুরে স্বামীজীর বিষয়ে সমকালীন বিপুল তথ্য সংগ্রহ করতে পেরেছি। তারই মধ্য থেকে দেখতে পেয়েছি — এই কালাতীত পুরুষ খণ্ডকালের মধ্যেও কল্পনাতীত মহিমায় বিরাজমান ছিলেন। তিনিই সর্বভারতীয় নবজাগরণের সূচনা করেছিলেন। জনগণকে দিয়েছিলেন উথথানের বাণী। পরাধীন ভারতবর্ষকে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন লুপ্ত আত্মমর্যাদা। প্রাচীন ভারতবর্ষকে যুক্ত করেছিলেন আধুনিক পৃথিবীর সঙ্গে। এবং মানবসমাজের সামনে উন্মোচন করেছিলেন শক্তি ও সৌন্দর্যে পূর্ণ এক মহান পৃথিবীর স্বপ্ন।
আমার কাজ এখনো শেষ হয়নি। সম্মুখের পথ কঠিন, লক্ষ্য বহুদূর। সামান্য মানুষ আমি, শক্তি সীমিত।
কিন্তু একই সঙ্গে আমার গভীর বিশ্বাস আছে বিবেকানন্দের এই উক্তিতে — ” মানুষের মধ্যে অনন্ত শক্তি বর্তমান। তার উন্মোচনেই মনুষ্যত্বের পরিচয়”।
সংগৃহীত হয়েছে লেখকের আত্মজীবনী — ‘রামকৃষ্ণ সারদা বিবেকানন্দ নিবেদিত আমার জীবন, আমার গবেষণা’।
আজ স্যারের মৃত্যু বার্ষিকীতে শ্রদ্ধার্ঘ্য, লেখাটা পাঠিয়ে সাহায্য করেছেন স্যারের ছেলে শঙ্খ বসু — কার্যকরী সম্পাদক