মার্কসবাদীরা দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদে বিশ্বাস করেন। কিন্তু অনেক সাচ্চা মার্কসবাদী দেখা গেছেন, যাঁরা নিজেদের জীবনযাত্রায় মোটেই বস্তুবাদী নন। পার্থিব জীবনের জন্য মোটেই লালায়িত নন। ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলনের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা মুজফফর আহমেদ, নৃপেন চক্রবর্তী, এ কে রায়— এমন অনেকের কথাই বলা যায়। কমবয়সিরা চিনবেন না কিন্ত পঞ্চাশ ঊর্ধ্ব বয়সিরা এ কে রায় বলতেই বুঝবেন ধানবাদের কয়লা খনির শ্রমিক নেতা অরুণকুমার রায়-এর কথা।
১৯৩৫ সালের ১৫ জুন তিনি অবিভক্ত বাংলার রাজশাহী জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তারপর বেলুড় রামকৃষ্ণ মিশন শিল্প মন্দিরে পড়তে আসেন। তখন তাঁর সহপাঠী ছিলেন আজকের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. অমিয় বাগচী। অরুণ কুমার রায় এমটেক পাশ করে অবিভক্ত বিহারের ধানবাদ জেলার সিন্ধিতে ফার্টিলাইজার কর্পোরেশন অব ইন্ডিয়ার ইঞ্জিনিয়ার হিসাবে কাজে যোগ দেন। সেসব ১৯৫০ দশকের শেষের কথা। সে সময় কোলিয়ারিগুলো বেসরকারি মালিকানাধীন ছিল। শ্রমিকদের উপর চলত চরম শোষণ ও নির্যাতন। ইঞ্জিনিয়ার এ কে রায় ছুটির দিনে খনি শ্রমিকদের বস্তিতে গিয়ে তাঁদের জীবনযাত্রা খোঁজ নিতে থাকেন। মাথায় ঢোকে, কি করে শ্রমিকদের এই শোষণ যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দেওয়া যায়। তখন ওখানে এআইটিইউসি-র শ্রমিক সংগঠন ছিল। কিন্তু তারা দুর্বল ছিল। এ কে রায় এআইটিইউসি-র সঙ্গে গোপনে যোগাযোগ করেন। তখন মাঝেমধ্যে এবং ছুটির দিনে শ্রমিক বস্তিতে যাতায়াত করতে থাকেন, এআইটিইউসি নেতাদের সঙ্গেও আলোচনা করতে থাকেন। তিনি বোঝেন, শ্রমিকদের শোষণ বন্ধ করতে হলে আধাখেঁচরা মন নিয়ে কাজ করলে হবে না। তাই একদিন মোটামাইনের ইঞ্জিনিয়ারের চাকরি ছেড়ে দিয়ে এআইটিইউসি-র সর্বসময়ের কর্মী হয়ে যান। সেটা ১৯৬০ দশকের গোড়ার কথা। তখন ওখানে এআইটিইউসি-র নেতা ছিলেন সাধন গুপ্ত। শ্রমিক সংগঠনে কাজের পরীক্ষা দিয়ে এ কে রায় কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ লাভ করেন। তারপর ১৯৬৪ সালে কমিউনিস্ট পার্টি ভাগের পর তিনি সিপিআইএমে যোগ দেন। তখন ধানবাদে খনি শ্রমিকদের আইএনটিইউসি নেতা ছিলেন প্রবল পরাক্রমশালী শংকরদয়াল সিং। এ কে রায়-এর সভায় লালঝান্ডা থাকত বলে, তিনি তাঁর কর্মীদের দিয়ে ষাঁঢ় ঢুকিয়ে দিতেন। রাজনৈতিক বিরোধিতা থাকলেও শংকরদয়াল সিং শ্রদ্ধা করতেন এ কে রায়-কে। ১৯৬৭ সালের বিধানসভা ভোটে তিনি ধানবাদ জেলার নিরসা বিধানসভা কেন্দ্র থেকে সিপিআইএমের প্রার্থী হিসেবে জয়ী হন। ১৯৭০ সালের ২০ মে সিপিআইএম নেতৃত্ব এআইটিইউসি ভেঙে সিআইটিউ তৈরি করেন। এ কে রায় স্বাভাবিকভাবেই সিআইটিইউ-তে যোগ দেন। সিআইটিইউ নেতৃত্বাধীন কোলিয়ারি কামগড় ইউনিয়ন নেতা হন।
১৯৬০ দশকে বিহারের জামশেদপুরে কেদার দাস, ধানবাদে এ কে রায় প্রমুখ নেতারা ঝড় তুলেছিলেন। কয়লা খনি শ্রমিকরা এ কে রায়-কে নিজেদের পরিবারের একজন বলেই মনে করতেন।
কিন্তু কিছুদিন পরেই তাঁর সঙ্গে সিপিআইএমের মতবিরোধ শুরু হয়। কবি সমর সেন সম্পাদিত ফ্রন্টিয়ার পত্রিকায় তিনি ‘ভোট অ্যান্ড রেভুলেশন’ নামে একটি লেখা লেখেন। সেই লেখায় তিনি সিপিআইএম নেতৃত্বকে কিছুটা সমালোচনা করে লিখেছিলেন, মানুষ চাঁদে পা রাখছে অথচ দেশে বিপ্লব করার প্রচেষ্টা জোরদার করার কোনও লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। তখন দলের পলিটব্যুরো থেকে বিহারে পার্টির দেখাশোনা করতেন প্রমোদ দাশগুপ্ত। তিনি সেই লেখা পড়ে ক্ষেপে যান। সেজন্য এ কে রায়-কে শোকজ করেন। শোকজের চিঠিতে প্রমোদবাবু লিখেছিলেন, নকশালপন্থীদের কাগজ ফ্রন্টিয়ার পত্রিকায় কেন লিখেছেন? এই রাজনৈতিক বিকৃতির জন্য কেন তাঁর বিরুদ্ধে শান্তি নেওয়া হবে না? এ কে রায় প্রত্যুত্তরে লিখেছিলেন, দলের পলিটব্যুরো সদস্য পি রামমূর্তি মাঝেমধ্যে এমন কাগজে লেখেন। যেটি স্বতন্ত্র দলের নেতা কর্তৃক পরিচালিত। এ কে রায় আরও লিখেছিলেন, আমি মনে করি, নকশালপন্থী রাজনীতি সমর্থন না করলেও তারা অন্তত স্বতন্ত্র দলের চেয়ে ভালো। এজন্য এ কে রায়-কে সিপিআইএম থেকে বহিষ্কার করা হয়। মজার কথা হল, সে সময় সিপিআইএমের রাজ্য সম্পাদক ছিলেন উমাকান্ত শুক্লা। অন্যতম রাজ্য নেতা ছিলেন টাকি রহিম। এই দুজনের সঙ্গে বছর দশক পরে আবার সিপিআইএমের মতবিরোধ হয়। যাইহোক এ কে রায় ধানবাদে মার্কসিস্ট কোঅর্ডিনেশন কমিটি গড়ে তোলেন। জরুরি অবস্থার সময় তাঁকে মিসায় গ্রেফতার করা হয়। ১৯৭৭ সালের মার্চে জেল থেকে তিনিই ধানবাদ লোকসভা কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে জেতেন। তিনি তিনবার লোকসভা ও একবার বিধানসভায় জেতেন। দিল্লিতে সাংসদদের আবাসনে তিনি থাকতেন। একটা স্টোভে ভাত ভুটিয়ে খেতেন। সাংসদদের কোনও টিমে কখনও তিনি বিদেশ যাননি। সাংসদ হিসেবে কখনও কোনও বাড়তি সুযোগ নেননি। এমনকি তিনিই একমাত্র সাংসদ ছিলেন, যিনি মাসিক ভাতা পেনশনের বিরোধিতা করেছিলেন।
তাঁর পুরোনো আসন নিরসা বিধানসভা কেন্দ্রে জিততেন তাঁরই সহযোদ্ধা মার্কসিস্ট কোঅর্ডিনেশন কমিটির গুরুদাস চ্যাটার্জি। গুরুদাসবাবুকে ২০০০ সালে কোল মাফিয়ারা জি টি রোডের ওপর খুন করে। ১৯৯১ সালের পর থেকেই ধানবাদে রাজনীতি পাল্টাতে থাকে। রাম মন্দিরের হাওয়া ঢোকে। ১৯৯১ সালের লোকসভা ভোটে বিজেপির কাছে এ জেলায় পরাস্ত হন। তারপর ধানবাদের কয়লাখনি শ্রমিকদের মধ্যেও বিজেপি প্রভাবিত ভারতীয় মজদুর সংঘের প্রভাব বাড়ে। এ কে রায় আস্তে আস্তে কিছুটা হতাশ হয়ে পড়েন। তাঁর মা কলকাতার কসবায় ভাইয়ের কাছে থাকতেন। প্রতি বছর পুজোর অষ্টমীর রাতে তিনি মা-কে দেখতে আসতেন। তারপর দশমীর বিকেলে ট্রেন ধরে ধানবাদ চলে যেতেন। সে সময় বহুদিন এই লেখককে ফোন করে ডেকে রাজনৈতিক আলোচনা করতেন। তখনই বুঝেছিলাম, তাঁর মধ্যে হতাশা বেড়েই চলেছে।
তিনি গোঁড়া মার্কসবাদী ছিলেন। জ্যোতি বসু বা বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য কর্মসংস্থানের জন্য শিল্পপতিদের কাছে বিনিয়োগের আবেদন জানানোয় তিনি তার বিরোধী ছিলেন। তিনি বলতেন, এসব পুঁজিবাদ হয়ে যাচ্ছে। পুঁজির জন্য ভিন রাজ্য বা ভিনদেশে যেতে হবে কেন? পুঁজি তো ঘরের আলমারিতেই রয়েছে। আসলে তিনি কার্ল মার্কসের লেখা পুঁজি বইটার কথা বলতে চেয়েছিলেন। সারা জীবন ধানবাদের শ্রমিকদের পাশে থেকেছেন। অবিবাহিত ছিলেন। ধানবাদের পুরোনো বাজারে ইউনিয়ন অফিসের একটা ছোট্ট ঘরে তক্তাপোশের উপর শুতেন। মাথার কাছে একটা কুজোয় জল ও গেলাস থাকত। আর সামনে একটা টেবিলে বইপত্র। দড়িতে ঝুলত পায়জামা, পাঞ্জাবি। কোনওরকম অহংকার ছিল না। শ্রমিকদের জন্য নিবেদিত প্রাণ এই এ কে রায় ২০১৯ সালের ২১ জুলাই প্রয়াত হন।