বালিশের তলায় এখনও ছপাতা কড়া ঘুমের ওষুধ জমিয়ে রাখা। সৌমিকা ভাবে এগুলো এবার অন্য কোন জায়গায় তুলে রাখা দরকার। অনেকদিন ধরে এগুলো জমাচ্ছে সে। ডাক্তার তো এখন চট করে ঘুমের ওষুধ দিতেই চাননা। অনেক সাধ্য সাধনা করে ‘ঘুম না হলে মরে যাবো’ এই বলে প্রেসক্রিপশন করানো। এবার ঘুরে ঘুরে বিভিন্ন ওষুধের দোকান থেকে ওষুধ জোগাড় করা। এই জোগাড় করতেই সৌমিকার হাঁসফাঁস অবস্থা। একা থাকে ফ্ল্যাটে। শঙ্খকে ছেড়ে এসেছে তা প্রায় বছর খানেক হতে চলল। সম্পর্কটা বহুদিন শেষ হয়ে গিয়েছিল, তবু টাব্বুর মুখের দিকে তাকিয়ে সম্পর্ক বাঁচিয়ে রেখেছিল তারা দুজনেই। তারপরে আর…
টাব্বুর ভিতরে যে একটা বড় মানুষের জন্ম হচ্ছে সেটা ওরা খেয়াল করেনি। টাব্বু যেদিন ওদের নিয়মিত ঝগড়ার মাঝে এসে দাঁড়িয়ে বলল “তোমরা এবার প্লিজ আলাদা থাকো, আমাকে একটু হেল্প করো। আমার কষ্ট হয়…” তারপর দম নিল বড় বড় করে। তখনই ওরা সরে আসার সিদ্ধান্ত নিল। টাব্বু এখন আটে পড়েছে। ও শঙ্খর কাছেই থাকতে পছন্দ করে, কারণ শঙ্খর বাবা মায়ের সঙ্গ। দুজন মিলে নাতনিকে আগলে রাখতে সুদূর কলকাতা থেকে সিডনি চলে এসেছেন তাঁরা পাকাপাকিভাবে। আশ্চর্য এটা যে, সৌমিকা আর শঙ্খ যখন নতুন সংসার পাততে সিডনি এসেছিল, তখন কিন্তু ওনারা কেউ ওদের সংসারে আসতে চাননি। না সৌমিকার বাবা মা, না শঙ্খর মা বাবা! ওনারা এসেছেন, থেকেছেন এক আধমাস। ঘুরে বেরিয়ে, রান্না করে, সংসার গুছিয়ে দিয়ে আবার দেশের বাড়ির টান অনুভব করেছেন। যেন দেশটা সৌমিকার বা শঙ্খর নয়!
প্রেমে সায় না দেওয়ায় সামনের ফ্ল্যাটের মেয়েটা ফ্যানের সঙ্গে ওড়না জড়িয়ে সুইসাইড করতে গিয়েও শেষরক্ষা করতে পারেনি। খুব ভিড় ওদের ব্লকের সামনে। সৌমিকা সকালে দুধ আনতে বেরিয়ে খানিকটা দাঁড়িয়ে শুনল ব্যাপারটা। ও সাধারণত কারোর সঙ্গে মেশে না। মেয়েটা বেঁচে গেছে শুনে একবার কৌতুহল হচ্ছে ওকে দেখার। শেষ মুহূর্তে কেউ দেখে ফেলে বাঁচিয়ে দিল বলেই বেঁচে গেল মেয়েটা!মেয়েটার এখন মনের অবস্থা কেমন জানার খুব কৌতুহল হচ্ছে। সে কি লজ্জা পাচ্ছে? অসহায় বোধ করছে? না, আর একটা জীবন পেল বলে বাঁচার নতুন আগ্রহ তৈরি হয়েছে তার?
একটা প্রেমের জন্যে সত্যিই মরে যাওয়া যায়! সৌমিকা আর শঙ্খ যখন ভালবাসায় উথাল পাথাল, তখন একবারও কি ওরা ভেবেছিল ওদের বিয়ের পর বিদেশে সংসার করতে গিয়ে ওরা অফিস, বাড়ি সব সামলাতে গিয়ে হাঁসফাঁস করবে! এতটাই দমবন্ধ হয়ে আসবে যে সম্পর্কটাকে টুকরো টুকরো করে বেরিয়ে আসতে হবে ওদের! অথচ তখন যদি শঙ্খ বা সৌমিকার বাবা মা গিয়ে একটু থাকতেন, হয়ত সংসারটা বেঁচে যেত। হয়ত বা নয়। একটা সম্পর্ক নষ্ট হয়ে গেলে অন্য কেউ কি এই সম্পর্ক মেরামত করতে পারে?কে জানে!
দমবন্ধ করা গরম পড়েছে কদিন। এসি ঠিকমতো কাজ করতে করতে মাঝেমাঝেই বিদ্রোহ করছে। যেমন আজ দুপুরে করল। যন্ত্রের আর দোষ কি, টানা কাজ করতে কারই বা ভাল লাগে? সৌমিকার দেশে ফেরার পর আজ বেশ কিছু বছর হয়ে গেল। ভেবেছিল, দেশে ফিরে ও ভাল থাকতে পারবে। কিন্তু ফিরে অবধি মনে হয় — না ফিরলেই ভাল ছিল। অন্তত কারোর সঙ্গে দেখা হলেই কেন সে সংসার করতে পারল না, এ কৈফিয়ত দিতে হত না জনে জনে। ইদানিং ঐজন্য সে কারোর বাড়ি যায় না, মেশে না। এমনকি নিজের বাপের বাড়িও নয়। আত্মীয়রা কেউ আসতে চাইলেও কিছু একটা বাহানা করে সে কাটিয়ে দেয়।
ওষুধের ফয়েল থেকে একটা একটা করে অনেকগুলো ট্যাবলেট বের করে একটা ছোট ট্রেতে রাখছে। দুবেলার রান্না করে পদ্মা যাবার আগে বারবার মনে করে খেতে বলে গেছে। সৌমিকা আজকাল প্রায়ই খেতে ভুলে যায়। আসলে ভোলে না। ভাল লাগে না একা একা খেতে, তাই খায় না। পদ্মা ভাবে, তার দিদিমণি সব ভুলে যায়। ভুলে যেতে তো সৌমিকাও চায়। পারে না বলেই তো এতো ওষুধ জমিয়ে তোলা। টাব্বু আজকাল তার মাকে রোজ ফোন করে না। বলে, ভুলে গেছি! ওই টুকু মেয়ে নিজের মাকে ভুলে যায় কি করে!আজ সৌমিকার জন্মদিন। ওদের তো এখন রাত হয়ে গেছে। একটু পরেই টাব্বু ঘুমিয়ে পড়বে। সারাদিনে একবারও মাকে উইশ করার কথা মনে পড়ল না মেয়েটার!
সব ওষুধ একটা কাচের গ্লাসে দিয়ে জলের দিকে তাকিয়ে থাকে সৌমিকা। এই বেশ ভাল। কাল ওকে ঘুম থেকে উঠতে না দেখে সবাই জানতে পারবে ও চলে গেছে। নিজের সমস্ত যন্ত্রণা একা গিলে সে চলে গেছে। ভাবতে ভাবতে দেখে জলের রঙ সাদাটে হচ্ছে! গ্লাস হাতে নিয়ে মুখে তুলতে যাবে ঠিক সেই সময় ফোনটা বেজে উঠল। টাব্বু গুড়িয়া কলিং। আর ঠিক সেই সময়, এই ভরদুপুরে আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে একটা বেদম ঝড়ের ঝাপটা গোটা শহর এলোমেলো করে দিল। হাতে লেগে উল্টে গেল গ্লাস। অন্ধকার চারিদিক। শুধু সোঁ সোঁ আওয়াজ। কোন জানলা বন্ধ করার কোন তাগিদ আজ সৌমিকার নেই। সে চুপ করে ফোন গালে চেপে ধরে বসে থাকে। ওদিক থেকে রিনরিন আওয়াজ “মাম্মা শুনতে পাচ্ছো? হ্যাপি বার্থডে মাম্মা। এই নাও, পাপা তোমার সঙ্গে কথা বলবে…. মাম্মা শুনতে পাচ্ছো! আই মিস উ মা! ….
ভরা জষ্টিতেই শ্রাবণ নামে সৌমিকার চোখে, বুকে, মনে….
ভীষণ সুন্দর এক ভালোবাসা হারিয়ে আবার ফিরে পাওয়ার গল্প। গুড়িয়রা আছেবলেইতো অসময়ে ঝড় উঠে সব এলোমেলো করে দেয় এমনকী আত্মহননের ইচ্ছেও।
অনেক ভালবাসা
বেশ ভালো লাগলো।