‘যদা যদা হি ধর্মস্য গ্লানির্ভবতি ভারত।
অভ্যুত্থানমধর্মস্য তদাত্মানং সৃজাম্যহম্।।
পরিত্রাণায় সাধূনাং বিনাশায় চ দুষ্কৃতাম্।
ধর্মসংস্থাপনার্থায় সম্ভবামি যুগে যুগে।’
ভগবান শ্রীকৃষ্ণ শ্রীমদ্ভাগবদ্গীতায় বলেছেন, ব্রহ্মাণ্ডে যখনই ধর্মের গ্লানি, পাপ ও পাপী বৃদ্ধি পায়, তখনই আমি যুগে যুগে অবতীর্ণ হয়ে সত্য ও সাধুদিগের পরিত্রাণ, পাপীদের বিনাশ এবং ধর্মসংস্থাপন করি।
অধর্মের বিনাশ ও ধর্মসংস্থাপনের চিত্র আমরা রামায়ণ ও মহাভারত, এই দুই মহাকাব্যেই পাই। ভগবান শ্রীবিষ্ণুর দশ অবতারের অন্যতম শ্রীকৃষ্ণ কৌরববংশকে ধ্বংস করার জন্য পাণ্ডবতনয় অর্জুনকে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার জন্য আহ্বান জানিয়েছিলেন। দশ অবতারের আরও এক অবতার হিসেবে শ্রীরামচন্দ্র রামায়ণ মহাকাব্যের পাপী রাবণকে যুদ্ধক্ষেত্রে নিজ হাতে বর্ধ করেছিলেন। পুরাণ থেকে আধুনিক সময়ে পদার্পণ করে আমরা দেখি দক্ষিণেশ্বরের পূজারি শ্রী গদাধর চট্টোপাধ্যায় নিজ মুখে বলছেন, ‘যে রাম, যে কৃষ্ণ, সেই আজকের রামকৃষ্ণ’।
আমাদের আলোচ্য বিষয় ‘অকালবোধন’। হিন্দুশাস্ত্র অনুসারে আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষের ষষ্ঠী তিথিতে শারদীয়া দুর্গাপূজার প্রারম্ভে ‘অকালবোধন’ অনুষ্ঠিত হয়। ‘বোধন’ শব্দটির অর্থ ‘জাগানো’ বা ‘জাগরণ’। রাজা সুরথ সমাধি নদীর তীরে বসন্তকালে প্রথম দুর্গাপূজার প্রচলন করেছিলেন বলে দেবী ‘বাসন্তী’ নামে পরিচিতা হন। মর্তে দেবী দুর্গার প্রথম পূজারি হিসাবে শ্রী শ্রী চণ্ডীতে রাজা সুরথের উল্লেখ আছে। পরবর্তী সময়ে রাবণবধের বর কামনায় শ্রীরামচন্দ্র দেবীকে শরৎকালে অর্থাৎ ‘অ-কালে’ জাগ্রত করেন।
বাংলার সনাতন বর্ষপঞ্জিতে বৎসরকে দুটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে—উত্তরায়ণ ও দক্ষিণায়ন। সূর্য যখন পৃথিবীর উত্তর গোলার্ধের কাছাকাছি অবস্থান করে, তখন তাকে উত্তরায়ণ বলা হয়। আর সূর্য যে সময়ে পৃথিবীর দক্ষিণ গোলার্ধের কাছাকাছি অবস্থান করে, তখন তাকে বলা হয় দক্ষিণায়ন। কৃত্তিবাসী রামায়ণে কথিত আছে, উত্তরায়ণ কালের অন্তর্গত হচ্ছে মাঘ, ফাল্গুন, চৈত্র, বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ ও আষাঢ় মাস। রাবণ বসন্তকালে দেবীর আরাধনা করেছিলেন— যাকে আমরা ‘বাসন্তী পূজা’ হিসেবে জানি। এটি দেবীর আরাধনার প্রকৃত সময়, কারণ তিনি এই সময়ে জেগে থাকেন। তাই এই পূজায় বোধনের প্রয়োজন হয় না। অপরদিকে দক্ষিণায়নের ছয় মাস হলো শ্রাবণ, ভাদ্র, আশ্বিন, কার্তিক, অগ্রহায়ণ ও পৌষ— যা দেবদেবীদের নিদ্রার সময়। তাই এই সময়ে পূজার্চনার নিমিত্ত তাঁদের জাগানোর জন্য বোধনের প্রয়োজন হয়। এখন দেবীকে হঠাৎ জাগানোর প্রয়োজন কেন হলো, সে কথায় আসা যাক।
কৃত্তিবাসী রামায়ণের ব্যাখ্যা অনুযায়ী রাবণ সীতাকে হরণ করার পর তাঁকে উদ্ধারের আশায় শ্রীরামচন্দ্র বানরসেনা-সহ লঙ্কায় উপস্থিত হন। লঙ্কার যুদ্ধক্ষেত্রে রাবণের প্রতাপ ও উগ্র রূপ দেখে রাম চিন্তায় পড়ে যান। তিনি জানতেন না যে, দেবাদিদেবকে কঠোর তপস্যায় সন্তুষ্ট করে রাবণ ইতিমধ্যে বর লাভ করেছেন। সেই সঙ্গে রাবণ বিভিন্ন সময়ে দেবীর বিভিন্ন রূপেরও উপাসনা করেছেন। ফলে যুদ্ধক্ষেত্রে স্বয়ং দেবী কালী তাঁকে নিজের কোলে স্থান দেন। তাই রাবণকে যুদ্ধে পরাজিত করা কার্যত অসম্ভব। এদিকে, রাবণ বধ না হলে সীতা উদ্ধারের আশা নেই। শ্রীরামচন্দ্রের এই শোচনীয় মানসিক অবস্থায় দেবরাজ ইন্দ্রও দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়েন। কারণ দৈববাণী অনুযায়ী রামই একমাত্র রাবণকে বধ করতে পারবেন। তাহলে উপায়? দেবরাজ তখন প্রজাপতি ব্রহ্মার কাছে গিয়ে পরিস্থিতির বর্ণনা করেন এবং উদ্ধারের উপায় জিজ্ঞাসা করেন। ব্রহ্মা তখন নিজে দেবী দুর্গাকে পূজার্চনায় সন্তুষ্ট করেন ও রাবণবধের উপায় জিজ্ঞাসা করেন। দেবী জানান, রামচন্দ্রকে ‘অকালবোধন’ করে দেবীর পূজা সম্পন্ন করতে হবে। একমাত্র তাহলেই তিনি রাবণকে বধ করার জন্য রামকে সাহায্য করবেন।
এই পরিস্থিতিতে প্রজাপতি ব্রহ্মা এবং দেবরাজ ইন্দ্র গিয়ে শ্রীরামচন্দ্রকে দেবীর ইচ্ছার কথা বলেন। তদনুযায়ী শ্রীরামচন্দ্র নিজ হাতে দেবীর মূর্তি গড়ে আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষে ষষ্ঠীর সন্ধ্যায় দেবীর বোধন করে সপ্তমী, অষ্টমী ও নবমীতে যথাযথ বিধি পালন করে দেবীর পূজা সম্পন্ন করেন। কিন্তু দেবী তখনও রামকে দেখা দেন না। পূজা ও তপস্যায় যথাযথ ফল না পেয়ে রাম মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। সেই সময় বিভীষণ রামকে পরামর্শ দিয়ে বলেন, ১০৮টি নীলপদ্ম দিয়ে দেবীর আরাধনা করলে তিনি সন্তুষ্ট হতে পারেন। সেইমতো রাম হনুমানকে দেব-দেবীদের হৃদ থেকে ১০৮টি নীলপদ্ম আনতে বলেন। পূজায় বসে রাম লক্ষ করেন ১০৮ নয়, ১০৭টি নীলপদ্ম আছে। কিন্তু পূজা তো তাঁকে শেষ করতেই হবে। উপায়ান্তর না দেখে রাম দেবীকে বলেন, তাঁর চোখকে সকলে নীলপদ্মের সঙ্গে তুলনা করেন। তাই একটি পদ্ম না পাওয়া গেলে তিনি তাঁর একটি চোখ উপড়ে দেবীর পায়ে নিবেদন করবেন। আসলে দেবী দুর্গাই একটি পদ্ম লুকিয়ে রামের পরীক্ষা নিচ্ছিলেন যে রাম দেবীকে সন্তুষ্ট করার জন্য কতটা আগ্রহী। পূজা শেষ করতে ব্যাকুল রাম যখন ধনুক দিয়ে নিজের চোখে তির মারতে উদ্যত, তখন দেবী সিংহবাহিনীরূপে আবির্ভূতা হন। এরপর রামচন্দ্র পূজা সম্পন্ন করে দেবীর আশীর্বাদ লাভ করেন এবং লঙ্কাযুদ্ধে রাবণকে বধ করতে সমর্থ হন।
‘অকালবোধন’ নিয়ে পুরাণ ও শাস্ত্রে আরও অনেক ব্যাখ্যা আছে। তবে রামচন্দ্রের পূজাকেই এর উৎস বলে ভাবতে আমাদের ভালো লাগে। কারণ শুভশক্তির উদয় দেখতেই তো সবাই পছন্দ করেন। সেই হিসেবে, অকালে যে দেবীপূজার প্রচলন শ্রীরামচন্দ্র শুরু করেছিলেন, তা ক্রমে হয়ে উঠেছে বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব—শারদীয়া দুর্গাপূজা। পশ্চিমবঙ্গ-সহ বিশ্বের যে প্রান্তেই বাঙালিরা থাকুন না কেন, সেখানেই শরৎকালে ঢাকের বোল বেজে ওঠে। সত্যি যদি নাও বাজে, মনে তো বাজবেই। ঢাকের আওয়াজের সঙ্গে বাতাসে মিশে যায় শ্রীশ্রী চণ্ডীর পবিত্র এই মন্ত্রোচ্চারণ:
‘মধুকৈটভবিধ্বংসি বিধাতৃ বরদে নমঃ।
রূপং দেহি জয়ং দেহি যশো দেহি দ্বিষো জহি।।
মহিষাসুরনির্ণাশি ভক্তানাং সুখদে নমঃ।
রূপং দেহি জয়ং দেহি যশো দেহি দ্বিষো জহি।।’