এক
রাজকাপূরের ছবি ‘শ্রী ৪২০’-এর গানের সুর তৈরী করছেন শঙ্কর জয়কিষণ জুটি। ‘প্যার হুয়া ইকরার হুয়া’ গানটির মুখরা তৈরী করলেন শঙ্কর, আর অন্তরা বাঁধলেন জয়কিষণ। কিন্তু অন্তরাটি শঙ্করের পছন্দ হয়নি। মুখরার সঙ্গে অন্তরা যেন মানানসই হয়নি। উনি তা পাল্টাতে চাইলেন। কিন্তু জয়কিষণ কিছুতেই মানতে নারাজ। আসলে প্রথাগত দিকে অত্যধিক গুরুত্ব না দিয়ে সুরে বৈচিত্র্য আনার বিশেষ ঝোঁক ছিল তাঁর। কথা কাটাকাটি থেকে শেষ পর্যন্ত তাঁদের মধ্যে প্রায় হাতাহাতি হওয়ার উপক্রম। অবশেষে যন্ত্রশিল্পীদের মধ্যস্থতার ফলে শঙ্কর অন্তরাটি রাখতে রাজী হলেন। সুর তৈরী শেষ হল। এবার রেকর্ডিং। দ্বৈতকণ্ঠে গাইলেন মান্না দে, লতা মঙ্গেশকর। উচ্ছ্বসিত মান্না দে বললেন, ‘তোমরা আবারও ইতিহাস তৈরী করলে’। তিনি অবশ্য গানটি তৈরীর আগের ইতিহাস জানতেন না…..
দুই
১৯৫২ সাল। প্রযোজক-পরিচালক বিজয় ভাট তৈরী করছেন, সঙ্গীতমুখর হিন্দি ছায়াছবি-‘বৈজু বাওড়া’। সুরকার নৌশাদ, গীতিকার শাকিল বদায়ুনি। কয়েকটি গান তৈরী হওয়ার পরে একটি ভজন কম্পোজ করতে গিয়ে মুসকিলে পড়লেন নৌশাদ।শাকিল ভজনটি লিখেছেন ব্রজভাষা বা অবধি ভাষায়। মধ্য উ.প্রদেশ থেকে রাজস্হানের ভরতপুর, আগ্রা পর্য্যন্ত এই ভাষা প্রচলিত । নৌশাদ-শাকিল উ. প্রদেশের। দুজনেই ভজনটির শব্দবিন্যাসে বেশ সন্তুষ্ট। লাহোরের উর্দুভাষী গায়ক মহ. রফি সুরে ঝড় তুলছেন। কিন্তু শব্দ উচ্চারণে সমানে হোঁচট খাচ্ছেন।নৌশাদের উদ্বেগের কারণ : একে তো শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের পন্ডিত/ওস্তাদেরা ফিল্মী গানে রাগরাগিনী ব্যবহারের বিরুদ্ধে। তারপর তিন মুসলমান মিলে শ্রীকৃষ্ণের ভজন তৈরী করছেন। তা আবার মালকোঁষ রাগে।সামান্য এদিক-ওদিক হলে কেরিয়ার শেষ হয়ে যেতে পারে।কিন্তু দমবার পাত্র নন নৌশাদ। বারাণসী থেকে কয়েকজন পন্ডিতকে নিয়ে আনলেন বমবে-তে। তাঁরা নিয়মিত মহ. রফিকে দরশন, মোহে, মোরে, মোরি, তুমরে, হমারী, ব্যাকুল, দীক্ষা, দুখভনজন, ইত্যাদি শব্দের সঠিক উচ্চারণ শেখানোর পাশাপাশি ভজনটিতে ভক্তের ভক্তি নিবেদনের নিগূঢ় অর্থ ব্যাখ্যা করতেন।

রফি ছেলেবেলায় গানের নেশায় ফকিরদের পিছনে ঘুরে বেড়াতেন। তাঁদের গানেই খুঁজে পেতেন অনির্বচনীয় আনন্দসুখ। এ যেন তেমন ধারারই গান। প্রশিক্ষণ যখন প্রায় শেষ হল, তখন একদিন সকালে বারাণসীর পন্ডিতরা দেখলেন, রফি আত্মহারা হয়ে গাইছেন- ‘হরি ওম/ হরি ওম/মন তড়পত হরি দরশন কো আজি….’।
আর ভক্তিরসে আপ্লুত রফির দুচোখ দিয়ে অবিরাম জলের ধারা বয়ে চলেছে।

বহুকাল আগে নৌশাদ-শাকিল-রফি, এই ত্রিরত্ন সুরলোকে পাড়ি দিয়েছেন। তবু আজও পৃথিবীর সমস্ত হিন্দু মন্দিরে তাঁদের তৈরী সাত দশক পুরনো ভজন বেজে চলেছে।
হরি ওম/ হরি ওম/মন তড়পত হরি দরশন কো আজি..
তিন
হিন্দি ছায়াছবির জগতে হুসনলাল ভগতরাম, শঙ্কর জয়কিষণের পরে যে তৃতীয় সুরকার জুটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন তাঁরা হলেন- কল্যানজী আনন্দজী। কচ্ছের এক অখ্যাত গ্রামে জন্ম এই দুই ভাইয়ের। বমবে ফিল্ম জগতে সুরকার হিসেবে প্রথম ছবি ‘সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত’-তেই বাজিমাত করলেন তাঁরা। প্রায় ২৫০ ছবিতে সুর দিয়েছেন। সুর তৈরী করতে গিয়ে অন্য সবার মত এদেরকেও কখন-সখন অসুবিধেয় পড়তে হত।
দেবানন্দ নায়ক ; ‘বনারসী বাবু’ ছবিটির জন্য পরিচালকের নির্দেশমত সিকোয়েনস্ অনুযায়ী একটি গান লিখেছেন বিখ্যাত গীতিকার অনজান আর সুর দিয়েছেন এই দুই ভাই। গানটি কিশোর কুমার গাইবেন। কিশোর গানের পাতা হাতে নিয়ে রেগে কাঁই। বললেন, ‘এটা কি ভাষা! ‘তাঁকে যতই বোঝানো হয় এটি এক ধরণের দেহাতি হিন্দি, তিনি ততই রেগে গিয়ে বলেন- ‘হতে পারে। কিন্তু আমি দেহাতি নই। আমি এই ভাষায় গাইতে পারব না।’ উঠে চলেই যাচ্ছিলেন। তড়িঘড়ি ছুটে আসলেন প্রযোজক। রাজী হলেন। কিন্তু শর্ত দিলেন- ‘আমি একবারই গাইব।’ সবার তখন ঘাম ছুটতে শুরু করেছে। কিশোরের কাছে গানের কথাগুলো খটমট লাগছে, অথচ একবারেই রেকর্ডিং সারতে হবে। রেকর্ডিং হল। কিশোর সাবলীলভাবে গাইলেন। সেই উচ্ছাসে ভরা, উদ্দাম গায়কী, সঙ্গে নানা অঙ্গভঙ্গিমা। সবাই প্রচন্ড খুশী। কিন্তু এবার বেঁকে বসলেন নায়ক, দেবানন্দ।তাঁর বকতব্য, এই গান গাইলে তাঁর ইমেজ নষ্ট হবে। তাই তিনি ঐ গানে লিপ দিতে অক্ষম। প্রযোজক বুঝলেন, বিধি বাম। ছবি থেকে ঐ গান বাদ দিতে হল।

এর কয়েক বছর পরের ঘটনা। ‘ডন’ ছবিটি তৈরী করেছেন পরিচালক চন্দা বারোট। নায়ক- অমিতাভ বচ্চন, নায়িকা- জীনত আমন।সুরকার- কল্যাণজী আনন্দজী। এক সপ্তাহ ধরে সিনেমা হলে চলছে ছবিটি। কিন্তু তেমন দর্শক সমাগম হচ্ছে না।নায়ক মনোজকুমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু হওয়ার সুবাদে পরিচালক তাঁর কাছে পরামর্শ চাইলেন কী করা যায়।মনোজ কুমার ‘ডন’ দেখে বললেন , ‘এতো বেশ জমজমাট এ্যাকশন মুভি। তবে বিরতির পরে দ্বিতীয় ভাগে খুব তাড়াহুড়ো করেছ। আমার মনে হয় মাঝে কোথাও একটা গান ঢুকিয়ে দাও।আর এখন কয়েক সপ্তাহের জন্য ছবিটি হল থেকে তুলে নাও।’ বন্ধুর পরামর্শমত পরিচালক ডেকে পাঠালেন সুরকার কল্যাণজী আনন্দজীকে। আরেকটা গান চাই। তবে একটু নতুন ধরণের।সুরকার ভাইয়েরা ভাবছেন এত চটজলদি কি গান বাঁধবেন। একথা জানতে পেরে ওদের ছোট ভাই বাবলা বললেন, ‘কোনও চিন্তা নেই। পরিচালক বারট ছবিটি নিয়ে জুয়া খেলছেন। এস, আমরাও তাই করি। পরিচালককে বলে সেই ‘বনারসী বাবু’-র বাতিল গানটা ঢুকিয়ে দাও এই ছবিতে।’ শেষপর্য্যন্ত পরিচালক অমিতাভকে খুলে বললেন সমস্ত বিষয়। অমিতাভ এককথায় রাজী হলেন। গানের দৃশ্যের শ্যুটিং হল। ছবি আবার মুক্তি পেল।

দ্বিতীয় দফা মুক্তির পরে ছবি সুপারহিট।ছবির দৃশ্যপট, এ্যাকশন, অন্যান্য গান তো ছিলই। কিন্তু নতুন গানেই বাজিমাত। পরদা জুড়ে অদ্ভুত মুখব্যাদানে অমিতাভ গাইছেন- ‘খাইকে পান বনারসবালা/ খুল যায়ে বন্ধ অকল কি তালা’…..আর দর্শকরা তুমুল হাততালিতে ঝড় তুলছেন। সারাদেশ কল্যাণজী আনন্দজীর সুরে গুনগুন করছেন ‘খাইকে পান…।কিন্তু অমিতাভকে এর জন্য কম খেসারত দিতে হয়নি। এই গানের দুদিনের শ্যুটিং-এ ঠোঁটের স্বাভাবিক লাল রঙ রাখতে পরিচালকের অনুরোধে রোজ ১৫/২০ টি পান খেতে হত তাঁকে। তারপর এক সপ্তাহ তাই ভালভাবে খাবার খেতে পারেন নি। কারণ, চূণের দংশনে জিভ জ্বলে যায়।
চার
সাল ২০০৩। বিখ্যাত পরিচালক যশ চোপড়া প্রায় ছ’বছর পরে আবার নতুন ছবি তৈরিতে হাত দিয়েছেন। গল্প, নায়ক-নায়িকা সব চুড়ান্ত হয়ে গেছে। কিন্তু সঙ্গীত পরিচালকের দায়িত্ত কাকে দেবেন ভেবে কূলকিনারা পাচ্ছেন না। একসময় যশরাজ ফিলমস্-এর সি.ই.ও কোহলি-কে ডেকে এই সমস্যা সমাধানে কী করা যায় তার পরামর্শ চাইলেন। যশের বক্তব্য, এখন বিদেশী সুরের দাপটে কান ঝালাপালা হয়ে যাচ্ছে । আমার ছবিতে পুরনো মেলডি চাই। পাঁচ বা ছয়ের দশকের মত সুর চাই, যা মানুষ আজও ভোলেনি। স্থানীয় লোকসঙ্গীতের দাপট চাই। আর চাই ভারতীয় তালবাদ্য, বাঁশি, বেহালা, পিয়ানো, সেতার, সানাইয়ের সমাহার। চোখের সামনে তো তেমন কেউ নেই। কোহলি-কে একদিন ভেবে দেখার সময় দিলেন। এই ছেলেটির উপর যশ আর আদিত্য চোপড়ার খুবই আস্হা ছিল। একসময় পলিডর ও এইচ এম ভি-র উঁচুপদে কাজ করতেন।নতুন নতুন আ্যলবাম বের করতেন। এরপর যশের সঙ্গে নতুন কম্পানী তৈরী করে নবীন প্রতিভাদের সুযোগ দিয়ে টেলি শো চালু করেন- ‘মেরি আওয়াজ শুনো’। খুবই জনপ্রিয় হয় সেই গানের অনুষ্ঠান।

কোহলি ভেবে চলেছেন। বাবার কথা হঠাৎ মনে এল। কত ছবিতে তিনি সুর দিয়েছেন। তা প্রায় ১২০টি ছবিতে। কিন্তু দশ শতাংশ ছবিও বক্স অফিসে দাগ কাটেনি। গান ভাল হলেই কী ছবি চলে ? দর্শকদের পছন্দের নায়ক, নায়িকা, ভিলেন, নর্তকী চাই। ভাল লোকেশন, ডায়লগ, কমেডিয়নও চাই। বাবা তো বিগ বাজেটের, প্রথম শ্রেণীর নায়ক-নায়িকা আছে, এমন ছবি পেতেন না। কারণ, সব নায়কই তখন পছন্দের সঙ্গীতকার বেছে নিয়েছেন। যেমন, দিলীপ কুমারের নৌশাদ, রাজকাপুরের শঙ্কর জয়কিষণ, শাম্মীকাপুরের শঙ্কর জয়কিষণ, নয় ওপি নায়ার। দেবানন্দের এস.ডি. বর্মণ, ইত্যাদি। বাবা গুরু দত্ত, ভারত ভূষণ, মনোজ কুমার, প্রদীপ কুমারদের ছবিতে সুর দিতেন। বহু আগে এক-আধ বার দিলীপ সাহেব, রাজকাপুরের ছবিতে সুর দিয়েছেন। কিন্তু সেসব ছবি চলেনি। তাই বাবা জীবিতকালে বিশেষ স্বীকৃতি পাননি। কিন্তু মারা যাওয়ার(১৯৭৫) পরে দু-দুটো ছবির গান সুপারহিট হয়। তাঁর আগের হিট ছবি ছিল – ও কৌন থী, আনপড়, আদালত, জাহানারা, হকিকত, মেরা সায়া, ইত্যাদি। এখন আবার লায়লা মজনু আর মৌসম-কে ঘিরে প্রশংসার বন্যা বয়ে গেল। কিন্তু তিনি তো আর বেঁচে নেই। তবে হ্যাঁ। বাবা মারা যাওয়ার পরে তাঁর গানের ঘর আর আলমারি পরিস্কার করতে গিয়ে দেখা যায় প্রচুর ক্যাসেট আর টেপ রেকর্ডারের স্পুলে বহু সুর তিনি রেখে গেছেন। যেগুলির ব্যবহার কোনও ছবিতে হয়নি। কোনটি হারমোনিয়মে, কোনটি পিয়ানোয়, কোনটি বা নিজের খালি গলাতে তোলা। সময়ের ছোবলে বেশ কিছু নষ্ট হয়ে পড়েছে। তবে এখনও চলতে পারে এমন সুরের সংখ্যাও নেহাত কম নয়। কোহলি এসব ভাবতে ভাবতে শুয়ে পড়েছে।

পরের দিন যশ চোপড়াকে সবকিছু খুলে বলতেই তিনি আনন্দে লাফিয়ে উঠলেন।বিস্ফারিত চোখে বললেন, ‘মদনমোহনজির সুর! তুমি একমাসের মধ্যে দশটা সুর বেছে দাও’। যথাসময়ে ন’টা সুর মনোনীত হল। কিন্তু গান লিখবেন কে আর গাইবেন বা কারা? শেষ পর্য্যন্ত গীতিকার, গায়ক-গায়িকা নির্বাচন থেকে মিউজিক আ্যারেনজার সব কিছুর ভার কোহলির কাঁধেই চাপল। গীতিকার জাভেদ আখতার, গাইলেন লতা মঙ্গেশকর, উদিত নারায়ণ, সোনু নিগম, রূপ কুমার রাঠোর, গুরুদাস মান, পৃথা মজুমদার, প্রমুখ। লতাজির বয়স তখন ৭৫, আর নায়িকা প্রীতি জিনটার বড় জোর ২৫ বছর। লতাজি মদনমোহনের সুরে বহু জনপ্রিয় গান গেয়েছেন।এবার তাঁর ‘মদন ভাইয়া’-র মৃত্যুর ২৮ বছর পরে তাঁরই সুরে গান গাইবেন ভেবেই কান্নায় ভেঙে পড়লেন। এমন ঘটনা আর কারুর জীবনে তো ঘটেনি। আর উদিত নারায়ন, রূপ কুমার, সোনু নিগমের মত এই প্রজন্মের গায়কেরা ৫০/৬০ বছরের পুরনো সুরে কখনও এককভাবে, আবার কখনও লতাজির সাথে দ্বৈতকণ্ঠে গাইছেন, তা ভাবা যায়! ২০০৪ সালে ‘বীর জারা’ মুক্তি পায়। যশের ছবি প্রয়াত মদনমোহনের সুরে যশলাভ তো করলই।এমনকি, ছবি তৈরিতে ২ কোটি ৩০ লক্ষ টাকা খরচ করে ধনলাভ হল ৯ কোটি ৭৪ লক্ষ টাকা।
ভারতের সিনেমা জগতে এক অবিশ্বাস্য ইতিহাস তৈরী হল। আর যার সুরের ভান্ডার এই ইতিহাসের অন্যতম নেপথ্য কারিগর , তিনি ২৯ বছর আগেই আকাশের ওপারে আরেক আকাশে চলে গেছেন।