মৃত্যুমুখে আকবর, অভিজাতদের পক্ষ ত্যাগ, সেলিমের ক্ষমতা দখল আগরায় জেসুইট সন্তের অভিজ্ঞতা : বিশ্বেন্দু নন্দ
এলাহাবাদে ঘাঁটিগেড়ে বসা আকবরের বিদ্রোহী পুত্র শাহজাদা সেলিম, ভবিষ্যতের সম্রাট জাহাঙ্গির, দক্ষিণ থেকে ফেরার সময় সাম্রাজ্য তাত্ত্বিক, সম্রাটের অন্যতম প্রধান বন্ধু, দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস রচনার কাঠামো তৈরির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব আবুলফজলকে হত্যা করলে আকবর অসুস্থ হয়ে পড়েন। আকবরের অসুস্থতা নিয়ে সাম্রাজ্যে নানান গুজব ছড়িয়ে পড়ে। তার মধ্যে অন্যতম প্রধান গুজবটি ছিল সম্রাটকে বিষ দেওয়ার।
সম্রাটকে বিষ দেওয়ার গুজবটি জেসুইট পাদ্রিরা তাদের দেশে পাঠানো চিঠিতে উল্লেখ করে লিখছে ‘কয়েক বছর আগে বিষের প্রভাব [সম্রাটের দেহে] এখন কাজ করছে’। মাথায় রাখতে হবে সম্রাটকে খ্রিষ্টধর্মে দীকজখা দেওয়ার জন্যে পাদ্রিরা খুবই ক্রিয়াশীল ছিল। সম্রাটের সঙ্গে কথাবার্তায় তাদের মনে হয়েছিল সম্রাট আকবরের খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ সময়ের অপেক্ষা। সম্রাটের জীবনের শেষ দিনগুলোতে তাদের এই ধারণা আরও প্রবল হয়।
আগ্রায় অবস্থিত জেসুইটদের লাহোর মিশনের পক্ষ থেকে লেখা হল, আমাদের এক সাথীকে নিয়ে পাদ্রি জেভিয়ার সক্কাল সক্কাল ঝরোখায় (পরিবর্ত জানালা বা ao lugar da janela) সম্রাটকে দেখতে গেলেন। কিন্তু সম্রাট সেদিন ঝরোখায় অনুপস্থিত। তারা আন্দাজ করলেন সম্রাট নিশ্চই আবারও অসুস্থ হয়েছেন। সম্রাটের অসুস্থতার ওষুধ নিয়ে তাকে দেখতে যাওয়ার বাহানায় তারা কেল্লায় ঢোকার চেষ্টা করলেও, প্রথমে তাদের আর পরের দিকে আকেরকদা যুবক পর্তুগিজদের দলকে কেল্লায় ঢুকতে দেওয়া হল না।

জেসুইটরা লিখছে, ‘সেলিম একবারের জন্যেও বাবাকে দেখতে এলেন না। কেউ কেউ বলেন তার বাবা আকবর জানতেন সেলিম তাকে বিষ খাইয়েছেন, হয়ত আকবরও তাঁর সঙ্গে দেখা করতে হয়ত ইচ্ছুক ছিলেন না। অন্যদের বয়ান হল সেলিম জানতেন বাবা অসুস্থ, কিন্তু তিনি নিরাপত্তার জন্যে বাবার সঙ্গে দেখা করেন নি; অসুস্থ বাবার ঘরের বন্ধ দরজার পিছনে থাকতে চান নি। কারন শাহজাদার আশংকা অভিজাত মনসবদার সেনাপতি শালা, শাহজাদার স্ত্রী, তার বোনকে নিয়ে সম্রাটের ঘনিষ্ঠরা অতীতের মত তার ওপর নতুন করে আক্রমন শানাতে পারেন। শাহাজাদা স্বামীর প্রতি ঈর্ষা বশত স্ত্রী স্বয়ং বিষ সেবন করে আত্মহত্যা করেছেন; শাহজাদার অভিজাত মনসবদার সেনাপতি শালা বর্তমানে অসুস্থ সম্রাটের কাছের মানুষ; তিনি শাহজাদার জায়গায় শাহজাদার বড় ছেলে, তার ভাগ্নেকে সিংহাসনে বসাতে মরিয়া। অভিজাত মনসবদার সেনাপতি তার পাশে আরেক মুসলমান অভিজাতকে পেয়েছেন, যার কন্যা শাহজাদার সেই পুত্রকে বিয়ে করেছে। অন্যান্য অভিজাত এবং মুসলমানেরাও একই ধারায় চিন্তা করেন। সম্রাটও যেহেতু এইভাবেই ভাবেন তাই শাহজাদা বাবার সঙ্গে কেল্লায় দেখা করতে যেতে ভয় পাচ্ছেন, পাছে তাকে সেখানে কয়েদ করা হয়’ (জাহাঙ্গিরের স্ত্রীর মৃত্যু নিয়ে জাহাঙ্গিরের বয়ানের জন্যে হুইলরার থ্যাকস্টোনের অনুবাদে জাহাঙ্গিরনামা দেখুন)।
ওপরে উল্লিখিত যে ব্যক্তিদের কথা আলোচিত হয়েছে তারা হলেন শাহজাদা সেলিমের শালা রাজা মান সিংহ, সেলিমের পুত্র খুসরুর মামা এবং খান-ই-আজম মির্জা আজিজ কোকা (কোকা সম্বন্ধে নুরজাহান এম্প্রেস অব মুঘল ইন্ডিয়াতে এলিসন ফিন্ডলি লিখছেন আকবরের তুতোভাই মির্জা আজিজ কোকা ছিলেন নানান বয়সী হারেম [আমরা জেনানা লিখি] মহিলার খুবই কাছের মানুষ। জাহাঙ্গিরের বিদ্রোহী পুত্র খুসরুর সঙ্গে তাঁর কন্যার বিয়ে হয়। খুসরুর বিদ্রোহে তার শ্বশুরের হাত ছিল প্রথম থেকেই সন্দেহ করে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ায় প্রকাশ্য দরবারে জাহাঙ্গিরকে বলেন ‘মহামহিম, জেনানায় প্রত্যেকজন বেগম মির্জা কোকার পক্ষ নিচ্ছেন। আপনি এক্ষুণি জেনানায় যান, না হলে আমরা প্রত্যেকে আপনার সামনে দল বেঁধে উপস্থিত হচ্ছি’। জাহাঙ্গির কাকাকে বাধ্য হয়ে ক্ষমা করে দেন। সালিমা সুলতানার জন্যে কোকার প্রাণ বাঁচল।)। মাথায় রাখতে হবে যদিও বাজারি গুজবের ওপর নির্ভর করে পর্তুগিজরা মুঘল ইতিহাস লিখেছেন, কিন্তু আকবরের মৃত্যুর সময়কার তাদের বয়ান ঘটমান বর্তমানের কাছাকাছিই ছিল।

জেভিয়ার লিখছেন ‘রাজার স্বাস্থ্যের অবস্থা খারাপ হতে থাকে’। তার দাবি, ক্রমশ ঘটনাবলীর নিয়ন্ত্রণ সম্রাটের হাতের বাইরে বেরিয়ে যাচ্ছিল, ‘এক রাতে সেলিম বাবাকে দেখতে এলেন, যদিও কেল্লায় তার বিরোধীপক্ষের সংখ্যাই বেশি, কেল্লার দরজাও তার নিয়ন্ত্রণে ছিল না, কিন্তু জনগণের সনুভূতি তার পক্ষে ছিল’। কারন জেসুইটেরা মনে করত সেলিম ছিলেন ‘মুক্তমনা এবং বিচারদায়ী’ এই জন্যেই তিনি একে একে আমীরের মন জয় করেন। জেভিয়ার লিখছেন ‘যে সব মুসলমান আমীর সম্রাটের নাতিকে সিংহাসনে বসাতে বদ্ধ পরিকর ছিল, তারাও সব দিক বিবেচনা করে (et omnibus pensatis) মন পাল্টে সিংহাসনের অধিকারীকেই সিংহাসনের অধিকার দেয়ার সিদ্ধান্ত নিল। তাদের একদল প্রতিনিধি হিসেবে সেলিমের সঙ্গে দেখা করে এ তাদের মত পাল্টানের কথা জানিয়ে দেয়, তার পুত্র বা অন্যকে সিংহাসনের দাবিদার হিসেবে আর গণ্য করছেন না; তিনি [সেলিম] যদি মুসলমানদের আইন রক্ষা করেন তাহলে তারা তাকে সাম্রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ তুলে দিতে রাজি। তিনি প্রত্যেকের কাছে কসম করলেন। সেই সন্ধ্যাতেই সম্রাটের নাতির অভিজাত মামা এবং তার শ্বশুর, সেলিমের কাছে তার পুত্রকে এনে তার কদমবুসি করাল এবং তারাও একই কাজ করল। সেই মুহূর্তে শাহজাদা কেল্লা মুখে পুরোনো রক্ষী সরিয়ে নিজের বিশ্বস্ত রক্ষী মোতায়েন করার নির্দেশ দিয়ে পরের দিন সঙ্গী নিয়ে সম্রাটকে দেখতে গেলেন’।