উত্তরপ্রদেশ বিধানসভা ভোটের দু’দফা ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। রবিবার হল তৃতীয় দফার ভোট। ২০২৪-এ লোকসভা ভোটের আগে উত্তরপ্রদেশের বিধানসভা ভোটের দিকে তাকিয়ে রয়েছে গোটা দেশ। অন্যদিকে বিজেপির জন্য এই ভোট অ্যাসিড টেস্ট বলা যায়। পাশাপাশি সপার জন্যও এই ভোট বড় পরীক্ষা। গোবলয়ে তৃতীয় দফায় রবিবাসরীয় নির্বাচনে অখিলেশের অগ্নিপরীক্ষা, অন্যদিকে প্রথমবার বিধানসভার ভোট লড়তে নেমেছেন যোগী আদিত্যনাথ।
উত্তরপ্রদেশের এই ভোট পর্ব ছিল বুন্দেলখণ্ড থেকে অবধ প্রদেশে। গোটা এলাকার বেশিরভাগটাই সমাজবাদী পার্টির যাদব-গড় হিসাবে পরিচিত। বহুকাল ধরেই এই এলাকা মুলাময়ম সিংয়ের পরিবারকে নিরাশ করেনি। অন্তত ২০১৭ সাল পর্যন্ত সেরকমই লক্ষ্য করা গিয়েছে। তবে যাদব-বলয়ের পোক্ত গড়ে ২০১৭ সালে যাদব বলয়ের ২৯ টি আসনের মধ্যে ২৩ টি আসন বিজেপি দখলে আনে, সমাজবাদী পার্টি পায় ৬ টি। ২০১২ তে এই যাদব-গড়ে সমাজবাদী পার্টি পেয়েছিল ২৫ টি ও বিজেপি পেয়েছিল মাত্র ১ টি ভোট। এবার এই এলাকার মধ্যে অন্যতম কেন্দ্র মৈনপুরি এলাকার কারহাল। সেখানে ভোটে লড়লেন খোদ যাদবকুলের সেনাপতি তথা সমাজবাদী পার্টির নেতা মুলায়াম-পুত্র অখিলেশ।
অখিলেশ ২০১২ সালে আইন পরিষদের সদস্য হয়ে দেশের সর্ব কনিষ্ঠ মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে লখনউ-এর গদিতে বসেছিলেন। এবারের বিধানসভা ভোটে তিনি লড়বেন না; এমনই পরিকল্পনা ছিল। শুরুতে জানিয়েওছিলেন যে এবার তিনি ভোটের লড়াইতে নামবেন না। শেষ পর্যন্ত তিনি জানান মইনপুরী জেলার কারহাল কেন্দ্র থেকে তিনি লড়ছেন।
কেন্দ্রটি সমাজবাদী পার্টির শক্ত ঘাঁটি। ১৯৬৭ থেকে ৯৩ পর্যন্ত মুলায়ম সিং যাদব এখানকার বিধায়ক ছিলেন। মাঝের দু’বছর বাদ দিলে সমাজবাদী পার্টিই এখানে জিতে এসেছে। স্বভাবতই অখিলেশের নিজেদের হোম গ্রাউন্ডে। অখিলেশের হোম গ্রাউন্ডে গোল দেওয়ার জন্য গেরুয়া শিবির হিসেব নিকেশ করেই দলিত নেতা এবং সাংসদ এসপি বাঘেলকে প্রার্থী করেছে।
অন্যদিকে অগ্রার সাংসদ বাঘেল সপার ঘরের পুরনো নেতা। গত কয়েকমাস ধরে অখিলেশ নিজের হয়ে যেমন, তেমনি দলের হয়ে বিজেপির বিরুদ্ধে একটানা প্রচার চালিয়েছেন। মানুষের সামনে বারবার বলার চেষ্টা করেছেন যে তাঁদের সরকার অনেক ভালো ছিল। গেরুয়া শিবিরের ভুল ত্রুটি চোখে আঙুল দিয়ে দেখানোর চেষ্টা করেছেন। মোট কথা গেরুয়া শিবির যেমন নিজেদের গদি ধরে রাখতে মরিয়া, তেমনি ক্ষমতা পুনরুদ্ধারের পালটা লড়াইয়ে সপা। অখিলেশ না যোগী কার কথা মানুষ কতটা গ্রহণ করেছেন, তা আজই মানুষ জানিয়ে দিয়েছেন।
যাই হোক যাদব পরিবারের শক্ত ঘাঁটি মইনপুরীর কারহাল আসনে এদিন ফাইট দিলেন সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদব। ১৯৯২ সালে সপা গঠনের পর থেকে মাত্র একবার তারা এই আসনটিতে হেরেছে। রবিবার যে ৫৯টি আসনের ভোট হল, ২০১৭ সালের বিধানসভা নির্বাচনে এই ৫৯ টি আসনের মধ্যে বিজেপি পেয়েছিল ৪৯টি আসন এবং সমাজবাদী পার্টি জিতেছিল ৯টি। কংগ্রেস জেতে একটি আসন এবং কোনও আসন পায়নি বহুজন সমাজবাদী পার্টি। এই দফায় অন্যান্য বিশিষ্ট প্রার্থীরা হলেন এসপি প্রধানের কাকা শিবপাল সিং যাদব (যশবন্তনগর আসন), বিজেপির সতীশ মাহানা (কানপুরের মহারাজপুর), রামবীর উপাধ্যায় (হাথরাসের সাদাবাদ), অসীম অরুণ (কনৌজ সদর) এবং কংগ্রেসের লুইসি খুরশিদ (ফারুখাবাদ সদর)। লুইসি খুরশিদ প্রবীণ কংগ্রেস নেতা এবং প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সালমান খুরশিদের স্ত্রী।
রবিবারের তৃতীয় দফার পর উত্তরপ্রদেশের ৪০৩টি বিধানসভা আসনের প্রায় অর্ধেক ভোট সম্পূর্ণ হল। ২০১৭ সালে দক্ষিণ উত্তরপ্রদেশের বুন্দেলখণ্ড অঞ্চলে ১৯টি আসনের সবকটিই জিতেছিল বিজেপি। তার আগে বিএসপির শক্ত ঘাঁটি ছিল এই এলাকাটি। মধ্য উত্তরপ্রদেশ বরাবরই এসপির শক্ত ঘাঁটি। তারা এবারের নির্বাচনে বেশ কিছুটা সুবিধাজনক জায়গায় রয়েছে, আশা করা যায় এখানকার আসনগুলিতে তারা বড় ব্যবধানে জয়লাভ করতে পারবে।
প্রসঙ্গত, উত্তরপ্রদেশ বিধানসভা কেন্দ্রের মধ্যে কারহাল এবং গোরখপুর (শহর), দু’টি কেন্দ্রের মধ্যে রয়েছে বিরাট ফারাক। মইনপুরী জেলার কারহাল কেন্দ্রে সমাজবাদী পার্টির অখিলেশ যাদব লড়ছেন ত্রিমুখী লড়াই। অন্যদিকে, গোরখপুর আসন থেকে মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের সামনে রয়েছেন মোট ১৩ জন প্রার্থী। এই প্রথম বিধানসভা নির্বাচনে লড়লেন অখিলেশ। আর আদিত্যনাথ লড়বেন ৩ মার্চ ষষ্ঠ দফায় গোরখপুর আসনে। কারহালে প্রায় ১.৪০ লক্ষ যাদব ভোটার। তার মধ্যে ওবিসি ভোটার প্রায় ৬০,০০০, ব্রাহ্মণ এবং ঠাকুর ভোটার ২৫,০০০ জন, দলিত ভোটার ৪০,০০০ এবং মুসলিম ভোটার রয়েছেন ১৫,০০০ জন। রবিবারের ভোটের আরেকটি কেন্দ্র হাথরাস। ২০২০ সালের গণধর্ষণের পর এই এলাকার ভোট মানচিত্র কোনদিকে যাবে সেদিকে তাকিয়ে দেশ।
এবারের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি বিরোধী প্রচারে বিরোধীরা বারবার সামনে এনেছে হাথরাস-উন্নাওয়ের মতো ঘটনাগুলো৷ রাজনৈতিক
মহলের মতে, ভোটাররা বিজেপির থেকে মুখ ফেরালে সেটা বিএসপি-র ঝুলিতে ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল৷
দক্ষিণ উত্তরপ্রদেশের বুন্দেলখণ্ড অঞ্চলে বিজেপি ২০১৭ সালে ১৯ টি আসনের সবকটিই জিতেছিল। আগে বিএসপির শক্ত ঘাঁটি ছিল এই
এলাকাটি। মধ্য উত্তরপ্রদেশের আসনগুলি বরাবরই এসপির শক্ত ঘাঁটি এবং এই নির্বাচনে সুবিধাজনক জায়গায় থাকার জন্য সপা’কে আসনগুলিতে বড় ব্যবধানে জয়লাভ করতে হবে।